নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে যে নারী প্রতিবাদে হন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ; সেই নারীই সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সমাজ বিনির্মাণে হয়ে ওঠেন ‘সঙ্ঘমিত্রা’। যে সমাজব্যবস্থা মানুষকে কেবল বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তার বিপরীতে নারীকণ্ঠে অনুরণিত হয় ঐক্যের সুর। এখন নারীর সেই লড়াইকে এগিয়ে নিতে তরুণদের যথোপযুক্ত সহযোদ্ধা হয়ে ওঠার আহ্বান জানালেন নারী নেত্রীরা।
শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর ছায়ানট মিলনায়তনে ‘নারীবাদী হয়ে ওঠার গল্প’ আসরে তারা এই আহ্বান জানান। নারী অধিকারবিষয়ক সংগঠন প্রাগ্রসরের এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাবিদ ও গবেষক হামিদা হোসেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম, মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, অধিকারকর্মী আরমা দত্ত, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির, নারী নেত্রী সুলতানা আহমেদ, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক শামীম আখতার।
এই আট নারী নেত্রীর পাশাপাশি কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকারকর্মী নিরূপা দেওয়ান, গবেষক-শিক্ষাবিদ মেঘনা গুহঠাকুরতা, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক নাজমুন নেসা মাহতাবের জীবনসংগ্রামের গল্পের সংকলন ‘নারীবাদী হয়ে ওঠার গল্প’ বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয় এ অনুষ্ঠানে। বইটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন প্রাগ্রসরের নির্বাহী পরিচালক ফওজিয়া খোন্দকার ও ওমর তারেক চৌধুরী। বইটি রকমারি ডটকমে পাওয়া যাবে।
কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান কবি সুফিয়া কামালকে ‘সঙ্ঘমিত্রা’ উপাধি দিয়েছিলেন। সুফিয়া কামালের সাংগঠনিক দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে তিনি এ উপাধি দেন। নারী আন্দোলন কর্মীদের সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে সুলতানা কামাল বলেন, ‘বাঁচতে হলে, সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে, সঙ্ঘমিত্রা হতে হয়। আমরা এখন কাদের সঙ্গে আছি, কারা আমাদের এখানে আনতে সাহায্য করেছেন, তাদের সঙ্গে সম্পর্কের প্রতিফলন খুব জরুরি। সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। মানুষ কেবল একা-একা নিজেকেই দেখে। এখন কিন্তু সবাইকে নিয়ে বড় হতে চেষ্টা করতে হবে।’
আরমা দত্ত এবং শাহীন আনাম বলেন, নারী অধিকার আন্দোলনে তাদের নিরন্তর অনুপ্রেরণা জোগায় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাঙালি আশায় বুক বেঁধেছিল; এ দেশ হবে সমতার, হবে ন্যায়ভিত্তিক। শাহীন আনামের ভাষ্যে, সেই স্বপ্নযাত্রা হোঁচট খেয়েছে বারবার। নারীবাদী আন্দোলন নিয়ে যারা সমালোচনা করেন তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এই আন্দোলন সমতা ও মানবাধিকারের।’ সুলতানা আহমেদ তরুণদের উদ্দেশে বলেন, ‘এটা ২০২৫ সাল। এখনো বলতে হচ্ছে নারী নির্যাতন কবে বন্ধ হবে? তরুণদের অনুরোধ করি, আপনারাই এর প্রতিকার করেন।’
তরুণ প্রজন্মের ওপর ভরসা রাখতে চান সুলতানা কামালও। তিনি বলেন, ‘মা (কবি সুফিয়া কামাল) সব সময় বলতেন, একটা আদর্শহীন জনগোষ্ঠী সমাজকে কিছু দিতে পারে না। সে কথা তরুণদের মনে করিয়ে দিতে চাই। আদর্শ তৈরি করতে হয়, গড়ে নিতে হয়। তরুণ প্রজন্মের ওপর ভরসা রাখি। তাদের বলি, পথের চিন্তা বার করে নিতে হলে ইতিহাস চেতনার দরকার আছে। আমরা সামনে কোথায় এগিয়ে যাব, এটা নির্ণয় করার দরকার আছে।’
ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘আমার লড়াই আসলে মানুষ হওয়ার লড়াই। আমি একজন মানুষ হতে চাই। আমি চাই, আমার চারপাশে যারা আছেন তারাও যেন মানুষ হয়ে ওঠেন। এই আন্দোলনটা আমরা গড়ে তুলতে চেয়েছি। এই লড়াইয়ে আমি ভরসা রাখি তারুণ্যের ওপর।’