রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাঁচাতে কোটি কোটি টাকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পেছনে ঘোরার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন। অভিযোগটির পরিপ্রেক্ষিতে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন দাবি করেছেন, ‘আমি তার (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) পেছনে টাকা নিয়ে ঘুরিনি।’
হাসপাতালটিতে সম্প্রতি ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি। রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠান আদ্-দ্বীন হাসপাতালে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
গত শনিবার এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল তার পেছনে কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে। কিন্তু তার টাকার প্রতি কোনো লোভ নেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন অভিযোগের ভিত্তিতে গতকাল সংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন ওই দাবি করেন।
এদিকে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সম্প্রতি হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করেছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ এই রিট করেন। তিনি গতকাল দৈনিক খবরের কাগজকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ জানান, জনস্বার্থে করা এই রিটের ওপর আগামী রবিবার (২১ জুন) শুনানি হতে পারে। বিচারপতি রাজিক আল জলিলের নেতৃত্বে থাকা হাইকোর্ট বেঞ্চে এই রিট হওয়ার কথা রয়েছে।
এই রিটের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান শেখ মহিউদ্দিন। হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে সরকারের দেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত এমন চিন্তা নেই। সরকার সহযোগিতা করবে এবং ঘাটতিগুলো দূর করার পর হাসপাতাল আবার লাইসেন্স পাবে, এমনটাই প্রত্যাশাই তাদের। লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে সে অনুযায়ী মঙ্গলবার (আজ) আপিল করা হবে বলেও জানান তিনি।
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সরকার লাইসেন্স বাতিল করার পর হাসপাতালটির বিভিন্ন সংস্কারের বিষয়ে জানাতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অভিযোগের প্রসঙ্গটি সামনে এলে শুরুতে জবাব দিতে চাননি আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। পরে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
শেখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই না। মন্ত্রীকেই জিজ্ঞেস করেন, এই প্রমাণটা ওনাকে দেখাতে। মন্ত্রীকে প্রুফ করতে বলেন। হি হ্যাজ টু প্রুভ ইট। আমি তার পেছনে টাকা নিয়ে কেন ঘুরব? আমার তো টাকা নিয়ে ঘোরার দরকার নেই। আমার কথা হলো, তার (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) পেছনে আমি টাকা নিয়ে ঘুরিনি।’
তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে। এটি আমার ফাঁসি হয়ে গেছে। আমার হাসপাতালের ফাঁসি। লাইসেন্স বাতিল হয়ে গেছে। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আমরা সম্মান জানাই। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, এটি দিয়ে অন্য বেসরকারি মেডিকেল কলেজকে শিক্ষা দিচ্ছি। আলহামদুলিল্লাহ, এটি দিয়ে যদি অন্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো শিক্ষা পায়, তাতে আমি খুশি। আমার হাসপাতালকে শিক্ষা দিয়ে যদি অন্য মেডিকেল কলেজকে পরিবর্তন করা যায়, তাহলে এটি নিয়ে আমার কোনো কষ্ট নেই।’
শেখ মহিউদ্দিন বলেন, লাইসেন্স বাতিলের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একটি পরিদর্শন প্রতিবেদনও দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে যেসব ত্রুটি ও ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো সমাধানে তারা কাজ শুরু করেছেন। তার আশা, এক সপ্তাহের মধ্যে অধিকাংশ কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে হাসপাতালে বেকারি থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাসপাতাল ভবনের ওপরের তলায় থাকা বেকারিটির লাইসেন্স নিয়ে কোনো আইনি সমস্যা ছিল না। তবে সরকারের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে বেকারিটি আপাতত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের অন্যত্র কাজের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে বেকারিটি অন্য স্থানে স্থানান্তর করা হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার তাদের কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়নি। তবে যে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে লাইসেন্স বাতিল হয়েছে, সেই প্রতিবেদনে চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারকে এসব অগ্রগতির বিষয়ও জানানো হবে। ডা. শেখ মহিউদ্দিন বলেন, এত শিশুর মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়নি জানিয়ে শেখ মহিউদ্দিন বলেন, সেখানে ভেন্টিলেশন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। বিষয়টির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে আরও বিস্তৃত ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন, যা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হওয়া উচিত।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নতুন কোনো রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। তবে কিছু রোগী, বিশেষ করে নবজাতক ও সংকটাপন্ন রোগীদের তাৎক্ষণিকভাবে স্থানান্তর করা ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে আইসিইউতে ৫ জন, এনআইসিইউতে ৩৬ জন, শিশু বিভাগে ৬ জন, গাইনি বিভাগে ৯ জন ও অন্যান্য বিভাগে কয়েকজন ভর্তি আছেন।