পৃথিবীতে বারবার অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটলেও তার সুফল বুর্জোয়া-ধনিক শ্রেণি আর শাসক গোষ্ঠী ভোগ করছে। বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা বিলোপের জন্য মানুষের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় বামপন্থিদের যুক্তফ্রন্ট গঠন করে বিপ্লবের আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
শনিবার (৯ আগস্ট) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবীর মিলনায়তনে ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চা আয়োজিত মতবিনিময় আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘পুঁজিবাদকে উচ্ছেদ করার উপায় হচ্ছে সামাজিক বিপ্লব। সামাজিক বিপ্লবের লক্ষ্য হচ্ছে সামাজিক মালিকানা। এখন করণীয় হচ্ছে, সামাজিক বিপ্লবের জন্য কাজ করা। যারা বামপন্থি, যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, যারা সামাজিক মালিকানায় বিশ্বাস করেন; এখন তাদের যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে হবে।’
‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক এ সভায় ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চার অন্যতম সমন্বয়ক এবং গণমুক্তি ইউনিয়নের সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন আহম্মদ নাসুর সভাপতিত্বে মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। আলোচক ছিলেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ, বাসদের (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনের আহ্বায়ক শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক পার্টির কার্যকরী সভাপতি আবদুল আলী, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান লাল্টুসহ আরও অনেকে। সভা সঞ্চালনা করেন বাসদের (মাহবুব) কেন্দ্রীয় সদস্য মহিউদ্দিন চৌধুরী লিটন।
গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তির প্রেক্ষাপটের কথা উল্লেখ করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামোর বিনির্মাণ সম্পর্কে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এই অভ্যুত্থানকে (জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান) বিপ্লব বলা হচ্ছে। কিন্তু এটা তো ছিল একটা সরকারের পতন। সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার কথা ছিল। কিন্তু সেটা ঘটল না; ক্ষমতা চলে গেল বুর্জোয়াদের হাতে। বুর্জোয়ারাই এখন শাসন করছে।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রবীণ এই অধ্যাপক বলেন, ‘স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ এখন ধনীদের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসকরা যা করে, আমাদের ধনী-বুর্জোয়া শাসকরা একই কাজ করছে। তারা লুণ্ঠন করে, সম্পদ পাচার করে; তাই মুক্তি আসেনি। মুক্তি আসবেও না, যদি না আমরা পুঁজিবাদকে বিদায় করতে পারি। পুঁজিবাদ ও ফ্যাসিবাদকে বিদায় করে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম হচ্ছে এখনকার সংগ্রাম।’
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ ও পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলন কতটা শক্তিশালী হবে তার ওপর। এই লক্ষ্যে ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে বামপন্থিদের ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। মতাদর্শগত ভিন্নতা থাকলেও সেখানে প্রত্যেকটা বাম দল থাকুক। কিন্তু সবাই একটা প্ল্যাটফর্মে আসুক; যার লক্ষ্য হবে দেশে একটা সামাজিক বিপ্লব ঘটানো।’
যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে হলে দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন দেশের প্রবীণতম এই চিন্তাবিদ।
যুক্তফ্রন্ট গঠন নিয়ে বামপন্থিদের মধ্যে এখনো মতভেদ রয়েছে বলে সভায় মন্তব্য করেন বাম নেতা মোশরেফা মিশু। সে কথার সূত্র ধরে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাম নেতাদের উদ্বুদ্ধ করে বলেন, ‘বাম নেতাদের ঐক্যকে সাংগঠনিক রূপ দিতে হবে। কারণ রাজনীতির ওপর মানুষের আস্থা নেই। পথহারা মানুষ জানে না কার পেছনে যেতে হবে; কোন সংগঠন তাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে। যদি যুক্তফ্রন্ট গঠন করা যায়, তাহলে পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে রাজধানী, মহকুমা শহরে সর্বত্র সব শ্রেণি-পেশার মধ্যে জাগরণ আসবে। বামপন্থিদের এই যুক্তফ্রন্ট এখন শক্তিশালী না হলেও আগামীতে শক্তিশালী হবে।’
সভায় বাম নেতারা অভিযোগ করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার টালবাহানা করছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এনসিপি নামক কিংস পার্টি গঠন করে ক্ষমতা দখলে রাখার দুঃস্বপ্ন দেখছে।
দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বাম নেতারা বলেন, সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য, অফিস-আদালতে ঘুষ-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিপীড়ন, নারী-শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, কোনো কিছুই বন্ধ করতে পারেনি এ সরকার। বরং সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় মব সন্ত্রাস, নারী নিগ্রহ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ভাঙচুর, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে মৌলবাদী শক্তি।