রাজধানীর ফুটপাত ও সড়কের পর এবার ফুটওভার ব্রিজও হকারদের দখলে চলে গেছে। নিরাপদে পথচারীদের পারাপারের জন্য নির্মিত এসব ব্রিজ এখন পরিণত হয়েছে অস্থায়ী বাজারে। হকারদের পাশাপাশি স্থানীয় চাঁদাবাজ চক্র নিয়ন্ত্রণ করছে এসব ফুটওভার ব্রিজ। কোথাও জামাকাপড়, কোথাও শাকসবজি, কোথাও ইলেকট্রনিক পণ্য; সব মিলিয়ে রাজধানীর অধিকাংশ ফুটওভার ব্রিজ হাটবাজারে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় চাঁদাবাজ চক্র প্রতিদিন এসব হকারের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে। ফলে যে ফুটওভার ব্রিজ পথচারীদের জন্য তৈরি হয়েছিল, তা এখন দখলের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, ফুটওভার ব্রিজের অবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। লোহায় মরিচা ধরে ক্ষয় হয়ে গেছে। তৈরি হয়েছে বড় গর্ত। বেশ কিছু ব্রিজে বাতি না থাকায় অন্ধকারে চলে মাদক সেবন ও অসামাজিক কার্যকলাপ। রাতে ছিনতাইও নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এ কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে ব্রিজের নিচ দিয়ে চলাচল করছেন। অথচ কর্তৃপক্ষের এদিকে কোনো নজর নেই।
শহর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ফুটওভার ব্রিজকে নিরাপত্তা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট স্থানে হকার জোন তৈরি করা যেতে পারে, যাতে তারা জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন আবার পথচারীরাও নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারেন। সিসিটিভি ক্যামেরাও তদারকির জন্য প্রয়োজন। রাজধানীর জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পারাপারের নিরাপদ বিকল্প ব্যবস্থা না করলে দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ৯২টি ফুটওভার ব্রিজ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীনে ৫১টি, দক্ষিণ সিটির অধীনে ৩৫টি, রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ বিভাগের অধীনে ৫টি এবং রাজউকের অধীনে রয়েছে ১টি ব্রিজ। অধিকাংশ ব্রিজই এখন হকারদের দখলে। কোথাও এর এক পাশ, কোথাও আবার দুই পাশজুড়েই দোকান বসে। কিছু ব্রিজের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কয়েকজন ক্রেতা দাঁড়ালেই চলাচলের জায়গা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
এ ছাড়া কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চলন্ত সিঁড়ি (এস্কেলেটর) অনেক জায়গায় অচল হয়ে পড়ে আছে। ভ্রাম্যমাণ দোকান, ময়লা-আবর্জনা ও বৃষ্টির পানি জমে থাকার কারণে ফুটওভার ব্রিজগুলোতে হাঁটার পরিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দখল করা ফুটওভার ব্রিজে মানুষের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত পণ্য বেশি বিক্রি হতে দেখা যায়। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে শার্ট, প্যান্ট, ব্রাশ, বিছানার চাদর, ওজন মাপার যন্ত্র, নামাজ পড়ার টুপি, আতর, তসবিহ, আয়না থেকে শুরু করে মোজা, গেঞ্জি, চশমা, হাতঘড়ি, মোবাইল ফোন অ্যাকসেসরিজ; এমনকি শাকসবজি, ডিম, খেজুর, খেজুরের গুড়সহ হরেক রকমের পণ্য নিয়ে বসেছেন হকাররা।
রাজধানীর দৃষ্টিনন্দন গুরুত্বপূর্ণ ফার্মগেট ফুটওভার ব্রিজটি এখন পুরোটাই দখলে। পুরোনো ব্রিজটি ভেঙে ২০২৩ সালে ২০ কোটি টাকা খরচ করে ঢাকার সবচেয়ে সুপ্রশস্ত এই ফুটওভার ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়। এটি ১৮ ফুট চওড়া। দৃষ্টিনন্দন করে তোলার জন্য বিভিন্ন ফুলের গাছ ছিল ব্রিজটিতে। অথচ ফার্মগেটের এই ফুটওভার ব্রিজটি এখন পুরোপুরি রমরমা বাজার। সন্ধ্যা নামলেই এখানে বসে ফল-সবজির বাজার।
একইভাবে নিউ মার্কেট এলাকার ব্রিজটি যেন স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শাখা। বছরজুড়ে এই ব্রিজটিও থাকে হকারদের দখলে। দুই পাশে শতাধিকের বেশি দোকান, মাঝের মূল পথটি সংকীর্ণ হয়ে গেছে। পথচারীদের প্রতিনিয়ত এই স্থান দিয়ে রীতিমতো গা বাঁচিয়ে ধাক্কাধাক্কি করে চলতে হয়। শার্ট-প্যান্ট থেকে শুরু করে মেয়েদের জামাকাপড়, ব্রাশ, বিছানার চাদর, নামাজের টুপি, আতর, তসবিহ, মোজা, চশমা, হাতঘড়ি, মোবাইল ফোনের অ্যাকসেসরিজ, এমনকি ডিম, শাকসবজি, খেজুর, গুড় পর্যন্ত পাওয়া যায় এসব দোকানে।
মুগদা-কমলাপুর এলাকার ফুটওভার ব্রিজে বসেছে ৫০টির মতো অবৈধ দোকান। গুলিস্তানের ফুটওভার ব্রিজের চিত্রও একই। অনেক জায়গায় ভিক্ষুকরা অর্ধেকের বেশি অংশ দখলে নিয়েছে। ফলে চাপাচাপি করে হাঁটাচলা করতে হয় বলে বেশির ভাগ মানুষ ঝুঁকি নিয়ে এই ব্রিজের নিচ দিয়ে রাস্তা পার হতে বাধ্য হন।
পরীবাগ ফুটওভার ব্রিজটি এখন যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ব্যবহার করলেও ব্রিজটির প্রতিটি সিঁড়ি জরাজীর্ণ আর ভাঙাচোরা। লোহা ক্ষয়ে এতে বড় বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় যেকোনো পথচারী যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন। এসব গর্তে কারুর পা পড়লেই নিশ্চিত ভূপাতিত হয়ে জীবন বিপন্ন হয়ে উঠবে। রাতে এই ব্রিজে কোনো বাতি জ্বলে না, ফলে অন্ধকারে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। সেখানে রাতে মাদক সেবনসহ অসামাজিক কর্মকাণ্ডও চলে। ব্রিজের ওপর এবং এর চারপাশে এ রকম দৃশ্য দেখা গেছে।
গুলিস্তানের পাতালপথ দিয়ে হাঁটলে বোঝাই মুশকিল এটি পারাপারের রাস্তা, নাকি মার্কেট। মূলত পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের জন্য এটি নির্মাণ করা হলেও এই আন্ডারপাস এখন রীতিমতো একটা জমজমাট ইলেকট্রনিকস মার্কেট। ক্রেতা ও দোকানিদের ভিড়ে সেখানে পথচারীদের চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
সাধারণ মানুষের চলাচলের এমন দুঃসহ পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়লেন অনেক পথচারী। গুলিস্তানে অফিসগামী রুবেল হোসেন বলেন, “ফুটওভার ব্রিজগুলো এখন আর পার হওয়ার জায়গা নয়। হকাররা দখল করে রেখেছে। কোনো রকমে শরীর বাঁচিয়ে মাঝের সরু পথ দিয়ে চলতে হয়। কখনো আবার সেই পথের মাঝখানে ভিক্ষুকরা বসে থাকে। পথচারীদের ‘পা’ ধরে আটকে রেখে ভিক্ষা চায়। বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষকে তাই নিচ দিয়ে রাস্তা পার হতে হয়। এতে ঝুঁকি অনেক, দুর্ঘটনাও ঘটে প্রায়ই।”
ধানমন্ডির গৃহিণী তানিয়া আক্তার বলেন, ‘নিউ মার্কেট ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে গেলে মনে হয় দোকানের ভেতর দিয়ে হাঁটছি। অথচ আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পারাপারের জন্যই তো এগুলো করা হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ চোখ বন্ধ করে আছে। কারুর যেন কোনো দায়িত্ব নেই।’
নিউ মার্কেটে ব্যবসায়িক কাজে আসা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে সবকিছু চাঁদার বিনিময়ে চলছে। হকাররা তো দোকান বসায়, কিন্তু তাদের পেছনে আছে শক্তিশালী গোষ্ঠী। তারা প্রতিদিন চাঁদা তোলে, টাকা নেয়। পথচারীরা ভুক্তভোগী হলেও সমাধান নেই।’
অবশ্য ফুটপাত দখল করা হকারদের পাল্টা যুক্তির শেষ নেই। নিউ মার্কেট এলাকার এক হকার জানান, দোকানের আয়তন অনুযায়ী দৈনিক ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয় স্থানীয় প্রভাবশালী আর প্রশাসনের লোকদের। কারও কারও কাছ থেকে সাপ্তাহিক বা মাসিক হিসেবে চাঁদা আদায় করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেরা তো এখানে বসতে চাই না, জীবিকার জন্য বসি। টিকে থাকার জন্য চাঁদা দিতেই হয়।’
মিরপুরের এক হকার অভিযোগ করে বলেন, ‘পুলিশ থেকে শুরু করে স্থানীয় নেতা-কর্মীরা সবাই আমাদের কাছ থেকে নেওয়া চাঁদার টাকায় ভাগ বসান। আমরা যারা গরিব, তাদের টিকে থাকার তো জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে ফুটওভার ব্রিজে তাই দোকান বসাই।’
দায় এড়াচ্ছে কর্তৃপক্ষ
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা দায় এড়িয়ে গেলেন। উত্তর সিটির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ অভিযান চালালেও রাজনৈতিক প্রভাশালীরা আবারও এগুলো দখল করে নিয়েছেন। এই দখলদারত্বের পেছনে আছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাশালীদের ইন্ধন। তাদের হাতে নগরবাসী জিম্মি। সিটি করপোরেশনও নামেমাত্র অভিযান চালায়। কিছুদিন কড়াকড়ি থাকে, পরে গা ছাড়া ভাব দেখায়। আগের অবস্থায় ফিরে যায় ফুটওভার ব্রিজগুলো। এভাবেই চলছে দিনের পর দিন।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি; বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে। এটা বন্ধ করতে হলে সবাইকে সচেতন হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’ আবার সব স্থানে একসঙ্গে অভিযানও চালানো যাচ্ছে না, বললেন তিনি। তবে কী কারণে বা কাদের জন্য অভিযান সব স্থানে চালানো যাচ্ছে না, এ বিষয়টি তিনি এড়িয়ে গেলেন।
তবে এসব ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে চলা ভুক্তভোগী নগরবাসী বলছেন, এসব জনবিরোধী দখল ঠেকাতে হলে সিটি করপোরেশন, পুলিশ ও স্থানীদের সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের সড়ক ও ফুটপাত দখল হয়ে গেছে। এখন পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের লক্ষ্যে তৈরি ফুটওভার ব্রিজও দখলে চলে গেছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি এবং চাঁদাবাজরা এক হয়ে এসব ফুটব্রিজ দখলে নিয়ে নিয়েছে।’
তিনি এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে, কোনো ছাড় দেবে না; এই ধরনের বার্তা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। প্রশাসনের এই দুর্বলতা বুঝতে পেরে চাঁদাবাজরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের এখনই থামানো না গেলে পরে রাজনৈতিক সরকার এলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। আমাদের আসলে সংস্কারের মধ্যে নগর উন্নয়নের বিষয়টিও রাখা উচিত। নিশ্চিত হতে হবে যে সরকার নাগরিক সুবিধার দিকগুলোও গুরুত্ব দেবে। চাঁদাবাজদের রাজনৈতিক চরিত্র এবং সামাজিক চরিত্র না দেখে এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে জনগণ স্বস্তি পাবেন।’