দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ ও জমি দখলের ঘটনা ‘উদ্বেগজনক’ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনোরিটিজ (এইচআরসিবিএম)। সংস্থাটির হিসাব মতে, গত আট মাসে দেশে অন্তত ৭২৭টি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেন সংস্থার কনভেনর অ্যাডভোকেট লাকী বাছাড়।
এসব অপরাধ দমনে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন ও বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বাড়ছে সহিংসতা
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্যাতনের ধারা ঊর্ধ্বমুখী।
২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সাত মাসে মোট ৪৯৪টি নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হত্যা, মব জাস্টিসের নামে সহিংসতা, মন্দির ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ।
২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২৩৩টি নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে।
চলতি বছরের প্রথম ৫৫ দিনে ৪৪ জন সংখ্যালঘু ব্যক্তি খুন বা রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। বর্তমানে ৩০ জন সংখ্যালঘু তরুণ-তরুণী নিখোঁজ বা অপহৃত অবস্থায় রয়েছেন।
গত দুই মাসে আটজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে মানিকগঞ্জে অপহৃত এক কিশোরীকে যথাযথ নথিপত্র ছাড়াই বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে ‘নিজে জিম্মায়’ পাঠানোর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া গত ২২ ফেব্রুয়ারি ভোলার তজুমদ্দিনে বাকপ্রতিবন্ধী এক হিন্দু নারীকে গণধর্ষণের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়।
জনপ্রতিনিধিত্ব ও নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে লাকী বাছাড় বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে মাত্র চারজন সংখ্যালঘু প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, যা জনসংখ্যার অনুপাতে অত্যন্ত নগণ্য।’
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি একটি বিশেষ ‘হটলাইন’ সেবা চালুর প্রস্তাব দেয় সংস্থাটি।
এইচআরসিবিএমের ৫ দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পাঁচ দফা দাবি পেশ করা হয়। ১. প্রতিটি নির্যাতনের ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা। ২. অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান। ৩. সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা চৌকি ও টহল জোরদার। ৪. মব সহিংসতা ও ধর্ম অবমাননার অভিযোগের অপব্যবহার রোধে কার্যকর আইন প্রয়োগ। ৫. অবিলম্বে ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।
অ্যাডভোকেট লাকী বাছাড় বলেন, ‘আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ চাই। সরকারের কাছে আমাদের আহ্বান, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জীবন ও মর্যাদা রক্ষায় দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিন।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সংস্থার কো-অর্ডিনেটর আশিষ কুমার অঞ্জন, ট্রেজারার বিদ্যুৎ কুমার রায়, বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটর দেবী চরণ রায়, সৃজন দাস এবং হিউম্যান রাইটস অ্যাসিস্ট্যান্ট রাজ চাকমা, টুকু বাছাড় ও সমীর চন্দ্র মিস্ত্রি।