মধুর দোকান একটি নয়, আসলে কয়েকটি, কিন্তু মধুদা ওই একজনই। কোনো মানুষেরই দ্বিতীয়টি নেই, কিন্তু মধুদা বিশেষভাবেই অনন্য। কেননা, তিনি যে কেবল একজন ব্যক্তি, তা নন, শুধু একটি প্রতিষ্ঠানও নন, দোকানের মালিক নন একজন, তিনি আমাদের চলমান ঐতিহ্যের অংশ।
মধুদার চায়ের দোকান একটি ছিল না, ছিল কয়েকটি। ক্রমাগত সে বদলেছে। আমাদের সময়ে ছিল এক রকম, তার আগে আরেক রকম; পরে ঘটেছে অন্য রদবদল। মেডিকেল কলেজের উত্তর-পূর্ব কোণ থেকে উঠে এসেছিল নতুন কলা ভবনে, সেখানে প্রথমে ছিল মূল ভবনে, তার পর তার আলাদা ঘর হয়েছে। কিন্তু শুধু এসব পরিবর্তনের কারণে যে সে কয়েকটি, তা নয়; যখন একই সময়ে ও স্থানে রয়েছে, তখনো দেখিছি তাকে বিভিন্ন রূপে।

আমরা প্রথমে দেখতাম বাইরে থেকে। মেডিকেল কলেজের সামনে দিয়ে যাওয়া-আসার সময়ে। তখনো ছাত্র নই বিশ্ববিদ্যালয়ের। তার পর ঢুকেছি যখন ভেতরে, বসেছি, চা খেয়েছি, একা কখনো, কখনো অনেকের সঙ্গে। তখন দেখেছি সে একটি নয়, একই সঙ্গে কয়েকটি দোকান বটে। বদলে যেত। সকালে গেলে মনে হতো আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠেছে। দুপুরে ব্যস্ত। বিকেলে ভিড় বেশি। সন্ধ্যার পরও জীবন্ত, কিন্তু অত প্রাণবন্ত নয়, যেমন বিকেলে ছিল। যেন নাটকের মঞ্চ একটি, যেখানে দৃশ্য বদলাচ্ছে, আসছে নতুন নতুন সংলাপ। ছাত্রদের কেউ আসে প্রয়োজনে, নাশতা খেতে, কিংবা মিলিত হতে অন্যের সঙ্গে, কারও লক্ষ্য আড্ডা দেওয়া। দ্রুত শিঙাড়া কিংবা গজা মুখে পুরে দিয়ে ছুটছে কেউ ক্লাস ধরতে, কারও তাড়া নেই, সময় আছে হাতে।
কোথাও বসেছে সাহিত্যপ্রিয় ছেলেরা, নিজেদের লেখা কিংবা নতুন পাওয়া কোনো বই নিয়ে কথা বলতে। নতুন বই পাওয়ার সুযোগ ছিল কম, মেডিকেল কলেজের সামনে কয়েকটি দোকান, কয়েকটি সদ্য প্রতিষ্ঠিত নিউমার্কেট, আর আছে ওয়ার্সি বুক সেন্টার, মাহুতটুলিতে; বই পেলে একজন আরেকজনকে দেখায়, আলাপ করে। আসে উদ্বিগ্ন ছাত্র। টিউটরিয়ালে ভালো করেনি, কী করে মান উন্নত করা যায়, ভাবে সে। এক টেবিলে বসে তিনজন হয়তো আলাপ করছে আসন্ন পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন নিয়ে। হতাশ প্রেমিকও আছে; কিংবা ঘোষিত প্রেমিককে ঘিরে বন্ধুরা। আছে রাজনীতির ছেলেরা। তারাই প্রধান। জমিয়ে বসে তর্কবিতর্ক করে। তৈরি করে কর্মসূচি। এ-সংগঠনে ও-সংগঠনে সন্ধি কিংবা সংঘর্ষের পরিকল্পনা রচিত হয়। বিবৃতি লিখছে কেউ। কেউ ভাবছে বক্তৃতার কথা। রয়েছে সংস্কৃতির ছেলেরা, যারা নাটক করে, গান গায়, কিংবা আয়োজন করে অনুষ্ঠানের। কোথাও গুঞ্জন, অট্টহাসি কোথাও, কোথাও-বা স্তব্ধতা।
মধুর দোকান তো অসামান্য কোনো জায়গা নয়। ওপরে টিনের চাল, নিচে টেবিল আর চেয়ার; খাবার-দাবার সামান্য; ছোট ছোট কাপে চা, সন্দেশ, শিঙাড়া, নিমকি, গজা এসবই তো। সবকিছু নির্দিষ্ট মানের, উঠতি-পড়তি নেই। কিন্তু সামান্য ওই চায়ের দোকানে একটা জীবন আছে সব সময়েই। সেটা নাটকীয়। নাটকের প্রাণ থাকে দ্বন্দ্বে। মধুর দোকানেও দ্বন্দ্ব ছিল, সব সময়ে। নানা মতের মধ্যে বিরোধ থাকত, তর্কবিতর্ক হতো। এমনকি একাকী বসে থাকত যে ছাত্র তার মনের মধ্যেও একটা লড়াই চলত, চিন্তা কিংবা দুশ্চিন্তার, অথবা, হতে পারে, নানা অনুভবের।
ছেলেরা আসে, চলে যায়। নিয়মিত যারা তাদের কারও কারও আছে বাকির খাতা। বিশেষ করে রাজনীতির ছেলেদের। তাদের সঙ্গে অনেকে থাকে, তারা বারে বারে আসে। বাকির খাতায় তাদের হিসাব সব সময়ে যে নির্ভুল হয় তা নয়। কতবার এসেছিল, কজন ছিল সঙ্গে, সেটা জেনে নিয়ে মধুদা একটা অঙ্ক লিখে রাখেন, তারিখ বসিয়ে, হিসাবের পাতায়।
এ দোকানেরই মালিক মধুদা। সাধারণ বেশভূষা, লুঙ্গি ও শার্ট কিংবা ফতুয়া পরনে। বসে থাকেন একটি ছোট টেবিল সামনে নিয়ে। পাশে ক্যাশ বাক্স, সামনে বাকির খাতা। দেখছেন কোথায় কী ঘটছে। একদল বেয়ারা, অল্পবয়সী তারা অধিকাংশই, ছোটাছুটি করে খাবার পৌঁছে দেয় টেবিলে টেবিলে। মধুদা খেয়াল রাখেন। অনিয়ম হচ্ছে কি না, গ্লাস ভাঙল কি কোথাও, কেউ কি পাচ্ছে না খাবার- সব দেখতে হয় তাকে। বিচ্ছিন্ন নন, সংলগ্ন, দোকানের মালিক মনে হয় না কখনো, মনে হয় বন্ধু। তিনি ওই একজনই। সবারই দাদা তিনি, সব বয়সী ছেলেদেরই।
একজন যে তিনি, একেবারেই একজন, জানতো তা পাকিস্তানি হানাদাররা, যারা তাকে হত্যা করেছিল একাত্তরে, গণহত্যা শুরুর সকালেই। চিহ্নিত ছিলেন তিনি। বাড়িতে গিয়ে, আটক করে হত্যা করেছে তাকে। তার স্ত্রী, জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং পুত্রবধূকেও। রাগ ছিল তাদের এতটাই। শত্রুপক্ষ খোঁজ রাখত তার, যেমন আলবদররা খোঁজ রাখত বুদ্ধিবীজীদের। অথচ মধুসূদন দে কে? তিনি তো অত্যন্ত নিরীহ ব্যক্তি একজন, সাধারণ বাঙালি। শিক্ষক নন, ছাত্র নন, কর্মচারীও নন-বিশ্ববিদ্যালয়ের। দোকানদার একজন। সাধারণ, নিরাভরণ একটি চা-দোকানের মালিক। কিন্তু জানতো ওই শত্রুরা যে মধুদা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অপরিহার্য অংশ।
বানিয়ে বলবার উপায় নেই, মধুর দোকান যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃৎপিণ্ডের একটি স্পন্দন। বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করার চেষ্টা অবশ্যই অসম্পূর্ণ থাকত যদি মধুদাকে হত্যা করার চেষ্টা না করা হতো। হানাদারদের হিসাবে ভুল ছিল না। তারা এমনও ভেবেছিল যে, বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষের সব বই ধ্বংস করবে। মধুদাকে তারা সহ্য করবে কেন।
একাত্তরে মধুর দোকান পুরাতন মেডিকেল কলেজ এলাকায় নেই। বিশ্ববিদ্যালয় তখন নীলক্ষেতে, মধুর দোকানও সেখানেই। মধুদাকে হত্যা করেছে যে পাকিস্তানি বাহিনী, ওই দোকানকেও তারা উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। বোধ হয় জুন-জুলাই মাসে। চিন্তা-চেতনার ওই প্রজনন ভূমিটাই রাখবে না, দেবে একেবারে অবলুপ্ত করে। যন্ত্রপাতি নিয়ে এসেছিল তারা। মধুর দোকানের আশপাশেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত, ওখানেই স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রস্তুতি, পাকিস্তানবিরোধী যত স্রোত, যত চাঞ্চল্য কোনোটাই মধুর দোকানকে বাদ দিয়ে নয়। এসব জানা ছিল হানাদারদের। তাদের গোয়েন্দা বাহিনী ছিল। মধুর দোকানেও নিশ্চয়ই আসত বাহিনীর সদস্যরা, নানান বেশে।
কিন্তু ভাঙতে পারেনি। কারণটা ছিল অপ্রত্যাশিত। যখন তারা প্রস্তুত, শুরু করবে কাজ, সেই মুহূর্তে ছুটে এসেছিলেন উর্দু ও ফার্সি বিভাগের প্রধান ড. আফতাব আহমদ সিদ্দিকী। একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতেন তিনি। কল্পনা করতে পারি যে, এভাবেই হেঁটেছিলেন তিনি সেদিন। এসে বলেছেন থামতে। অবাঙালি তিনি, অবাঙালি হানাদারদের উর্দু ভাষাতেই আরেক ইতিহাসের কথা বলেছিলেন তিনি সেদিন। যেখানে মধুর দোকান এখন, সেখানেই একদিন মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল, ১৯০৬ সালে। নবাববাড়ির সম্পত্তি ছিল ওটি। ওইখানে বসেছিল মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার। আফতাব আহমদ সিদ্দিকী বুঝিয়েছিলেন তাদের। হানাদাররা নিবৃত্ত হয়েছিল। একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিকে নিশ্চিহ্ন করা বোধ হয় ঠিক হবে না, ভেবেছে তারা। বিশেষ করে ওই ইতিহাস যখন তাদের পক্ষেরই। মুসলিম লীগের।
ওইভাবেই মধুর দোকান বাঁচল। মধুদা না বাঁচলেও। দোকানের ওই বেঁচে যাওয়া ইতিহাসের পরিহাস যেন। মধুদা নিহত হলেন পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে, তার দোকান বাঁচল পাকিস্তানের স্মারক হিসেবে। পরিহাসটি আরও বিস্তৃত বটে। কেননা, সত্য দুটোই। ওইখানেই ওই দোকানের কাছেই পাকিস্তানের জন্ম, আবার ওইখানেই পাকিস্তানের মৃত্যু। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়, তার পরে মুসলমানদের সন্তুষ্ট করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা; আরও পরে পাকিস্তান আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ গ্রহণ- এসবই ঐতিহাসিক সত্য। আবার সত্য এটাও যে, পাকিস্তানকে ভাঙার আন্দোলন এবং তার ভাঙার ঘটনা- এ দুয়ের সূত্রপাতও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই।
সাতচল্লিশের আগের ছবিটা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। কিন্তু দোকান ছিল, মধুদার আগে তার বাবা আদিত্য দোকান চালাতেন, শুনেছি আমরা। সে সময়ে মুসলমান ছাত্রদের আধিপত্য ছিল না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে; সত্য সেটাও। দোকানে তাদের আনাগোনা কম ছিল, নিশ্চয়ই। সংখ্যায় তারা অল্প, তাছাড়া অধিকাংশই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, চা-নাশতা হয়তো বিলাসিতার পর্যায়ে পড়ত তাদের জন্য। তবু মুসলিম ছাত্ররা ছিল এবং তাদের অধিকাংশই ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। নাজির আহমদ শহিদ হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই। তিনি পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন।
অবিভক্ত বাংলার কারণেই একদিন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল। বাঙালি মুসলমান যেভাবে ভোট দিয়েছিল পাকিস্তানের পক্ষে, অবাঙালি পাকিস্তানিরা সেভাবে দেয়নি। পাকিস্তান ভাঙার আন্দোলনও পরে বাঙালিরাই করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, জড়িত ছিল তারা ভাঙার সঙ্গেও। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা মানেই তো মধুর দোকানে থাকা। পরস্পরবিরোধী ওই দুই ঘটনা- প্রতিষ্ঠা ও ধ্বংস- একটি স্বাভাবিকতার সূত্রে প্রথিত বটে। সূত্রটা হলো, মধ্যবিত্তের বিকাশ। বাংলার মুসলমান মধ্যবিত্ত পাকিস্তান চেয়েছিল মুক্তির আশায়, সেই মুক্তি আসছে না দেখে তারা প্রতিষ্ঠা করতে চাইল স্বাধীন বাংলাদেশের। মধুর দোকান রইল ওই ঘটনাধারার সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে।
২
মধুর দোকানকে আমার বিশেষভাব চেনা দুটি ব্যক্তিগত ঘটনার ভেতর দিয়ে, একটি রাজনৈতিক, অপরটি শিক্ষাগত।
প্রথমটি ঘটল ছাত্রজীবনের প্রথম বর্ষেই। ১৯৫২-এর পরে এসেছি আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরেই, বলা যায়, হলগুলোতে নির্বাচন উপলক্ষে গড়ে উঠেছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। আমি দাঁড়িয়ে গেছি নির্বাচনে, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ইউনিয়নের সদস্য পদপ্রার্থী হয়ে, যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে। ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্রকাশের সুযোগ ছিল না। অনিবার্য ছিল দাঁড়ানো, আর সেই দাঁড়ানোতেই মধুর দোকানের সঙ্গে আমার রাজনৈতিক পরিচয়। হাত মেলানো, কাগজ বিলি করা। দাঁড়িয়েছি যে এটা জানানো, পরিচিত হওয়া। এসবের উপলক্ষে ঘন ঘন যাতায়াত করতে হয়েছে আমাকে মধুর দোকানে। কাজটা কতটা পছন্দ করেছি, বলতে পারব না; কিন্তু ওই কাজের মধ্যদিয়ে আমি যে পরিবর্তিত হয়েছি, কিছুটা হলেও, রাজনীতি-সচেতন হয়েছি আগের তুলনায় বেশি, তাতে কোনো সন্দেহই নেই। আমার উপকার হয়েছে।
দ্বিতীয়বারের পরিচিতিটা অন্যভাবে। তখন অনার্স পরীক্ষা এগিয়ে এসেছে কাছে, এত তো তখন বই ছিল না, ফটোকপি করার ব্যবস্থা ছিল না একেবারেই, পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রন্থাগারে গিয়েই নিতে হতো, নিজে নিজে। আমরা থাকতাম আজিমপুরে। রোজ বিকেলে চলে আসতাম গ্রন্থাগারে। রাত ৯টায় বন্ধ হতো গ্রন্থাগারের দরজা। তখন রওনা দিতাম বাসার পথে। দু-তিন মাস একটানা চলেছিল আমার এ আনাগোনা। সেই সময়টা খুবই স্মরণীয় আমার জন্য। নতুন জগৎ খুলে যাচ্ছে আমার কাছে, দেখতে পাচ্ছি। খোলা জগৎটাও বড় হচ্ছে, টের পাচ্ছি। পুরোনো বই নতুন হয়ে উঠছে, নতুন বই হাতে পেলে উত্তেজিত হয়ে পড়ছি, ভেতরে ভেতরে। সেই সময়ে মধুর দোকানকে আরেকভাবে চেনা আমার। ওই যে আমার বই পড়া গ্রন্থাগারে, দ্রুত হাতে কপি করা প্রয়োজনীয় অংশ, সবই সম্ভব হয়েছে মধুর দোকানের কারণে। কতবার এসেছি ঠিক নেই। দেখা হয়েছে বন্ধুদের সঙ্গে। আলাপ হয়েছে নানা বিষয়ে।
বুঝেছি তখন যে মধুর দোকান দুভাবেই সত্য। যেমন রাজনৈতিকভাবে, তেমনি শিক্ষাজীবনেও। মিলেমিশে এক সে; অবিচ্ছেদ্য অংশ আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গ্রন্থাগার যেমন অপরিহার্য, তেমনি অপরিহার্য তার চায়ের দোকান। আমাদের সময়ে মিলবার অন্য কোনো জায়গা ছিল না, মধুর দোকান ছাড়া। চা খাবার অন্য কোনো ভালো ব্যবস্থা ছিল না মধুর দোকান ব্যতীত।
এখন হয়তো আগের মতো সে অনন্য নয়। ছেলেমেয়েদের জন্য মিলিত হওয়ার আরও অনেক জায়গা আছে, ব্যবস্থা রয়েছে। তবু রাজনীতি ও সংস্কৃতির কর্মী যারা, তারা এখনো মেলে ওই দোকানেই। কিন্তু রাজনীতিতে এখন আর আগের মতো মতাদর্শগত তর্কবিতর্ক নেই; মীমাংসার জন্য এখন যুক্তিই একমাত্র অস্ত্র নয়, আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহৃত হয়।
তা হোক, তবু মধুর দোকান আছে এবং থাকবে, অন্য কোথাও না থাকুক অবশ্যই থাকবে আমাদের ঐতিহ্যে। হানাদাররা মধুদাকে হত্যা করেছে, কিন্তু তাকে নিশ্চিহ্ন করা তাদের ক্ষমতার বাইরে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়বার চেষ্টায় তার উপস্থিতি উজ্জ্বল, এবং উজ্জ্বল বলেই তাকে শহিদ হতে হয়েছে, যেমন শহিদ হয়েছেন আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবী ও অগণিত মুক্তিযোদ্ধা।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

.jpg)
.jpg)