চট্টগ্রামের অধিকাংশ শিল্পকলকারখানা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছে। কারখানার ভবন কমপ্লায়েন্স ভবনে রূপান্তর না করায় এ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অধিকাংশ ভবনের ফায়ার সেফটি সনদও নেই।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার সিইপিজেডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অগ্নিনিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস। দুই সপ্তাহের মধ্যে কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।
জানা গেছে, চট্টগ্রামে একের পর এক শিল্পকারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। অতি গুরুত্বপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অবস্থিত শিল্পকারখানাতেও ঘটছে অগ্নিকাণ্ড। অথচ এসব স্থানে যথাযথ ফায়ার সেফটি থাকার কথা ছিল। ফায়ার সেফটি না থাকার বিষয়টি একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখছেন চট্টগ্রামের ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
ফায়ার সার্ভিসের মতে, চট্টগ্রামের অনেক কারখানায় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র না থাকা বা সেগুলো অচল থাকার অভিযোগ রয়েছে। এতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের সময়, প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ, নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা না থাকায় জীবনহানির শঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রামের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর জানায়, চট্টগ্রামের অনেক কারখানায় অগ্নিনির্বাপণ বা পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। জরুরি বহির্গমনের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক কারখানায় শ্রমিকদের অগ্নিকাণ্ডের সময় করণীয় সম্পর্কে সঠিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা রোধ করতে এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি করা প্রয়োজন কর্তৃপক্ষের। কিন্তু সেটি দেখা যায় না। সরকার ও শিল্পমালিকদের যৌথভাবে কাজ করতে হবে। যাতে পোশাক কারখানাগুলোতে ফায়ার সেফটি নিশ্চিত করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম সরবরাহ করা, নিয়মিত সেগুলো পরীক্ষা করা, অগ্নিকাণ্ডের সময় দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করা এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া।
চট্টগ্রামে তৈরি পোশাকসহ প্রায় ১০ হাজার শিল্পকলকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নিবন্ধিত উৎপাদনকারখানা ৬ হাজার ৫৯৭টি। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় রয়েছে দুই শতাধিক কারখানা, যার মধ্যে ভারী শিল্পের কারখানা প্রায় ১৫০টি।
এ ছাড়া চট্টগ্রামে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (বেপজা) নিয়ন্ত্রিত চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা সিইপিজেড, কেইপিজেড ও কোরিয়ান ইপিজেড, কালুরঘাট ভারী শিল্প এলাকা, বিসিক নিয়ন্ত্রণাধীন শিল্পাঞ্চলে আরও ২ হাজার কারখানা রয়েছে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নেই এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৯৪টি। সবই পোশাক কারখানা। এসব প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হবে। তাই চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পোশাক কারখানায় বেশি শ্রমিক কাজ করেন। অধিকাংশ পোশাক কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল। এ ছাড়া অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা আছে কিন্তু আরও জোরদার করা জরুরি এ ধরনের সংখ্যাও কয়েক হাজার।’
এদিকে গত ১৬ অক্টোবর বেলা ২টার দিকে চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (সিইপিজেড) অ্যাডামস ক্যাপস অ্যান্ড টেক্সটাইল কারখানার ভবনে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। ১৭ ঘণ্টা পর শুক্রবার সকালে নিয়ন্ত্রণে আসে এ আগুন। এ ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। একটি ফায়ার সার্ভিসের, অপরটি সিইপিজেড কর্তৃপক্ষের। যদিও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। আগুনের ভয়াবহতা, ফায়ার সার্ভিসের কাজের সীমিত সুযোগ এবং ভবনের ভেতরে থাকা কেমিক্যালের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
এ ছাড়া অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকার বিষয়টিও সামনে আসে এ অগ্নিকাণ্ড থেকে। ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দেখেন এ ভবন কমপ্লায়েন্স ভবনে রূপান্তর করা হয়নি। এর আগে গত ১১ জুলাই চট্টগ্রামের পতেঙ্গার কর্ণফুলী ইপিজেডের অ্যারো ফেভারিট কারখানায় (তুলার কারখানা) আগুন লাগে। তারও আগে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের ইপিজেডে ৬ তলা একটি ভবনের ৪ তলায় একটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
নগরবিদ ও স্থপতি আশিক ইমরান খবরের কাগজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি প্রধান শিল্পাঞ্চল। এখানে ছোট-বড় অসংখ্য কারখানা, গুদাম ও উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই অগ্নিনিরাপত্তার মৌলিক শর্ত পূরণ করে না। এতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। অধিকাংশ কারখানায় নেই অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, হাইড্রান্ট বা স্মোক ডিটেকশন সিস্টেম। জরুরি বহির্গমন পথ অনেক জায়গায় অবরুদ্ধ। শ্রমিক ও কর্মকর্তারা ফায়ার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ পান না। বিপদের সময় করণীয় সম্পর্কে অনেকের ধারণা নেই। নিয়ন্ত্রণ সংস্থার তদারকিও খুবই দুর্বল। নিয়মিতভাবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিদর্শন করা হয় না। অনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনুমোদন (সনদ) নেওয়া হয়। এ ছাড়া অনেক কারখানা পুরোনো ভবন, অপর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন, অতিরিক্ত লোডে বিদ্যুৎ সংযোগ- সব মিলিয়ে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বহু গুণ বেড়ে যায়। চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প অঞ্চলে যদি ফায়ার সেফটি অবহেলিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এখনই সময় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার।’
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ইপিজেডের সব ভবন কমপ্লায়েন্স ভবনে রূপান্তর করা খুবই জরুরি। সব কারখানার শ্রমিকদের ফায়ার ড্রিল ট্রেনিং করানো জরুরি। সামনে শীত আসছে। এ সময় অনেক অগ্নিকাণ্ড ঘটে থাকে। সবাইকে সতর্ক থাকা জরুরি। কারখানাগুলোকে অগ্নিনিরাপত্তা সনদ নিতে হবে।’