ঢাকা ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
পাকিস্তানের বিমান হামলায় আফগানিস্তানে নিহত ১২ ইংল্যান্ড ফেবারিট না হলেও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখতেই পারে: টুখেল যুক্তরাষ্ট্রে মজুত কমে যাওয়ায় বাড়ল তেলের দাম লাইনচ্যুত বগি উদ্ধার করতে গিয়ে রিলিফ ট্রেনও লাইনচ্যুত! হেলিকপ্টার হারিয়ে ইরানে হামলা যুক্তরাষ্ট্রের, প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি তেহরানের আজকের মুদ্রার বাজার: ১০ জুন, ২০২৬ বগি লাইনচ্যুত, জামালপুর- ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ভারতে সাজাভোগের পর তামাবিল দিয়ে ফিরলেন ৭ বাংলাদেশি কেমন ছিল নবিজি (সা.)-এর গায়ের বর্ণ? আবারও কমল সোনার দাম, নতুন দর কত? ক্লিন ইমেজের আলী রেজাও দুদকের জালে দেশে ৫০ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে: চট্টগ্রামের ডিসি বাবাকে খাবার দিতে গিয়ে নদীতে তলিয়ে গেল শিশু গজারিয়ায় আকস্মিক ঝড়ে অর্ধশত গাছ উপড়ে পড়েছে, মহাসড়কে তীব্র যানজট প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে এসে আত্মহত্যা প্রেমিকার শাবিপ্রবিতে ৩২৫ গবেষকের অংশগ্রহণে ওশেনোগ্রাফি বিভাগের সিম্পোজিয়াম আর্জেন্টিনার উত্তাপে গলে গেল আইসল্যান্ড ক্যাম্প থেকে পালিয়ে সীমান্তে মাছ ধরায় ১৯ রোহিঙ্গা আটক বাড়ছে না বিড়ির দাম সারাদেশে মাঝারি ধরনের বৃষ্টির সম্ভাবনা চায়না-সাউথ এশিয়া এক্সপোতে অংশ নেবে বিসিসিসিআই ইসলামী ব্যাংকের সিআরআরে বড় ধরনের ঘাটতি আক্কেলপুরে একদিনে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার একদিনেই বদলে গেল চবির দুই উপ-উপাচার্য কক্সবাজারে মা-মেয়েকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গ্রেপ্তার ৬ রাজশাহীতে বর্ষার আগেই ডেঙ্গুর অশনিসংকেত বিদেশি কোচদের চোখে নতুন ইতিহাস ল্যাবএইডে ডেঙ্গুবিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত আবেগের বিয়েতে ঝুঁকিতে পড়ছে মেয়েরা শখ থেকে স্বাবলম্বী গৃহবধূ, ঘরের ছাদ যেন ক্যাকটাস রাজ্য
Nagad desktop

বিশেষ সাক্ষাৎকারে ড. ইফতেখারুজ্জামান দুদককে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান করতে চাই

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৫, ০১:০১ পিএম
আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২৫, ০৪:৪০ পিএম
দুদককে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান করতে চাই
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. ইফতেখারুজ্জামান। অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক। একই সঙ্গে তিনি দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য। রাষ্ট্র সংস্কারে দুর্নীতি দমনে তার কমিশনের প্রস্তাব, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের অগ্রগতি, এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতাসহ নানা বিষয়ে খবরের কাগজের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার শাহনাজ পারভীন এলিস

খবরের কাগজ: আপনার নেতৃত্বাধীন দুদক সংস্কার কমিশন থেকে সাংবিধানিক ও স্বাধীন দুদক গড়ার লক্ষ্যে ৪৭টি সুপারিশ করা হয়। এগুলো বাস্তবায়নে আপনার আশাবাদ জানতে চাই।
ইফতেখারুজ্জামান: অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে রাষ্ট্র সংস্কারের একটা বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আমি আশাবাদী। কারণ সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে সুপারিশমালা প্রণয়ন করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। আশার কথা হচ্ছে, দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর বেশির ভাগের ব্যাপারে প্রায় সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। কিছু ছোটখাটো রিজারভেশন আছে। সেগুলো ব্যাখ্যা করার পর তাদের মধ্যে মোটামুটি ঐকমত্য হয়েছে। আমাদের বেশকিছু সুপারিশ রয়েছে, যেগুলো স্বল্প মেয়াদে সরকারের নির্বাহী সিদ্ধান্তে এবং দুদকের প্রতিপালনযোগ্য, বাস্তবায়নযোগ্য। সেগুলো সরকারের কাছে ফেব্রুয়ারিতে হস্তান্তর করেছি। সরকারের অঙ্গীকার আছে সেগুলো বাস্তবায়ন করবে। তবে এখনো পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য পাইনি সেগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে কি না। আশা করছি, খুব শিগগিরই হয়তো সে প্রক্রিয়া সরকার শুরু করবে। 

খবরের কাগজ: আপনার কমিশনের কতটি সুপারিশ আশু বাস্তবায়নযোগ্য? 
ইফতেখারুজ্জামান: দুদক সংস্কারে কমিশন প্রস্তাবিত ৪৭টি সুপারিশের মধ্যে অর্ধেকের বেশিই আশু বাস্তবায়নযোগ্য। এর মধ্যে দুদককে শক্তিশালী করা, কার্যকর ও ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে কমিশনারদের পদ বাড়ানো, নিয়োগ, সার্চ কমিটি, আইনের সংস্কার, বেতন বৃদ্ধি ও প্রণোদনার মতো নানা সুপারিশ রয়েছে। এসব সুপারিশ অর্ডিন্যান্স জারির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। যেমন- দুদকে উচ্চপর্যায়ে নিয়োগ। সচিব ও মহাপরিচালক পদ- যাদের সাধারণত আমলাতন্ত্র থেকে নিয়োগ করা হতো। এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার প্রস্তাব হয়েছে। যাতে করে একটা সীমারেখার মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ আমলাতন্ত্র বা প্রশাসন থেকে আসতে পারবে। 

দ্বিতীয়ত দুদক কমিশনের কিছু কার্যপদ্ধতিতে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। কারণ অনুসন্ধানের নামে কার্যপদ্ধতিকে দীর্ঘ করা হয়। এতে করে দুর্নীতিবাজরা অনেক সময় পার পেয়ে যায় বা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বেশি সময় লাগে। দেখা গেছে, দুর্নীতির যেকোনো অভিযোগ অনুসন্ধান শেষ হওয়ার পর দুদকের মাঠপর্যায়ের তদন্ত শুরু করা হয়; যা আইনে অন্য কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে নেই। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অনুসন্ধান পর্বটা বাতিল করে সংস্থাটির যাচাই-বাছাই কমিটির কার্যক্রমকে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করতে কমিশনের পক্ষ থেকে সরকারকে সুপারিশ করা হয়েছে। সেটা গৃহীতও হয়েছে। 

দুদকের কোনো সদস্য বা কর্মীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ সাপেক্ষে অভিযুক্তদের বরখাস্ত করে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে শূন্য পদগুলো পূরণ করতে হবে। আমরা চাই দুদক একটা কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হোক। আমরা বলেছি দুদকের কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা এমন হতে হবে; যা সরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের স্কেলের থেকে আলাদা, পর্যাপ্ত প্রণোদনামূলক। প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের যাতে ওনারশিপ তৈরি হয়। সেই লক্ষ্যে একদিকে কর্মকর্তাদের প্রণোদনা দেওয়া অন্যদিকে কার্যক্রমের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রস্তাব রেখেছি। দুদকের কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে গঠিত কমিটিকে আমরা নিয়োগ বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি বলেছি। এই কমিটি ৬ মাস পরপর সংস্থাটির কার্যক্রম পর্যালোচনা করবে। এরপর কমিটির সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে সেগুলো বিশ্লেষণে একধরনের গণশুনানি করবে। তাতে সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যমসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিতে পারেন। ফলে দুদকের একটা জবাবদিহির ক্ষেত্র তৈরি হবে। আশা করছি, এগুলো বাস্তবায়িত হলে দুদক কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। 

খবরের কাগজ: ঢাকার বাইরে দুদকের কার্যক্রম উন্নয়নে আপনার কমিশনের পরিকল্পনা কী?
ইফতেখারুজ্জামান: ঢাকার বাইরে প্রতিটি জেলায় এখন পর্যন্ত দুদক মানের কোনো কার্যালয় নেই। যেখানে কার্যালয় আছে সব জায়গায় আদালত নেই। স্পেশাল আদালত যেটা হওয়ার কথা সেগুলো আমরা প্রস্তাব করেছি। দেশের যেসব জেলায় এখনো হয়নি, পর্যায়ক্রমে সেসব জেলায় দুদকের কার্যালয় স্থাপন করতে হবে। লক্ষ্য দুদকের কার্যক্রমকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া। আর কার্যালয় রয়েছে এমন জেলাগুলোতে আদালত প্রতিষ্ঠার কথা বলেছি। জরুরি ও গুরুতর মামলাগুলোর জন্য যাতে সাধারণ মানুষকে ঢাকায় আসতে না হয়। 

খবরের কাগজ: জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ হয়েছে। গত এক বছরে ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে জনমনে যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা কতটা পূরণ হয়েছে?
ইফতেখারুজ্জামান: জুলাই ঘোষণাপত্র যেটা হয়েছে, তাতে আন্দোলনের মাধ্যমে সবার স্বপ্নের যে জায়গাটা সেটা ক্যাপচার করা হয়েছে। মোটাদাগে এটা আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের সর্বজনীন ঘোষণা। এটি নিয়েও নানা ধরনের বিতর্ক হয়েছে। এটা ২০২৪ সালের আগস্টেই হতে পারত। কেন তা ঘোষণা করা হলো না। আমি বলব, একটি ঘোষণার মাধ্যমে তো আর সব প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব হয় না। দেরিতে হলেও এই ঘোষণা ঐতিহাসিক। এক অর্থে এটা ভালো। কারণ সরকারের উদ্যোগে এতে রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যের পর মতামত দিয়েছে। এ ঘোষণায় থাকা অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে বর্তমান ও পরবর্তী সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। 

মনে রাখতে হবে, দেশের বিশেষ প্রেক্ষাপটে গঠিত এ সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল তিনটি। সেগুলো হলো- জুলাই আন্দোলনের হত্যাকারীদের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, নতুন বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কার এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে হত্যাকারীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়াটা ইতিবাচক। এই বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যেও আবার কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা প্রত্যাশিত ছিল না। বিশেষ করে আদালত প্রাঙ্গণে আসামিদের সঙ্গে ভায়োলেন্স হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে সত্যিকারের বিচার হচ্ছে, না প্রতিশোধ হচ্ছে? আশা করব, বিচারটা যেন বিচারই হয়, প্রতিশোধের পর্যায়ে না যায়। এছাড়া একই মামলায় শতাধিক ব্যক্তিকে একসঙ্গে ঢালাওভাবে আসামি করে মামলা করা, জামিন না হওয়া- এসব ঘটনা আসল অপরাধীদের জবাবদিহিতে আনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না সেটাও বিবেচনার বিষয়। বিচারপ্রক্রিয়া যাতে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, স্বচ্ছতার মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হবে। আশার দিক হলো, এবারই প্রথম আদালতের এজলাস থেকে বিচার কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে লাইভ ব্রডকাস্ট করা হচ্ছে। ফলে দেশবাসীর পাশাপাশি বিশ্ববাসী দেখতে ও জানতে পারছে- এটা ইতিবাচক।

খবরের কাগজ: জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর এবং এর বাস্তবায়ন নিয়ে কমিশনের পরিকল্পনা কীভাবে এগোচ্ছে? 
ইফতেখারুজ্জামান: ঐকমত্য কমিশন প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ হলো রাজনৈতিক অঙ্গীকার। যেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কমিশন গত ৩১ জুলাই দ্বিতীয় পর্যায়ের বৈঠক শেষে জুলাই সনদের খসড়া দলগুলোকে দিয়েছে। শিগগিরই সনদটির পূর্ণাঙ্গ খসড়াও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হবে। বিগত দিনে দলগুলোর অঙ্গীকার লঙ্ঘনের চর্চা আমরা দেখেছি। ফলে এবারের এ সনদের আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা এবং বাস্তবায়নের উপায় খুঁজতে আমরা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও তৃতীয় পর্যায়ের বৈঠক করছি। পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের অংশীজনরা যাতে তা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হন। এবারের বৈঠক শেষে সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর সই নেওয়া হবে; যার মধ্যদিয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে জুলাই সনদ। এ পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ওপর নির্ভর করছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা কী হবে। অনেকেরই প্রত্যাশা- নির্বাচনের আগেই সনদ বাস্তবায়ন যেন শুরু হয়। তবে যেসব ইস্যুতে সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রয়োজন, সেগুলো বাস্তবায়ন নির্বাচিত সরকার ও সংসদ ছাড়া সম্ভব নয়। 

খবরের কাগজ: রাষ্ট্র সংস্কারে মোট ১১টি কমিশন গঠিত হলেও মাত্র ৬টি কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের উদ্যোগ নেয় সরকার। বাকি কমিশনগুলোর সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে সরকার ঐকমত্য কমিশনকে কী জানিয়েছে?
ইফতেখারুজ্জামান: ঐকমত্য কমিশনের দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে প্রথম দফায় গঠিত ৬টি কমিশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে সরকার। বাকি ৫ কমিশনের কাজগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কারণ ওইসব কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগেই পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সম্ভব। তবে ওইসব কমিশনের প্রস্তাব ঐকমত্য কমিশনে আলোচনার বাইরে রাখায় সমালোচনা রয়েছে। আমি মনে করি, ওই কমিশনগুলোর প্রতিটাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারপরও তাদের প্রস্তাবিত সুপারিশমালা নিয়ে বাস্তবে তেমন আলোচনা হয়নি। মূলত সব কমিশনের সুপারিশই বাস্তবায়ন করবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার, যারা আগামী সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন। কাজেই কোনো না কোনো উপায়ে এই ৫ কমিশনের প্রস্তাবগুলোও রাজনৈতিকভাবে আলোচনা হওয়া দরকার ছিল।

গুরুত্বপূর্ণ নারী সংস্কার কমিশনকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলপাড় করা হলো। অনাচারের মাধ্যমে এই কমিশনের প্রতিবেদন বাতিল করার দাবি তুলেছে ধর্মভিত্তিক দলগুলো। সে ক্ষেত্রে সরকার সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিতে পারেনি, যেটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আর সরকারের নীরবতায় নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের ইকোসিস্টেম নষ্ট হলো। এসব ঘটনার প্রভাবে পরবর্তী সময়ে ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকেও সংসদে প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে প্রত্যাশা পূরণ হলো না। একইভাবে শ্রম সংস্কার কমিশন, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন এবং স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা নেই এবং কমিশনগুলোর সুপারিশের বাস্তব অগ্রগতিও জানা যাচ্ছে না।  
অন্যদিকে শিক্ষা ও ব্যবসা খাতের সংস্কারে কোনো কমিশনই হয়নি! ফলে প্রশ্ন উঠেছে; অথচ শিক্ষা খাতকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন। আর ব্যবসা খাত; ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতের ব্যবসা কিন্তু কর্তৃত্ববাদ বিকাশে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাদের কারণে দেশের ব্যবসা খাত চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের সম্পদ ও অর্থ লুটপাট হয়েছে। ব্যাংকিং খাত জবরদখল হয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, অল্প সময়ে বিদেশে পাচার হয়েছে ২৪০ মিলিয়ন ডলার। এসব দুর্নীতি যারা করেছেন, রাষ্ট্রে সম্পদ জবরদখল করেছেন- তাদের অন্যতম হাতিয়ার ছিল রাজনীতি, আমলাতন্ত্র আর ব্যবসা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। কাজেই ব্যবসা খাতকেও সংস্কারের আওতাভুক্ত করা উচিত ছিল। 

খবরের কাগজ: দেশজুড়ে চলমান মব সন্ত্রাস প্রতিরোধে সরকারের তৎপরতা ও পদক্ষেপ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
ইফতেখারুজ্জামান: আন্দোলন-উত্তর বাংলাদেশে বিগত দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং যে ধরনের অরাজকতার ঘটনা আমরা দেখেছি তা খুব অস্বাভাবিক নয়। এ ধরনের গণ-অভ্যুত্থানের পর সব দেশে এমনটাই হয়। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশ বাহিনী; তাদের অনেকে কর্তৃত্ববাদ বিকাশের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। অন্যদিকে হত্যাকাণ্ডসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনেও জড়িত ছিল। পরে তারা এক ধরনের পলাতক অবস্থায় চলে গেছে। তাদের নৈতিক দৃঢ়তা, পেশাগত দায়িত্ব পালনের মোরাল অথরিটি তারা হারিয়েছে। ফলে সারা দেশেই আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সেই অবস্থার উত্তরণ ঘটিয়ে কার্যকর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গড়ার চেষ্টা চলছে। 

খবরের কাগজ: স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৫৪ বছরেও এ দেশে দুর্নীতি রোধ করা যায়নি। দুর্নীতির লাগাম টানতে সরকারগুলোর ব্যর্থতার মূল কারণ কী?
ইফতেখারুজ্জামান: বাংলাদেশে যে দুর্নীতি, সেটা একচ্ছত্র বলে কিছু নেই। এটা ধারাবাহিক হয়ে আসছে। সব রাজনৈতিক দল, যারা যখন ক্ষমতায় ছিল দুর্নীতিতে জড়িত ছিল। ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আওয়ামী লীগের সময় গত ১৫-১৬ বছরে এটা একটা চূড়ান্ত জায়গায় গেছে, কিন্তু এটার দায় আওয়ামী লীগের একার নয়। রাষ্ট্র কাঠামো দখলের জন্য আদালতসহ তাদের ত্রিমুখী যে শক্তিগুলো ছিল, সেগুলো সবসময়ই কেন্দ্রে ছিল। অন্যদিকে অতি ক্ষমতাহীন বিশেষ মহলের এক ধরনের অরাজকতা, অনেক ক্ষেত্রে হযবরল পরিস্থিতি, মব সন্ত্রাস দেখা গেছে। এর মধ্যে আবার অনেক সুযোগসন্ধানী ঢুকে পড়েছে। বছরজুড়ে পুরোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মতোই নতুন যে রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ ঘটেছে তারাও সেই পুরনো প্রবণতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনেও অস্থিতিশীলতা বিরাজ করেছে। 

খবরের কাগজ: দেশজুড়ে অরাজকতার এসব ঘটনা প্রতিরোধে রাষ্ট্রের ভূমিকা কেমন ছিল?
ইফতেখারুজ্জামান: পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি মোকবিলায় আসলে সরকারের চ্যালেঞ্জ ছিল বহুমুখী। তাই প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়তো ডেলিভারি সম্ভব হয়নি। তবে সরকারের প্রয়াশের ঘাটতি ছিল না। কোনো বিশেষ ঘটনা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হওয়ার পর প্রশাসন তৎপর হয়েছে। যদিও সেনাবাহিনীর সহায়ক ভূমিকায় অনেক ঘটনা তারা সামাল দিতে পেরেছে। সার্বিক নাজুক পরিস্থিতিতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে যথাযথ ভূমিকা পালনে ঘাটতি দেখা গেছে।

খবরের কাগজ: সম্প্রতি কয়েকজন উপদেষ্টার পিএস, এপিএসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। আটজন উপদেষ্টা সরাসরি দুর্নীতিতে জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে বলে বক্তব্য দিয়েছেন একজন সাবেক সচিব। এসব ঘটনায় আপনার মন্তব্য কী?
ইফতেখারুজ্জামান: কর্তৃত্ববাদের অন্যতম উপাদানই ছিল দুর্নীতি। লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি করে প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করা, পেশাগত দেউলিয়াপনা করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা। তাদের পতনের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল নতুন বাংলাদেশে এসব আর থাকবে না, উত্তরণ ঘটবে। সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং সবার প্রত্যাশার বিপরীতে সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টার এপিএসের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেটা প্রত্যাশিত ছিল না। যে দুটি অভিযোগ উঠেছে দুদক সেগুলো তদন্ত করছে। অভিযুক্তদের জবাবদিহি ও শাস্তির আওতায় আনা হবে। 

একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, যিনি একটা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত। তিনি যে কথাটি বলেছেন, সরকারের আট উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনিশ্চিত তথ্য তার কাছে আছে- তার এটুকু বলাই তে যথেষ্ট নয়। অথচ এখন আর তাকে যোগাযোগ করে পাওয়া যাচ্ছে না। ওই ব্যক্তি বলেছেন, এসব তথ্য গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের হাতেও আছে। তিনি কীভাবে জানলেন যে, গোয়েন্দা সংস্থার হাতে তথ্যগুলো আছে? তাহলে সাবেক এই আমলার আমলাতন্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ, ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ- এটা ভালো লক্ষণ না। কারণ এ তথ্য তার হাতে যাওয়ার কথা নয়। এ তথ্য সরকারের হাতে থাকার কথা এবং দুদকের কাছে যাওয়ার কথা, অভিযোগ হওয়ার কথা। যাই হোক, সেটা হয়নি। তার উচিত হবে অনতিবিলম্বে সেসব তথ্য সরকারের হাতে, দুদকের হাতে হস্তান্তর করা। আর সেটা যদি না হয়, তাহলে বুঝতে হবে এটা তার একধরনের পলিটিক্যাল স্টান্টবাজি। হয়তো তিনি রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য এ ধরনের ঘোষণার মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ বা তার দলের নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এ কাজটা করেছেন। 

খবরের কাগজ: গত ২০২৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৪তম; যা ২০২৩ সালে ছিল ১০ম। এমন অবনতির কারণ কী?
ইফতেখারুজ্জামান: এ দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের যে উপাদান সেগুলো কার্যকর ছিল না। দুর্নীতি দমনে ‘জিরো টলারেন্সের’ যে ঘোষণা- সেটা কাগজে-কলমে ছিল, বাস্তব প্রয়োগে রাজনৈতিক সদিচ্ছা তাদের ছিল না। অন্যদিকে রাষ্ট্রকাঠামোর দখলে থাকা দুর্নীতিবাজদের বিচার তো দূরের কথা বরং সুরক্ষা দেওয়া হতো। এ ক্ষেত্রে দুদকসহ পুরো বিচার প্রক্রিয়া অকার্যকর অবস্থার সুযোগ নিয়েছে অভিযুক্তরা। রাষ্ট্র ও জনগণের পক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত ওইসব প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তির দায়িত্ব পালনে নিস্ক্রিয়তা দেখা গেছে। সেই অবস্থা পরিবর্তনের সুযোগ এসেছে, নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কারের এজেন্ডাগুলো বাস্তবায়ন হলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। হুট করে ম্যাজিক্যালি দুর্নীতিতে দেশের অবস্থান উন্নতির দিকে যাবে, এটা বাস্তবসম্মত নয়। 

খবরের কাগজ: ২০২৪-এর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতারা নতুন দল এনসিপি গঠন করেছেন। এতে কী তারা লাভবান হয়েছেন? 
ইফতেখারুজ্জামান: বৈষম্যের বিরুদ্ধে এ দেশে যে আন্দোলনটা হয়েছে, সেটা ঐতিহাসিক বিশাল অর্জন। সেই ফোর্স (তরুণদের) থেকে রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ অত্যন্ত ইতিবাচক ও সম্ভাবনাময় মনে করি। এটাকে আমি স্বাগতও জানাই। কিন্তু ইতোমধ্যে দলটির তরুণরা বিভিন্ন ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ কাজে নিজেদের জড়িয়েছেন। এসব ঘটনায় কয়েকজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। উচ্চপর্যায়ে নেতৃত্বে থাকা কয়েকজন নেতা ইস্তফাও দিচ্ছেন। অথচ দল গড়ার পর এসব তরুণ যে রোল মডেলটা অনুসরণ করছে, সেটা এদেশের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির অর্থ ও পেশিশক্তির রোল মডেল। যেটা থেকে তাদের দূরে থাকা, প্রত্যাখ্যান করার কথা ছিল। বিপরীতে তারা অপশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে আত্মঘাতী অবস্থানে যাচ্ছে। তবে এখনো সময় আছে। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা দলবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজিসহ যত অভিযোগ- এ ধরনের ঘটনা থেকে তাদের বেরিয়ে আসতে হবে। জনগণের কাছে নিজেদের কাজের স্বচ্ছতা প্রমাণ করতে পারলে তাদের মধ্যেও সম্ভাবনা রয়েছে।

খবরের কাগজ: নতুন এই দলটির (এনসিপি) নেতা-কর্মীরা রাজনীতিতে নবীন। তাদের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে তাদের দায় কতখানি? 
ইফতেখারুজ্জামান: কারও বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের ও বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ থাকলে সেটা দেখা বা ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলের। কিন্তু যদি কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ থাকে সেটা দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সে ঘটনা তদন্ত করবে দুদক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও ভূমিকা রাখবে। দীর্ঘদিনে কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের ফলে আন্দোলনে থাকা বিজয়ী শক্তির রাজনীতিবিদ ও তরুণরা নিজেদের ক্ষমতায়িত ভাবছে। অনেকে অতি ক্ষমতায়িত ভাবছে। তাদের অনেকে মনে করছেন, ‘১৬ বছর বঞ্চিত ছিলাম। এখন আমাদের চাই’- এই যে বিষয়টা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি দলটির কিছু নেতা-কর্মীর নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠার পর দলটির অনেক নেতার মধ্যে হতাশাও দেখা গেছে। সহযোদ্ধাদের ভূমিকায় তারা বিব্রত। এনসিপির নেতাদের অনেক ক্ষেত্রে জনস্বার্থে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতেও দেখা গেছে। কাজেই কিছু ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও চাঁদাবাজির কারণে পুরো আন্দোলনটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা উচিত নয়।  

খবরের কাগজ: দলটিকে কিংস পার্টি বলার কারণ কী?
ইফতেখারুজ্জামান: বিভিন্ন দলের নেতারা তাদের কিংস পার্টি হিসেবে অভিহিত করছেন। কারণ দলটির সহযোদ্ধাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রথমে তিনজন উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন। এখনো দু’জন সেখানে আছেন। সে কারণে অনেকেই তাদের ওই নামে ডাকেন। তবে এ ধরনের কিংস পার্টি দেশে নতুন নয়। আগেও হয়েছে, দেখেছি আমরা। এ ধরনের বিতর্ক দূর করতে এনসিপির দায়িত্ব হলো এটা পরিষ্কার করা যে, যে দুজন সরকারের রয়েছেন দলে এবং রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা কী? অথবা ঘোষণা দিয়ে সরকারে থাকা ওই দুই উপদেষ্টার পদত্যাগ করে সরাসরি রাজনীতি চলে আসা। 

খবরের কাগজ: প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রমজানের আগেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নির্বাচনের জন্য কতটা অনুকূল মনে করছেন?
ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাচন তো হতেই হবে। নির্বাচন আমরা আশা করি। নির্বাচনটা কতখানি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ হবে, সেটা অনেক ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করে। যেমন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে ভোটের দিন পর্যন্ত সরকারের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটুকু দলনিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে। দলগুলোর মধ্যে কোনো স্বার্থের দ্বন্দ্ব কাজ করবে কিনা। নির্বাচন কমিশন কতটুকু নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে- এসব কিছুই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের ধারণা, বর্তমান কমিশন আগের তিনটি কমিশনের তুলনায় অনেক বেশি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। কারণ এ কমিশনের বিরুদ্ধে এক বা একাধিক রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান নেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। ফলে এ নির্বাচন কমিশনকেও পরীক্ষা দিতে হচ্ছে।  

খবরের কাগজ: নানা জনমত জরিপের তথ্য- আগামী সংসদ নির্বাচন ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার হলে বিএনপি জয়ী হবে। দেশ গঠনে এ দলটির সক্ষমতা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? 
ইফতেখারুজ্জামান: অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব থেকে নির্বাচনকে মুক্ত করতে না পারলে ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন সম্ভব নয়। এই দলটির যে পলিটিক্যাল ট্র্যাক রেকর্ড- সেটা থেকে তারা সরে আসবে মানুষ এমনই প্রত্যাশা করে। বাংলাদেশে যে দুর্নীতি, সেটা টানা একচ্ছত্রভাবে হয়েছে এমন নয়, এটা ধারাবাহিক হয়ে আসছে। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আওয়ামী লীগের সময় গত ১৫-১৬ বছরে এটা একটা চূড়ান্ত জায়গায় গেছে, কিন্তু এটার দায় আওয়ামী লীগের মনোপলি ছিল না। সব রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় গিয়ে দুর্নীতিতে জড়িয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। কাজেই সেই ট্র্যাক রেকর্ড থেকে বিএনপি সরে আসা উচিত। তাদের নেতৃত্ব পর্যায় থেকে সেটা বাস্তবায়িত হলে অন্য ধরনের নতুন সরকার বিএনপি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে আশা করি।  

খবরের কাগজ: অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে, মন্তব্য করুন।
ইফতেখারুজ্জামান: পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি দেখছি না। কিছু হত্যা মামলায় ঢালাওভাবে সাংবাদিকদেরও আসামি করা হয়েছে; যা অপ্রত্যাশিত। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ট্যাগিংসহ নানা যুক্তিতে অনেকের অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব পরিবর্তন করা হয়েছে, অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটেছে, যার পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারের ইন্ধন রয়েছে। এসব কারণে গণমাধ্যমে প্রত্যাশিত পরিবেশ ও স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। তবে আগের মতো হুমকির পরিবেশ না থাকায় মানুষ অনেক ক্ষেত্রে মন খুলে কথা বলতে পারছে, সাংবাদিকরাও লিখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সরব। এ ছাড়া গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন অত্যন্ত শক্তিশালী রিপোর্ট দিয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়ন হলে সার্বিকভাবে গণমাধ্যমের ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব হবে। 

খবরের কাগজ: অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের আকাশসমান প্রত্যাশা ছিল। তারা কতটা পূরণ করতে পেরেছে?
ইফতেখারুজ্জামান: প্রত্যাশিত অর্জন হয়নি। সব সরকারের মতো এ সরকারেরও কিছু ব্যর্থতা রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানার ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হলেও, কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এরকম একটা সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেশি থাকে। অন্যদিকে পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের চ্যালেঞ্জ ছিল বেশি। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সক্ষমতার ঘাটতি দৃশ্যমান হয়েছে। কিছু সফলতাও সরকারের রয়েছে। যেমন ব্যাংকিং খাত একটা গ্রুপের হাতে কলাপস ছিল। ৯টি ব্যাংক জবরদখল ছিল। সেই খাতকে অনেকটা টেনে তুলে আনতে পেরেছে। এছাড়া রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগেও অগ্রগতি রয়েছে। দেশের অনেক জটিল কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও এ সরকার ইতিবাচক অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে সফল হয়েছে।

খবরের কাগজ: অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও খবরের কাগজকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। 
ইফতেখারুজ্জামান: খবরের কাগজকেও ধন্যবাদ।

রামিসা ও নূরজাহান হত্যা: আমাদের মূল্যবোধের পচন

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
রামিসা ও নূরজাহান হত্যা: আমাদের মূল্যবোধের পচন
ড. নাহিদ ফেরদৌসী

নূরজাহান বেগমের মরদেহ পরীক্ষা করলে আইনের চেয়ে বেশি ধরা পড়ে আমাদের মূল্যবোধের পচন। যে দেশের সংবিধান বলে জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা, সেই দেশের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অধিকার কেবল কাগজে বন্দি হবে না–এ দাবি এখন সময়ের।...

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি বিচারিক কার্যকারিতা ও শিশু সুরক্ষার বিষয়ে গভীর উদ্বেগের সূত্রপাত করেছিল। ঘটনা সংঘটনের ১৯ দিন পর, ঘথ ৭ জুন বহুল প্রতীক্ষিত রায় প্রকাশ হয়েছে।

এতে দুজন মূল অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই যুগান্তকারী রায়টি নিঃসন্দেহে দ্রুত বিচারের একটি নজির সৃষ্টি করেছে। রায়টি শোকাহত মা-বাবার জন্য কতটুকু স্বস্তি ও মানসিক মুক্তি এনে দিয়েছে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে এসেছে কি না, তা নির্ভর করছে রায়টির দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর।

স্বপ্ন মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান, যা কারও দ্বারা দখল বা কেড়ে নেওয়া যায় না। একজন বাবা-মা সারাজীবন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সন্তানের ভবিষ্যৎকে ঘিরে যে স্বপ্ন বুনে যান, তা কেবল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ নয়; বরং তা একটি গভীর মানবিক প্রতিশ্রুতি, ভালোবাসা ও আশার প্রতিফলন।

কিন্তু আজ আমরা এমন এক সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে শিশুদের–বিশেষ করে কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। তাদের মৌলিক অধিকার, নিরাপদ শৈশব ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা আজ গভীর প্রশ্নের সম্মুখীন।

রামিসার মতো একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর সংঘটিত নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিক কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটকে উন্মোচিত করেছে। এই নির্মম ঘটনা জাতির বিবেককে যেমন গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সহিংসতা ও অবক্ষয়ের নগ্ন চিত্রও স্পষ্ট করেছে।

যে মা-বাবা তাদের সন্তানের স্বপ্ন, আশা ও ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে জীবনের প্রতিটি ত্যাগ স্বীকার করেন, তাদের জন্য সন্তানের নিথর ও ক্ষতবিক্ষত দেহের সামনে দাঁড়ানো অকল্পনীয়, ভাষাহীন ও চিরস্থায়ী বেদনার অভিজ্ঞতা। এই বেদনা কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমগ্র মানবিক সমাজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

এই নির্মম ঘটনার জন্য প্রকৃত দায় কার–পরিবার, সমাজ, নাকি রাষ্ট্র? নাকি আমাদের সম্মিলিত উদাসীনতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং কার্যকর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতাই এই ট্র্যাজেডির মূল কারণ?

আজ প্রশ্ন আরও গভীরভাবে উঠে আসে–শিশুদের সার্বিক সুরক্ষার চূড়ান্ত দায়িত্ব কার ওপর বর্তায়? এবং কেন বারবার এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে?

বছরের পর বছর কত আর মা-বাবাকে সন্তানের শোকে আজীবন মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাতে হবে? রামিসার মতো অসংখ্য শিশু ও পরিবার আজ একই অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে বসবাস করছে, এটাই আমাদের সমকালীন সামাজিক বাস্তবতার নির্মম চিত্র।

এখন সময় এসেছে ন্যায়বিচারের এমন একটি দৃষ্টান্তমূলক ও কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার, যেখানে অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হবে দ্রুত, নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য; যাতে আর কোনো মা-বাবাকে সন্তানের নির্মম মৃত্যু স্মরণ করে আজীবন মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে না হয়।

বাংলাদেশের আইনি প্রেক্ষাপটে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ মোকাবিলার জন্য সুস্পষ্ট আইনগত কাঠামো বিদ্যমান। দণ্ডবিধি-১৮৬০ (Penal Code, 1860)-এর অধীনে হত্যা (ধারা ৩০২) এবং ধর্ষণ-সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধগুলোর জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (Women and Children Repression Prevention Act, 2000) শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা এবং যৌন সহিংসতার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন করেছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত। এ ছাড়া শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে শিশু আইন-২০১৩ (Children Act, 2013) রাষ্ট্রকে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে, যা সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে জীবন, মর্যাদা ও সমতার অধিকারকে সুরক্ষা দেয়। তবুও বাস্তবতা হলো, আইনগত কাঠামো থাকা সত্ত্বেও এর কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া এবং প্রতিরোধমূলক সামাজিক ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী না হলে এ ধরনের নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দ্রুত নিরপেক্ষ ও সময়বদ্ধ বিচার নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে। শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে সমন্বিতভাবে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও নজরদারি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

আইন ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে রামিসার ওপর সংঘটিত ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড এমন এক অপরাধ, যা সমাজের সামষ্টিক বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট Bachan Singh v. State of Punjab (1980) এবং পরবর্তীতে Machhi Singh v. State of Punjab (1983) মামলায় ‘Rarest of the Rare Cases’ নীতি প্রবর্তন করে ঘোষণা করেন যে, যখন কোনো অপরাধের নৃশংসতা, ভুক্তভোগীর অসহায়ত্ব, অপরাধের সামাজিক অভিঘাত এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত এতটাই গভীর হয় যে, সাধারণ শাস্তি ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য পূরণে অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে, তখন সর্বোচ্চ শাস্তি বিবেচিত হতে পারে। আদালত আরও উল্লেখ করেন যে, এমন অপরাধ সমাজের ‘collective conscience’ বা সামষ্টিক বিবেককে স্তম্ভিত করে দেয়। রামিসার মতো একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর সংঘটিত এই পাশবিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড সেই নীতির আলোকে বিচারযোগ্য একটি ঘটনা হিসেবে জনমনে প্রতীয়মান হয়েছে, যেখানে ন্যায়বিচার কেবল একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং সমগ্র সমাজের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য।

গত ৩১ মে ঢাকার মিরপুর-১১-এর একটি অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের অর্ধগলিত মরদেহ। তার পাশেই ছিল সন্তানদের পাসপোর্ট সাইজের ছবি, সার্টিফিকেটের ফ্রেম–এক যুগ্ম সচিব, এক বুয়েট শিক্ষক, এক কানাডাপ্রবাসী ছেলে আর এক স্কুলশিক্ষিকা কন্যার মা। কিন্তু মা মারা গেছেন কবে? কেউ জানেন না। গন্ধ ছড়ালে প্রতিবেশীরা ফোন দেয় ৯৯৯-এ। এ ঘটনা কোনো ইংরেজি থ্রিলারের দৃশ্য নয়। এ আমাদের সমাজের সাদা-কালো সিসিটিভির ফুটেজ–যেখানে বড় পদ, বিদেশি ডিগ্রি, চমকানো সিভির নিচে পুঁতে রাখা আছে এক প্রবীণের নিঃশব্দ যন্ত্রণা, অবহেলা আর অপেক্ষার অবসান।

বাংলাদেশে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩’ আছে। আইনটি স্পষ্ট বলেছে: সন্তানকে মায়ের ভরণপোষণ দিতেই হবে–খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান, এমনকি ‘সঙ্গ’ দেওয়াও আইনি দায়িত্ব। পিতা-মাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো যাবে না। অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা ৩ মাসের কারাদণ্ড। এসব বিধান দেখে মনে হয়, নূরজাহান বেগমের সন্তানদের জেলে যাওয়া উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো–কে যাবে আদালতে? আইনে বলা আছে, শুধু ভুক্তভোগী বাবা বা মা নিজেই অভিযোগ করতে পারবেন। যে মা মারা গেছেন, তিনি তো আর মামলা করবেন না। অথচ বেঁচে থাকতেও তিনি কি পারতেন? নিজের সন্তান–যুগ্ম সচিব আর বুয়েট শিক্ষক, যাদের মুখে সমাজের ‘আইন’ ও ‘নীতি’ উচ্চারিত হয়, তাদের বিরুদ্ধে থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া, কোন বৃদ্ধ বাবা-মা সেটা পারেন?

এটাই এই আইনের মারাত্মক দুর্বলতা। বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের অবহেলা একটি ‘নীরব অপরাধ’–কারণ ভুক্তভোগী নিজে প্রায়শই শারীরিক, মানসিক বা আর্থিকভাবে অসহায়; আর সামাজিক লজ্জায় চুপ করে থাকেন। নূরজাহান বেগমের মরদেহ পরীক্ষা করলে আইনের চেয়ে বেশি ধরা পড়ে আমাদের মূল্যবোধের পচন। যে দেশের সংবিধান বলে জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা, সেই দেশের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অধিকার কেবল কাগজে বন্দি হবে না–এ দাবি এখন সময়ের।

লেখক: ডিন, স্কুল অব ল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় 
[email protected]

ট্রাম্পের চুক্তি যে কারণে নস্যাৎ করতে চান নেতানিয়াহু

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম
ট্রাম্পের চুক্তি যে কারণে নস্যাৎ করতে চান নেতানিয়াহু
সামি আল-আরিয়ান

ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আরববিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো অর্থপূর্ণ পথ নেই। তবে নেতানিয়াহু তার মূল বিশ্বাসের পরিপন্থি কোনো চুক্তি মুখ বুজে মেনে নেবেন, এমনটা ভাবা হবে সবার জন্য বিপজ্জনক বিভ্রম। তবে এর চেয়েও গভীরতর বিভ্রম হলো, পাশবিক শক্তি দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন এর রাজনৈতিক, নৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে।...


ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন না। তার পুরো রাজনৈতিক ক্যারিয়ারজুড়ে ইসরায়েলি আধিপত্য বজায় রাখা এবং নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধের কৌশলকেই তিনি পছন্দ করেন বেশি।

বর্তমানে তার প্রধান অগ্রাধিকার হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে প্রায় চূড়ান্ত হওয়া সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত রাখা। এ সংকটের কূটনৈতিক বিজয় ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিলে তিনি তা নস্যাৎ করার জন্য রাজনৈতিক, সামরিক, কূটনৈতিক, গণমাধ্যম এবং লবিংয়ের মতো হাতিয়ার ব্যবহার করবেন।

তথাকথিত ‘চূড়ান্ত বিজয়’ নিয়ে তিনি অনমনীয় এবং আপস করতে নারাজ। তার কাছে কোনো সমঝোতাই গ্রহণযোগ্য নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না গাজায় হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ, লেবাননে হিজবুল্লাহকে খতম এবং স্বয়ং ইরানকে নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করা হচ্ছে।

গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন এবং ইরানজুড়ে চলা যুদ্ধগুলো কখনোই বিচ্ছিন্ন কোনো সংঘাত ছিল না। এসব যুদ্ধ ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠা এবং এ অঞ্চলে ইসরায়েলি হেজিমনি বা আঞ্চলিক আধিপত্য সুসংহত করার আগ্রাসনের অংশ হয়ে ওঠে। নেতানিয়াহু ভালো করেই জানেন, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সত্ত্বেও তার এই লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। তিনি নিশ্চিত হয়েছেন, পর্যাপ্ত শক্তি প্রয়োগ না করার কারণে তার লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়াতে প্ররোচিত করার পর, নেতানিয়াহু এখনো আত্মবিশ্বাসী তিনি আবারও সেই একই চাল চালতে পারবেন। তবে এবার তার লক্ষ্য সীমিত হামলা নয়, বরং চূড়ান্ত ও সর্বাত্মক যুদ্ধ, যা এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যকে স্থায়ীভাবে বদলে দেবে।

নেতানিয়াহু অবশ্য যা-ই মনে করেন না কেন, ট্রাম্পকে আরও জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি হয়তো বিশ্বাস করেন, ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণভাবে, মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশ এখন প্রকাশ্যেই এসব যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার পক্ষে জনসমর্থন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ট্রাম্পবিরোধী মনোভাব ট্রাম্পের নিজের জোটের মধ্যেই ফাটল ধরাচ্ছে। তার সমর্থকরা নেতানিয়াহুর এজেন্ডা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও সৈন্যদের রক্ত দেওয়ার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

আমেরিকানরা এখন আরও বেশি করে জানতে চাচ্ছেন কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি আঞ্চলিক যুদ্ধের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক বোঝা বইতে হবে। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এ প্রশ্নগুলো আরও জোরালো হচ্ছে। জ্বালানি বাজার এখনো নাজুক এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বাড়ছে, যা মার্কিন ভোক্তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিয়েছে এবং হোয়াইট হাউসের জন্য অর্থনৈতিক পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠছে।

ট্রাম্প জানেন, অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে কোনো বৈদেশিক অভিযান চালানো সম্ভব নয়। আর যেহেতু মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে তাই যেকোনো ভুলের মাশুল তাৎক্ষণিকভাবে দিতে হবে। তিনি যদি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারান, তাহলে তাকে ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসনের মুখে পড়তে হতে পারে।

আন্তর্জাতিক চাপ ট্রাম্পের ওপর আরও তীব্রভাবে চেপে বসেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৌশলগত পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। এ সংকট যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। ৩৯ দিনব্যাপী চলা যুদ্ধে ইরান এবং তাদের মিত্রদের হামলায় আটটি দেশজুড়ে থাকা অন্তত ১৬টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার কয়েকটি প্রায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

স্যাটেলাইট ইমেজের ওপর ভিত্তি করে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানি হামলায় ওই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর অন্তত ২২৮টি স্থাপনা ও সরঞ্জাম ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হ্যাঙ্গার, জ্বালানি ডিপো, যুদ্ধবিমান, রাডার নেটওয়ার্ক, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এ যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের পুরো কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত মারাত্মকভাবে ফুরিয়ে এসেছে।

পেন্টাগন সতর্ক করেছে, ক্ষেপণাস্ত্রের এ মজুত আগামী দশকের আগে পূরণ করা সম্ভব হবে না। রাশিয়ার এবং চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের পরিকল্পনা করতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক দুর্বলতা। ট্রাম্পের যুদ্ধ করার উদ্দেশ্য ছিল নিজের আধিপত্য জাহির করা, কিন্তু এখন তা উল্টো আমেরিকার শিল্প ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে।

ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব সর্বোচ্চ লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিল। সেটা হলো ইরানকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা, তার পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করা, প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ইরানি রাষ্ট্রের উৎখাত বা একে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলা। কিন্তু এর একটি লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। ইরান আত্মসমর্পণ করেনি, তার সরকার ভেঙে পড়েনি এবং তীব্র চাপের মধ্যেও আঞ্চলিক জোটগুলোকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। ইরান এবং তার মিত্ররা আঘাত সয়েছে, কিন্তু পরাজিত হয়নি।

ইরান যুদ্ধক্ষেত্রকে প্রসারিত করেছে, বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহকে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সহজ বিজয় থেকে বঞ্চিত করেছে। আত্মসমর্পণের বিকল্প হিসেবে তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার পথ বেছে নেয়, যা পুরো পরিস্থিতিকে ঘুরিয়ে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিকে পরাস্ত করার ক্ষমতা ইরানের ছিল না। কিন্তু পাল্টা আক্রমণ করে তারা আত্মরক্ষা করতে পেরেছে। ইরানের জন্য পরাজয় এড়ানো, নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং শত্রুকে তার রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে বঞ্চিত করাই যথেষ্ট ছিল। একটি রাষ্ট্র যখন প্রবল পরাক্রমশালী শক্তির মুখোমুখি হয়, তখন নিজের অস্তিত্ব ও কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে পারাটাই এক ধরনের বিজয়। ইরান সেটা পেরেছে।

নেতানিয়াহু তার সম্প্রসারণবাদী প্রকল্পের হুমকিটা এখন বুঝতে পারছেন। কিন্তু যুদ্ধবিরতি ইসরায়েল কখনই মেনে নিতে পারবে না। কেননা তাহলে যুদ্ধটি ইসরায়েলের বিজয়ের মধ্যদিয়ে শেষ হবে না, শেষ হবে ইরানের টিকে থাকার মধ্যদিয়ে।

বর্তমান আলোচনা, যা জানা গেছে যে পাকিস্তান মধ্যস্থতা করছে এবং বেশ কয়েকটি আরব ও ইসলামিক রাষ্ট্র এতে সমর্থন দিচ্ছে। চুক্তির প্রায়-চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে অন্তত ৬০ দিনের জন্য লেবাননসহ বহুমাত্রিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি খাতের অস্থিরতা এবং উত্তর আমেরিকায় আসন্ন বিশ্বকাপের মতো বড় ইভেন্টগুলোকে বিঘ্নিত করতে পারে এমন একটি বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কা থেকে ওয়াশিংটনের এখন শান্ত পরিস্থিতি প্রয়োজন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই পিছুটান কোনো বিজয়ের ফসল নয়, বরং পরিস্থিতি তাকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করছে।

যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি, অন্তর্বর্তী সময়ে এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্যে একগুচ্ছ পদক্ষেপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালির মধ্যদিয়ে নৌচলাচল নিরাপদ করা, ইরানের শিপিংয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, ইরানের অবরুদ্ধ করে রাখা সম্পদের আংশিক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া এবং সম্পর্ক আরও স্বাভাবিক করার বিষয়ে আলোচনা শুরু করা।

এ রূপরেখা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বেশ কয়েকটি দাবি মেনে নেবে। কিন্তু নেতানিয়াহুর কাছে এটা একেবারেই অসহ্য লাগছে। কারণ, এরকম চুক্তি হলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে স্বস্তিতে থাকবে। তার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে না। আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গেও ইরানের সম্পর্ক অটুট থাকবে। এতে তেহরান ভবিষ্যতে আরও বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যাবে। ট্রাম্পের ওপর নেতানিয়াহুর তীব্র চাপ দেওয়ার কারণ এটাই। দুজনের মধ্যে যে কথা চালাচালি হচ্ছে তা এ কারণেই উত্তপ্ত ও অস্বাভাবিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হচ্ছে। নেতানিয়াহু কূটনৈতিক সমঝোতার বিরোধিতা করছেন এবং গাজা ও লেবাননজুড়ে নতুন করে হামলা বাড়ানোর জন্য ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন।

নেতানিয়াহুর সামনে এখন সীমিত ও বিপজ্জনক কিছু পথ খোলা আছে। তিনি যদি কূটনৈতিক সমঝোতাকে সরাসরি আটকে দিতে না পারেন তাহলে এ চুক্তি যাতে বাস্তবায়িত না হয় সেজন্য নাশকতা করার চেষ্টা করবেন। এ জন্য তিনি লেবাননে হামলা চালিয়ে যাওয়া এবং ফিলিস্তিনে আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারেন। নেতানিয়াহু হয়তো হিসাব কষছেন, গাজায় নতুন করে গণহত্যা, অবরোধ জোরদার করা বা অধিকৃত পশ্চিম তীরের পবিত্র স্থানগুলোতে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালালে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যেতে পারে। এরকম পরিস্থিতেতে ট্রাম্প তখন ইসরায়েলের দাবির পক্ষে দাঁড়াতে বাধ্য হবেন।

আসলে ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আরববিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো অর্থপূর্ণ পথ নেই। তবে নেতানিয়াহু তার মূল বিশ্বাসের পরিপন্থি কোনো চুক্তি মুখ বুজে মেনে নেবেন, এমনটা ভাবা হবে সবার জন্য বিপজ্জনক বিভ্রম। তবে এর চেয়েও গভীরতর বিভ্রম হলো, পাশবিক শক্তি দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন এর রাজনৈতিক, নৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে। আদর্শিক অন্ধত্ব এবং কৌশলগত ব্যর্থতার মাঝে আটকা পড়ে নেতানিয়াহু হয়তো শেষ পর্যন্ত মারাত্মক জুয়া খেলতে পারেন এবং পুরো ব্যবস্থাটি তার সঙ্গে ভেঙে পড়ার আগ পর্যন্ত যুদ্ধকে আরও ছড়িয়ে দিতে পারেন। এরকম শঙ্কা একেবারেই অমূলক নয়। (সংক্ষেপিত)

লেখক: ইস্তাম্বুল জাইম ইউনিভার্সিটির ‘সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’-এর পরিচালক। মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান

রামিসার মৃত্যু, অপরাধীর শাস্তি এবং সমাজের দায়

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
রামিসার মৃত্যু, অপরাধীর শাস্তি এবং সমাজের দায়
রাজেকুজ্জামান রতন

একটা দেশ তার ভবিষ্যৎ তৈরি করে শিশুদের মাধ্যমে। শিশুদের চোখে স্বপ্ন তৈরি করা সমাজের কাজ, কিন্তু আমাদের শিশুরা পথ চলছে, বড় হচ্ছে দুঃস্বপ্ন আর আতঙ্ক নিয়ে। রামিসার খোলা চোখ যেন তাকিয়ে আছে আর প্রশ্ন করছে, আমাদের জন্য কেমন বাংলাদেশ তৈরি করছ তোমরা?...

রামিসার নৃশংস হত্যার খবরে শিউরে উঠেছিলেন দেশের মানুষ। একটা শিশুর গলা কেটে বালতিতে রেখেছে খুনি। যখন দরজায় ধাক্কা দিয়ে মা ডাকছেন, তখন ঘরের ভেতর তার সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করা হচ্ছে। নৃশংসতা বোঝানোর জন্য এটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু না, আরও ভয়ংকর বর্বরতার চিত্র দেখেছেন মানুষ। শিশুর শরীর ক্ষত-বিক্ষত, এতটুকু শরীরে নির্মম আঘাতের চিহ্ন, আর তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। কোনো মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ এই ঘটনার বিবরণ পড়ে সুস্থ থাকতে পারেন? তার সন্তান, তার স্বজন অথবা চারপাশের উচ্ছল শিশুদের মুখের দিকে তাকালে বুকের ভেতর কি হাহাকার তৈরি হবে না? এ কোন সমাজে বাস করছি আমরা? এই ঘটনায় কেঁপে উঠেছিল সারা দেশ, বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন এক মাসের মধ্যেই এই নৃশংসতার বিচার হবে।

৭ জুন বেলা ১১টায় রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা ও স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন আদালত। হত্যাকাণ্ড সংঘটনের ১৯ দিন এবং মামলা দায়েরের ১৮ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন, অধিকাংশ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও আসামিদের সাফাই সাক্ষ্যসহ যাবতীয় বিচারিক কার্যক্রম শেষে মামলাটির রায় ঘোষণা দেশের বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একটা মাইলফলক। মানুষ বলতে পারবেন অন্তত একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হলো।

রামিসা আমাদের সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই আমাদের সমাজ, যেখানে শিশুরা সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন। আয়না কখনো মিথ্যা দেখায় না। প্রতিবিম্ব দেখানোর জন্য শুধু উল্টো হয়ে আসে ছবিটা। মানুষের মাথা তাকে আবার সোজা করে দেখে। মুখের ময়লা দূর না করে শুধু আয়না মুছলে চেহারা পরিষ্কার দেখা যাবে না।

কারণ এসব নতুন ঘটনা নয়। রামিসার আগে যেমন পরেও তেমনি ধর্ষণ, হত্যা চলছেই। কিছু ঘটনায় মানুষ উত্তাল হয়ে ওঠেন আর বাকিগুলো কী হয়? শত শত ঘটনা পত্রিকার পাতায় ঠাঁই পায়, আড়ালে থেকে যায় যে কত তার সংখ্যা অনুমান করা ছাড়া উপায় নেই। যেমন ২০২৪ সালের মার্চে মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণের ঘটনায় পুরো দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল। তখনো মানুষের বিক্ষোভের কারণে দ্রুত বিচার সম্পন্ন হয়েছিল। শিশু আছিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। এর চার দিন পর ডেথ রেফারেন্সের নথি হাইকোর্টে পৌঁছায়। রায় ঘোষণা এবং ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানোর এক বছর পূর্ণ হলেও পরবর্তী অগ্রগতি কতটুকু, তা আজ অজানা। অথচ ছুটির দিন বাদে টানা শুনানি করে মাত্র ১৪ কার্যদিবসে আলোচিত এই মামলার বিচারকাজ শেষ হয়েছিল। শুধু আছিয়া হত্যাকাণ্ডই নয়, এমন বহু বেদনাকাতর সংবেদনশীল মামলার কাগজ আদালতে ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে। ধর্ষণের দায় স্বীকার করার পরও বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে, নিষ্পত্তি হয় না। আবার রায় হলেও তা কার্যকর হয় না, উল্টো অনেক আসামি জামিনে বের হয়ে আসে। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পরও শাস্তি না হওয়ার আক্ষেপ বুকে নিয়েই বেঁচে থাকতে হয় নির্যাতিত পরিবারগুলোকে। কেউ যখন দেখেন তার প্রিয় সন্তানের খুনি তার চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন কি ধিক্কার তৈরি হয় না সমাজ ও বিচারের প্রতি?

আছিয়ার বেদনা না ভুলতেই রাজধানীতে নির্মমতার শিকার হলো দ্বিতীয় শ্রেণি পড়ুয়া সাত বছরের শিশু রামিসা। নারী ও শিশুর জীবন, নিরাপত্তা তাহলে কোথায়? আমাদের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা যেন অপরাধীদের কাছে একধরনের প্রশ্রয়ের বার্তা দেয়। নির্যাতিতার দোষ খুঁজে বের করা, পোশাকের দোহাই দেওয়া, সাজগোজ করাকে অজুহাত করা এবং শয়তান ভর করার মতো আত্মপক্ষ সমর্থন করার নানা দৃষ্টান্ত দেখা হয়েছে ইতোমধ্যে। কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো শাস্তি না থাকায় নারীর প্রতি সহিংসতা বা ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে।

সব খবর পত্রিকায় আসে না, পরিসংখ্যান সব বলে না; কিন্তু যা বলে তা কি আতঙ্কিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়? বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন গত ২ মে প্রকাশ করা হয়। সেই প্রতিবেদনের তথ্য অত্যন্ত ভয়াবহ: দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পেয়ে যাচ্ছে আসামিরা। আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে সময় লাগছে ৩ বছর ৭ মাস। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে। প্রতিবার শুনানিতে স্বজনরা অপমানিত হন, বেদনায় ভারাক্রান্ত হন আর বাড়তে থাকে ক্ষোভ কিংবা অসহায়ত্ব।

এই এক পরিসংখ্যানেই যথেষ্ট আমাদের বিচারব্যবস্থার গতি এবং চিত্র বুঝতে পারার জন্য। কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটার পর মামলা হওয়া, আসামি ধরা পড়া এবং সাজা হওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে কোনো কোনো মামলায় ১০ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। অনেক সময় রায় হওয়ার আগেই মামলার বাদী মারা যান। শুধু তা-ই নয়, আসামি জামিনে বের হয়ে এসে বাদীকে জীবননাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনাও অহরহ ঘটে। এ ছাড়া এটা কে না জানে যে, থানায় মামলা করতে গেলে প্রশাসন, প্রভাব এবং পয়সার কী গুরুত্ব। কিছু আপাত নিরীহ পরামর্শ দেওয়া হয়, যেমন মামলা করে কী লাভ? কোনো ফল পাবে না, শুধু টাকা খরচ। বিপদ বাড়বে ইত্যাদি। আবার গ্রাম্য মাতব্বর বা প্রভাবশালী মহল সালিশ-বৈঠকের মাধ্যমে লোক দেখানো শাস্তি, জরিমানা করে মীমাংসা করা আর বাদীকে নানা রকম ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার নজিরও কম নয়।

কয়েকটা ঘটনা মনে করা যেতে পারে। ২০১৭ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে জাকিয়া সুলতানা রুপাকে গণধর্ষণ ও হত্যায় ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। ওই মামলার বিচার থেকে রায় পর্যন্ত ছয় মাসও লাগেনি। রায়ে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। কিন্তু উচ্চ আদালতে দীর্ঘ শুনানি শেষে তিন আসামিকেই সাজা কমিয়ে সাত বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

গত ১ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে গহিন জঙ্গলে উদ্ধার হওয়া সাত বছরের শিশু জান্নাতুল নাইমা ইরার রক্তাক্ত ছবিটি ভোলার নয়। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বাবু শেখ নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা শেষে গলা কেটে জঙ্গলে রেখে যাওয়া হয় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে। কিন্তু তিন মাস পার হলেও ওই ঘটনায় এখনো অভিযোগপত্রই দিতে পারেনি পুলিশ।

কুমিল্লার তরুণী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়নি দীর্ঘ ১০ বছরেও। ওই ঘটনাও সারা দেশে আলোড়ন তৈরি করেছিল। ফেনীতে ২০১৯ সালে আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায়ে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। সাত বছর পরও ওই মামলা হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় আটকে আছে। ফলে কমছে না হত্যা ও ধর্ষণ। মে মাসে দেশে অন্তত ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ৬৬টি গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন। এ ছাড়া গত মাসে ৮৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ১১ হাজার ৯৩৪টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা করা হয়েছে ৬ হাজার ১৩৫টি। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬ হাজার ৩১ জন শিশু, যার মধ্যে ৫ হাজার ৬৩১ জন মেয়ে এবং ৪০০ জন ছেলে শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ৩১০ জন শিশুকে। ভাবা যায়! কতটা নিরাপত্তাহীন আমাদের শিশুরা।

একটা দেশ তার ভবিষ্যৎ তৈরি করে শিশুদের মাধ্যমে। শিশুদের চোখে স্বপ্ন তৈরি করা সমাজের কাজ, কিন্তু আমাদের শিশুরা পথ চলছে, বড় হচ্ছে দুঃস্বপ্ন আর আতঙ্ক নিয়ে। রামিসার খোলা চোখ যেন তাকিয়ে আছে আর প্রশ্ন করছে, আমাদের জন্য কেমন বাংলাদেশ তৈরি করছ তোমরা? অপরাধীর শাস্তির পাশাপাশি শিশুদের স্বস্তির সমাজ কি তৈরি হবে না? 

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]

জাতিসংঘ: উন্নয়ন অংশীদার নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম
জাতিসংঘ: উন্নয়ন অংশীদার নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ
ড. খলিলুর রহমান

বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের অংশীদারির ইতিহাস পাঁচ দশকেরও বেশি পুরোনো। বাংলাদেশের জনগণ জাতিসংঘের কাছে কোনো নির্দিষ্ট সরকার, রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শিক গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন প্রত্যাশা করে না। বরং তারা আশা করে, সংস্থাটি ভার সর্বজনীন নীতিমালা সমুন্নত রেখে সমগ্র জাতির স্বার্থে কাজ করবে।...

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং আবারও একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে–একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বৈধ আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা এবং হস্তক্ষেপের সীমারেখা কোথায় টানা উচিত? এ বিতর্ক শুধু বাংলাদেশের নয়। উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু দেশে বিভিন্ন সময়ে সরকার, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে তাদের নির্ধারিত ম্যান্ডেট অতিক্রম করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সুশাসন বা রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির নামে পরিচালিত কিছু কার্যক্রমকে সমালোচকরা এমন ক্ষেত্র হিসেবে দেখেছেন, যা মূলত জাতীয় সরকার ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একান্ত এখতিয়ারভুক্ত।

বর্তমান বিতর্ককে বুঝতে হলে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সম্পর্কের বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশ জাতিসংঘ ব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও ফলপ্রসূ অংশীদারি বজায় রাখছে। রাজনৈতিক মতাদর্শনির্বিশেষে বিভিন্ন সরকার জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, দারিদ্র্যবিমোচন, দুর্যোগব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন, মানবিক সহায়তা এবং সামাজিক উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করেছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ, আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংক এবং বহু আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি জাতিসংঘের প্রায় সব প্রধান সংস্থারই বাংলাদেশে কার্যক্রম চলমান।

বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় এসব প্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য। শিশুমৃত্যু হ্রাস, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, দুর্যোগ প্রস্তুতি উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন কিংবা মানবিকসংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অবদানকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ফলে এ সম্পর্ক পারস্পরিকভাবে লাভজনক এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ঐতিহ্যগতভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা মূলত কারিগরি সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা এবং উন্নয়ন সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

যদিও এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল সর্বজনীন মূল্যবোধের প্রসার, তবুও এগুলো বিতর্কেরও জন্ম দেয়। বাংলাদেশসহ অনেক দেশে পর্যবেক্ষকদের একাংশ প্রশ্ন তুলতে শুরু করে যে, জাতিসংঘের কিছু সংস্থা কি কারিগরি বা মানবিক বিষয়ের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিষয়ে ক্রমবর্ধমানভাবে জড়িয়ে পড়ছে?

বাংলাদেশে জাতিসংঘের কথিত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ দেখা যায় ২০০৭ সালের ১/১১-পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সংকটের সময়। সে সময় বিভিন্ন মহলে এ ধরনের খবর প্রচারিত হয় যে, রাজনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব প্রতিবেদনের সত্যতা যাই হোক না কেন, জনমনে একটি ধারণা তৈরি হয় যে, বহিরাগত শক্তিগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।

পরবর্তী বছরগুলোতে এ ধারণা বিভিন্ন মাত্রায় অব্যাহত থেকেছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বাড়তি নজরদারির বিষয় হয়ে ওঠে। একই সময়ে ২০১৭ সালে মায়ানমার থেকে ১০ লক্ষাধিক জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার আগমন দেশে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উপস্থিতি ও কার্যক্রম বহু গুণে বৃদ্ধি করে।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর এসব উদ্বেগ আরও তীব্র হয়। সংস্কার, শাসনব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনায় কিছু জাতিসংঘ কর্মকর্তার দৃশ্যমান সক্রিয়তা সমালোচকদের এ যুক্তিকে শক্তিশালী করে যে, কারিগরি সহায়তা ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মধ্যকার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের মন্তব্যের পরও প্রশ্ন দেখা দেয়। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, বিক্ষোভ ও সহিংসতা মোকাবিলা নিয়ে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে বার্তা পৌঁছানো হয়েছিল। যদিও বাংলাদেশের সামরিক কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে স্পষ্টভাবে জানায় যে, এ ধরনের কোনো যোগাযোগ তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেনি, তবুও ঘটনাটি চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনটি সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সম্পর্ক সবচেয়ে আলোচিত আন্তর্জাতিক দলিলগুলোর একটি। সমর্থকদের মতে, এটি জবাবদিহি ও মানবাধিকার সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান। অন্যদিকে সমালোচকদের অভিযোগ, প্রতিবেদনটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানকে প্রতিফলিত করেছে এবং এটি অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় প্রস্তুত করা হয়েছে।

বিতর্ক শুধু প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সমালোচকদের মতে, ঢাকায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং সংসদীয় পর্যালোচনা, অনুমোদন ও অনুসমর্থন এবং কোনো সংরক্ষণ (রিজার্ভেশন) ছাড়াই বাংলাদেশের জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যোগদান এই দুটি পদক্ষেপ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা উভয় উদ্যোগের প্রক্রিয়া নিয়েই আপত্তি বা সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু প্রভাবশালী উপদেষ্টার ভূমিকা–বিশেষ করে আইন উপদেষ্টা, তিনজন নারী উপদেষ্টা এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন উপদেষ্টা যিনি আগে মানবাধিকার বিষয়ক একটি এনজিওর কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সমালোচকদের মতে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও শাসনবাবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের মতে, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের উচিত জাতীয় স্বার্থের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এসব অঙ্গীকার ও সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা।

জাতিসংঘের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ের কথিত নির্বাচনি বা বাছাইকৃত সক্রিয়তা। সমালোচকদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার বিষয়ে জাতিসংঘ অভান্ত সক্রিয় থাকলে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর উত্থাপিত অভিযোগগুলো সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে অনেক কম সরব ছিল। তাদের মতে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরবর্তী ঘটনাবলির বিষয়ে জাতিসংঘের সক্রিয়তার পরিবর্তে এর কার্যক্রমের গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে গেছে মূলত ভলকার তুর্কের প্রতিবেদন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর আমি ব্যক্তিগতভাবে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী এবং ইউএন উইমেনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। উদ্দেশ্য ছিল ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষায় জাতিসংঘ কীভাবে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করা। ইউএন উইমেনের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও তৎকালীন আবাসিক সমন্বয়কারীর প্রতিক্রিয়া আমাকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। তার অগ্রাধিকার যেন নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা মোকাবিলার পরিবর্তে আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন কনসেনসাস কমিশনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ওপর বেশি কেন্দ্রীভূত ছিল।

রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে তৎকালীন আবাসিক সমন্বয়কারীর কিছু প্রকাশ্য মন্তবা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অন্তর্ভুক্তিমূলকতা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) এবং জাতিসংঘের সামগ্রিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। ফলে এমন কোনো বক্তব্য, যা প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অংশগ্রহণের গুরুত্বকে খাটো করে দেখায়, তা জাতিসংঘের নিজস্ব নীতির সঙ্গেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হতে পারে। অনেকেই তার বক্তব্যকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে ইউনূস প্রশাসনের অবস্থানের প্রতি সমর্থন হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন।

রাজনীতির বাইরেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কিছু পদক্ষেপ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি অংশ ঢাকাকে ‘নন-ফ্যামিলি ডিউটি স্টেশন’ হিসেবে চিহ্নিত করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।

একইভাবে ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তর নিয়েও মতপার্থক্য দেখা দেয়। কিছু জাতিসংঘ সংস্থা শুরুতে এ উদ্যোগের বিরোধিতা করে এবং কক্সবাজার ও টেকনাফে বিদ্যমান শিবির সম্প্রসারণের পক্ষে মত দেয়। সমালোচকদের মতে, পরিবেশগত অবক্ষয়, বন উজাড় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপের বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নেও হতাশা রয়েছে। অনেক বাংলাদেশির বিশ্বাস, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ ব্যবস্থার কিছু অংশ, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মায়ানমারের ওপর পর্যাপ্ত চাপ প্রয়োগ করতে পারেনি। একই সঙ্গে জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতা নির্ভর করে তার নিরপেক্ষতা ও জনআস্থা বজায় রাখার সক্ষমতার ওপর। বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের অংশীদারির ইতিহাস পাঁচ দশকেরও বেশি পুরোনো। বাংলাদেশের জনগণ জাতিসংঘের কাছে কোনো নির্দিষ্ট সরকার, রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শিক গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন প্রত্যাশা করে না। বরং তারা আশা করে, সংস্থাটি ভার সর্বজনীন নীতিমালা সমুন্নত রেখে সমগ্র জাতির স্বার্থে কাজ করবে।

আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশে জাতিসংঘ যদি তার বিশ্বাসযোগ্যতা, কার্যকারিতা এবং জনআস্থা অটুট রাখতে চায়, তাহলে সম্পৃক্ততা ও নিরপেক্ষতার মধ্যকার এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা হবে তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ সরকারের সচিব এবং সাবেক সিনিয়র জনস্বাস্থ্য নীতি উপদেষ্টা ও জাতিসংঘের ESCAP-এ বিশ্ব স্থাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি

মেধার কঙ্কাল ও মায়াহীন সভ্যতা নূরজাহান ট্র্যাজেডির সমাজতাত্ত্বিক পাঠ

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
নূরজাহান ট্র্যাজেডির সমাজতাত্ত্বিক পাঠ
ড. দিপু সিদ্দিকী

সন্তানদের শুধু আমলা বা প্রকৌশলী বানানোর অন্ধ ইঁদুরদৌড় বন্ধ করে, সবার আগে তাদের ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার যৌথ প্রতিজ্ঞা আমাদের রাষ্ট্র, শিক্ষাব্যবস্থা ও পরিবারকে নিতেই হবে।...

মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা নূরজাহান বেগমের পচাগলা লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি স্রেফ কোনো প্রাত্যহিক ক্রাইম রিপোর্টের খতিয়ান নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং সর্বোপরি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক দেউলিয়াত্ব ও পচনের এক জীবন্ত ময়নাতদন্ত। ১ জুন রাতে ৯৯৯-এ আসা একটি ফোন কলের সূত্র ধরে পুলিশ যখন মিরপুর-৬ নম্বরের সি-ব্লকের সেই অন্ধকার কক্ষটিতে প্রবেশ করে, তখন সেখানে সভ্যতার এক বীভৎস কঙ্কাল পড়ে ছিল। দীর্ঘদিন অবহেলা, অনাহার আর চরম অমানবিক পরিবেশে পড়ে থাকার কারণে শরীরটিতে পচন ধরেছিল।

এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে নির্মম এবং কুৎসিত অধ্যায়টি উন্মোচিত হয় যখন মৃতার সন্তানদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় সামনে আসে। নূরজাহান বেগম কোনো গৃহহীন বা অনাথ বৃদ্ধা ছিলেন না। তিনি সেই ফ্ল্যাটটিতে নিজের মেয়ের সঙ্গেই থাকতেন, যিনি পেশায় একজন স্কুলশিক্ষিকা। তার অন্য সন্তানদের মধ্যে একজন সরকারের যুগ্ম সচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক এবং অপরজন কানাডাপ্রবাসী। সমাজের সর্বোচ্চ স্তরের সফল, প্রতিষ্ঠিত এবং উচ্চশিক্ষিত সন্তানদের জন্মদাত্রীর এই পরিণতি একবিংশ শতাব্দীর বাঙালি সমাজকে এক চরম আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

সামাজমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া ও দ্বিমুখী দ্বন্দ্ব
এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় তুলেছে। কিন্তু এই ভার্চুয়াল প্রতিক্রিয়ার গভীরতা কতটুকু? এটি কি সাময়িক হুজুগ, নাকি সমাজ পরিবর্তনের কোনো আন্তরিক তাগিদ–তা নিয়ে আজ নির্মোহ বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, নূরজাহানের এই চলে যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন পারিবারিক দুর্ঘটনা নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত সংকটের খণ্ডচিত্র মাত্র। যখন কোনো বাবা বা মা নিঃসঙ্গ অবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, তখন সমাজ খুব দ্রুত সন্তানদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। চারদিকে রব ওঠে–‘সন্তানরা অকৃতজ্ঞ এবং অমানুষ ছিল।’ কিন্তু আমরা কখনো নিজেকে প্রশ্ন করি না–যে সন্তানকে আজ অকৃতজ্ঞ বলছি, তাকে কৃতজ্ঞতা শেখানো হয়েছিল কবে? যে সন্তানকে আজ হৃদয়হীন বলছি, তার হৃদয়টা ভেঙেছিল কে?

একটা শিশু পৃথিবীতে আসে মায়া নিয়ে। তার পর ধীরে ধীরে আমরা তাকে বদলে দিতে শুরু করি। আমরা বলি–ওকে হারাতে হবে, ওর চেয়ে বেশি নম্বর পেতে হবে, ওর চেয়ে বড় হতে হবে। আমরা তার হাতে বই দিই, কিন্তু মানবতা দিই না। আমরা তাকে অঙ্ক শেখাই, কিন্তু সম্পর্কের হিসাবের বাইরে ভালোবাসতে শেখাই না। আমরা তাকে সফল হওয়ার শিক্ষা দিই, কিন্তু কারও চোখের জল মুছে দেওয়ার শিক্ষা দিই না। বছরের পর বছর আমরা তার ভেতরের কোমল মানুষটাকে হত্যা করি, তার পর একদিন আশা করি–সে আমাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসবে। এ যেন একটি গাছের শেকড়ে প্রতিদিন বিষ ঢেলে, শেষ বয়সে এসে মিষ্টি ফল খুঁজে বেড়ানোর মতো।

আধুনিক শিক্ষার ভ্রান্তি: মেশিন বনাম মানবিক সত্ত্বা
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জোয়ারে ভাসছে। ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং আর করপোরেট ম্যানেজমেন্টের মতো বিষয়ে জ্ঞানলাভের এক অন্ধ প্রতিযোগিতা চলছে আমাদের চারপাশে। নতুন প্রযুক্তি আসছে–এটি নিঃসন্দেহে সময়ের দাবি। কিন্তু এসব অগ্রগতির কেন্দ্রে যে উপাদানটি থাকার কথা ছিল, তা হলো ‘মানুষ’। মানুষের সেবায়, মানুষের আত্মিক কল্যাণে কীভাবে এ বিজ্ঞানকে কাজে লাগানো হবে, সেই পরিমিতিবোধ মানুষকে কে দেয়? এই চেতনা কোনো ল্যাবরেটরি বা কোডিং ক্লাসরুম থেকে আসে না; এটি আসে কলা (Arts), সাহিত্য, ইতিহাস এবং সামাজিক দর্শনবিষয়ক চর্চা থেকে।

দর্শনহীন বিজ্ঞান আর মূল্যবোধহীন উচ্চশিক্ষা মানুষকে মানুষ বানায় না, বরং তাকে পরিণত করে একেকটি দক্ষ, সংবেদনহীন, স্বার্থপর রোবটে। নূরজাহান বেগমের সন্তানরা বুয়েটে পড়াতে পারেন, সরকারের নীতিনির্ধারণ করতে পারেন, ক্লাসরুমে শিশুদের পাঠ দিতে পারেন–কিন্তু মায়ের জীর্ণ ঘরের খবর রাখার, অসুস্থ জন্মদাত্রীর পাশে দাঁড়ানোর ন্যূনতম মানবিক বোধটুকু তাদের ভেতর গড়ে ওঠেনি। কারণ, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তাদের ‘সফল’ হতে শিখিয়েছে, ‘মানুষ’ হতে শেখায়নি।

আত্মকেন্দ্রিক পরিবার ও করপোরেট দাঁড়িপাল্লা 
এ সংকটের শেকড় আরও গভীরে, আমাদের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরে। বর্তমান বিশ্বায়িত অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে ব্যক্তিস্বার্থ আর চরম ভোগবাদের ওপর। আমাদের সনাতন যৌথ পরিবারের সুরক্ষামূলক কাঠামো ভেঙে আমরা এখন ‘আমি, আমার সঙ্গী আর আমার চার দেয়াল’–এই আত্মকেন্দ্রিক অণু-পরিবার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় সম্পর্কগুলোও এখন লাভ-ক্ষতির করপোরেট দাঁড়িপাল্লায় পরিমাপ করা হয়।

ড. সুকোমল বড়ুয়ার দর্শন ও বাস্তবায়নের শূন্যতা
কারিগরি শিক্ষার এই নৈতিক মহামারি থেকে সমাজকে বাঁচাতে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডক্টর সুকোমল বড়ুয়া দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার আত্মিক রূপান্তরের কথা বলে আসছেন। তার মতে, কেবল বস্তুগত শিক্ষা মানুষকে অহংকারী ও বিচ্ছিন্ন করে তোলে। এর বিপরীতে তিনি আমাদের পাঠ্যক্রমে অহিংসা, পারস্পরিক মৈত্রী এবং অসাম্প্রদায়িক সামাজিক দর্শনের মেলবন্ধনের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি মূলত ‘মানবিক জ্ঞান ও বিজ্ঞানের একটি সমন্বিত শিক্ষা মডেল’ প্রস্তাব করেন। বিভিন্ন ফোরামে তার এই দূরদর্শী চিন্তাধারা প্রশংসিত হলেও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক মহল, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা কারিকুলাম বোর্ড তা বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই দর্শনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাধ্যতামূলক করা যায়নি বলেই আজ সমাজ এমন মানবিক শ্মশানে পরিণত হয়েছে, যেখানে কাগজের সার্টিফিকেটের আড়ালে তৈরি হচ্ছে ‘উচ্চশিক্ষিত অমানুষ’।

উত্তরণের পথ: আইন বনাম মনস্তাত্ত্বিক সংস্কার
এই সামাজিক মড়ক থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হলে আমাদের এখনই একটি সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ সংকটের সমাধান কেবল একতরফা আইনি প্রয়োগে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন দ্বিমুখী নীতি। বলা যেতে পারে-
আইনের কঠোর প্রয়োগ: বাংলাদেশে ২০১৩ সালের ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ রয়েছে। এটি একটি ভালো আইন হলেও সচেতনতার অভাব ও আইনি জটিলতার কারণে এর প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত। এ আইনের ধারাগুলো আরও কঠোর ও গতিশীল করা সময়ের দাবি। মা-বাবাকে অবহেলাকারী সন্তানদের চাকরি, পদোন্নতি বা রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধা বাতিলের মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান যুক্ত করতে হবে।

পারিবারিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের সংস্কার: আইন দিয়ে রাষ্ট্র কাউকে শারীরিকভাবে পাশে দাঁড় করাতে পারবে, কিন্তু মনের ভেতরের সহানুভূতি জোর করে তৈরি করতে পারবে না। সেটার জন্য প্রয়োজন পারিবারিক মনস্তত্ত্বের আমূল সংস্কার। প্রকৃতির সবচেয়ে কঠিন নিয়ম হলো–যা বপন করবে, একদিন তাই ফিরে আসবে। তাই সন্তানকে শেখান–একটা ক্ষুধার্ত প্রাণীকে খাবার দিতে, একটা কান্নারত মানুষকে সান্ত্বনা দিতে, একটা সম্পর্ককে আগলে রাখতে। কারণ জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে মানুষ বুঝতে পারে–এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় অভাব অর্থের নয়, সবচেয়ে বড় অভাব ভালোবাসার।

সবচেয়ে করুণ মৃত্যু সেটা নয়, যখন মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। সবচেয়ে করুণ মৃত্যু তখনই ঘটে, যখন জীবিত অবস্থাতেই একটি হৃদয়ের ভেতর থেকে মায়া, ভালোবাসা আর মানবিকতা মারা যায়। সন্তানদের শুধু আমলা বা প্রকৌশলী বানানোর অন্ধ ইঁদুরদৌড় বন্ধ করে, সবার আগে তাদের ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার যৌথ প্রতিজ্ঞা আমাদের রাষ্ট্র, শিক্ষাব্যবস্থা ও পরিবারকে নিতেই হবে। নয়তো আজ যে অবহেলা আর নির্মমতার শিকার এই মা হলেন, কাল সেই একই ভয়াবহ নিয়তি আমাদের প্রত্যেকের দরজায় এসে কড়া নাড়বে।

লেখক: প্রাবন্ধিক এবং কবি; ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা