চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ‘গার্মেন্টস ভিলেজে’ কারখানা গড়ার আগেই উদ্যোক্তারা পানি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ওয়াসা বর্তমানে যে দামে পানি সরবরাহ করছে তার চেয়ে বেশি দাম দিতে তারা রাজি নন। অন্যদিকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) বলছে, মেঘনা নদী থেকে পানি এনে সরবরাহ করতে গেলে প্রতি এক হাজার লিটারের দাম ১২০ টাকার বেশি পড়বে। যা ওয়াসার বর্তমানের দরের চেয়ে প্রায় সোয়া তিনগুন বেশি।
বেজার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই শিল্প অঞ্চলে দৈনিক পানির চাহিদা হওয়ার কথা ৪৬ কোটি লিটার। ৩০ সালে ৫৯ কোটি, ৩৫ সালে ৬৫ কোটি এবং ৪০ সালে ৭০ কোটি লিটার। বর্তমানে এই শিল্প অঞ্চলে যে কয়টি কারখানা উৎপাদনে গেছে তাদেরকে গভীর নলকূপ থেকে বেজা পানি সরবরাহ করছে। যার প্রতি এক হাজার লিটারের দাম পড়ছে ৩২ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম শহরে বর্তমানে আবাসিক সংযোগে ওয়াসা প্রতি এক হাজার লিটার পানির দাম নেয় ১৮ টাকা। বাণিজ্যিক সংযোগের ক্ষেত্রে ৩৭ টাকা।
বিজিএমইএ’র পরিচালক ও চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় গার্মেন্ট শিল্প গ্রুপ ক্লিপটন’র সিইও মহিউদ্দিন চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘গার্মেন্টস শিল্পের অন্যতম উপকরণ পানি। বিশেষ করে ডাইং কারখানাগুলোতে বিপুল পরিমাণ পানি লাগবে। অথচ এখানে পানি নেই। বেজা পানির যে দাম বলছে তাতে পানিনির্ভর কোনো কারখানা এখানে নির্মাণ করা সম্ভব হবে না। তারা পানির দাম চাইছে চট্টগ্রাম ওয়াসার পানির চেয়ে কয়েকগুন বেশি। গ্যাস কখন আসবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।’
তিনি বলেন, ‘সরকার বিভিন্ন জায়গায় যে দামে পানি সরবরাহ করে এখানেও সেই দামে সরবরাহ করুক। ওয়াসার চেয়ে বেশি দামে পানি কেনার সুযোগ কারখানা মালিকদের নেই। ওয়াসার পানির দাম এমনিতেই বেশি। ব্যবসায়ীরা এর চেয়ে এক টাকাও বেশি দিতে রাজি নন। কারণ উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।’
জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিচালক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ ফারুক বলেছেন, ‘মেঘনা নদী থেকে আনলে প্রতি এক হাজার লিটার পানির দাম ১২০ টাকার উপরে পড়বে। সরকার যদি ভর্তুকি দিতে চায় দেবে। তাতে বেজার বলার কিছু নেই।’
চট্টগ্রাম ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরুল আমিন এ বিষয়ে বলেন, ‘মেঘনা থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে পানির সরবরাহ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই এখনো শেষ হয়নি। সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন পানি শোধনাগার নির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।’
পানি সরবরাহ খরচ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতি হাজার লিটারে ১২০ টাকার কাছাকাছি দাম পড়বে। তবে বাস্তবে পানির দাম কত নির্ধারণ করা হবে তা ঠিক করবে সরকার। এনিয়ে বেজা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে একটি সভার আয়োজন করতে যাচ্ছে। সেখানেই পানির দর নির্ধারণ করা হবে।’
বেজার তথ্যমতে, বিজিএমইএ গার্মেন্ট ভিলেজে মোট বিনিয়োগ হবে ১১শ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এখানে চার লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু সময়মতো প্লট বুঝে না পাওয়ায় উদ্যোক্তারা কারখানার নির্মাণ কাজ শুরু করতে পারেনি। দীর্ঘসূত্রতার কারণে কারখানার জন্য যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আগ্রহী ছিল তারাও পিছু হটছে। একারণে বিপাকে পড়ছেন উদ্যোক্তারা।
বিজিএমইএ’র পরিচালক মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আশার জায়গা যেমন আছে, হতাশারও রয়েছে। ২০১৯ সালে প্রথম ধাপে প্লট পাওয়ার কথা অথচ এখনো কিছুই হয়নি। সবেমাত্র সড়কের কাজ চলছে। নালা নির্মাণ হয়নি। গার্মেন্টস ভিলেজের জন্য যে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে তার চেয়ে কিছু প্লট প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু। বিষয়টি বেজাকে বলা হয়েছে। তারা সদুত্তর দিতে পারেনি। বেজা বলছে আগামী বছরের শুরু থেকে প্লট দৃশ্যমান হবে। আমরা অপেক্ষায় আছি।’
জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিচালক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ ফারুক বলেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্লট বুঝিয়ে দেয়ার প্রস্তুতি চলছে। সড়ক, নালার কাজ চলছে। ডিসেম্বরের মধ্যে কোনো কাজ বাকি থাকলে তা হয়তো জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি লাগতে পারে। এরচেয়ে বেশি সময় লাগবে না।
উঁচু প্লটের বিষয়ে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক জোনে ৬ দশমিক ৫ মিটার ভরাট করা হয়েছে। কোনো কোম্পানি যদি নিজ খরচে কোথাও অতিরিক্ত মাটি দিয়ে তাদের প্লট ভরাট করে তাতে বেজার কিছু করার নেই। তবে যেটুকু প্রয়োজন বেজা তা ভরাট করে দিয়েছে।