জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, আগামী জুলাইয়ের মধ্যে জাতীয় সনদ তৈরির ব্যাপারে আশাবাদী কমিশন। আগামী জুন মাসের প্রথম সপ্তাহেই দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন। আর সেই আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় সনদের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে। সাংবিধানিক কিছু মৌলিক ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে এখনো ঐকমত্য না হলেও তত্ত্বাবধায়ক ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠাসহ অনেক বিষয়েই তারা একমত হতে পেরেছেন। মত ভিন্নতা থাকা মৌলিক ইস্যুগুলোতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা এবং সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নির্ধারণে রাজনীতিবিদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। কারণ সংবিধান কীভাবে সংস্কার হবে, সংস্কারের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করার দায়িত্ব কমিশনের নয়, রাজনৈতিক দল ও সরকারের।
সোমবার (২৬ মে) সংসদ ভবন এলাকার এলডি হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রথম ধাপের কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, ড. ইফতেখারুজ্জামান, বিচারপতি এমদাদুল হক, মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে ড. আলী রীয়াজ কমিশনের কার্য অগ্রগতি তুলে ধরেন। তাতে পুলিশ সংস্কার কমিশন ছাড়া বাকি ৫টি কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর ঐকমত্য কমিশনের সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় কোন কোন বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে আর কোন কোন বিষয়ে তারা এখনো একমত হতে পারেননি তা তুলে ধরেন। জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কমিশনের প্রথম পর্বের এই বৈঠকগুলো ছিল অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। গত ২০ মার্চ থেকে ১৯ মে ২০২৫ পর্যন্ত সংস্কার ইস্যুগুলো নিয়ে মোট ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ৪৫টি অধিবেশন করেছে কমিশন। আলোচনার সুবিধার্থে কয়েকটি দলের সঙ্গে তারা একাধিক দিনও বৈঠক করেছেন।
প্রথম ধাপের আলোচনায় সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু মৌলিক ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এখনো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি বলে জানান ড. আলী রীয়াজ। সেগুলো মধ্যে রয়েছে- বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণের কাঠামো, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন, একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কতবার নির্বাচিত হতে পারবেন, একজন সংসদ সদস্য কতগুলো পদে থাকতে পারবেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া কী হবে, সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া কী হবে, এই ধরনের মৌলিক কাঠামোগত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো অমীমাংসিত। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে হবে সেই প্রশ্নেও অনেকের রয়েছে ভিন্ন মত। তবে এসব বিষয়ে অনেক দলই আরও আলোচনায় বসার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
আলী রীয়াজ জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠাসহ অনেক বিষয়েই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো রকম দ্বিমত নেই। সংবিধান বিষয়ে ঐকমত্য বা আংশিক ঐকমত্য আছে-তার মধ্যে সংবিধানে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, বহুত্ববাদ এবং গণতন্ত্র’ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবে ‘বহুত্ববাদ’ না রাখার ব্যাপারে বেশিরভাগ দল মতামত দিয়েছে।
সংসদ ভবনের এলডি হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রথম ধাপের কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সংবাদ সম্মেলনে ড. আলী রীয়াজ। ছবি: খবরের কাগজ
অন্য ৪টি মূলনীতির ব্যাপারে এক ধরনের ঐকমত্য আছে। তবে অনেক দল এর বাইরে আরও বিষয় যুক্ত করার কথা বলেছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নির্ধারণে সংবিধানের ৪৮(ক) অনুচ্ছেদ সংশোধন, দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠনের ব্যাপারে অধিকাংশ দল নীতিগতভাবে একমত। কিছু দল এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা বহাল রাখার পক্ষেও মত দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে হবে, সেই প্রশ্নে রয়েছে ভিন্ন মত।
এছাড়া প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা, ডেপুটি স্পিকারের পদ বিরোধী দল থেকে দেওয়া, বিদ্যমান পাবলিক সার্ভিস কমিশন পুনর্গঠন করে ৮ সদস্য বিশিষ্ট তিনটি পাবলিক সার্ভিস গঠন ও নিম্নকক্ষে নারীদের জন্য ১০০ আসন সংরক্ষণের প্রশ্নে এক ধরনের ঐক্যমত রয়েছে দলগুলোর। তবে সেটা পদ্ধতি কী হবে তা নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, অর্থাৎ সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেবার ক্ষেত্রে যে বিধান, তা পরিবর্তনের ব্যাপারে ঐকমত্য হলেও- কী কী বিষয়ে দলের পক্ষে ভোট দেওয়া বাধ্যতামূলক হবে, তার একটি আংশিক তালিকার ব্যাপারে ঐকমত্য হয়েছে। অর্থ বিল, আস্থা ভোট, সংবিধান সংশোধন বিলের ব্যাপারে দলীয় অনুশাসনের বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে বেশিরভাগ দল একমত, এর অতিরিক্ত আরও কিছু যুক্ত করার, যেমন-রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিষয়ক বিল যুক্ত করার জন্যেও কিছু দলের প্রস্তাব আছে। এছাড়া আইনসভার গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতিত্ব পদ বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের দেওয়ার ব্যাপারে প্রায় সবাই একমত। এছাড়া বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করার জন্য সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সংশোধন করার সুপারিশের বিষয়ে দলগুলো একমত পোষণ করেছে।
তিনি জানান, মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার প্রশ্নে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে দলগুলো। এর আইনি দিক বিবেচনার জন্যে অধিকাংশ দল গুরুত্ব দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কিংবা শপথ ভঙ্গ করলে মেয়াদ শেষে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করবে প্রস্তাবিত সংসদীয় কমিটি। এরপর সেই কমিটি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ পাঠাবেন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে। এ বিধানের বিষয়ে বেশিরভাগ দল নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। বর্তমান পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে পুনর্গঠন করে তিনটি পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন করার ব্যাপারে বেশিরভাগ দল নীতিগতভাবে একমত। দুদকের স্বাধীনতা, কার্যকারিতা ও গতিশীলতার পাশাপাশি এর স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার জন্য প্রস্তাবিত সব সুপারিশ সম্পর্কে প্রায় সব দলই সম্পূর্ণ একমত। জুলাই অভ্যুত্থানে গণহত্যা ও নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত এবং ভোট জালিয়াতি ও দুর্নীতির সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন প্রশ্নে অধিকাংশ দল একমত পোষণ করেছে।
ড. আলী রীয়াজ আরও জানান, সংস্কারের ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে খুব শিগগিরই দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা শুরু করার প্রস্তুতি চলছে কমিশনের। আলোচনায় এই পর্বে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি বা দলগুলোর অবস্থান কাছাকাছি সেসব বিষয় আলোচিত হবে। এছাড়া আলাদা করে নয়, রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে বিষয় ভিত্তিক আলোচনা করবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সকল বিষয়ে হয়তো ঐকমত্য হবে না, কিন্তু যেসব মৌলিক বিষয়ে এখনো মতভিন্নতা রয়েছে সেসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা করবে কমিশন।
অন্তবর্তী সরকার ২০২৪ সালের অক্টোবরে ৬টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। এই কমিশনগুলো গত ফেব্রুয়ারিতে তাদের সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদন সরকারের কাছে পেশ করে। এসব প্রতিবেদনের সুপারিশের বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারি যাত্রা করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এই কমিশনের দায়িত্ব হলো রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো এবং একটি ‘জাতীয় সনদ’ প্রণয়ন করা। তারা সংবিধান সংস্কার কমিশন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন এবং জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ১৬৬টি সুপারিশের বিষয়ে ৩৮টি রাজনৈতিক দল ও জোটের মতামত জানতে চায়- যাদের মধ্যে ৩৩টি মতামত জানায়।
এলিস/মাহফুজ