বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকে তৎপর ছিলেন ময়মনসিংহের শিক্ষার্থীরাও। তবে ১৯ জুলাই নগরীতে রিদোয়ান হোসেন সাগর (২৪) শহিদ হওয়ার পর জেলাজুড়ে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। জানা গেছে, সে সময় নানা চাপে শহিদ সাগরকে নীরবে দাফন করা হয়েছিল।
শিক্ষার্থীরা জানান, আন্দোলন বেগবান করতে গত বছরের ৫ জুলাই গোপনে বৈঠক করেন আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থীরা। পরিকল্পনা মতো ৬ জুলাই মিছিল নিয়ে টাউন হল মোড়ের উদ্দেশে বের হন তারা। পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। ৭ জুলাই ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করতে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ অবরোধ করেন বাকৃবির শিক্ষার্থীরা। এদিন সকালে শিক্ষার্থীদের একটি বিক্ষোভ মিছিল বাকৃবির কেআর মার্কেটসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ভবন ঘুরে জব্বারের মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।
বেলা ১১টা থেকে জব্বারের মোড়সংলগ্ন এলাকায় ঢাকা থেকে জামালপুরগামী তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেন অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা কোটাবিরোধী স্লোগান দেন। ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সমর্থন জানাতে থাকে জনতা। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পুরো জেলায়। ১৬, ১৭ ও ১৮ জুলাই প্রশাসনসহ তৎকালীন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা মিছিল বের করেন, যা গোটা ময়মনসিংহে উত্তাপ ছড়ায়। ১৯ ও ২০ জুলাই ময়মনসিংহ সদর, ফুলপুর ও গৌরীপুর উপজেলায় কোটাবিরোধী আন্দোলনে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন পাঁচজন। এর মধ্যে গৌরীপুরে তিনজন, ফুলপুরে একজন ও ময়মনসিংহ সদরে একজন। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধসহ আহত হন অর্ধশত মানুষ।
সদরে শহিদ হয়েছিলেন ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া চৌরাঙ্গী মোড় এলাকার ব্যবসায়ী মো. আসাদুজ্জামান আসাদের ছেলে রিদোয়ান হোসেন সাগর (২৪)। দুই ভাই-বোনের মধ্যে সাগর ছিলেন বড়। ফুলবাড়িয়া কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকের ছাত্র ছিলেন তিনি। পাশাপাশি একটি কম্পিউটারের দোকানেও কাজ করতেন। কোটাবিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকেই নিয়মিত অংশ নিতেন সাগর। সাগরই ময়মনসিংহ নগরীর একমাত্র শহিদ। তার মৃত্যুকে ঘিরে আন্দোলনের মাঠে সহকর্মীদের মধ্যে নতুন শক্তির সঞ্চার হয়েছিল।
যেভাবে শহিদ হন সাগর, দিনটি ছিল ১৯ জুলাই শুক্রবার। জুমার নামাজ পড়েই শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসেন। বিকেল ৪টায় নগরীর টাউন হল মোড়ে পুলিশের ব্যারিকেড উপেক্ষা করে জড়ো হন হাজার হাজার শিক্ষার্থী। এরপর একটি বিক্ষোভ মিছিল নগরীর চরপাড়া হয়ে বাইপাসে গিয়ে অবস্থান নেয়। এতে থমকে যায় পুরো নগরী। সন্ধ্যায় নগরীর মিন্টু কলেজ রোড এলাকায় আন্দোলনকারীদের একটি অংশের ওপর যৌথ হামলা চালায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ। আন্দোলন থামাতে চলতে থাকে গুলি। শিক্ষার্থীরা দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে থাকেন। হঠাৎ গুলির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সাগর। এ সময় অন্তত ৩৫ জন আন্দোলনকারী আহত হন। সাগরকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সাগরের স্বজনরা জানান, সেদিন বিকেলে সাগর হাসপাতালে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন। এরপর সন্ধ্যায় পরিবারকে এক অপরিচিত নম্বর থেকে ফোনে জানানো হয় সাগর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মমেক হাসপাতালে ভর্তি। সঙ্গে সঙ্গে সাগরের বাবা ও পরিবারের স্বজনরা হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে হাসপাতালের মেঝেতে পান সাগরের নিথর দেহ। তার বুকের বাম পাঁজরে একটি ছিদ্র ও পেটের ডান পাশে ছিল বড় গুলির ক্ষত। এরপর রাত ৮টার দিকে কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তি একটি অ্যাম্বুলেন্সে সাগরের লাশ বাসায় পৌঁছে দেয়। পরদিন সকাল ১০টায় জানাজা শেষে বাসার পাশেই নগরীর মাদ্রাসা কোয়ার্টার কবরস্থানে অনেকটা নীরবে তাকে দাফন করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে ময়মনসিংহের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ জনগণ বিজয় মিছিলসহ আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠেন। বিতরণ করা হয় মিষ্টি। বেলা ৩টার দিকে ছাত্র-জনতা নগরীর টাউন হল মোড়ে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে জড়ো হন। জাতীয় পতাকা গায়ে জড়িয়ে ও বাদ্য বাজিয়ে আনন্দ মিছিল করেন।