ঈদ মানেই আনন্দ, আর সেই আনন্দ বহুগুণ বেড়ে যায় যখন নাড়ির টানে পরিবারের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে সময় কাটানো যায়। তবে প্রতিবছর ঈদযাত্রায় ভোগান্তির যে চিরাচরিত চিত্র দেখা যায়, তা এড়াতে এবার ভিন্ন কৌশল নিয়েছেন অনেক ঘরমুখী মানুষ। বাড়তি ভিড় ও ভোগান্তি এড়াতে কর্মজীবী পুরুষরা নিজে থেকে গেলেও আগেভাগেই পরিবারের অন্য সদস্যদের গ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
রবিবার (১৫ মার্চ) সকালে কমলাপুর রেলস্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, গত দুই দিনের তুলনায় স্টেশনে যাত্রীদের চাপ অনেকটাই কম। স্বস্তিতে ও আরামদায়ক পরিবেশে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছেন যাত্রীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ট্রেনের আগাম টিকিট কেটে রাখা যাত্রীদের জন্য গতকাল ছিল ঈদযাত্রার তৃতীয় দিন। স্টেশনে মানুষের সংখ্যা ছিল বেশ সীমিত। মূলত যারা আগে টিকিট কেটেছিলেন, তাদের বড় একটি অংশ গত দুই দিনে ঢাকা ছেড়েছেন। আর যারা এখনো রাজধানীতে অবস্থান করছেন, তারা অপেক্ষা করছেন অফিস ছুটির।
তবে এই মধ্যবর্তী সময়ে পরিবারের নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং শিক্ষার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। টাঙ্গাইলগামী ট্রেনের যাত্রী ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী মো. রোম্মান বলেন, ‘টিউশনি ছুটি দিয়ে আগেভাগেই বাড়ির পথ ধরেছি। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা ও ছোট ভাই আছে। অনেক দিন পর তাদের সঙ্গে ঈদ করব, ভাবতেই ভালো লাগছে।’
জামালপুরগামী আন্তনগর ট্রেনের যাত্রী সুমাইয়া জানান, তার বাবার অফিস ছুটি হবে ২৭ রমজানে। তাই ভিড় এড়াতে মা ও ভাইয়ের সঙ্গে তিনি আগেই রওনা হয়েছেন।
পরিবারকে বিদায় জানাতে আসা লোকমান হোসেন বলেন, ‘আমার ছুটি ১৮ মার্চ। সেদিন অনেক চাপ থাকবে ভেবে স্ত্রী-ছেলেকে আজই পাঠিয়ে দিচ্ছি। ট্রেনও বেশ ফাঁকা দেখছি। তবে দুঃখের বিষয়, ওদের টিকিট অনলাইনে কাটতে পারলেও নিজের জন্য টিকিট সংগ্রহ করতে পারিনি।’
স্টেশনে দায়িত্বরত টিটিদের (ট্রেন টিকিট পরীক্ষক) সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রকৃত অর্থে ঈদযাত্রার বড় চাপ শুরু হতে পারে সোমবার (আজ) থেকে। সরকারি-বেসরকারি বেশির ভাগ অফিসের ছুটি এখনো শুরু হয়নি, তাই শেষ মুহূর্তের দিনগুলোতে স্টেশনে তিল ধারণের জায়গা থাকবে না বলে তাদের ধারণা।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, এখন পর্যন্ত ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ঘটেনি এবং যাত্রীরা নির্বিঘ্নে তাদের গন্তব্যে রওনা হতে পারছেন।
রেলওয়ে জানিয়েছে, আজ সোমবার থেকে সারা দেশের সব আন্তনগর ট্রেনের সাপ্তাহিক বন্ধ বাতিল করা হয়েছে। বিনা টিকিটের যাত্রী প্রতিরোধে ঢাকা, বিমানবন্দর, জয়দেবপুর, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, রাজশাহী, খুলনাসহ বড় স্টেশনগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। জিআরপি, আরএনবি, বিজিবি, র্যাব ও স্থানীয় পুলিশের সহযোগিতায় টিকিটবিহীন যাত্রীদের স্টেশনে প্রবেশ ঠেকাতে সার্বক্ষণিক প্রহরার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নাশকতা প্রতিরোধে চলন্ত ট্রেন, স্টেশন ও রেললাইনে নিরাপত্তা কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। আরএনবি, জিআরপি ও রেলওয়ে কর্মীদের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি র্যাব, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় সহযোগিতায় নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করা হবে।
গাজীপুরে পরিবহন সংকট: ১০০০ বাসের দাবি
এদিকে প্রতিবছরের মতো এবারও গাজীপুরের তৈরি পোশাক ও শিল্প খাতের প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ শ্রমিক চরম পরিবহন সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছেন বলে আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। গতকাল এক বার্তায় সংগঠনটি জানায়, ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী বাসের সব টিকিট ঢাকাতেই শেষ হয়ে যাওয়ায় গাজীপুরের চন্দ্রা বা বাইপাইল কাউন্টারগুলোতে কোনো টিকিট নেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ইতোমধ্যে চন্দ্রার অস্থায়ী কাউন্টারগুলো সরিয়ে দিয়েছে।
সংগঠনটি বলছে, গাজীপুর থেকে উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলায় যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত স্থায়ী বাস সার্ভিস নেই। টিকিট না পেয়ে শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে ট্রাক, পিকআপ বা ঢাকার লক্কড়-ঝক্কড় সিটি সার্ভিসের বাস রিজার্ভ করছেন। এবারের ঈদে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রায় ২২ লাখ পরিবার মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা করছে, যা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে গাজীপুরের শ্রমিকদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ৫০০ বিআরটিসি এবং ৫০০ বেসরকারি কোম্পানির বাস বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিআরটি প্রকল্পে জরুরি সংস্কার
ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে বিআরটি প্রকল্পের আব্দুল্লাহপুর অ্যাট-গ্রেড অংশের জরুরি সংস্কারকাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন সেতুসচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ। গতকাল আব্দুল্লাহপুর ইন্টারসেকশন পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ‘বিআরটি প্রকল্পের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া এবং ঠিকাদার জটিলতায় কাজ থমকে ছিল। তবে জনদুর্ভোগ কমাতে সেতু কর্তৃপক্ষের নিজস্ব বাজেটে আব্দুল্লাহপুর ও টঙ্গী ইউ টার্ন অংশের রিজিড পেভমেন্টের কাজ শুরু হয়েছে।’
সচিব আরও জানান, গত ৫ মার্চ থেকে বিআরটি প্রকল্পে অস্থায়ী মেরামত কাজ শুরু হয়েছে, যা ঈদের আগেই শেষ হবে। এর ফলে উত্তরবঙ্গ ও গাজীপুরগামী যাত্রীদের যানজট ভোগান্তি অনেকাংশে কমে আসবে। ঈদের পর এই অংশে স্থায়ী সংস্কারের কাজ পুরোদমে শুরু হবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।