বিএনপি সরকারের ইশতেহার অনুযায়ী ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা সবার আগে বাংলাদেশ নীতিতেই চলবে দেশের পররাষ্ট্রনীতি। পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায় নতুন সরকার।
সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানও জানিয়েছেন, এখন থেকে দেশের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় নীতি হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে সম্পর্কোন্নয়ন করেই হচ্ছে এ সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন, যার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। সম্মান ও সার্বভৌমত্ব এবং দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে। এখানে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও অবস্থান থেকেই পররাষ্ট্রনীতি এগিয়ে যাবে।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে আগের পররাষ্ট্রনীতির নতুন ‘ভার্সন’।
আগের পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ ছিল খুবই উদার এবং এখানে জাতীয় স্বার্থের কথাটি উল্লেখ ছিল না। কিন্তু নতুন পররাষ্ট্রনীতিতে সমতা ও সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্কোন্নয়ন এবং কেউ কারও বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। এবার বেশি করে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানও ঘোষণা দেন, দেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’।
সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গে, বিশেষ করে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্মানজনক ও পারস্পরিক কল্যাণকর সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা জানান তিনি। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই তিনি জানান, দেশের বৈদেশিক সম্পৃক্ততা নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে। সার্বভৌম, সমতা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, জাতীয় মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ মাত্রায় জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখব।’
পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করে ড. খলিলুর রহমান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অসতর্কতা বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে গণমাধ্যমকে বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’
তিনি বলেন, সরকার শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়কার ইতিবাচক ও বিস্তৃত পররাষ্ট্রনীতিতে ফিরে যেতে চায়। সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ অটুট রাখার ওপর জোর দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, ‘সরকার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায় এবং এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে নজর রাখার আহ্বান জানাই।’
কার্যকর যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের পররাষ্ট্র কার্যক্রম হবে জনকেন্দ্রিক।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, “নীতিনির্ধারকদের মধ্যে যারা দ্বৈত নাগরিক বা যাদের সন্তানরা পশ্চিমা দেশে লেখাপড়া করেন, তাদের দিয়ে এই পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন অসম্ভব। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট, পররাষ্ট্রনীতি ভালো শোনা গেলেও বাস্তবায়ন সহজ হবে না। রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে বিদেশের নাগরিকত্ব থাকার বিষয়টি ভারত, চীন, সিঙ্গাপুরসহ কোনো দেশই মেনে নেয় না। কিন্তু বাংলাদেশে দ্বৈত নাগরিকরা দেশ চালান, কেউ কিছু বলেন না। এদের মনোযোগ বিদেশেই বেশি থাকে।”
তবে পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পেশাদারত্ব আনতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের ভিত্তিতে। কোনো বিশেষ দেশের প্রতি অতি-নির্ভরশীলতা নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো দেশের মেরুদণ্ড সোজা রেখে বিদেশে একটি স্থিতিশীল এবং সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত করা।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, মেরুদণ্ড সোজা রেখে বাংলাদেশ ফার্স্ট পররাষ্ট্রনীতি ভালো শোনা গেলেও এতে কোনো নতুনত্ব নেই। কূটনীতিতে মেরুদণ্ড সোজা রেখেই সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা হয়, কিন্তু অনেক সময় ব্যক্তিস্বার্থ ফার্স্ট হয়ে যাওয়ায় মেরুদণ্ড আর সোজা থাকে না। আবার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক সময় তৃতীয় অন্য শক্তিশালী দেশের কথা ভেবে মেরুদণ্ড বাঁকা করতে হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে মেরুদণ্ড সোজা ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সেই অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতায় থাকা দ্বৈত নাগরিকদের কেউ কেউ নতুন সরকারের ক্ষমতায় আছেন। তাহলে মেরুদণ্ড সোজা রেখে বাংলাদেশ ফার্স্ট পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন অনেক কঠিন।