জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাবেক পরিচালক আফসানা বেগমের দায়িত্বকালে বই কেনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় তাদের গঠিত ‘বই নির্বাচন কমিটি’ বাতিল করেছে।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) এক দাপ্তরিক আদেশে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের ‘বই নির্বাচন কমিটি’ বাতিল করে দেয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।
সোমবার জারি করা মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বেসরকারি গ্রন্থাগারে অনুদানের জন্য বই নির্বাচনের উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর গঠিত বই নির্বাচন কমিটি বাতিল করা হলো।’
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. খালিদ হোসেন স্বাক্ষরিত সেই আদেশে বলা হয়েছে, ‘কমিটির কার্যক্রমে স্বার্থের সংঘাতসহ বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় বই নির্বাচন কমিটি বাতিল করা হয়েছে।’
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, খুব শিগগিরই নীতিমালা অনুযায়ী নতুন বই নির্বাচন কমিটি গঠন করা হবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পরে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বই নির্বাচন ও দান-বিতরণ কাজের জন্য একটি বই নির্বাচন কমিটি গঠন করে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও সাহিত্যিকদের নিয়ে ১১ সদস্যের এ কমিটি গঠিত হয়।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রতিবছর সরকারি অনুদানে বিভিন্ন গ্রন্থাগারের জন্য বই নির্বাচন ও সরবরাহ করা হয়। এ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে খোদ সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী প্রশ্ন তুলেছেন নানা বৈঠকে।
এ সমালোচনার কারণে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বই নির্বাচন কমিটির সদস্যরা বিব্রত হচ্ছিলেন। সদ্য সাবেক পরিচালক আফসানা বেগম জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কাজে ‘অযাচিত হস্তক্ষেপ’ করতেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা ফারুকী।
বই বাছাই কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু। কমিটির কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনার জবাবে তিনি ফেইসবুকে বেশ কয়েকটি ‘স্ট্যাটাস’ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘বই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শিশু-কিশোর পাঠক, গ্রাম ও মফস্বলের পাঠকদের চাহিদা বিশেষভাবে বিবেচনায় রেখেছিল বাছাই কমিটি।’ পুরো প্রক্রিয়াটি ‘স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক’ ছিল মন্তব্য করেন তিনি।
সুলতানা ঋতু জানান, বদরুদ্দীন উমর, ফরহাদ মজহার, সলিমুল্লাহ ও আনু মুহাম্মদের যেসব বই প্রকাশকেরা তালিকাভুক্ত করেছিলেন, সেগুলোই নিয়ম অনুযায়ী বাছাই হয়েছে। প্রকাশকেরা তালিকায় না দিলে কমিটির পক্ষে কোনো বই নির্বাচন করার সুযোগ ছিল না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মোশাহিদা সুলতানা ঋতু আরও জানান, অনেক পছন্দের বই থাকা সত্ত্বেও তালিকায় না থাকায় দেওয়া সম্ভব হয়নি। যেসব বই নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে, সেগুলো মোট বাছাইকৃত বইয়ের এক শতাংশেরও কম।
নিজেদের বই অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার এবং আহমাদ মোস্তফা কামালের কোনো বই আমরা প্রস্তাব করিনি। ১১ সদস্যের কমিটির মধ্যে ৯ জনের মতামতেই বইগুলো চূড়ান্ত হয়েছে।’
বাছাই কমিটির বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের সমালোচনা করে মোশাহিদা সুলতানা ঋতু বলেন, ‘কমিটিতে ১১ জন ছিলেন, অথচ মাত্র দুইজনকে দায়ী করা হচ্ছে। সংস্কৃতি উপদেষ্টা নিজেই বাছাইকৃত বই অনুমোদন দিয়েছেন। তাহলে পুরো প্রক্রিয়াই কি তিনি দেখেননি?’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্কৃতি সচিব মো. মফিদুর রহমান বলেন, ‘বই নির্বাচন কমিটি বাতিল করা হয়েছে এবং শিগগিরই একটি নতুন কমিটি গঠন করা হবে। পাশাপাশি জুলাইয়ের চেতনায় উদ্বুদ্ধ বই কেনার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, চলতি অর্থবছরেই জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান, পিলখানা ও শাপলা ট্র্যাজেডি বিষয়ক বই ক্রয়ের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
জয়ন্ত সাহা/সুমন/