ব্রিটেন, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের ১৫০টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে বর্তমান ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনের পক্ষে এ অভূতপূর্ব সমর্থনের জন্য স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। ইসরায়েলের অবর্ণনীয় গণহত্যার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের নির্লিপ্ত পক্ষপাতিত্বকে দায়ী করা অযৌক্তিক নয়। ইসরায়েলি বর্বরতার শিকার এ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ফিলিস্তিনি। তার মধ্যে অধিকাংশ শিশু ও মহিলা মৃত্যুবরণ করেছে এবং ২০ লাখ অধিবাসী ঘরছাড়া হয়েছে। সার্বদের দ্বারা বসনিয়ার জাতি নিধনের পর ফিলিস্তিনিদের ওপর এ পদ্ধতিগত নিধনের প্রক্রিয়া মানবজাতির বিবেকের এক মর্মান্তিক এবং শোচনীয় পরাজয়।
ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্মের পেছনে যে ব্যক্তির সর্বপ্রথম অগ্রণী ভূমিকা ছিল তার নাম কাইম ওয়াইজম্যান। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী বৈজ্ঞানিক। ১৮৭৪ সালে তদানীন্তন রাশিয়া, বর্তমান বেলারুশে তার জন্ম। তখনকার রাশিয়ায় ইহুদিদের ওপর বৈষম্যের শিকার ওয়াইজম্যান তার ছাত্রাবস্থায় যুক্তরাজ্যে অভিবাসন গ্রহণ করেন। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হলে ব্রিটিশ সরকার ওয়াইজম্যানকে অস্ত্র প্রস্তুতের বৈজ্ঞানিক হিসেবে নিয়োগ দেয়।
ওয়াইজম্যান তার মেধা খাটিয়ে ভুট্টা থেকে অ্যাসিটোন তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। অ্যাসিটোন ছিল করডাইট নামক ধীরে ধীরে জ্বলন্ত বিস্ফোরকের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অ্যাসিটোনটি ব্যবহৃত হতো আর্টিলারি কামান এবং আগ্নেয়াস্ত্রের বারুদ হিসেবে। ব্রিটিশ আগ্নেয়াস্ত্র প্রস্তুতকারী কারখানায় তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তার এই নিরলস পরিশ্রম অস্বীকৃত থেকে যায়নি।
অতিমাত্রায় সন্তুষ্ট ব্রিটিশ সরকার ওয়াইজম্যানকে পুরস্কৃত করতে চাইল; তিনি যা চাইবেন, ব্রিটিশ সরকার তাকে সেই উপহারই সম্মানসরূপ কৃতজ্ঞ হয়ে দেবে। উত্তরে ওয়াইজম্যান জানালেন, অর্থ, যশ, উপাধি কিংবা উপহার কোনোটাই তিনি চান না। ওয়াইজম্যান বললেন, ‘তার নিজের জন্য কিছু নয়। কিন্তু ইহুদিদের জন্য প্যালেস্টাইনে একখণ্ড জমি।’ জাতিপ্রেমের এরূপ দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রায় ৩০ বছর পর ১৪ মে ১৯৪৮ সালে ওয়াইজম্যানের স্বপ্ন ব্রিটিশরা পূরণ করেন প্যালেস্টাইনের ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে। ওয়াইজম্যান সেই ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ধর্মের ওপর ভিত্তি করে প্রায় সমসাময়িক মুহূর্তে আরও একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, সেটি হলো পাকিস্তান। ধর্মের ওপর আশ্রিত এ দুটি দেশরই পরবর্তী ইতিহাস হলো অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং ঐতিহাসিক দহন।
বোধ হয়, ওয়াইজম্যানের ধারাবাহিকতাকে রক্ষা করে বেলফোর ডিক্লারেশনের সূচনা হয় ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর। ব্রিটিশ কূটনীতিক আর্থার বেলফোরকে দেওয়া ঐতিহাসিক দায়িত্বে ‘প্যালেস্টাইন ভূখণ্ডে ইহুদি জাতির আবাসভূমি গঠনের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল। সেই সময় প্যালেস্টাইনে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ছিল আরব মুসলমানরা। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে মুসলমানদের সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক শক্তির অবসান ঘটলে তাদের পক্ষে কথা বলার কেউ ছিল না। পক্ষান্তরে ইহুদিদের পক্ষে তখন পরাশক্তি যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল। ধারণা করা হয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে যোগদানের পেছনে কারণ ছিল যুক্তরাজ্যের দেওয়া আশ্বাস যে, যুদ্ধশেষে ইহুদিদের জন্য প্যালেস্টাইনে রাষ্ট্র গঠনে যুক্তরাজ্য সম্মতি জ্ঞাপন করবে। সে সময়ে প্যালেস্টাইনের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ছিল ব্রিটিশদের ওপর। অবশ্য স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রকৃত স্বরূপের জন্ম দিতে বিশ্বকে আর একটি বিশ্বযুদ্ধের মানবিক নৃশংসতাকে অতিক্রম করতে হয়েছিল।
ইহুদিদের স্বাধীনতা ইসরায়েল এবং আরব বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করল না, প্রতিষ্ঠা করল যুদ্ধ; যেভাবে শান্তির জন্য পাকিস্তান সৃষ্টির বাস্তবতা পরবর্তীতে রূপান্তরিত হলো ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে নিয়মিত যুদ্ধের জিঘাংসায়। একই মনস্তাত্বিক রোগে প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু তার সামরিক এবং রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করছেন ফিলিস্তিনের নিরীহ এবং নির্দোষ জনসাধারনের বিরুদ্ধে।
ইসরায়েলের জন্মের পর থেকে আরবদের সঙ্গে ইহুদিদের নিয়মিত যুদ্ধ হয়ে আসছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৪৮-৪৯ (ইসরায়েলের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিনি নাকবা), ১৯৫৬ (সুয়েজ সংকট), ১৯৬৭ (ছয় দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ), ১৯৭৩ (ইয়ম কিপুর যুদ্ধ), ১৯৮২ (লেবানন যুদ্ধ), ২০০৬ (দ্বিতীয় লেবানন যুদ্ধ), এবং ২০২৩- বর্তমান যাকে অনেকে ফিলিস্তিনিদের দ্বিতীয় নাকবা যুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে। আশ্চর্যজনকভাবে যুদ্ধের সময়কালের সঙ্গে পাক-ভারত যুদ্ধের এক সমান্তরাল যোগাযোগ পাওয়া যায়, যেমন- ১৯৪৭-৪৮ (প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধ), ১৯৬৫ (দ্বিতীয় কাশ্মীর যুদ্ধ), ১৯৭১ (বাংলাদেশ স্বাধীনতার যুদ্ধ), ১৯৯৯ (কারগিল যুদ্ধ), এবং ২০২৫ (আন্তসীমান্ত যুদ্ধ)।
আরব-ইসরায়েলের যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি কষ্ট-দুঃখ এবং বিয়োগ সহ্য করেছে ফিলিস্তিনিরা। তাদের বেদনার মূলে রয়েছে উপনিবেশিক মনস্তাত্বিক প্রবৃত্তির ছেড়ে যাওয়া জাতিগত বিদ্বেষের বীজ। এই মূলটির পেছনেও উপাদান হিসেবে কাজ করে সমৃদ্ধশালী দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদী সভ্যতার জটিল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজ্ঞা। পশ্চিমের আধিপত্যবাদের মুখে সমগ্র আরব জাতি কেবল সামরিকভাবে দুর্বলই নয়, মানসিকভাবেও পরাভূত। নেতানিয়াহুর আগ্রাসনের মুখে যেন সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, মিসর, ইরাক, লিবিয়া সবাই পরাভূত। এ পরাজয়ের অন্তর্নিহিত কারণ হলো মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের অভাব এবং মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্রের প্রতি অনীহা। মুখ্যত প্রতিটি মুসলিম রাষ্ট্র তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থায় দৃঢ়তার প্রচুর অভাব রয়েছে। এ কারণে, প্যালেস্টাইনের ব্যাপারে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্সের মতো প্রতিষ্ঠানটিকে আমরা হতাশা ব্যাঞ্জকভাবে নির্জীব অবস্থানে পতিত হতে দেখেছি।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল এবং প্যালেস্টাইনের মধ্যে শান্তি চুক্তি ফিরিয়ে আনতে ট্রাম্প প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। বরঞ্চ ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আব্রাহাম চুক্তির আওতাধীন ইসরায়েল এবং আরব দেশগুলোর মধ্যে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপান্তরিত করতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি হয়তোবা এখন ভিন্নতর হতো। কিন্তু তখনো আব্রাহাম চুক্তির মধ্যে প্যালেস্টাইন বিষয়টি অনুপস্থিত ছিল। ফিলিস্তিন ব্যতীত ইসরায়েল এবং আরব দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে সম্পৃক্ত হওয়াটা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে যেন আরব মুসলমানদের বিশ্বাসঘাতকতা। গাজায় ইসরায়েলিদের নৃশংসতা আব্রাহাম চুক্তির বাস্তবায়নে ছেদ টেনেছে। ইসরায়েল ইতিপূর্বেও বহু আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছিল, যেমন- ১৯৭৯ সালে মিসর, ১৯৯৩ সালে প্যালেস্টইন এবং ১৯৯৪ সালে জর্ডানের সঙ্গে। কিন্তু কোনো চুক্তিই শান্তির মুখ দেখেনি।
গাজার সমগ্র জনসাধারণ এখন ইসরায়েলি বাহিনী দ্বারা আটকে পড়েছে এবং প্রতিদিন হত্যার শিকার হচ্ছে। ১ লক্ষাধিক শিশু এবং মহিলা প্রতিনিয়ত মারাত্মক ক্ষুদার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। মিডিয়ার মাধ্যমে তুলে ধরা ফিলিস্তিনিদের করুণ দৃশ্য যেন আমাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদির ওপর জার্মান সৈন্যদের লাইন করে গুলি করার মর্মন্তুদ মুহূর্তগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
এমতাবস্থায়, ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্স এবং ইউরোপের আরও কিছু রাষ্ট্রের প্যালেস্টইনকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যদিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন ভূরাজনৈতিক অবস্থার সূচনা হবে বলে ধারণা করা যায়। নেতানিয়াহুকে বুঝতে হবে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন ইসরায়েলের কাছ থেকে সরে আসাটা ইহুদিদের জন্য এক কূটনৈতিক বিপর্যয়ের বার্তা বহন করে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৃহৎ চারটি শক্তিই নেতানিয়াহু সরকারের প্যালেস্টাইনিদের হত্যাযজ্ঞকে নৈতিক স্থলনের চরম পতনের ঘটনা হিসেবে দেখছে। কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের ওপর ভর করে ইসরায়েলের পক্ষে বেশি দিন টিকে থাকাটা একদিন হয়তো জাতির জন্য স্ট্রাটেজিক পরাজয় বয়ে নিয়ে আসতে পারে। এখনো ইহুদি নেতৃত্বের সময় আছে তাদের নৈতিক পরাজয়ের স্ট্রাটেজি থেকে নিজেদের সরিয়ে আনার।
ফিলিস্তিনি জাতি দমনের অভীপ্সা ইহুদি নেতাদের মধ্যে তাৎক্ষণিক আনন্দের উপজীব্য হতে পারে পরিশেষে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাদের চরম মূল্য দিতে হতে পারে। ইসরায়েল এবং ইউরোপের আর্থ-সামাজিক সম্পর্কে অবশ্যই ভাঙন সৃষ্টি হবে। ইউরোপের স্মৃতিতে বসনিয়ার জাতি নিধনের ইতিহাসটা এখনো জীবন্ত আছে। ইহুদিদের বিরুদ্ধে তাদের নিজস্ব আচরণ ক্ষমার অযোগ্য বলে বর্তমান ইউরোপীয় প্রজন্ম বিশ্বাস করে। ডোনাল্ড ট্রাম্পও হয়তোবা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে এবং ফলে ইসরায়েলের পক্ষ সমর্থন হতে বিরত থাকবে। রাশিয়া এবং চীন ইতোমধ্যেই ইসরায়েলের পক্ষ সমর্থনে দ্বিধাগ্রস্ত।
উপয়ান্তরের অভাবে নেতানিয়াহুর জন্য কেবলমাত্র পরিচিত এবং বিকল্প প্রতিবেশী হবে আরব বিশ্ব। এবং তাদের মধ্যে ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিবেশী অবশ্যম্ভাবী থাকবে প্যালেস্টাইন গোষ্ঠী। যদি ইসরায়েল এই মুহূর্তে এ ঐতিহাসিক সত্যটি অনুধাবন না করে, তবে প্যালেস্টাইনের সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ যে অন্ধকারাচ্ছন্ন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সভ্য সমাজ হিসেবে বেঁচে থাকতে হলে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের প্যালেস্টাইন জাতি দমননীতি বন্ধ করা আন্তর্জাতিক বিশ্বের সর্বোপরি নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা এবং সিএএবির সাবেক চেয়ারম্যান
.jpg)
.jpg)
