বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই উচ্চমূল্যস্ফীতি প্রবণতা দেখা দেয়। করোনা-উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি যখন উত্তরণের পর্যায়ে ছিল, ঠিক তখনই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন বিপর্যস্ত হয়। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ আরোপ করে। প্রতিটি দেশই উচ্চমূল্যস্ফীতির অভিঘাতে জর্জরিত হয়ে পড়ে। এমনকি বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতির হার আগের ৪০ বছরের রেকর্ড অতিক্রম করে ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়। গত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উচ্চমূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। কোনোভাবেই এ মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা যাচ্ছে না। পলিসি রেট বৃদ্ধির ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার (ব্যাংক উদ্যোক্তা ও গ্রাহক পর্যায়ে ঋণদানের সময় যে সুদ আরোপ করে) আনুপাতিক হারে বেড়ে যায়। ফলে গ্রাহকদের মাঝে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের আগ্রহ ও সামর্থ্য হ্রাস পায়। এতে বাজারে অর্থের জোগান কমে যায়। এ ছাড়া আরও কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এতে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেট আগে ছিল ৫ শতাংশ। পর্যায়ক্রমে বাড়তে বাড়তে এখন তা ১০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। পলিসি রেট বৃদ্ধির পাশাপাশি আরও কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে অধিকাংশ দেশই তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিরাজমান উচ্চমূল্যস্ফীতি কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির হার গত আগস্টে ছিল ২ দশমিক ৭০ শতাংশ। এখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৪ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ২৫ শতাংশে নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে। বছর শেষে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির হার ২ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা বাড়িয়ে ১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশে স্থির রাখা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উচ্চমূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৭০ শতাংশে নেমে আসার পেছনে পলিসি রেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশই তাদের অর্থনীতিতে সৃষ্ট উচ্চমূল্যস্ফীতি কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হলেও আমরা এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা উচ্চমূল্যস্ফীতি কমাতে পারছি না। চীনের মূল্যস্ফীতির হার গত আগস্টে ছিল শূন্য দশমিক ৪১ শতাংশ। আগস্টে অন্যান্য দেশের মধ্যে হংকংয়ে ১ দশমিক ১ শতাংশ, ভারতে ২ দশমিক ০৭ শতাংশ, জাপানে ২ দশমিক ৭ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ, ভুটানে ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ, মালদ্বীপে ৪ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ, নেপালে ১ দশমিক ৬৮ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ফিলিপাইনে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে গত আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
দেশে বিভিন্ন সময় উচ্চমূল্যস্ফীতির প্রবণতা প্রত্যক্ষ করা গেছে। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে এসে তা ৯ দশমিক ০২ শতাংশে উন্নীত হয়। সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে একক মাস হিসাবে সবচেয়ে উচ্চমূল্যস্ফীতি প্রত্যক্ষ করা যায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। সেই সময় মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে। গত তিন বছর ধরে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উচ্চমূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এর পাশাপাশি মানুষের মজুরির হার আনুপাতিকভাবে বাড়ছে না। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি এবং মজুরি বৃদ্ধির প্রবণতা বিপরীতমুখী হওয়ার কারণে মানুষের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে খাদ্যপণ্যের অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য। নির্দিষ্ট আয়ের নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারগুলো উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে সবচেয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। উচ্চমূল্যস্ফীতির অভিঘাত সহ্য করতে না পেরে অনেক পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে বাধ্য হচ্ছে। দীর্ঘকালীন মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হচ্ছে। পরিবারগুলো তাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারছে না। অনেক পরিবারকে ঋণ করে চলতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে যে উচ্চমূল্যস্ফীতির প্রবণতা প্রত্যক্ষ করছে, তা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। বিগত সরকারের আমলে এ প্রবণতা শুরু হয়। উচ্চমূল্যস্ফীতির প্রবণতা শুরু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংক উচ্চমূল্যস্ফীতির প্রবণতা রোধে পলিসি রেট বারবার বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশে ফিক্সড করে রাখে। ফলে শিডিউল ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আগের তুলনায় বেশি সুদে ঋণ গ্রহণ করলেও সেই ঋণের অর্থ উদ্যোক্তা এবং সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে প্রদানের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি সুদ আরোপ করতে পারেনি। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো ঋণ সংকোচন নীতি গ্রহণ করে; যদিও সরকার সমর্থক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ব্যাংক ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ প্রয়োগ করে ঋণ বের করে নেয়। বিরাজমান মূল্যস্ফীতির চেয়ে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ছিল তুলনামূলক কম। ফলে বাজারে অর্থ সরবরাহ কমানোর যে প্রচেষ্টা, তা সফল হয়নি।
বাজারব্যবস্থার ওপর সরকারের তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছামতো যেকোনো সময় পণ্যমূল্য বৃদ্ধি করে গণদুর্ভোগ সৃষ্টি করতে পারেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছু নীতি-আদর্শ মেনে চলতে হয়। অধিকাংশ ব্যবসায়ীর মধ্যে ব্যবসায়িক নীতি-আদর্শ মেনে চলার প্রবণতা লক্ষ করা যায় না। তাদের কাছে অতি মুনাফা অর্জনই মূল লক্ষ্য বলে বিবেচিত হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হচ্ছে উচ্চমূল্যস্ফীতিকে দ্রুত কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা। কিন্তু বিগত এক বছরেরও বেশি সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। অবশ্য এটা ঠিক, শুধু পলিসি রেট বৃদ্ধি অথবা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংক ঋণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উচ্চমূল্যস্ফীতি প্রবণতা রোধ করা যাবে না। এজন্য আরও কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নির্ধারণের জন্য শহরের ৪২২টি এবং গ্রামের ৩১৮টি অর্থাৎ মোট ৭৪০টি পণ্যকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর মধ্যে বেশকিছু পণ্য আছে, যা সাধারণ মানুষ খুব একটা ব্যবহার করে না। মূল্যস্ফীতি ক্যালকুলেট করার সময় এসব অপ্রয়োজনীয় পণ্য বাদ দিয়ে মূল্যায়ন করা হলে মূল্যস্ফীতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে। মূল্যস্ফীতির চাপে দেশের জনগণ এখন বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। এ মুহূর্তে উচ্চমূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। কারণ সাধারণ মানুষ উচ্চমূল্যস্ফীতির চাপে বড়ই অসহায় অবস্থার মধ্যে রয়েছে।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

