নির্বাচনসহ কয়েকটি ইস্যুতে দেশে যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা কাটানোর চেষ্টা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। চেষ্টা করছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও। গত কয়েক দিনে দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার পাশাপাশি মবের ঘটনাও ঘটে। এর পরই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ধরনের সংঘাত হয়। একই সময়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে নানা গুঞ্জন-গুজব ছড়িয়ে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে গত রবিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গুরুত্বপূর্ণ তিনটি রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে জুলাই সনদ ও নির্বাচন নিয়ে জামায়াত ও এনসিপি একই সুরে কথা বললেও বিএনপি আলাদা মতামত পেশ করে। জামায়াত ও এনসিপি জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবি তুললেও বিএনপি এ ধরনের দাবি জানায়নি। পরিস্থিতি নিয়ে আজ মঙ্গলবার আটটি দলের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধান উপদেষ্টা। গতকাল সেনাপ্রধানও রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলাসহ নানা বিষয়ে বৈঠক করেন।
তবে আইএসপিআর ও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের বক্তব্য আসার আগে, সেনাপ্রধানের পৃথক বৈঠকের খবরে গুজবের ঢালপালা মেলতে শুরু করেছিল। অনেকের মধ্যে এমন আলোচনা ওঠে, কোথাও কিছু হচ্ছে কি না। কিন্তু আইএসপিআর ও প্রেস উইংয়ের ব্যাখ্যায় সেই আশঙ্কা দূর করে দেয়। ছড়িয়ে পড়া গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এদিকে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও গুজব-গুঞ্জন নিয়ে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই বলে মন্তব্য করেছেন।
সমাজচিন্তক, বিশ্লেষক ও বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের নিয়ে পরিচ্ছন্নভাবে কথা বলার সময় এটা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভালো পরিবেশ তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। তবে আমাদের দেশটা উল্টোপথে চলে। ছাত্র সংসদ নির্বচন ঘিরে সে রকম পরিবেশ তৈরি না হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চেষ্টা করছে। কিন্তু রাষ্ট্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। পত্রিকায় খবর এসেছে, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচনে অর্থ সহায়তা দেবে। যে দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিজেদের টাকায় করা যায় না, বিদেশের সহযোগিতা নিতে হয়। সেই দেশের রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যৎ বলতে কিছু নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের একটা বিষয় থাকা খুবই দরকার, সেটা হলো সদিচ্ছা। এই সদিচ্ছা যদি যথেষ্ট পরিমাণে গড়ে ওঠে, ধারাবাহিক হয়, তাহলে রাজনীতি উন্নত হবে। মানুষের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে। সদিচ্ছা অর্জন করা সহজ না, এ জন্য ভালো নেতৃত্ব দরকার।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন খবরের কাগজকে বলেন, এত গুজব হঠাৎ করে কেন ছড়ানো হচ্ছে? একটা দেশে এত গুজব ছড়ানো ভালো লক্ষণ নয়। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সেনাপ্রধানের বৈঠকের খবর প্রকাশ হয়েছে, এটা স্বাভাবিক না। সরকার চেঞ্জ হচ্ছে, চারদিকে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এই গুজবের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত সরকারের। প্রত্যেকটা বিষয়ের একটা সংযোগ থাকতে পারে। সরকারকে ভালোভাবে নজর দিতে হবে।
প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে গত সপ্তাহে উত্তপ্ত হয় পরিস্থিতি। এরই মধ্যে ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) মঞ্চ ৭১-এর প্রোগ্রাম নিয়ে মব তৈরির চেষ্টা এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে মারধরে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের দাবি জোরালো হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান অবরোধ করেন নুরুল হক নুরের সমর্থকরা। রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ঘটনা নিয়ে বিবৃতি দেন। বিচার বিভাগীয় তদন্তের কথা জানানো হয় সরকারের পক্ষ থেকে।
এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গ্রামবাসীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয় গত রবিবার। থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে সেখানে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ভোটার ইস্যুতে তৈরি হয় গণ্ডগোল। সন্ধ্যায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়। গত রবিবার প্রধান উপদেষ্টা পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
একই দিন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে বৈঠক করেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। পরের দিন সেনাপ্রধান প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, পরে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই দুই বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা গুজব দেখা যায়। কেউ কেউ সরকার পরিবর্তনের আশঙ্কা প্রকাশ করেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধ ও অনৈক্য পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করেছে। জুলাই সনদের বিভিন্ন ইস্যু এখনো ঝুলে আছে। ফলে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। এরই মধ্যে যুক্ত হয় ডাকসু নির্বাচনের স্থগিতাদেশ। ক্ষুব্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল করেন। পরে চেম্বার আদালত হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ স্থগিত করেন। সার্বিক বিষয় নিয়ে নানা মন্তব্য উঠে আসছে।
তবে সব গুজবের শঙ্কা দূর হয় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের বক্তব্যে। আইএসপিআর জানায়, দুই বৈঠকে সেনাবাহিনী প্রধান সম্প্রতি চীন সফরের সময় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বৈঠকের অভিজ্ঞতা ও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরেন। পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং তা উন্নয়নে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে সেনাপ্রধান আশ্বস্ত করেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান প্রধান উপদেষ্টাকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে তিনি গুজবের প্রতি মনোযোগ না দেওয়ার আহ্বান জানান।
একই ইস্যুতে কথা বলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও। এসব গুজব-গুঞ্জন নিয়ে বিচলিত হওয়ার মতো কিছু নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। জরুরি অবস্থা বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সম্ভাবনার বিষয়ে অবগত নন জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর বিচার-বিবেচনাবোধের প্রতি আস্থা আছে। এর আগেও বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতবিরোধ হয়েছে, পরে আবার মতবিরোধ শেষও হয়েছে। প্রয়োজনীয় মুহূর্তে অবশ্যই তাদের মধ্যে ঐক্য দেখতে পারব বলে বিশ্বাস করি।