ঢাকা ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
সরকারি ভাতা বিতরণে নগদের প্রতি আস্থা অব্যাহত আলিয়ঁসে শুরু  হচ্ছে তিন শিল্পীর ‘ত্রিবন্ধন’ জাকসু ভিপি ও জিএসের ছাত্রত্ব শেষ: পদে বহাল থাকা নিয়ে নতুন সংকট ঢাকাসহ ১২ জেলায় রাত ১টার মধ্যে বজ্রবৃষ্টির আভাস ধানমন্ডিতে বহুতল ভবনে আগুন সময়টা কি তবে শেষ! রাসুল (সা.)-এর বর্ণনায় আজকের সমাজ বড় বাজেটের বড় প্রশ্ন সুর-ছন্দের আন্তর্জাতিক মেলবন্ধনে মেতে উঠছে ঢাকা ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে দেশজুড়ে সনি-স্মার্টের ‘গোল্ডেন গোল অফার’ শুরু প্রেমিকার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই রাবি শিক্ষার্থীর গলায় ফাঁস চতুর্থবারের মতো সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ ওসি হলেন রতন শেখ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ৫ বছরের মেগা কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার গণতন্ত্রমুখী বাজেট ও প্রত্যাশার সমীকরণ পশ্চিমবঙ্গে নতুন মন্ত্রিসভার দপ্তর বণ্টন আদ্-দ্বীন হাসপাতালের জবাব সন্তোষজনক নয়, বললেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের নির্দেশ হাতে টর্চ-লাঠি ও বাঁশি নিয়ে রাতভর পাহারায় পঞ্চগড় সীমান্তের মানুষ ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় নতুন পথ বের হলো চীনা মহাকাশ স্টেশনে চীনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পর্যটনের গল্প পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, সবাই নিহত ছয় দফা দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দারিদ্র‍্য থেকে মুক্তি–পথের সন্ধানে পরিবেশ স্টার্টআপ তহবিল গঠনের প্রস্তাব জোবাইদা রহমানের আম উৎসব আয়োজন করল স্বপ্ন, সুবিধাবঞ্চিতদের মাঝে মৌসুমি আনন্দের ছোঁয়া সিলেট সীমান্তে সতর্কতায়ও থেমে নেই চোরাচালান, ৬৬ লাখ টাকার পণ্য জব্দ তিন ঘণ্টা পর জামালপুর-ঢাকা ট্রেন চলাচল শুরু শিল্পকলায় নতুন নাটকের উৎসব গোপালগঞ্জে দুধ দিয়ে গোসল করে আর্জেন্টিনায় যোগ দিলেন ব্রাজিল সমর্থক শেষ বিশ্বকাপের আগে শিশুর মতো উচ্ছ্বসিত নেইমার বান্ধবীকে ৩৭০ টাকার বিরিয়ানি খাইয়ে ‘উসুল’ করতে চেয়েছিলেন তরুণ
Nagad desktop

সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ রিস্টোর হয়েছে

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৪, ১২:০৭ পিএম
আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০২৪, ০৩:৪১ পিএম
সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ রিস্টোর হয়েছে
মনজিল মোরসেদ

আদালত শুনানি শেষে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি করে দেন। এর ফলে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের ৮ ধারা পুনরায় সংবিধানে রিস্টোর করে দিয়েছেন। এতে ওই সংশোধনীতে থাকা বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে নেওয়ার আদেশ পুনরায় বাতিল হয়ে গেছে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পুনর্বহাল করা হয়েছে। এখন থেকে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা আগের মতো সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে চলে এল।

তবে বিগত দিনে এই মামলার লড়াইটা খুব কঠিন ছিল। সংবিধানের ষোড়শ বাতিলের রায় দেওয়ার কারণে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। আইনজীবীরাও অনেক প্রতিকূল সময় পার করেছেন এটা নিয়ে। এবার পরিবেশ ভিন্ন হওয়ায় সরকার রিভিউ আবেদনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেনি। তাই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে।

এই রায়ের ফলে বিচারকদের অপসারণ করতে হলে অবশ্যই সেটা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে করতে হবে, পার্লামেন্টের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না। আর এই কাউন্সিলের বিচারের পদ্ধতিটা এমন- কেউ যদি রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ করেন, তিনি যদি মনে করেন সেটা জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে পাঠাবেন। তারপর প্রধান বিচারপতিসহ তিন সদস্যের জুডিশিয়াল কাউন্সিল সেটা তদন্ত করবেন। তিনি যদি অভিযোগের সত্যতা পান তাহলে রাষ্ট্রপতিকে সুপারিশ করবেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

গণতন্ত্রমুখী বাজেট ও প্রত্যাশার সমীকরণ

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম
আপডেট: ১০ জুন ২০২৬, ০৬:১০ পিএম
গণতন্ত্রমুখী বাজেট ও প্রত্যাশার সমীকরণ
ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল

কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য–এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই এবারের বাজেট একটি নতুন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করতে পারে। কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই এই গণতন্ত্রমুখী বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে না, সমান্তরালে সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কারও নিশ্চিত করতে হবে। স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং জবাবদিহিহীন যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা উপড়ে ফেলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।...

অতীতে দেশের অর্থনীতি যে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা এবং বাহ্যিক চাকচিক্য প্রদর্শনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, তা সবার জানা। স্বৈরাচারী সরকারের আমলে গৃহীত উচ্চাভিলাষী, মেগা-প্রকল্পনির্ভর এবং খাতাকলমে বড় জিডিপি প্রবৃদ্ধির বাজেটগুলো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও নেতিবাচক ধস নামিয়েছিল। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ-সংকট এবং ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর দশা তারই অকাট্য প্রমাণ। বিভিন্ন সূত্রের আভাসে জানা গেছে, এবারের বাজেট হতে যাচ্ছে ‘গণতন্ত্রমুখী’। সাম্যবাদী বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিযাত্রায় ‘গণতন্ত্রমুখী বাজেট’ ধারণাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও অপরিহার্য।

গণতন্ত্রমুখী বাজেট বলতে এমন একটি অর্থনৈতিক দর্শনকে বোঝায়–যেখানে বাজেটের কেন্দ্রে থাকে সাধারণ নাগরিক। এতকাল ধরে যে ‘টপ-ডাউন’ অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করা হয়েছে, তার অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল মানুষের অধিকার ও চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়াই এ বাজেটের মূল লক্ষ্য হবে। স্বৈরাচারী কাঠামোর প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল কতিপয় সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পকেট ভারী করা এবং এমন কিছু দৃশ্যমান অবকাঠামো তৈরি করা, যা সাধারণ মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে খুব কমই অবদান রাখে। এর ফলে সমাজে তৈরি হয়েছে তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য।

বাজেটকে শুধু মুখে ‘গণতন্ত্রমুখী’ বললেই হবে না। এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট খাতের পুনর্বিন্যাস এবং কাঠামোগত সংস্কার। একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্ত হয় তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণের ওপর। আর এ অধিকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি স্তম্ভ হলো– কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। বিগত সরকারের আমলে এই তিন খাতের ওপর দিয়ে যে অবহেলার ঝড় বয়ে গেছে, তার ক্ষত এখনো দগদগে। মেগা প্রকল্পের আড়ালে দেশের ফুসফুসখ্যাত এ খাতগুলোকে ক্রমাগত সংকুচিত করা হয়েছে। তাই নতুন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন নিশ্চিত করতে এই তিন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির অন্য কোনো বিকল্প নেই।

যে দেশের সিংহভাগ মানুষ এখনো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল, মানসম্মত শিক্ষা নতুন প্রজন্মের একমাত্র ভবিষ্যৎ এবং সাধারণ মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় চিকিৎসার পেছনে, সেখানে এই তিন খাতকে পেছনে ফেলে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এবারের বাজেটকে যদি সত্যিকার অর্থেই একটি ঐতিহাসিক ও রূপান্তরকামী দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে রাষ্ট্রকে তার ব্যয়ের অগ্রাধিকার আমূল বদলে ফেলতে হবে। এই বিনিয়োগই নির্ধারণ করবে আমরা কেমন বাংলাদেশ পেতে যাচ্ছি।

বিগত সরকার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষিকে এক প্রকার উপেক্ষাই করেছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ উচ্চমূল্যস্ফীতির এই ক্রান্তিকালে খাদ্য নিরাপত্তাই হলো আমাদের সবচেয়ে বড় ঢাল। সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো দেশের মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা। এর জন্য প্রয়োজন কৃষি খাতে ভর্তুকি বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং বীজ ও সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পান, সে জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট বাজারজাতকরণ কাঠামোর জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখতে হবে। কৃষি খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও সবচেয়ে বড় উৎস। ফলে কৃষির আধুনিকায়ন ও কৃষিজাতশিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করলে তা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করবে।

কৃষির পর যে খাতটি জাতির মেরুদণ্ড শক্ত করে, তা হলো ‘শিক্ষা’। বিগত আমলগুলোতে শিক্ষা খাতকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ কারিকুলাম, গবেষণায় বরাদ্দের অভাব এবং দলীয়করণের কারণে শিক্ষার গুণগত মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। নতুন বাংলাদেশে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বরাদ্দের গুণগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ বা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া উচিত, অথচ আমাদের দেশে তা বরাবরই উপেক্ষিত ছিল। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই ক্ষতি পূরণে সাহসী পদক্ষেপ দেখতে চায় দেশবাসী। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন ও প্রশিক্ষণ এবং উচ্চশিক্ষায় গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর সুযোগ আমরা হারাব। শিক্ষা খাতকে বৈষম্যমুক্ত করা না গেলে কোনো দিনই একটি সাম্যবাদী ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব নয়।

শিক্ষা ও কৃষির মতোই আরেকটি ভঙ্গুর ও উপেক্ষিত খাত হলো ‘স্বাস্থ্য’ খাত। বিগত দিনগুলোতে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা দেশের মানুষকে কতটা নিঃস্ব করেছে, তা সবার জানা। সাধারণ মানুষের আয়ের একটি বিশাল অংশ চলে যায় চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে, যা অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে দারিদ্র্যের চরম সীমায় ঠেলে দিচ্ছে। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র কখনোই তার নাগরিকদের চিকিৎসার অভাবে মরতে দিতে পারে না। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ জিডিপির অন্তত ২ থেকে ৩ শতাংশে উন্নীত করা সময়ের দাবি। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর আধুনিকায়ন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য বিমা চালুর জন্য বাজেটে পাইলট প্রজেক্টের সূচনা করা যেতে পারে। চিকিৎসাসেবা যখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে, তখনই বাজেটের গণতান্ত্রিক চরিত্র সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান হবে।

কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য–এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই এবারের বাজেট একটি নতুন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করতে পারে। কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই এই গণতন্ত্রমুখী বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে না, সমান্তরালে সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কারও নিশ্চিত করতে হবে। স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং জবাবদিহিহী যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা উপড়ে ফেলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাজেটের টাকা যাতে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের পকেটে না গিয়ে সরাসরি মাঠপর্যায়ে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তার জন্য একটি স্বচ্ছ, আধুনিক ও ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি খাতের খরচের হিসাব জনগণের সামনে উন্মুক্ত রাখতে হবে, যেন বাজেটের ওপর নাগরিকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই হবে বাজেটের প্রকৃত গণতন্ত্রীকরণ।

এই বিশাল বাজেটের অর্থসংস্থানের ক্ষেত্রেও একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর থেকে নামিয়ে ফেলতে হবে। একটি গণতন্ত্রমুখী বাজেটের নীতি হওয়া উচিত প্রত্যক্ষ করের ওপর জোর দেওয়া। অর্থাৎ, ধনীদের ওপর করের হার বাড়িয়ে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের করের বোঝা কমাতে হবে। কর ফাঁকি রোধ, অর্থ পাচার বন্ধ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে যদি অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি করা যায়, তবে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে আসবে। স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার এ প্রক্রিয়াটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে। যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে প্রণোদনা দেওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি আরও সম্প্রসারিত করার মাধ্যমেই এ বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রতিফলিত হবে।

লেখক: চিকিৎসক, ছড়াকার ও কলামিস্ট
[email protected]

রামিসা ও নূরজাহান হত্যা: আমাদের মূল্যবোধের পচন

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
রামিসা ও নূরজাহান হত্যা: আমাদের মূল্যবোধের পচন
ড. নাহিদ ফেরদৌসী

নূরজাহান বেগমের মরদেহ পরীক্ষা করলে আইনের চেয়ে বেশি ধরা পড়ে আমাদের মূল্যবোধের পচন। যে দেশের সংবিধান বলে জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা, সেই দেশের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অধিকার কেবল কাগজে বন্দি হবে না–এ দাবি এখন সময়ের।...

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি বিচারিক কার্যকারিতা ও শিশু সুরক্ষার বিষয়ে গভীর উদ্বেগের সূত্রপাত করেছিল। ঘটনা সংঘটনের ১৯ দিন পর, ঘথ ৭ জুন বহুল প্রতীক্ষিত রায় প্রকাশ হয়েছে।

এতে দুজন মূল অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই যুগান্তকারী রায়টি নিঃসন্দেহে দ্রুত বিচারের একটি নজির সৃষ্টি করেছে। রায়টি শোকাহত মা-বাবার জন্য কতটুকু স্বস্তি ও মানসিক মুক্তি এনে দিয়েছে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে এসেছে কি না, তা নির্ভর করছে রায়টির দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর।

স্বপ্ন মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান, যা কারও দ্বারা দখল বা কেড়ে নেওয়া যায় না। একজন বাবা-মা সারাজীবন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সন্তানের ভবিষ্যৎকে ঘিরে যে স্বপ্ন বুনে যান, তা কেবল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ নয়; বরং তা একটি গভীর মানবিক প্রতিশ্রুতি, ভালোবাসা ও আশার প্রতিফলন।

কিন্তু আজ আমরা এমন এক সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে শিশুদের–বিশেষ করে কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। তাদের মৌলিক অধিকার, নিরাপদ শৈশব ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা আজ গভীর প্রশ্নের সম্মুখীন।

রামিসার মতো একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর সংঘটিত নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিক কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটকে উন্মোচিত করেছে। এই নির্মম ঘটনা জাতির বিবেককে যেমন গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সহিংসতা ও অবক্ষয়ের নগ্ন চিত্রও স্পষ্ট করেছে।

যে মা-বাবা তাদের সন্তানের স্বপ্ন, আশা ও ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে জীবনের প্রতিটি ত্যাগ স্বীকার করেন, তাদের জন্য সন্তানের নিথর ও ক্ষতবিক্ষত দেহের সামনে দাঁড়ানো অকল্পনীয়, ভাষাহীন ও চিরস্থায়ী বেদনার অভিজ্ঞতা। এই বেদনা কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমগ্র মানবিক সমাজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

এই নির্মম ঘটনার জন্য প্রকৃত দায় কার–পরিবার, সমাজ, নাকি রাষ্ট্র? নাকি আমাদের সম্মিলিত উদাসীনতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং কার্যকর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতাই এই ট্র্যাজেডির মূল কারণ?

আজ প্রশ্ন আরও গভীরভাবে উঠে আসে–শিশুদের সার্বিক সুরক্ষার চূড়ান্ত দায়িত্ব কার ওপর বর্তায়? এবং কেন বারবার এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে?

বছরের পর বছর কত আর মা-বাবাকে সন্তানের শোকে আজীবন মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাতে হবে? রামিসার মতো অসংখ্য শিশু ও পরিবার আজ একই অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে বসবাস করছে, এটাই আমাদের সমকালীন সামাজিক বাস্তবতার নির্মম চিত্র।

এখন সময় এসেছে ন্যায়বিচারের এমন একটি দৃষ্টান্তমূলক ও কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার, যেখানে অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হবে দ্রুত, নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য; যাতে আর কোনো মা-বাবাকে সন্তানের নির্মম মৃত্যু স্মরণ করে আজীবন মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে না হয়।

বাংলাদেশের আইনি প্রেক্ষাপটে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ মোকাবিলার জন্য সুস্পষ্ট আইনগত কাঠামো বিদ্যমান। দণ্ডবিধি-১৮৬০ (Penal Code, 1860)-এর অধীনে হত্যা (ধারা ৩০২) এবং ধর্ষণ-সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধগুলোর জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (Women and Children Repression Prevention Act, 2000) শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা এবং যৌন সহিংসতার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন করেছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত। এ ছাড়া শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে শিশু আইন-২০১৩ (Children Act, 2013) রাষ্ট্রকে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে, যা সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে জীবন, মর্যাদা ও সমতার অধিকারকে সুরক্ষা দেয়। তবুও বাস্তবতা হলো, আইনগত কাঠামো থাকা সত্ত্বেও এর কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া এবং প্রতিরোধমূলক সামাজিক ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী না হলে এ ধরনের নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দ্রুত নিরপেক্ষ ও সময়বদ্ধ বিচার নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে। শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে সমন্বিতভাবে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও নজরদারি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

আইন ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে রামিসার ওপর সংঘটিত ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড এমন এক অপরাধ, যা সমাজের সামষ্টিক বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট Bachan Singh v. State of Punjab (1980) এবং পরবর্তীতে Machhi Singh v. State of Punjab (1983) মামলায় ‘Rarest of the Rare Cases’ নীতি প্রবর্তন করে ঘোষণা করেন যে, যখন কোনো অপরাধের নৃশংসতা, ভুক্তভোগীর অসহায়ত্ব, অপরাধের সামাজিক অভিঘাত এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত এতটাই গভীর হয় যে, সাধারণ শাস্তি ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য পূরণে অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে, তখন সর্বোচ্চ শাস্তি বিবেচিত হতে পারে। আদালত আরও উল্লেখ করেন যে, এমন অপরাধ সমাজের ‘collective conscience’ বা সামষ্টিক বিবেককে স্তম্ভিত করে দেয়। রামিসার মতো একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর সংঘটিত এই পাশবিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড সেই নীতির আলোকে বিচারযোগ্য একটি ঘটনা হিসেবে জনমনে প্রতীয়মান হয়েছে, যেখানে ন্যায়বিচার কেবল একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং সমগ্র সমাজের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য।

গত ৩১ মে ঢাকার মিরপুর-১১-এর একটি অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের অর্ধগলিত মরদেহ। তার পাশেই ছিল সন্তানদের পাসপোর্ট সাইজের ছবি, সার্টিফিকেটের ফ্রেম–এক যুগ্ম সচিব, এক বুয়েট শিক্ষক, এক কানাডাপ্রবাসী ছেলে আর এক স্কুলশিক্ষিকা কন্যার মা। কিন্তু মা মারা গেছেন কবে? কেউ জানেন না। গন্ধ ছড়ালে প্রতিবেশীরা ফোন দেয় ৯৯৯-এ। এ ঘটনা কোনো ইংরেজি থ্রিলারের দৃশ্য নয়। এ আমাদের সমাজের সাদা-কালো সিসিটিভির ফুটেজ–যেখানে বড় পদ, বিদেশি ডিগ্রি, চমকানো সিভির নিচে পুঁতে রাখা আছে এক প্রবীণের নিঃশব্দ যন্ত্রণা, অবহেলা আর অপেক্ষার অবসান।

বাংলাদেশে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩’ আছে। আইনটি স্পষ্ট বলেছে: সন্তানকে মায়ের ভরণপোষণ দিতেই হবে–খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান, এমনকি ‘সঙ্গ’ দেওয়াও আইনি দায়িত্ব। পিতা-মাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো যাবে না। অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা ৩ মাসের কারাদণ্ড। এসব বিধান দেখে মনে হয়, নূরজাহান বেগমের সন্তানদের জেলে যাওয়া উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো–কে যাবে আদালতে? আইনে বলা আছে, শুধু ভুক্তভোগী বাবা বা মা নিজেই অভিযোগ করতে পারবেন। যে মা মারা গেছেন, তিনি তো আর মামলা করবেন না। অথচ বেঁচে থাকতেও তিনি কি পারতেন? নিজের সন্তান–যুগ্ম সচিব আর বুয়েট শিক্ষক, যাদের মুখে সমাজের ‘আইন’ ও ‘নীতি’ উচ্চারিত হয়, তাদের বিরুদ্ধে থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া, কোন বৃদ্ধ বাবা-মা সেটা পারেন?

এটাই এই আইনের মারাত্মক দুর্বলতা। বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের অবহেলা একটি ‘নীরব অপরাধ’–কারণ ভুক্তভোগী নিজে প্রায়শই শারীরিক, মানসিক বা আর্থিকভাবে অসহায়; আর সামাজিক লজ্জায় চুপ করে থাকেন। নূরজাহান বেগমের মরদেহ পরীক্ষা করলে আইনের চেয়ে বেশি ধরা পড়ে আমাদের মূল্যবোধের পচন। যে দেশের সংবিধান বলে জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা, সেই দেশের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অধিকার কেবল কাগজে বন্দি হবে না–এ দাবি এখন সময়ের।

লেখক: ডিন, স্কুল অব ল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় 
[email protected]

ট্রাম্পের চুক্তি যে কারণে নস্যাৎ করতে চান নেতানিয়াহু

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম
ট্রাম্পের চুক্তি যে কারণে নস্যাৎ করতে চান নেতানিয়াহু
সামি আল-আরিয়ান

ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আরববিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো অর্থপূর্ণ পথ নেই। তবে নেতানিয়াহু তার মূল বিশ্বাসের পরিপন্থি কোনো চুক্তি মুখ বুজে মেনে নেবেন, এমনটা ভাবা হবে সবার জন্য বিপজ্জনক বিভ্রম। তবে এর চেয়েও গভীরতর বিভ্রম হলো, পাশবিক শক্তি দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন এর রাজনৈতিক, নৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে।...


ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন না। তার পুরো রাজনৈতিক ক্যারিয়ারজুড়ে ইসরায়েলি আধিপত্য বজায় রাখা এবং নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধের কৌশলকেই তিনি পছন্দ করেন বেশি।

বর্তমানে তার প্রধান অগ্রাধিকার হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে প্রায় চূড়ান্ত হওয়া সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত রাখা। এ সংকটের কূটনৈতিক বিজয় ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিলে তিনি তা নস্যাৎ করার জন্য রাজনৈতিক, সামরিক, কূটনৈতিক, গণমাধ্যম এবং লবিংয়ের মতো হাতিয়ার ব্যবহার করবেন।

তথাকথিত ‘চূড়ান্ত বিজয়’ নিয়ে তিনি অনমনীয় এবং আপস করতে নারাজ। তার কাছে কোনো সমঝোতাই গ্রহণযোগ্য নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না গাজায় হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ, লেবাননে হিজবুল্লাহকে খতম এবং স্বয়ং ইরানকে নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করা হচ্ছে।

গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন এবং ইরানজুড়ে চলা যুদ্ধগুলো কখনোই বিচ্ছিন্ন কোনো সংঘাত ছিল না। এসব যুদ্ধ ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠা এবং এ অঞ্চলে ইসরায়েলি হেজিমনি বা আঞ্চলিক আধিপত্য সুসংহত করার আগ্রাসনের অংশ হয়ে ওঠে। নেতানিয়াহু ভালো করেই জানেন, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সত্ত্বেও তার এই লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। তিনি নিশ্চিত হয়েছেন, পর্যাপ্ত শক্তি প্রয়োগ না করার কারণে তার লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়াতে প্ররোচিত করার পর, নেতানিয়াহু এখনো আত্মবিশ্বাসী তিনি আবারও সেই একই চাল চালতে পারবেন। তবে এবার তার লক্ষ্য সীমিত হামলা নয়, বরং চূড়ান্ত ও সর্বাত্মক যুদ্ধ, যা এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যকে স্থায়ীভাবে বদলে দেবে।

নেতানিয়াহু অবশ্য যা-ই মনে করেন না কেন, ট্রাম্পকে আরও জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি হয়তো বিশ্বাস করেন, ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণভাবে, মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশ এখন প্রকাশ্যেই এসব যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার পক্ষে জনসমর্থন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ট্রাম্পবিরোধী মনোভাব ট্রাম্পের নিজের জোটের মধ্যেই ফাটল ধরাচ্ছে। তার সমর্থকরা নেতানিয়াহুর এজেন্ডা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও সৈন্যদের রক্ত দেওয়ার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

আমেরিকানরা এখন আরও বেশি করে জানতে চাচ্ছেন কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি আঞ্চলিক যুদ্ধের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক বোঝা বইতে হবে। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এ প্রশ্নগুলো আরও জোরালো হচ্ছে। জ্বালানি বাজার এখনো নাজুক এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বাড়ছে, যা মার্কিন ভোক্তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিয়েছে এবং হোয়াইট হাউসের জন্য অর্থনৈতিক পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠছে।

ট্রাম্প জানেন, অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে কোনো বৈদেশিক অভিযান চালানো সম্ভব নয়। আর যেহেতু মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে তাই যেকোনো ভুলের মাশুল তাৎক্ষণিকভাবে দিতে হবে। তিনি যদি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারান, তাহলে তাকে ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসনের মুখে পড়তে হতে পারে।

আন্তর্জাতিক চাপ ট্রাম্পের ওপর আরও তীব্রভাবে চেপে বসেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৌশলগত পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। এ সংকট যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। ৩৯ দিনব্যাপী চলা যুদ্ধে ইরান এবং তাদের মিত্রদের হামলায় আটটি দেশজুড়ে থাকা অন্তত ১৬টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার কয়েকটি প্রায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

স্যাটেলাইট ইমেজের ওপর ভিত্তি করে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানি হামলায় ওই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর অন্তত ২২৮টি স্থাপনা ও সরঞ্জাম ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হ্যাঙ্গার, জ্বালানি ডিপো, যুদ্ধবিমান, রাডার নেটওয়ার্ক, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এ যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের পুরো কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত মারাত্মকভাবে ফুরিয়ে এসেছে।

পেন্টাগন সতর্ক করেছে, ক্ষেপণাস্ত্রের এ মজুত আগামী দশকের আগে পূরণ করা সম্ভব হবে না। রাশিয়ার এবং চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের পরিকল্পনা করতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক দুর্বলতা। ট্রাম্পের যুদ্ধ করার উদ্দেশ্য ছিল নিজের আধিপত্য জাহির করা, কিন্তু এখন তা উল্টো আমেরিকার শিল্প ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে।

ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব সর্বোচ্চ লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিল। সেটা হলো ইরানকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা, তার পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করা, প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ইরানি রাষ্ট্রের উৎখাত বা একে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলা। কিন্তু এর একটি লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। ইরান আত্মসমর্পণ করেনি, তার সরকার ভেঙে পড়েনি এবং তীব্র চাপের মধ্যেও আঞ্চলিক জোটগুলোকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। ইরান এবং তার মিত্ররা আঘাত সয়েছে, কিন্তু পরাজিত হয়নি।

ইরান যুদ্ধক্ষেত্রকে প্রসারিত করেছে, বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহকে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সহজ বিজয় থেকে বঞ্চিত করেছে। আত্মসমর্পণের বিকল্প হিসেবে তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার পথ বেছে নেয়, যা পুরো পরিস্থিতিকে ঘুরিয়ে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিকে পরাস্ত করার ক্ষমতা ইরানের ছিল না। কিন্তু পাল্টা আক্রমণ করে তারা আত্মরক্ষা করতে পেরেছে। ইরানের জন্য পরাজয় এড়ানো, নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং শত্রুকে তার রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে বঞ্চিত করাই যথেষ্ট ছিল। একটি রাষ্ট্র যখন প্রবল পরাক্রমশালী শক্তির মুখোমুখি হয়, তখন নিজের অস্তিত্ব ও কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে পারাটাই এক ধরনের বিজয়। ইরান সেটা পেরেছে।

নেতানিয়াহু তার সম্প্রসারণবাদী প্রকল্পের হুমকিটা এখন বুঝতে পারছেন। কিন্তু যুদ্ধবিরতি ইসরায়েল কখনই মেনে নিতে পারবে না। কেননা তাহলে যুদ্ধটি ইসরায়েলের বিজয়ের মধ্যদিয়ে শেষ হবে না, শেষ হবে ইরানের টিকে থাকার মধ্যদিয়ে।

বর্তমান আলোচনা, যা জানা গেছে যে পাকিস্তান মধ্যস্থতা করছে এবং বেশ কয়েকটি আরব ও ইসলামিক রাষ্ট্র এতে সমর্থন দিচ্ছে। চুক্তির প্রায়-চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে অন্তত ৬০ দিনের জন্য লেবাননসহ বহুমাত্রিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি খাতের অস্থিরতা এবং উত্তর আমেরিকায় আসন্ন বিশ্বকাপের মতো বড় ইভেন্টগুলোকে বিঘ্নিত করতে পারে এমন একটি বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কা থেকে ওয়াশিংটনের এখন শান্ত পরিস্থিতি প্রয়োজন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই পিছুটান কোনো বিজয়ের ফসল নয়, বরং পরিস্থিতি তাকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করছে।

যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি, অন্তর্বর্তী সময়ে এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্যে একগুচ্ছ পদক্ষেপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালির মধ্যদিয়ে নৌচলাচল নিরাপদ করা, ইরানের শিপিংয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, ইরানের অবরুদ্ধ করে রাখা সম্পদের আংশিক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া এবং সম্পর্ক আরও স্বাভাবিক করার বিষয়ে আলোচনা শুরু করা।

এ রূপরেখা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বেশ কয়েকটি দাবি মেনে নেবে। কিন্তু নেতানিয়াহুর কাছে এটা একেবারেই অসহ্য লাগছে। কারণ, এরকম চুক্তি হলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে স্বস্তিতে থাকবে। তার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে না। আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গেও ইরানের সম্পর্ক অটুট থাকবে। এতে তেহরান ভবিষ্যতে আরও বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যাবে। ট্রাম্পের ওপর নেতানিয়াহুর তীব্র চাপ দেওয়ার কারণ এটাই। দুজনের মধ্যে যে কথা চালাচালি হচ্ছে তা এ কারণেই উত্তপ্ত ও অস্বাভাবিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হচ্ছে। নেতানিয়াহু কূটনৈতিক সমঝোতার বিরোধিতা করছেন এবং গাজা ও লেবাননজুড়ে নতুন করে হামলা বাড়ানোর জন্য ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন।

নেতানিয়াহুর সামনে এখন সীমিত ও বিপজ্জনক কিছু পথ খোলা আছে। তিনি যদি কূটনৈতিক সমঝোতাকে সরাসরি আটকে দিতে না পারেন তাহলে এ চুক্তি যাতে বাস্তবায়িত না হয় সেজন্য নাশকতা করার চেষ্টা করবেন। এ জন্য তিনি লেবাননে হামলা চালিয়ে যাওয়া এবং ফিলিস্তিনে আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারেন। নেতানিয়াহু হয়তো হিসাব কষছেন, গাজায় নতুন করে গণহত্যা, অবরোধ জোরদার করা বা অধিকৃত পশ্চিম তীরের পবিত্র স্থানগুলোতে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালালে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যেতে পারে। এরকম পরিস্থিতেতে ট্রাম্প তখন ইসরায়েলের দাবির পক্ষে দাঁড়াতে বাধ্য হবেন।

আসলে ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আরববিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো অর্থপূর্ণ পথ নেই। তবে নেতানিয়াহু তার মূল বিশ্বাসের পরিপন্থি কোনো চুক্তি মুখ বুজে মেনে নেবেন, এমনটা ভাবা হবে সবার জন্য বিপজ্জনক বিভ্রম। তবে এর চেয়েও গভীরতর বিভ্রম হলো, পাশবিক শক্তি দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন এর রাজনৈতিক, নৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে। আদর্শিক অন্ধত্ব এবং কৌশলগত ব্যর্থতার মাঝে আটকা পড়ে নেতানিয়াহু হয়তো শেষ পর্যন্ত মারাত্মক জুয়া খেলতে পারেন এবং পুরো ব্যবস্থাটি তার সঙ্গে ভেঙে পড়ার আগ পর্যন্ত যুদ্ধকে আরও ছড়িয়ে দিতে পারেন। এরকম শঙ্কা একেবারেই অমূলক নয়। (সংক্ষেপিত)

লেখক: ইস্তাম্বুল জাইম ইউনিভার্সিটির ‘সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’-এর পরিচালক। মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান

রামিসার মৃত্যু, অপরাধীর শাস্তি এবং সমাজের দায়

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
রামিসার মৃত্যু, অপরাধীর শাস্তি এবং সমাজের দায়
রাজেকুজ্জামান রতন

একটা দেশ তার ভবিষ্যৎ তৈরি করে শিশুদের মাধ্যমে। শিশুদের চোখে স্বপ্ন তৈরি করা সমাজের কাজ, কিন্তু আমাদের শিশুরা পথ চলছে, বড় হচ্ছে দুঃস্বপ্ন আর আতঙ্ক নিয়ে। রামিসার খোলা চোখ যেন তাকিয়ে আছে আর প্রশ্ন করছে, আমাদের জন্য কেমন বাংলাদেশ তৈরি করছ তোমরা?...

রামিসার নৃশংস হত্যার খবরে শিউরে উঠেছিলেন দেশের মানুষ। একটা শিশুর গলা কেটে বালতিতে রেখেছে খুনি। যখন দরজায় ধাক্কা দিয়ে মা ডাকছেন, তখন ঘরের ভেতর তার সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করা হচ্ছে। নৃশংসতা বোঝানোর জন্য এটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু না, আরও ভয়ংকর বর্বরতার চিত্র দেখেছেন মানুষ। শিশুর শরীর ক্ষত-বিক্ষত, এতটুকু শরীরে নির্মম আঘাতের চিহ্ন, আর তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। কোনো মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ এই ঘটনার বিবরণ পড়ে সুস্থ থাকতে পারেন? তার সন্তান, তার স্বজন অথবা চারপাশের উচ্ছল শিশুদের মুখের দিকে তাকালে বুকের ভেতর কি হাহাকার তৈরি হবে না? এ কোন সমাজে বাস করছি আমরা? এই ঘটনায় কেঁপে উঠেছিল সারা দেশ, বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন এক মাসের মধ্যেই এই নৃশংসতার বিচার হবে।

৭ জুন বেলা ১১টায় রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা ও স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন আদালত। হত্যাকাণ্ড সংঘটনের ১৯ দিন এবং মামলা দায়েরের ১৮ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন, অধিকাংশ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও আসামিদের সাফাই সাক্ষ্যসহ যাবতীয় বিচারিক কার্যক্রম শেষে মামলাটির রায় ঘোষণা দেশের বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একটা মাইলফলক। মানুষ বলতে পারবেন অন্তত একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হলো।

রামিসা আমাদের সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই আমাদের সমাজ, যেখানে শিশুরা সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন। আয়না কখনো মিথ্যা দেখায় না। প্রতিবিম্ব দেখানোর জন্য শুধু উল্টো হয়ে আসে ছবিটা। মানুষের মাথা তাকে আবার সোজা করে দেখে। মুখের ময়লা দূর না করে শুধু আয়না মুছলে চেহারা পরিষ্কার দেখা যাবে না।

কারণ এসব নতুন ঘটনা নয়। রামিসার আগে যেমন পরেও তেমনি ধর্ষণ, হত্যা চলছেই। কিছু ঘটনায় মানুষ উত্তাল হয়ে ওঠেন আর বাকিগুলো কী হয়? শত শত ঘটনা পত্রিকার পাতায় ঠাঁই পায়, আড়ালে থেকে যায় যে কত তার সংখ্যা অনুমান করা ছাড়া উপায় নেই। যেমন ২০২৪ সালের মার্চে মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণের ঘটনায় পুরো দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল। তখনো মানুষের বিক্ষোভের কারণে দ্রুত বিচার সম্পন্ন হয়েছিল। শিশু আছিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। এর চার দিন পর ডেথ রেফারেন্সের নথি হাইকোর্টে পৌঁছায়। রায় ঘোষণা এবং ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানোর এক বছর পূর্ণ হলেও পরবর্তী অগ্রগতি কতটুকু, তা আজ অজানা। অথচ ছুটির দিন বাদে টানা শুনানি করে মাত্র ১৪ কার্যদিবসে আলোচিত এই মামলার বিচারকাজ শেষ হয়েছিল। শুধু আছিয়া হত্যাকাণ্ডই নয়, এমন বহু বেদনাকাতর সংবেদনশীল মামলার কাগজ আদালতে ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে। ধর্ষণের দায় স্বীকার করার পরও বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে, নিষ্পত্তি হয় না। আবার রায় হলেও তা কার্যকর হয় না, উল্টো অনেক আসামি জামিনে বের হয়ে আসে। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পরও শাস্তি না হওয়ার আক্ষেপ বুকে নিয়েই বেঁচে থাকতে হয় নির্যাতিত পরিবারগুলোকে। কেউ যখন দেখেন তার প্রিয় সন্তানের খুনি তার চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন কি ধিক্কার তৈরি হয় না সমাজ ও বিচারের প্রতি?

আছিয়ার বেদনা না ভুলতেই রাজধানীতে নির্মমতার শিকার হলো দ্বিতীয় শ্রেণি পড়ুয়া সাত বছরের শিশু রামিসা। নারী ও শিশুর জীবন, নিরাপত্তা তাহলে কোথায়? আমাদের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা যেন অপরাধীদের কাছে একধরনের প্রশ্রয়ের বার্তা দেয়। নির্যাতিতার দোষ খুঁজে বের করা, পোশাকের দোহাই দেওয়া, সাজগোজ করাকে অজুহাত করা এবং শয়তান ভর করার মতো আত্মপক্ষ সমর্থন করার নানা দৃষ্টান্ত দেখা হয়েছে ইতোমধ্যে। কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো শাস্তি না থাকায় নারীর প্রতি সহিংসতা বা ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে।

সব খবর পত্রিকায় আসে না, পরিসংখ্যান সব বলে না; কিন্তু যা বলে তা কি আতঙ্কিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়? বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন গত ২ মে প্রকাশ করা হয়। সেই প্রতিবেদনের তথ্য অত্যন্ত ভয়াবহ: দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পেয়ে যাচ্ছে আসামিরা। আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে সময় লাগছে ৩ বছর ৭ মাস। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে। প্রতিবার শুনানিতে স্বজনরা অপমানিত হন, বেদনায় ভারাক্রান্ত হন আর বাড়তে থাকে ক্ষোভ কিংবা অসহায়ত্ব।

এই এক পরিসংখ্যানেই যথেষ্ট আমাদের বিচারব্যবস্থার গতি এবং চিত্র বুঝতে পারার জন্য। কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটার পর মামলা হওয়া, আসামি ধরা পড়া এবং সাজা হওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে কোনো কোনো মামলায় ১০ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। অনেক সময় রায় হওয়ার আগেই মামলার বাদী মারা যান। শুধু তা-ই নয়, আসামি জামিনে বের হয়ে এসে বাদীকে জীবননাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনাও অহরহ ঘটে। এ ছাড়া এটা কে না জানে যে, থানায় মামলা করতে গেলে প্রশাসন, প্রভাব এবং পয়সার কী গুরুত্ব। কিছু আপাত নিরীহ পরামর্শ দেওয়া হয়, যেমন মামলা করে কী লাভ? কোনো ফল পাবে না, শুধু টাকা খরচ। বিপদ বাড়বে ইত্যাদি। আবার গ্রাম্য মাতব্বর বা প্রভাবশালী মহল সালিশ-বৈঠকের মাধ্যমে লোক দেখানো শাস্তি, জরিমানা করে মীমাংসা করা আর বাদীকে নানা রকম ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার নজিরও কম নয়।

কয়েকটা ঘটনা মনে করা যেতে পারে। ২০১৭ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে জাকিয়া সুলতানা রুপাকে গণধর্ষণ ও হত্যায় ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। ওই মামলার বিচার থেকে রায় পর্যন্ত ছয় মাসও লাগেনি। রায়ে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। কিন্তু উচ্চ আদালতে দীর্ঘ শুনানি শেষে তিন আসামিকেই সাজা কমিয়ে সাত বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

গত ১ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে গহিন জঙ্গলে উদ্ধার হওয়া সাত বছরের শিশু জান্নাতুল নাইমা ইরার রক্তাক্ত ছবিটি ভোলার নয়। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বাবু শেখ নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা শেষে গলা কেটে জঙ্গলে রেখে যাওয়া হয় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে। কিন্তু তিন মাস পার হলেও ওই ঘটনায় এখনো অভিযোগপত্রই দিতে পারেনি পুলিশ।

কুমিল্লার তরুণী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়নি দীর্ঘ ১০ বছরেও। ওই ঘটনাও সারা দেশে আলোড়ন তৈরি করেছিল। ফেনীতে ২০১৯ সালে আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায়ে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। সাত বছর পরও ওই মামলা হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় আটকে আছে। ফলে কমছে না হত্যা ও ধর্ষণ। মে মাসে দেশে অন্তত ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ৬৬টি গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন। এ ছাড়া গত মাসে ৮৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ১১ হাজার ৯৩৪টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা করা হয়েছে ৬ হাজার ১৩৫টি। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬ হাজার ৩১ জন শিশু, যার মধ্যে ৫ হাজার ৬৩১ জন মেয়ে এবং ৪০০ জন ছেলে শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ৩১০ জন শিশুকে। ভাবা যায়! কতটা নিরাপত্তাহীন আমাদের শিশুরা।

একটা দেশ তার ভবিষ্যৎ তৈরি করে শিশুদের মাধ্যমে। শিশুদের চোখে স্বপ্ন তৈরি করা সমাজের কাজ, কিন্তু আমাদের শিশুরা পথ চলছে, বড় হচ্ছে দুঃস্বপ্ন আর আতঙ্ক নিয়ে। রামিসার খোলা চোখ যেন তাকিয়ে আছে আর প্রশ্ন করছে, আমাদের জন্য কেমন বাংলাদেশ তৈরি করছ তোমরা? অপরাধীর শাস্তির পাশাপাশি শিশুদের স্বস্তির সমাজ কি তৈরি হবে না? 

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]

জাতিসংঘ: উন্নয়ন অংশীদার নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম
জাতিসংঘ: উন্নয়ন অংশীদার নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ
ড. খলিলুর রহমান

বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের অংশীদারির ইতিহাস পাঁচ দশকেরও বেশি পুরোনো। বাংলাদেশের জনগণ জাতিসংঘের কাছে কোনো নির্দিষ্ট সরকার, রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শিক গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন প্রত্যাশা করে না। বরং তারা আশা করে, সংস্থাটি ভার সর্বজনীন নীতিমালা সমুন্নত রেখে সমগ্র জাতির স্বার্থে কাজ করবে।...

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং আবারও একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে–একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বৈধ আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা এবং হস্তক্ষেপের সীমারেখা কোথায় টানা উচিত? এ বিতর্ক শুধু বাংলাদেশের নয়। উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু দেশে বিভিন্ন সময়ে সরকার, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে তাদের নির্ধারিত ম্যান্ডেট অতিক্রম করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সুশাসন বা রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির নামে পরিচালিত কিছু কার্যক্রমকে সমালোচকরা এমন ক্ষেত্র হিসেবে দেখেছেন, যা মূলত জাতীয় সরকার ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একান্ত এখতিয়ারভুক্ত।

বর্তমান বিতর্ককে বুঝতে হলে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সম্পর্কের বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশ জাতিসংঘ ব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও ফলপ্রসূ অংশীদারি বজায় রাখছে। রাজনৈতিক মতাদর্শনির্বিশেষে বিভিন্ন সরকার জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, দারিদ্র্যবিমোচন, দুর্যোগব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন, মানবিক সহায়তা এবং সামাজিক উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করেছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ, আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংক এবং বহু আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি জাতিসংঘের প্রায় সব প্রধান সংস্থারই বাংলাদেশে কার্যক্রম চলমান।

বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় এসব প্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য। শিশুমৃত্যু হ্রাস, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, দুর্যোগ প্রস্তুতি উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন কিংবা মানবিকসংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অবদানকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ফলে এ সম্পর্ক পারস্পরিকভাবে লাভজনক এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ঐতিহ্যগতভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা মূলত কারিগরি সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা এবং উন্নয়ন সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

যদিও এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল সর্বজনীন মূল্যবোধের প্রসার, তবুও এগুলো বিতর্কেরও জন্ম দেয়। বাংলাদেশসহ অনেক দেশে পর্যবেক্ষকদের একাংশ প্রশ্ন তুলতে শুরু করে যে, জাতিসংঘের কিছু সংস্থা কি কারিগরি বা মানবিক বিষয়ের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিষয়ে ক্রমবর্ধমানভাবে জড়িয়ে পড়ছে?

বাংলাদেশে জাতিসংঘের কথিত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ দেখা যায় ২০০৭ সালের ১/১১-পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সংকটের সময়। সে সময় বিভিন্ন মহলে এ ধরনের খবর প্রচারিত হয় যে, রাজনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব প্রতিবেদনের সত্যতা যাই হোক না কেন, জনমনে একটি ধারণা তৈরি হয় যে, বহিরাগত শক্তিগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।

পরবর্তী বছরগুলোতে এ ধারণা বিভিন্ন মাত্রায় অব্যাহত থেকেছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বাড়তি নজরদারির বিষয় হয়ে ওঠে। একই সময়ে ২০১৭ সালে মায়ানমার থেকে ১০ লক্ষাধিক জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার আগমন দেশে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উপস্থিতি ও কার্যক্রম বহু গুণে বৃদ্ধি করে।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর এসব উদ্বেগ আরও তীব্র হয়। সংস্কার, শাসনব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনায় কিছু জাতিসংঘ কর্মকর্তার দৃশ্যমান সক্রিয়তা সমালোচকদের এ যুক্তিকে শক্তিশালী করে যে, কারিগরি সহায়তা ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মধ্যকার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের মন্তব্যের পরও প্রশ্ন দেখা দেয়। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, বিক্ষোভ ও সহিংসতা মোকাবিলা নিয়ে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে বার্তা পৌঁছানো হয়েছিল। যদিও বাংলাদেশের সামরিক কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে স্পষ্টভাবে জানায় যে, এ ধরনের কোনো যোগাযোগ তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেনি, তবুও ঘটনাটি চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনটি সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সম্পর্ক সবচেয়ে আলোচিত আন্তর্জাতিক দলিলগুলোর একটি। সমর্থকদের মতে, এটি জবাবদিহি ও মানবাধিকার সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান। অন্যদিকে সমালোচকদের অভিযোগ, প্রতিবেদনটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানকে প্রতিফলিত করেছে এবং এটি অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় প্রস্তুত করা হয়েছে।

বিতর্ক শুধু প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সমালোচকদের মতে, ঢাকায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং সংসদীয় পর্যালোচনা, অনুমোদন ও অনুসমর্থন এবং কোনো সংরক্ষণ (রিজার্ভেশন) ছাড়াই বাংলাদেশের জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যোগদান এই দুটি পদক্ষেপ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা উভয় উদ্যোগের প্রক্রিয়া নিয়েই আপত্তি বা সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু প্রভাবশালী উপদেষ্টার ভূমিকা–বিশেষ করে আইন উপদেষ্টা, তিনজন নারী উপদেষ্টা এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন উপদেষ্টা যিনি আগে মানবাধিকার বিষয়ক একটি এনজিওর কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সমালোচকদের মতে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও শাসনবাবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের মতে, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের উচিত জাতীয় স্বার্থের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এসব অঙ্গীকার ও সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা।

জাতিসংঘের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ের কথিত নির্বাচনি বা বাছাইকৃত সক্রিয়তা। সমালোচকদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার বিষয়ে জাতিসংঘ অভান্ত সক্রিয় থাকলে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর উত্থাপিত অভিযোগগুলো সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে অনেক কম সরব ছিল। তাদের মতে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরবর্তী ঘটনাবলির বিষয়ে জাতিসংঘের সক্রিয়তার পরিবর্তে এর কার্যক্রমের গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে গেছে মূলত ভলকার তুর্কের প্রতিবেদন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর আমি ব্যক্তিগতভাবে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী এবং ইউএন উইমেনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। উদ্দেশ্য ছিল ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষায় জাতিসংঘ কীভাবে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করা। ইউএন উইমেনের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও তৎকালীন আবাসিক সমন্বয়কারীর প্রতিক্রিয়া আমাকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। তার অগ্রাধিকার যেন নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা মোকাবিলার পরিবর্তে আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন কনসেনসাস কমিশনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ওপর বেশি কেন্দ্রীভূত ছিল।

রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে তৎকালীন আবাসিক সমন্বয়কারীর কিছু প্রকাশ্য মন্তবা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অন্তর্ভুক্তিমূলকতা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) এবং জাতিসংঘের সামগ্রিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। ফলে এমন কোনো বক্তব্য, যা প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অংশগ্রহণের গুরুত্বকে খাটো করে দেখায়, তা জাতিসংঘের নিজস্ব নীতির সঙ্গেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হতে পারে। অনেকেই তার বক্তব্যকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে ইউনূস প্রশাসনের অবস্থানের প্রতি সমর্থন হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন।

রাজনীতির বাইরেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কিছু পদক্ষেপ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি অংশ ঢাকাকে ‘নন-ফ্যামিলি ডিউটি স্টেশন’ হিসেবে চিহ্নিত করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।

একইভাবে ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তর নিয়েও মতপার্থক্য দেখা দেয়। কিছু জাতিসংঘ সংস্থা শুরুতে এ উদ্যোগের বিরোধিতা করে এবং কক্সবাজার ও টেকনাফে বিদ্যমান শিবির সম্প্রসারণের পক্ষে মত দেয়। সমালোচকদের মতে, পরিবেশগত অবক্ষয়, বন উজাড় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপের বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নেও হতাশা রয়েছে। অনেক বাংলাদেশির বিশ্বাস, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ ব্যবস্থার কিছু অংশ, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মায়ানমারের ওপর পর্যাপ্ত চাপ প্রয়োগ করতে পারেনি। একই সঙ্গে জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতা নির্ভর করে তার নিরপেক্ষতা ও জনআস্থা বজায় রাখার সক্ষমতার ওপর। বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের অংশীদারির ইতিহাস পাঁচ দশকেরও বেশি পুরোনো। বাংলাদেশের জনগণ জাতিসংঘের কাছে কোনো নির্দিষ্ট সরকার, রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শিক গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন প্রত্যাশা করে না। বরং তারা আশা করে, সংস্থাটি ভার সর্বজনীন নীতিমালা সমুন্নত রেখে সমগ্র জাতির স্বার্থে কাজ করবে।

আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশে জাতিসংঘ যদি তার বিশ্বাসযোগ্যতা, কার্যকারিতা এবং জনআস্থা অটুট রাখতে চায়, তাহলে সম্পৃক্ততা ও নিরপেক্ষতার মধ্যকার এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা হবে তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ সরকারের সচিব এবং সাবেক সিনিয়র জনস্বাস্থ্য নীতি উপদেষ্টা ও জাতিসংঘের ESCAP-এ বিশ্ব স্থাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি