প্রাথমিকে সংগীত ও শরীরচর্চা শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গতকাল শনিবারও রাজধানী ঢাকায় বিবৃতি দেওয়াসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এদিন সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যানারে প্রতিবাদী গানের মিছিল, অবস্থান বিক্ষোভ এবং সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
উদীচীর পক্ষকালব্যাপী কর্মসূচি
দেশজুড়ে পক্ষকালব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। গতকাল সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন উদীচীর কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে।
শিশুদের সাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে গড়ে তোলার চক্রান্ত রুখে দেওয়ার লক্ষ্যে এই কর্মসূচি ঘোষণা করে অমিত রঞ্জন দে বলেন, বিভিন্ন সমমনা প্রগতিশীল সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে উদীচীর সব জেলা ও শাখা সংসদের উদ্যোগে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশ, মানববন্ধন, গানের মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হবে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদান, গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন, বিশিষ্টজনদের বিবৃতি প্রদান কর্মসূচি পালন করা হবে।
লিখিত বক্তব্যে অমিত রঞ্জন দে বলেন, ‘সংগীত ও শরীরচর্চাবিষয়ক শিক্ষক নিয়োগ বাতিল করা একটি সুদূরপ্রসারী চক্রান্তমূলক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ। শিক্ষাক্রম থেকে চারুকলা, সংগীতকলা, নৃত্যকলা, নাট্যকলাও বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। উদীচী মনে করে, এসব সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী এবং সাম্প্রদায়িক, রাজনৈতিক সংকীর্ণতাপ্রসূত।’
উদীচীর কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিমের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থার সভাপতি ড. মকবুল হোসেন, সংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সহ-সাধারণ সম্পাদক মহাদেব ঘোষ, নজরুলসংগীত শিল্পী পরিষদের সভাপতি সুজিত মোস্তফা, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সহসভাপতি কামারুজ্জামান ভূঁইয়া, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের সহ-সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইটসহ অন্যরা।
প্রাথমিক শিক্ষায় সংগীত ও শারীরিক শিক্ষাবিষয়ক শিক্ষকের পদ পুনর্বহালের দাবিতে আজ রবিবার রাজধানীর তোপখানা রোড থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন অভিমুখে গানের মিছিল করবে সংস্কৃতিকর্মীদের একটি দল। এই দলটির নেতৃত্ব দেবেন উদীচীর সংস্কৃতিকর্মীদের একটি অংশ।
হাবিবুল আলম ও জামশেদ আনোয়ার তপনের নেতৃত্বাধীন সংস্কৃতিকর্মীদের এই জোট বিবৃতিতে বলেছে, ‘ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলের হুমকির মুখে সরকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষাবিষয়ক শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে, যার মধ্য দিয়ে মূলত একটি বিশেষ গোষ্ঠীর কাছে সরকারের নতজানু চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করে উদীচী।’
ছায়ানটে সম্মেলক সংগীত
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক ও শারীরিক শিক্ষাবিষয়ক শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন ছায়ানটের শিল্পীরা। গতকাল বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির ছায়ানট ভবনের সামনে শিল্পীরা সম্মেলক কণ্ঠে গান গেয়ে সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান।
ছায়ানটের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষায় সংগীত ও শরীরচর্চার শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ছায়ানট মনে করে, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য সংগীত শিক্ষা ও শরীরচর্চা অপরিহার্য। উদার ও সহিষ্ণু সমাজ গড়ার জন্য সংগীত শিক্ষা ও শরীরচর্চার কোনো বিকল্প নেই, সরকারের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য ছায়ানট অনুরোধ জানাচ্ছে।’
সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারিরীক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক নিয়োগ বাতিল করতে সরকারি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ। পরিষদের সভাপতি মফিদুল হক এবং নির্বাহী সভাপতি বুলবুল ইসলামের যৌথ বিবৃতিতে এ দাবি জানিয়ে বলা হয়েছে, ‘শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির যোগসাধনে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সমন্বিত শিক্ষা-কার্যক্রম বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই দুই বিষয়ে শিশু-কিশোরদের শিক্ষা লাভের অধিকার নিয়ে দ্বিমত করার অবকাশ নেই। বরং কীভাবে তা আরো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় সেটাই আমাদের জাতীয় কর্তব্য।’
সংগীত ও শারিরীক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ায় গলদ ছিল বলে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ বলছে, ‘সারা দেশে সব প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই দুই বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ রাতারাতি সম্ভব হবে না। তবে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর এখনই সময়।’