গত জুলাইয়ের শেষ দিন মায়ানমারের ক্ষমতাসীন জান্তা সরকার দেশটিতে আসছে ডিসেম্বরে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে দেশটিতে বিরাজমান জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হয়েছে। নির্বাচন আয়োজনের জন্য গঠন করা হয়েছে ১১ সদস্যের নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনের তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত না হলেও মায়ানমারের চলমান পরিস্থিতিতে এ ঘোষণা ব্যাপক তাৎপর্য বহন করে। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, জান্তাপ্রধান জেনারেল মিং অং হ্লাইং সামরিক বাহিনী, অর্থাৎ ‘তাৎমাদো’র ক্ষমতা একটি তথাকথিত বেসামরিক অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে হস্তান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন। বিস্ময়কর হচ্ছে, এই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হচ্ছেন জেনারেল মিং অং হ্লাইং নিজে। তিনি ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের সাধারণ নির্বাচনে বিপুলভাবে নির্বাচিত অং সান সুচির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) সরকারকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করেন। বাতিল ঘোষণা করেন একই বছরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল। অং সান সুচিসহ এনএলডি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অসংখ্য নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার এবং জেলে পাঠানোসহ ভয়াবহ রাজনৈতিক নিপীড়ন চালান। এই জেনারেলই আবার নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্ব দেবেন আর মায়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতেই মায়ানমারে জান্তা শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন, বিক্ষোভ ও প্রতিরোধের ডাক দেয় দেশটির বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল, জাতিগোষ্ঠী, সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীসমূহ এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন দল। ফলে দেশজুড়ে শুরু হয় সামরিক রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও ব্যাপক সহিংসতা। দেশটিতে দ্রুত গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। প্রথাগত সশস্ত্র গ্রুপ ছাড়াও পিডিএফ এবং থ্রি ব্রাদারহুড জোট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জান্তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
পাশাপাশি ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) নামে একটি ছায়া সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়। ফলে মায়ানমারের জান্তা সরকার শক্তিশালী রাজনৈতিক এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। এই প্রতিরোধ, অর্থাৎ গৃহযুদ্ধ এতই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, ২০২৩ সাল থেকে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে জান্তা সরকার নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে। জান্তা সরকারকে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হচ্ছে রাখাইন রাজ্যে। আরাকান আর্মির নেতৃত্বে সমগ্র রাখাইন রাজ্য জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়। অঞ্চলটি কার্যত আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে যুক্তরাষ্ট্রের বার্মা আইন, গণতন্ত্রের জন্য আসিয়ান ও আন্তর্জাতিক চাপ, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, রোহিঙ্গা সমস্যাকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক তৎপরতা এবং চীনের দ্বিমুখী নীতির ফলে দেশটির জান্তা সরকার নজিরবিহীন সংকটে পড়ে। সম্ভবত ষাটের দশকে সামরিক শাসন শুরু হওয়ার পর দেশটির সামরিক শাসকগোষ্ঠী এত শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ এবং বাইরের বিশ্বের প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়নি।
অনেকেই শুরু করেন জান্তা সরকারের সামরিক পরাজয়ের ক্ষণগণনা। দেশটির একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ যেহেতু বিরোধী পক্ষের হাতে চলে গেছে, ফলে জান্তা সরকারের পরাজয়কে সময়ের ব্যাপার বলে মনে করা হয়। সামরিক জান্তা টিকে থাকার জন্য মায়ানমারে বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ চালু করেছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে রোহিঙ্গাদের। কিন্তু এসব সত্ত্বেও জান্তা শাসকগোষ্ঠী সুবিধা করতে পারেনি। দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধই হয়ে ওঠে মায়ানমারের সামরিক, রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা।
এই যখন জান্তা শাসকদের পরিস্থিতি, তখনই দেশটির জন্য, অর্থাৎ তাৎমাদোর কাছে আসে সুসংবাদ। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন মায়ানমারের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। শুধু তাই নয়, সামরিক কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে। বিশেষ করে শীর্ষ সামরিক জেনারেল মিং অংয়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এমসিএমের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়। গণমাধ্যমের সূত্রে জানা যায়, মায়ানমারের বিরুদ্ধে আরোপিত ট্রাম্পের সর্বজনীন শুল্ক প্রত্যাহারের অনুরোধসংবলিত জান্তা সরকারের চিঠিটি ট্রাম্পের প্রশংসা পাওয়ায় এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের নাটকীয় ঘটনা ঘটল। কারণ যা-ই হোক, ট্রাম্পের এই ঘোষণা মায়ানমারের জান্তা শাসকদের নতুন জীবন দিল। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা করেছে, যদি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তাহলে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সে হস্তক্ষেপ করবে না। এ ঘোষণা মায়ানমারের সামরিক জান্তার অবস্থানকে নিঃসন্দেহে আরও শক্তিশালী করেছে। ট্রাম্পের এই ঘোষণার মাত্র এক সপ্তাহ পরই জান্তা সরকার দেশটিতে নির্বাচনের ঘোষণা দিল।
মিয়ানমারের বিরোধী দলগুলো এই নির্বাচনের ঘোষণাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। জান্তাপ্রধান মিং অংয়ের হাতে সব ক্ষমতা রেখে সরকার এবং নির্বাচন পরিচালনার ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই অগ্রহণযোগ্য ও হাস্যকর। শুধু তা-ই নয়, এই নির্বাচনের যারা বিরোধিতা করবেন বা নির্বাচনবিরোধী তৎপরতা চালাবেন, তাদের কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। বিভিন্ন মেয়াদে জেল, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির ব্যবস্থা রেখে নতুন আইন করা হয়েছে। ফলে সহজেই অনুমেয়, এই নির্বাচন হবে প্রহসনমাত্র। আসলে জান্তা সরকারের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করা এবং বেসামরিক আচ্ছাদন দেওয়াই হলো এই ঘোষণার প্রধান উদ্দেশ্য।
এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া সেভাবে দৃশ্যমান হয়নি। তবে চীন মায়ানমারের বিবদমান সব গোষ্ঠীকে সম্মিলিতভাবে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে রাজনৈতিক সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছে। এই ইঙ্গিতও পরোক্ষভাবে জান্তা সরকারের এই তৎপরতাকে সমর্থন করছে।
স্পষ্টভাবে বললে, মায়ানমারের অর্ন্তবর্তী সরকারের গঠন-প্রক্রিয়া, জেনারেল মিং অংয়ের ক্ষমতা ধরে রাখা সদ্যঘোষিত নির্বাচনি আইন আর বিরোধীদের সরাসরি প্রত্যাখ্যান নির্বাচনের ঘোষণাকে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, সামরিক দিক থেকে দুর্বল এবং ব্যাপক অজনপ্রিয় জান্তা সরকার জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেওয়ার সাহস ও শক্তি কোথায় পেল? এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক কৌশলের নাটকীয় পরিবর্তন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। বাণিজ্যযুদ্ধ, জিরো সাম গেম এবং শত্রু-মিত্রের নতুন সংজ্ঞায়ন বিশ্বে ভয়াবহ সংকট ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। ভারত, পাকিস্তান, কানাডা ও ইউরোপের প্রতি ট্রাম্পের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। মায়ানমারের জান্তা সরকার সম্ভবত কৌশলে এই সুযোগটি গ্রহণের চেষ্টা করছে।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সব সময় গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা সংকটের বিশাল চ্যালেঞ্জ ছাড়া ভূরাজনৈতিক এবং ভূ-অর্থনৈতিক বিবেচনায় মায়ানমার বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিশেষ করে সম্প্রতি মানবিক করিডরসহ রাখাইন রাজ্যের সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। এই প্রেক্ষাপটে মায়ানমারের নির্বাচনের বিষয়টি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। দেখতে হবে, জান্তার এই ঘোষণা দেশটিতে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করার ইঙ্গিত বহন করে কি না। প্রশ্ন উঠতে পারে, যারা জান্তা সরকারের পতনের বয়ান দিচ্ছেন তারা কি তাহলে ভুল বার্তা দিচ্ছেন? নির্বাচনের ঘোষণার মাধ্যমে জান্তা সরকার কি ট্রাম্প প্রশাসনের আরও কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছে? অর্থাৎ মায়ানমারের বিরোধী দলগুলোর বৈশ্বিক, বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থনের মাত্রা কি এতে হ্রাস পাবে? রাখাইনে আরাকান আর্মির আধিপত্যের কি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে? এ রকম নানামুখী প্রশ্নের গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে, দেশটিতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের সামান্যতম পরিবেশ নেই। একদিকে গৃহযুদ্ধ, অন্যদিকে ব্যাপকভাবে ত্রুটিপূর্ণ ও একতরফা নির্বাচন-প্রক্রিয়ার ঘোষণা জান্তা সরকারের নতুন কৌশল বলে মনে করা অসংগত হবে না। এসব সত্ত্বেও মায়ানমারের জান্তা সরকারের নতুন ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেশটির দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক নীতিতে পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে, যা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
ড. দেলোয়ার হোসেন: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক। অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
.jpg)
.jpg)
.jpg)