দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা যখন বিরাজ করে, তখন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নানারকম উদ্বেগ ও দ্বিধা তৈরি হয়। কারণ তারা নিশ্চিত হতে পারে না, তাদের বিনিয়োগ কতটা নিরাপদ থাকবে। এর জন্য অবশ্যই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক এবং আইনি কাঠামো গড়ে তোলা, যাতে ব্যবসায়ীরা নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারেন এবং বিনিয়োগের পাশাপাশি শ্রমবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়। আমরা ইতোমধ্যে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি এবং বিভিন্ন প্রজেক্টে প্রায় ১.১ বিলিয়নের চুক্তিস্বাক্ষর সম্পন্ন হয়েছে। বিগত সময়ে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার দেশি-বিদেশি ঋণনির্ভর অর্থনীতি তৈরি করে যাওয়ায় বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বিনিয়োগের আগেই ঘুষ-দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়ে বিনিয়োগকারীদের বাজার তৈরিতে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা বিকল্প চিন্তা করতে বাধ্য হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- চীন অথবা কোরিয়া কখনো টাকা নেয় না বরং তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বার উন্মোচন করার পক্ষে সবসময়। এর ফলে উভয়পক্ষই লাভবান হয়।

বিগত শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে বাকস্বাধীনতা ছিল না। কেউ কোনো কথা বলতে পারেননি, রাস্তায় নামতে পারেনি। মানুষ গুম-খুনের স্বীকার হয়েছেন। এমনকি লাঠিপেটার শিকার হয়েছেন। শ্রমিকরা নানাভাবে নিপীড়ন সহ্য করেছেন। কখনো শুনিনি ক্ষতিগ্রস্ত কাউকে কমপেনসেশন (ক্ষতিপূরণ) দেওয়া হয়েছে। সবাই মালিকের পক্ষে কাজ করেছে। কিন্তু আমরা মালিক-শ্রমিক উভয়ের পক্ষে কাজ করছি। শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি উত্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয়ের দরজা সব সময় খোলা আছে। সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে শ্রমিকদের ন্যূনতম চাহিদা পূরণের সবসময় আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
শ্রমিকদের ন্যায্যমূল্য, বেতন দেওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুর পেছনে শ্রম মন্ত্রণালয় অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। লেবার অ্যাক্টকে যুগোপযোগী করার চেষ্টা চলছে। ট্রেড ইউনিয়নের বিষয়টি অত্যন্ত শিথিল করা হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন এবং কোনো শ্রমিককে কোনো মালিক কালো তালিকাভুক্ত করতে পারবে না, এটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটা করার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের কাছে আমরা এ ক্ষমতা রাখতে চাচ্ছি। ট্রেড ইউনিয়নের কারও নাম প্রকাশ করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং ইনসপেকশনও হবে না। তবে যাদের বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকবে, তাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। প্রতিটি কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার রয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন করার পর নির্বাচনের মাধ্যমে সিবিএ নির্ধারিত হবে। তারাই সরকারের সঙ্গে শ্রমিকদের পক্ষে যেসব দাবিদাওয়া আছে, সেগুলো উত্থাপন করবে এবং তারাই হবে বার্গেইনিং এজেন্ট।
সম্ভাব্য ব্যয়-সক্ষমতা বৃদ্ধি বিদেশি বিনিয়োগের জন্য এখনো সম্ভাবনাময় এক বাজার বাংলাদেশ। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে যে উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক রূপান্তরে সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আশির দশক-পরবর্তী সময়ে ভিয়েতনাম, চীন, মেক্সিকো ও ভারতের মতো দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্প্রসারণে অবদান রেখেছে। বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে থাকে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চাইলে যেসব সমস্যা রয়েছে, তা সমাধান করতে চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করাসহ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সমন্বয়সহ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে চেষ্টা করেছি।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে নিঃসন্দেহে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার আরও উন্নতি ঘটবে। সুন্দর ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, প্রশস্ত রাস্তা, বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে ব্যবহার ও আচরণ, রাজনৈতিক পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, যোগাযোগ, প্রাকৃতিক পরিবেশ, সম্পদের প্রাচুর্য, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত অথবা প্রশিক্ষণযোগ্য জনবল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস ইত্যাদি বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের কোনো দেশ সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা তৈরি করে, যা বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। পক্ষান্তরে দূষিত পরিবেশ, অব্যবস্থাপনা, জনগণের অসংযত আচরণ ও ব্যবহার ইত্যাদি কোনো দেশের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করা প্রয়োজন। সঠিক পরিকল্পনা এবং এর সফল বাস্তবায়নে সরকার চেষ্টা করছে।
এ সম্পর্কে সরকারের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ হচ্ছে প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। দেশের অর্থনীতিকে দৃঢ় ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। বর্তমানে বিনিয়োগ-জিডিপির অনুপাত সন্তোষজনক না থাকায় সরকার বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে। একই সঙ্গে মধ্যমেয়াদে সরকরি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। সরকারের মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়ে বলা হয়- অবকাঠামো উন্নয়ন, দেশে ব্যবসার পরিবেশ সহজীকরণ, বিধি-বিধানগত কাঠামোর সংস্কার, ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্টকরণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। এ ছাড়া পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) সম্প্রসারণ, এসএমই খাত উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধিতে কাজ করছে। সরকারের নেওয়া এসব উদ্যোগ নীতির সমন্বয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে, তার মাধ্যমে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিনিয়োগভিত্তিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে। আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে। প্রথমত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে উন্নতি। দ্বিতীয়ত, ব্যবসা পরিবেশের উন্নতি এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে সংস্কারের সফল বাস্তবায়ন। এর মধ্যদিয়ে দেশে ব্যাপকহারে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।
দেশের অর্থনীতিতে সম্ভাবনার অভাব নেই। কিন্তু চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রক্রিয়াগত। বিনিয়োগ আনতে গেলে অনেক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এর অন্যতম হলো উচ্চ করহার; একজন বিনিয়োগকারী ভিয়েতনামের মতো দেশে কম কার্যকর করহার পেলে স্বভাবতই সেখানে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকবেন। লভ্যাংশ প্রত্যাবাসনের জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়াও একটি বড় বাধা, কারণ এটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে। এ ছাড়া আমাদের কাস্টমস ব্যবস্থা-বাণিজ্য সহজ করার পরিবর্তে কর আদায়ের ওপর বেশি জোর দেয়, যা পণ্য খালাস প্রক্রিয়াকে ধীর করে তোলে। আমরা নিজেরাই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এমন কিছু পরিবেশ তৈরি করেছি, যা তাদের নিরুৎসাহ করে,যা দূরীকরণে সরকার কাজ করছে।
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের বড় সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে এর বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং রপ্তানি সক্ষমতার কারণে আমরা তৈরি পোশাক খাতে প্রমাণ করেছি। তবে এখানে বিনিয়োগের পরিবেশটি এখনো সহজ নয়। একজন বিনিয়োগকারীকে অনেক ধৈর্য ধরতে হয় এবং অসংখ্য অনুমোদনের মধ্যদিয়ে যেতে হয়। এ প্রক্রিয়া সহজ করতে সবাইকে একক প্ল্যাটফর্মে আনা জরুরি। আমাদের সেই চেষ্টা স্বার্থক হলে সংস্কার, উদ্ভাবন ও মানবসম্পদের উন্নয়নের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।
লেখক: অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম, কর্মসংস্থান ও নৌপরিবহন উপদেষ্টা এবং অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা


.jpg)