প্রভুর ইচ্ছা নানাভাবে কাজ করে- কখনো সরাসরি, অনেক সময় গোপনে। আধিপত্যের একটা সংস্কৃতিই গড়ে ওঠে। প্রভুভক্তদের পক্ষে তো অবশ্যই, এমনকি যারা বিদ্রোহ করে তাদের অনেকের পক্ষেও বৃত্তটা ভেঙে বের হয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না, যদি না খুব বড় কিছু ঘটে কিংবা ঘটানো সম্ভব হয়। আর পরিবর্তনের পরও প্রায়ই টের পাওয়া যায় যে, প্রভু বদল হয়েছে বটে, প্রভুত্বের বদল হয়নি। গোলামিরই হোক, আনুগত্যের কিংবা মেনে নেওয়ার, আধিপত্যের চিত্রটাকে আশাব্যঞ্জক বলা সহজ নয়। তবু সমষ্টিগতভাবে মানুষ কখনোই পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করে না, বদলাতে চায়, আশা রাখে, এবং বদলাতে যে পারে না এমনো নয়।
কিন্তু প্রভুটা কে? প্রভু কোনো ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান নয়, প্রভু হচ্ছে একটি ব্যবস্থা, যেটা সুবিস্তৃত ও সুগভীর, এবং একই সঙ্গে স্থানীয় ও বিশ্বজুড়ে ব্যাপ্ত। ব্যবস্থাটার নাম পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদ যেমন একটি অর্থনৈতিক বিধিব্যবস্থা তেমনি আবার একটি আদর্শও বৈকি। এ অর্থনৈতিক ও আদর্শিক আয়োজন দাসত্বের সৃষ্টি করে; শুধু দরিদ্রদের জন্য নয়, তাদের জন্যও যারা ধনী। ধনী-দরিদ্র সবাই বন্দি হয়ে থাকে মুনাফার লোভ ও ভোগবাদী লালসার এবং আত্মকেন্দ্রিকতার ও বিচ্ছিন্নতার হাতে।
পুঁজিবাদ স্বভাবতই সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। সাম্রাজ্যবাদ একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা যা পুঁজিবাদকে একাধারে রক্ষা ও সুবিস্তৃত করে। বিশ্ব এখন পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের অধীন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে এবং এখন সেখানে পুঁজিবাদের মারাত্মক দৌরাত্ম্য চলছে। গণচীনও রওনা দিয়েছে বাজারদাসত্বের অভিমুখে।
বিশ্বব্যবস্থার আসল নিয়ন্ত্রক হলো বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। এতই যে, বড় রাষ্ট্রগুলোও সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়, আর আমাদের মতো দুর্বল রাষ্ট্রের পক্ষে স্বাধীন অবস্থান নেওয়া প্রায় অসম্ভব- এ সত্য অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। আমাদের দেশে শাসকরা রাজনৈতিক দলাদলি, কলহ ও সংঘর্ষে লিপ্ত থাকলেও এক বিষয়ে তারা ঐক্যবদ্ধ, সেটি হলো সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থসাধন। যদিও নিজেদের স্বার্থগত বিভেদের কারণে পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় তারা লিপ্ত, তবুও সাম্রাজ্যবাদের তুষ্টি তাদের ক্ষমতায় থাকা-না থাকার অনেকটাই নির্ধারণ করে।
প্রভুত্বের অধীনস্ততা আমাদের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে যেমন তৎপর তেমনি প্রভাবশালী আমাদের মনোজগতেও। এমনকি যারা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী তারাও দুর্বল হয়ে পড়েন; স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতার মোহ তো রয়েছেই, বিভ্রান্ত হন বিকৃত তথ্য ও তত্ত্বের পীড়নে এবং নিজেদের সামন্তবাদী পিছুটানে। কঠিন হয়ে পড়ে শিরদাড়া শক্ত রাখা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানো। মুক্তির সংগ্রাম চলে, কিন্তু মুক্তি আসে না; রাষ্ট্র বদলায়, কিন্তু সমাজ বদলায় না।
রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে সাম্রাজ্যবাদের কার্যকর তৎপরতার কিছু দিক অস্বীকার করা যাবে না। সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতায় মওলানা ভাসানী অত্যন্ত দৃঢ় ছিলেন এবং প্রভুত্বকে মানেননি। যে কারণে তার বক্তব্য, কাজের পরিধি ও দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। গ্রামসি যাদের বিপ্লবী মনে করতেন তিনিও ছিলেন তেমন ধরনেরই একজন বুদ্ধিজীবী; কিন্তু তার নিজের অবস্থানের ওপরও যে সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব পড়েনি এমনটা বলা যাবে না, যে প্রভাবটা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এই জন্য যে, সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আপসের কোনো চিন্তা তার ভেতর থাকার কথা নয়।
ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করা যায়, বিবেচনার কেন্দ্রে রয়েছে ‘নিম্নবর্গের বলে পরিচিত ইতিহাস চর্চার ধারাটি। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকরা বিশাল ভারতবর্ষকে কৃত্রিমভাবে এক করতে চেয়েছিল, শাসন-শোষণ, প্রশাসন, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অনুগত শ্রেণি তৈরি ইত্যাদির মধ্য দিয়ে। উপনিবেশবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে ভারতবর্ষীয়দেরও ওই ঐক্য মেনে নিতে হয়েছে, কেননা ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব ও অধিপত্য বিস্তৃত ছিল ভারতজুড়েই। দখলদারদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ব্যাপারে ভারতীয়দের জন্য প্রয়োজন ছিল জাতীয়তাবাদের; কিন্তু ওই জাতীয়তাবাদই আবার বিপদ ডেকে আনল তাদের জন্য। জাতীয়তাবাদের প্রধান উপাদান ধর্ম নয়, ভাষা। ভারতবর্ষ ছিল নানা ভাষার দেশ, ব্রিটিশ শাসকরা ইংরেজি ভাষা চাপিয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই চাপিয়ে দেওয়াটা ছিল জাতীয়তাবাদী চেতনার ওপর নিপীড়ন, অন্যপক্ষে ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের পক্ষে সম্ভব ছিল না কোনো একটি ভাষার সাহায্যে ভারতবর্ষের সব মানুষকে এক করা। তা ছাড়া জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে অগ্রসর অংশ যেহেতু ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী, তাই তারা নিজেদের ধর্মের সাহায্যে ভারতকে এক করার আপাত সহজ ও কার্যকর পথ ধরেই এগোলেন। ফলটা দাঁড়াল বিপজ্জনক, সাম্প্রদায়িকতা সুযোগ পেল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বিভাজন সৃষ্টির, ঐক্যের জায়গায় দেখা দিল দাঙ্গা-হাঙ্গামা, যার পরিণামে অনিবার্য হয়ে পড়ল ভারত-বিভাগ।
১৯৪৭-এ উদ্ভব ঘটেছিল দুটি রাষ্ট্রের, ভারত ও পাকিস্তানের; ১৯৭১-এ জন্ম আরেকটি নতুন রাষ্ট্রের, বাংলাদেশের। এই তিন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তিনজন রাষ্ট্রনায়ক খুব বড় ভূমিকা পালন করেন; তারা হলেন গান্ধী, জিন্নাহ ও শেখ মুজিব। তাদের পটভূমি, অবস্থান ও সময়ের ভেতর পার্থক্য ছিল, কিন্তু তিনজনের ভেতর ঐক্য ছিল এক জায়গায়- তারা সবাই পুঁজিবাদে আস্থাবান ছিলেন। তাদের ওই আস্থা রাষ্ট্র তিনটির চরিত্রের ভেতরও প্রতিফলিত হয়েছে বৈকি।
সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার ক্ষেত্রে অনড় দুজন ব্যক্তিত্ব, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও লীলা নাগের কথা এসেছে। এ দুজনের কেউই কিন্তু পুঁজিবাদী ছিলেন না, তাদের পক্ষপাত ছিল সমাজতন্ত্রের দিকে। কিন্তু পুরোপুরি সমাজতান্ত্রিক হওয়া তাদের পক্ষেও সম্ভব হয়নি। দুর্লঙ্ঘ্য একটি পরিখা ছিল সামনে দাঁড়িয়ে, যেটি শ্রেণি ও সংস্কৃতির।
রাষ্ট্রের উত্থান ঘটেছে, পতনও ঘটেছে; মুক্তির জন্য মানুষ সংগ্রাম করেছে, কিন্তু মুক্তি আসেনি, উল্টো বিড়ম্বনা জুটেছে। মুক্তি কেন এল না? না আসার প্রধান কারণ সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ বিরোধিতাকে ধারাবাহিক ও ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কাজটি করবার কথা ছিল বামপন্থিদেরই। তারা যে চেষ্টা করেননি তা নয়। কিন্তু সফলতা আসেনি। ব্যর্থতার একটি কারণ হলো এই যে, নিজের পায়ে এবং মেরুদণ্ড শক্ত করে তারা দাঁড়াতে পারেননি। অন্য কারণ তাদের পক্ষে সাধারণ মানুষের কাছে সেভাবে যাওয়া সম্ভব হয়নি, যেভাবে জাতীয়তাবাদীরা গেছেন।
মূল প্রশ্নটি কিন্তু প্রভু নয়, প্রভুর প্রতি আনুগত্যও নয়, সেটি হলো আনুগত্য ছিন্ন করার চেষ্টা। আধিপত্যবাদী ও কর্তৃত্বকামী প্রভুর নানা ইচ্ছা ওই চেষ্টাকে জরুরি করে তুলেছে। কেননা এর সঙ্গে আমাদের সমষ্টিগত ভবিষ্যৎ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িত বটে। কাজটি যে সহজ নয়, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াব কী করে, তা নিয়ে কালক্ষেপণের অবকাশ আর নেই। দাঁড়ানোর ক্ষেত্রটি যে গোপন কিছু নয়, পরিষ্কারই।
সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে উদারনৈতিক নয়, প্রকৃত গণতান্ত্রিক (নামান্তরে সমাজতান্ত্রিক) অবস্থান থেকেই। লক্ষ্য থাকবে দেশের ভেতরে সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার যে শাসকশ্রেণি তাদের পরাভূত করে রাষ্ট্রে জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, রাষ্ট্রক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটানো এবং সর্বস্তরে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ সংগ্রাম যেমন হবে স্থানীয় তেমনি তাকে হতে হবে আন্তর্জাতিক। সারা বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদবিরোধী যে আন্দোলন চলছে এ হবে তারই অংশ।
লেনিন আশা করেছিলেন তার নিজের দেশের মতো সারা বিশ্বেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। পরবর্তী সময়ে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে রাশিয়ার কর্তৃত্ব এবং আরও পরে রাশিয়ার সঙ্গে চীনের বিরোধের পথ ধরে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী উপাদান প্রবল হয়ে ওঠে; ফলে দেখি বাংলাদেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে চীন তখন তাকে সমর্থন করছে না, ইরানে যখন রাজতন্ত্রবিরোধী সংগ্রাম চরম আকার ধারণ করছে চীন তখন সংগ্রামীদের পক্ষ নিচ্ছে না, পরিচালিত হচ্ছে নিজেদের জাতীয় স্বার্থের বিবেচনা দ্বারা। তারও আগে ভারতীয় উপমহাদেশে কমিউনিস্টরা যে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে পারেননি তার প্রধান কারণ ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ওপর রাশিয়ার প্রভাব। পার্টি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি, ফলে প্রচুর আত্মত্যাগ সত্ত্বেও ব্যাপক জনসমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানে রাজতন্ত্র উচ্ছেদের আন্দোলন সে দেশের কমিউনিস্টদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হতে পারত, হলে ইরানের চেহারা ভিন্ন রকম দাঁড়াত; কিন্তু সেটা হয়নি, কেননা তুদেহ পার্টি সাহসী ভূমিকা নেয়নি। যার কারণ পার্টির বিশাল কর্মীবাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং বিপ্লবী অভ্যুত্থানের পরিণতিতে সেখানে মৌলবাদীদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন শুনছি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে যে প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই। সাম্রাজ্যবাদকে যারা চেনে না তারা যেকোনো ধরনের কমিউনিস্ট তা বুঝতে তো কোনো কষ্ট নেই। বাংলাদেশের বামপন্থিদের যে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই তার কারণও এটা যে, তারা নিজের পায়ে দাঁড়ান না এবং জনগণের কাছে যাওয়ার ক্ষমতা রাখেন না। তাদের একাংশ শাসকশ্রেণির লেজুড়ে পরিণত হয়, অপরাংশ হয় শুষ্ক তত্ত্ব প্রচার করে, নয়তো জনবিচ্ছিন্ন হঠকারী তৎপরতায় লিপ্ত থাকে।
কাজী নজরুল ইসলামের প্রসঙ্গটা আসে। তিনি যেভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন, যা ছিল একাধারে সাহসী, জনসম্পৃক্ত, মেরুদণ্ডসম্পন্ন, দৃষ্টিভঙ্গিতে আন্তর্জাতিক এবং নতুন রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ, সেখানে বোধ করি ছোট হলেও উজ্জ্বল একটি দৃষ্টান্ত আছে সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতাটা কেমন হওয়া উচিত এবং কোন পথে তার এগোনো দরকার, উভয় প্রয়োজনের জন্যই।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

