মানসম্মত বই প্রকাশের ক্ষেত্রে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বুক নাম্বার (আইএসবিএন) প্রদানে আরও কড়াকড়ি আরোপের পরামর্শ এসেছে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের আলোচনা সভায়।
শনিবার (৬ ডিসেম্বর) অনুষ্ঠিত এ সভায় প্রকাশনাকে পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জাতীয় গ্রন্থনীতি প্রণয়ন এবং জাতীয় গ্রন্থ উন্নয়ন পরিষদ গঠনের পরামর্শ এসেছে।
‘বাংলাদেশে মানসম্মত সৃজনশীল বই প্রকাশের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণ’ শীর্ষক এ আলোচনাসভায় সভাপতিত্ব করেন গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনীষ চাকমা।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক খান মাহবুব।
আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক খবরের কাগজের উপ-সম্পাদক ড. এমদাদ হাসনায়েন, বৈষম্যবিরোধী প্রকাশক সমিতির সভাপতি সাঈদ বারী ও সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হাসান, বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গফুর হোসেন, লেখক ও সাংবাদিক হক ফারুক আহমেদ, কবি ইমরান মাহফুজসহ আরও অনেকে৷
ড. এমদাদ হাসনায়েন বলেন, ‘আইএসবিএন নাম্বার এখন খুব কঠিনভাবে দেখা দরকার। কারণ, আমরা একটা আবেদন করি, সঙ্গে সঙ্গে আইসবিএন নাম্বার পাঠিয়ে মেসেজ আসে। মাত্র ২০০-২৫০ টাকা দিলেই আইএসবিএন নাম্বার পাওয়া যায়। এটা তো এত সস্তা জিনিস না। আইএসবিএন নাম্বার পেতে হলে করণীয় কী হবে, তার পরামর্শ দেন গবেষক এমদাদ হাসনায়েন।’
তিনি বলেন, ‘একটা বইয়ের পাণ্ডুলিপি জমা পড়বে, জমা পড়ার পর এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে গবেষক, লেখক, কথাসাহিত্যিক এবং শিক্ষাবিদরা। তারপর গবেষকরা পাণ্ডুলিপি বিশ্লেষণ করে বইটি ঠিক আছে কি না তা বলে দেবেন।’
খান মাহবুব বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মের চাহিদা অনুযায়ী প্রকাশনার পরিকাঠামো পুনর্গঠন জরুরি, যেখানে ট্র্যাডিশনাল কনটেন্ট ও মুদ্রণ শৈলীর বাইরে গিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ই-বুক, অডিওবুক, এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্টের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তরুণ প্রজন্মের পরিবর্তিত পাঠাভ্যাস, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ঝোঁক, এবং প্রযুক্তিনির্ভর চিন্তাধারা প্রকাশনা শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তবে ই-বুক, অডিওবুক, ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্ট, এসবের চাহিদা পূরণের জন্য বাংলা ফন্ট, টাইপিং সফটওয়্যার, ক্যালিগ্রাফি, এবং এআই-ভিত্তিক লেখালেখির ক্ষেত্রে ঘাটতি প্রকট।’
এ ঘাটতি পূরণের পরামর্শ দিয়ে খান মাহবুব বলেন, ‘সরকারকে প্রকাশনা শিল্পকে একটি পূর্ণাঙ্গ, সম্মানিত শিল্পখাতে রূপান্তরের জন্য নীতিগত সহায়তা ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সরকার যদি প্রকাশনাকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জাতীয় গ্রন্থনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে ‘জাতীয় গ্রন্থ উন্নয়ন পরিষদ’ গঠন করে, তাহলে লেখক, প্রকাশক, পাঠক ও গবেষক-সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।’
প্রকাশক সমিতির নেতা সাঈদ বারী বলেন, ‘প্রকাশকদের মধ্যে পেশাদারত্ব বৃদ্ধি করতে হবে। সম্পাদনা, কভার ডিজাইন, প্রুফ রিডিং, অনুবাদসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল নিয়োগে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। বইয়ের ডিজিটাল সংস্করণ, অডিও বই, অনলাইন সেলস, এগুলোকে আরও কার্যকর করা গেলে বাজার বাড়বে এবং উৎপাদন খরচ কমবে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গ্রন্থাগার বিস্তার ও বই-ভর্তুকি চালু করলে মানসম্পন্ন বই প্রকাশে উৎসাহ বাড়বে। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে পাঠাভ্যাস জোরদার করলেও দীর্ঘমেয়াদে পাঠকের সংখ্যা বাড়বে।’
জয়ন্ত/নাঈম/