পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে শনিবার (৩১ মে) সকাল ৬টা থেকে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। কমলাপুরের ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন থেকে গতকাল ৪৩টি আন্তনগর ট্রেন ছেড়ে গেছে বিভিন্ন গন্তব্যে। এ ছাড়া বিভিন্ন রুটে মেইল, কমিউটার ট্রেনও ছেড়ে গেছে কমলাপুর থেকে।
আন্তনগর ট্রেনগুলোর মধ্যে শুধু রংপুর এক্সপ্রেস ২০ মিনিট দেরিতে ছেড়েছে। এ ছাড়া অন্য ট্রেনগুলো যথাসময়েই ছেড়েছে ঢাকা স্টেশন।
তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়াগামী তিতাস কমিউটার, চট্টগ্রামগামী কর্ণফুলী কমিউটার, জামালপুরগামী জামালপুর কমিউটার, মোহনগঞ্জগামী মহুয়া কমিউটার, চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী চাঁপাই কমিউটার, খুলনাগামী নকশিকাঁথা কমিউটার আর জয়দেবপুরগামী তুরাগ কমিউটার ট্রেনগুলো যথাসময়ে না ছাড়ায় ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে যাত্রীদের।
নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে সোনালি পেপার মিলের কর্মী মো. আশরাফুল ইসলামের পরিবারের তিন সদস্যকে বিদায় জানাতে এসেছিলেন কমলাপুরে। তারা যাচ্ছিলেন সিরাজগঞ্জের লাহিড়ী মোহনপুর। আন্তনগর ট্রেনের স্টপেজ নেই বলে তাদের কমিউটার ট্রেনেই যাত্রা করতে হয়। অবশ্য রাজশাহী কমিউটারের পরিবেশ নিয়ে খুব আপত্তি নেই তার। আশরাফুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি আজকে আমার পরিবারকে পাঠাচ্ছি। আমি যাব দুই দিন পর। আন্তনগর ট্রেনে গেলে সেই সিরাজগঞ্জে গিয়ে নামতে হবে। বাড়ির পাশের স্টেশনে লোকাল ট্রেন থামে। তাই রাজশাহী কমিউটারই আমাদের ভরসা।’
চট্টগ্রামগামী কর্ণফুলী কমিউটারে যাত্রী রোকসানা আক্তার বলেন, ‘মেইল ট্রেনে একটু খরচ কম বলে আমরা সব সময় কর্ণফুলী ট্রেনেই মিরসরাই যাই। কিন্তু আজকে আমি টিকিট কাটলাম চারটা, কিন্তু সিট দিল তিনটা। কাউন্টারে এ নিয়ে জানতে চেয়েছিলাম। আমাকে বলেছেন, যেতে হলে যান, না গেলে টিকিট ফেরত দিন।’
কমিউটার ট্রেনের এমন ভোগান্তির কথা শোনান রাজশাহী কমিউটারের যাত্রী আজমিনা আক্তার বৃষ্টি। তিনি বলেন, ‘আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাব। আন্তনগর ট্রেনে টিকিট পাইনি বলে কমিউটারে যাচ্ছি। আমার সঙ্গে মা ও বোন আছে। আমরা তিনটা টিকিট কেটেছি, কিন্তু সিট পেয়েছি দুটি। কমিউটার ট্রেনে কাছের এলাকায় গেলে এমনটা করত আগে। এখন একেবারে লাস্ট স্টপেজের যাত্রীদের সঙ্গেও তারা এমনটা শুরু করেছেন। আমরা যাত্রীরা ঈদ মৌসুমে বড় অসহায়।’
কমিউটার ট্রেনগুলোর সেবা নিয়েও অনেক প্রশ্ন আছে যাত্রীদের। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ট্রেনগুলোর বগির পরিবেশ, ওয়াশরুম নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। তিতাস কমিউটারের যাত্রী চয়ন ইসলাম বলেন, ‘বগিতে ফ্যান চলে তো লাইট ফিউজড। লাইট জ্বলছে তো ফ্যান চলে না। আর ওয়াশরুমের বাজে গন্ধে সেগুলো ব্যবহারের একেবারে অনুপযোগী। আন্তনগর ট্রেন আমাদের এলাকায় থামে না বলে এই ট্রেনে যাচ্ছি। না হলে এমন বাজে ট্রেনে কেউ জার্নি করেন?’
টিকিট অব্যবস্থাপনার বিষয়ে মেইল-কমিউটার ট্রেনের কাউন্টারে কথা বলতে গেলে কাউন্টারম্যাননরা কোনো মন্তব্য করবেন না বলে জানান।
তবে গতকাল আন্তনগর ট্রেনে ঈদযাত্রায় ছিল স্বস্তির আবহ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে যাচ্ছিলেন নেত্রকোনা। তিনি জানান, ঈদযাত্রায় পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘরে ফেরার পথে ট্রেন যাত্রাকেই প্রাধান্য দেন। তার দুই বোনও ট্রেনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তিনি বলেন, ‘ট্রেনে কোনো ভোগান্তি পোহাতে হয় না। বাসে গেলে তো মহাখালী থেকে সেই শ্রীপুর পর্যন্ত জ্যাম লেগে থাকে। এবার স্টেশন বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। তেমন চাপও দেখছি না আজকে।’
নাটোরের আব্দুলপুর সরকারি কলেজে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন সৌরভ হোসেন শাকিল। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সারাইয়ের ব্যবসা আছে। ঢাকা থেকে কিছু যন্ত্রাংশ কিনে তিনি যাচ্ছিলেন বাড়ি। সিল্কসিটি এক্সপ্রেসের টিকিট আগেই কেটেছিলেন। তবে তিনবারের প্রচেষ্টায় দুটি টিকিট কাটতে পারেন তিনি।
ব্যবসায়ী সাজেদুর রহমানের পরিবার রাজশাহী যাচ্ছিলেন বনলতা এক্সপ্রেসে। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে বিদায় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি টিকিট কাটতে পেরেছিলাম সময়মতো। তেমন ভোগান্তি পোহাতে হয়নি।’ তবে উল্টো চিত্রও আছে। লালবাগের বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল নাহিদ বলেন, ‘আমি আজকে পরিবারকে পাঠিয়ে দিলাম। ৫ জুন আমি যাব। সেদিন রেলযাত্রার টিকিট কাটতে অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু টিকিট পাইনি। আমাকে এখন প্রায় দ্বিগুণ টাকা দিয়ে বাসে যেতে হবে।’
ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘শনিবার (গতকাল) সকাল ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ২৪টি আন্তনগর ট্রেন ছেড়ে গেছে ঢাকা থেকে। সারা দিনে ৪৩টি আন্তনগর ট্রেন যাবে। কোনো ট্রেনই খুব বেশি বিলম্বে স্টেশন ছাড়েনি। তাই যাত্রীরা সন্তুষ্ট। আশা করছি, গত রোজার ঈদের চেয়ে এবার ট্রেন যাত্রা আরও আরামদায়ক হবে, স্বস্তির হবে।’
কমিউটার ট্রেনের যাত্রীদের ভোগান্তি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই ট্রেনগুলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলাচল করে। আমরা এ নিয়ে এখনো যাত্রীদের কাছে কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আমরা খতিয়ে দেখব, কেন তিনটি টিকিট কেনার পরেও যাত্রীদের দুটি সিট দেওয়া হয়েছে।’
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, ‘রেলযাত্রায় টিকিট কালোবাজারি রোধে আমাদের ভিজিলেন্স টিম তৎপর রয়েছে। যারা টিকিট কালোবাজারির চেষ্টা করবে, আমরা তাদের আইনের আওতায় আনব।’