বহুল আলোচিত ‘জাতীয় জুলাই সনদ-২০২৫’ আজ শুক্রবার স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে। প্রায় আট মাস ধরে তিন ধাপে রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা শেষে এই সনদ তৈরি করা হয়েছে। তবে এই সনদের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে। বেশ কিছু ইস্যুতে বামজোটসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে রয়েছে গুরুতর মতপার্থক্য ও ভিন্ন অবস্থানও। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সনদ স্বাক্ষরের অনুষ্ঠান। আজকের এই আয়োজনে উপস্থিত থাকছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা ও উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
জুলাই সনদ স্বাক্ষরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও সরকারের সব প্রস্তুতি পুরোপুরি শেষ হলেও সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াসহ বেশ কিছু বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে এখনো মতভিন্নতা রয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, শুক্রবার জুলাই সনদে সই করতে প্রস্তুত আছে তার দল। তবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ যেগুলো রয়েছে, সেগুলোর অবশ্যই উল্লেখ থাকতে হবে। জুলাই সনদে স্বাক্ষরের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামী অংশ নেবে। তবে সনদে স্বাক্ষর করার বিষয়ে তারা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের বিষয়বস্তু সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে এই সনদে স্বাক্ষর করবে না জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সনদে যথাযথ মর্যাদায় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও স্বাধীনতার ইশতেহার উপেক্ষিত হওয়ায় স্বাক্ষর অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে সিপিবি, বাসদসহ বামপন্থি চারটি রাজনৈতিক দল। দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন, সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগে সংশোধিত খসড়া না পেলে তারা সনদে সই করবেন না।
সনদে স্বাক্ষর নিয়ে দলগুলোর এমন অবস্থান প্রসঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, কিছু বিষয়ে মতভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত সব দলই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে। জুলাই সনদে স্বাক্ষরের সুযোগ পরেও থাকবে। তার পরও যেসব রাজনৈতিক দল সনদে সই করবে না, তবে দীর্ঘ আলোচনায় তাদের দলের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছিলেন, সেসব দলকে জুলাই সনদের স্টেকহোল্ডার হিসেবে ধরে নেওয়া হবে।
এদিকে ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ তৃতীয়বারের মতো বাড়িয়েছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এই কমিশনের মেয়াদ ১৫ অক্টোবর থেকে বাড়িয়ে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত করা হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি এবং এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতভিন্নতার বিষয়ে গতকাল রাতে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার এলডি হলে সংবাদ সম্মেলন করেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ‘কমিশন মনে করে, জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়া প্রয়োজন। বর্ধিত এই মেয়াদের মধ্যেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট এবং পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ সরকারের কাছে উপস্থাপন করবে কমিশন। একই সঙ্গে সুপারিশ বাস্তবায়নে কমিশনের পক্ষ থেকে সর্বোত্তম প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। সরকারের পক্ষ থেকে এই সময়ের মধ্যেই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াটি শুরু করবে এবং সেই প্রক্রিয়া সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে যাতে অগ্রসর হয় সরকার তার নিশ্চয়তা বিধান করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।’
সনদ স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে এনসিপির অনাস্থা প্রসঙ্গে ড. আলী রীয়াজ বলেন, জুলাই আন্দোলন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পরবর্তী সংস্কার ও রাজনৈতিক সনদ প্রক্রিয়ায় এনসিপির অবদান আছে। এসব বিবেচনায় কমিশন আশা করছে, এনসিপির নেতারা জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে আসবেন এবং সই করবেন।
তিনি আরও জানান, কমিশন আশা করছে শুক্রবার উৎসবমুখর পরিবেশ সনদে রাজনৈতিক দলগুলো সই করবে। তবে কোনো দল যদি মনে করে পরে করবে, তবে সেটাও করতে পারবে। তাদের জন্য দরজা খোলা থাকবে। সব দল জুলাই সনদে স্বাক্ষর না করলে সনদের ভবিষ্যৎ কী- এমন প্রশ্নের উত্তরে ড. রীয়াজ বলেন, এটি হাইপোথিটিক্যাল। সনদে সই করাটা একটি ডকুমেন্ট। বামদলগুলো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে- এমন প্রত্যাশাও করেন তিনি।
‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ স্বাক্ষরে প্রস্তুত বিএনপি
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি জাতীয় সংসদের ওপর নির্ভর করবে। আমরা জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করব, তবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ যেগুলো রয়েছে, সেগুলোর অবশ্যই উল্লেখ থাকতে হবে। আমরা আশা করি, ১৭ অক্টোবর জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হবে এবং সেটি জাতির সামনে প্রকাশ করা হবে। পরে ঐকমত্য কমিশন সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রস্তাব রাখবে। আগে গণভোট অনুষ্ঠানের বিষয়টা কতটা যৌক্তিক আপনারা সবাই একটু চিন্তা করে দেখবেন এবং আমরা মনে করি, সেটা নির্বাচন বিলম্বিত করার একটা প্রয়াস। আর একই দিনে একটা ছোট্ট ব্যালটে গণভোট হলে সেটা আমাদের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক এবং ব্যয়বহুল হবে না।”
সিদ্ধান্তহীনতায় জামায়াতে ইসলামী
জুলাই সনদে স্বাক্ষরের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় জামায়াত। গতকাল এক অনুষ্ঠানে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামী অংশ নেবে। তবে সনদে স্বাক্ষর করার বিষয়ে তারা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি বলেন, গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে হলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। নভেম্বরই গণভোটের উপযুক্ত সময়। এ সময়ে ঐকমত্য কমিশনের সব প্রস্তাবই গণভোটের মধ্যে রাখার দাবি জানান তিনি। জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিয়ে সংশয় রয়েছে। গণভোটের মাধ্যমে সনদের আইনি ভিত্তি দিতেই হবে। গণভোটে বাধা দিলে বিএনপির অবস্থা আওয়ামী লীগের মতো হবে।
সনদে স্বাক্ষর করবে না এনসিপি
জুলাই সনদে সই করা না করার প্রশ্নে গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ছাড়া অর্ডারে স্বাক্ষর করা মূল্যহীন হবে। সেই বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা অনুষ্ঠানে অংশীদার হব না। আমরা প্রথম থেকেই বলেছি যে এটার একটা আইনি ভিত্তি দিতে হবে। কারণ এ ক্ষেত্রে কতগুলো রাজনৈতিক দল এক জায়গায় বসে একটা দীর্ঘ আলোচনা দিয়ে কিছু বিষয়ে ঐকমত্যে আসাই যথেষ্ট না। একটা নিশ্চয়তা আমাদের দিতে হবে যে সেই বিষয়গুলো রাজনৈতিক দলগুলো পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় গেলে সেটা বাস্তবায়ন করবে। আগামীকাল যেই অনুষ্ঠানটা হতে যাচ্ছে, সেখানে জুলাই সনদ স্বাক্ষরের ঘটনা ঘটবে। ফলে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি বা যে অর্ডার জারি করার কথা বলা হচ্ছে, সে অর্ডার জারির আগে স্বাক্ষর কেবল আনুষ্ঠানিকতা।’
অনুষ্ঠান বর্জন করেছে ৪ বামদল
জুলাই সনদে যথাযথ মর্যাদায় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও স্বাধীনতার ইশতেহার উপেক্ষিত হয়েছে অভিযোগ তুলে শুক্রবারের জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে বামপন্থি চারটি দল। দলগুলো হলো বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশ জাসদ ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী)। তাদের মতে, কমিশনের আলোচনায় যেসব বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য হয়েছে কেবল সেসব বিষয়েই সবার স্বাক্ষর নেওয়া যেতে পারে। ভিন্নমতগুলো অতিরিক্ত (অ্যানেক্স) প্রতিবেদন হিসেবে সনদে সংযুক্ত থাকতে পারে।
গতকাল পুরানা পল্টনে সিপিবির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলটির নেতারা জানান, সনদে স্বাধীনতার ঘোষণা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
জুলাই সনদ স্বাক্ষরের প্রস্তুতি
জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি বিষয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ জানান, শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সনদ তৈরির প্রেক্ষাপট এবং এর ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা বিষয়ে ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হবে। পাশাপাশি আগামী দুই মাসে এটা নিয়ে আরও কাজ করা হবে। এই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা গেলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন আসবে।
জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান ঘিরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা এলাকায় কোনো ধরনের ড্রোন না ওড়াতে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এ তথ্য জানিয়েছে।
সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী সাংবাদিক মনির হায়দার গতকাল রাজধানীর বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে গিয়ে তাদের দাওয়াতপত্র পৌঁছে দেন। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে থাকবেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নেতৃত্বে শতাধিক নেতা। এ ছাড়া ১২-দলীয় জোটের প্রধান ও জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, জোটের মুখপাত্র ও বাংলাদেশ এলডিপি চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের ডা. ফরিদুজ্জামান ফরহাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত থাকবেন।
গত ২৯ জুলাই রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদের প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। পরে দলগুলোর মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে ওই খসড়া সংশোধন করে গত ১৬ আগস্ট ‘সমন্বিত খসড়া’ দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়। গত ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে জুলাই জাতীয় সনদের চূড়ান্ত অনুলিপি ৩২টি রাজনৈতিক দল ও একটি জোটের কাছে পাঠানো হয়। এসব দল ও জোটের পূর্ণ ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ১৭টি বিষয়ে ৮৪ দফার জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। বাকি ৬৭টি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কেউ কেউ বিরোধিতা করেছে; সাংবিধানিক ৯টি ইস্যুতে দিয়েছে নোট অব ডিসেন্ট।