রাজধানীসহ সারা দেশের সড়ক-মহাসড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন সরাতে গতকাল রবিবার থেকে অভিযান জোরদার করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এ কারণে অসন্তুষ্ট পরিবহনমালিকরা ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছেন। পাশাপাশি তারা পরিবহনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল অন্তত পাঁচ বছর বাড়ানো ও ট্যাক্স কমানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, গত মে মাসে মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন সরানোর সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও বিআরটিএ কোনো কার্যকর অভিযান পরিচালনা করতে পারেনি। এ নিয়ে শুধু বিআরটিএ নয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগেরও কঠোর সমালোচনা হয়েছে। এরপর গতকাল থেকে মাঠে নেমেছে বিআরটিএ। এ অভিযানে সহায়তা করছে পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন।
সূত্র আরও জানায়, বিআরটিএ বেশ কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে। এসব আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ২০৫টি মামলা করেছেন। এ সময় ৫ লাখ ৬১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। সারা দেশে নানা অভিযানে আটটি গাড়িকে ডাম্পিং স্টেশনে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে রবিবার (২০জুলাই) দুপুরে যখন সড়কে অভিযান পরিচালিত হচ্ছিল, তখন রাজধানীর পরীবাগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির প্রধান কার্যালয়ে হাজির হন প্রভাবশালী বাসমালিকরা।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মো. কফিল উদ্দিন। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। সভা সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম।
সভায় ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি এম এ বাতেন, কোষাধ্যক্ষ এ এস এম আহম্মেদ খোকন, প্রচার সম্পাদক সাইদুর রহমান বাবু, বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান রমেশ চন্দ্র ঘোষ ও সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবির, হানিফ পরিবহনের মালিক মো. কফিল উদ্দিন আহমেদ, সোহাগ পরিবহনের মালিক ফারুক তালুকদার সোহেল, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আবদুর রহিম বক্স দুদু উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই নানা দাবিতে কেন্দ্রীয় শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শিমুল বিশ্বাসকে চেপে ধরেন।
তখন শিমুল বিশ্বাস ও সাইফুল আলম বাসমালিকদের জানান, প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশ অনুসারে সড়কে লক্কড়-ঝক্কড় বাসের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে বিআরটিএ। বাস মালিক সমিতিও চায় সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ বাস সরিয়ে নিতে। এতে সমিতি সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে। এ নিয়ে অনেক কথা-কাটাকাটির পর সিদ্ধান্ত হয়েছে, বাংলাদেশ বাস মালিক সমিতি থেকে বাস ও পণ্য পরিবহনকারী ট্রাকের আয়ুষ্কাল অন্তত পাঁচ বছর করে বাড়াতে সরকারের কাছে আবেদন জানাবে। সড়ক আইন অনুযায়ী, একটি বাসের সর্বোচ্চ আয়ুষ্কাল ২০ বছর। পণ্য পরিবহনের ট্রাকগুলোর আয়ুষ্কাল ২৫ বছর।
সভায় শিমুল বিশ্বাস বলেন, ‘বিগত সরকারের আইনে বাণিজ্যিক মোটরযানের মধ্যে বাসের ইকোনমিক লাইফ ২০ এবং ট্রাকের লাইফ ২৫ বছর করা হয়েছে। এ আইনটি বাস্তবায়ন করতে গেলে পরিবহন সেক্টরে অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে। এতে করে ৭০ ভাগ গাড়ি বন্ধ হয়ে যাবে। এত গাড়ি ডাম্পিং করার জায়গাও বাংলাদেশে নেই। তা ছাড়া এত গাড়ি একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেলে পরিবহন সেক্টরে এমনিতেই অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে।’
তিনি বলেন, ‘গাড়ির তিনটি ফ্যাক্টর কাজ করে। সেগুলো হলো- লুব্রিক্যান্ট, মবিল ও ইঞ্জিন। এই তিনটি জিনিস ঠিক থাকলে কালো ধোঁয়া হয় না। বিআরটিএ পরীক্ষা করে দেখুক, যেসব গাড়িতে তারা এসব ত্রুটি পাবে, সেগুলো ফিটনেস তারা দেবে না। কিন্তু যেগুলো গাড়ির ফিটনেস আছে, সেগুলো বয়সের ভিত্তিতে চলাচলের অযোগ্য ঘোষণা করা ঠিক হবে না।’
কিছুদিন আগে সরকার পরিবহনমালিকদের ট্যাক্স বাড়িয়েছে। এ সিদ্ধান্তে নাখোশ বাসমালিকরা। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক কাজী মাসুদ এখন গাজীপুর পরিবহনের মালিক। তিনি বলেন, ‘আগে আমাকে মাসে সাড়ে ১১ হাজার টাকা দিতে হতো। এখন আমাকে ট্যাক্স বাবদ ২০ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। এই ট্যাক্স কমাতে আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি। সরকার যদি এটা আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সমাধান করতে না পারে, তাহলে একটা স্ট্রাইকের (ধর্মঘট) আশঙ্কা করতে পারেন যাত্রীরা।’
২০১৮ সালে প্রণীত সড়ক পরিবহন আইনে কয়েকটি ধারায় বলা হয়েছে, সড়কে দুর্ঘটনার দায়ে চালক গ্রেপ্তার হলে জামিন পাবেন না। এ ধারা বাতিলের দাবিও এখন জোরদার করা হবে বলে জানান বাস মালিক সমিতির নেতারা। তিনি বলেন, ‘এ ধারাটি বহাল রাখায় আমরা বাসমালিকরা এখন চালক পাচ্ছি না। পর্যাপ্ত বাসচালক না থাকায় সড়কে ঠিকমতো বাস চালাতে পারছি না।’
বাসমালিককে ক্ষতিগ্রস্ত করার সরকারের উদ্দেশ্য না: সড়ক উপদেষ্টা
মেয়াদোত্তীর্ণ বাস সরানোর অভিযান জোরদার করলেও সরকার বাসমালিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায় না বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। গতকাল হাতিরঝিলের চক্রাকার বাসে র্যাপিড পাস সেবা উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ‘ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদ উত্তীর্ণ গাড়ি সড়কে থাকলে যানজট তৈরি করে। এসব গাড়ি তুলে নেওয়ার জন্য বিআরটিএর অভিযান চলমান আছে। একটা জিনিস আমাদের মাথায় রাখতে হবে, কোনো ব্যবসায়ীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা আমাদের উদ্দেশ্য না। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে বলেছি, বিশেষ রেয়াতি হারে ঋণের ব্যবস্থা করব। কিন্তু এই বাসগুলোকে আপনাদের সরাতে হবে।’