নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জোহান মামদানির বিপক্ষে কঠোর অবস্থান নিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। সর্বোচ্চ ক্ষমতাচর্চাও টিকল না জনগণের চূড়ান্ত রায়ের কাছে। না টেকারই কথা। টেকেনি কোনো দিন, টিকছে না এবং টিকবে না ভবিষ্যতেও। এখানেই সত্যিকার গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, মাধুর্যতা ও গণতান্ত্রিক শক্তির মূল ভিত্তি। স্বাভাবিকভাবেই ভোটের ক্ষমতা প্রদর্শন বিকাশটি নির্ভর করে জনগণের ভোটের ক্ষমতা প্রয়োগের যথার্থ নিশ্চয়তার ওপর।

প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক, ভোটের ক্ষমতার যথার্থ নিশ্চয়তা কী কী বিষয়ের ওপর বা কোন কোন উপাদানের ওপর নির্ভর করে। এখানে ভোট প্রয়োগের ক্ষমতার বিষয়টি অধীন চলক এবং যে উপাদানগুলো একান্তভাবেই নিশ্চিত করলে প্রত্যেক ভোটার তার ভোটের ক্ষমতা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারবে সেই চলকগুলোকে সমাজ বিভাজনের ভাষায় Social Variable কিংবা আরও বৃহত্তর অর্থে Political Variables-ও বলতে পারি। সেগুলোকে সর্বাগ্রে চিহ্নিত করে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন।
জনগণের ভোটের ক্ষমতা যথার্থভাবে প্রয়োগ করার নিমিত্তে রাজনৈতিক দলের কার্যকর ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ ক্ষেত্রে দলীয় কর্মসূচি, আদর্শ ও নির্বাচনি ইশতেহার একান্ত প্রয়োজনীয় বিষয়। দলীয় কর্মসূচিগুলোকে আশু বাস্তবায়নযোগ্য স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি আকারে বিভাজন করে জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। প্রয়োজন জাতীয় আর্থিক নীতির খুঁটিনাটি ভালোভাবে সহজ ভাষায় জনগণকে অবহিত করা। সংবিধানে যদি কোনো সাংঘর্ষিক বিষয় থাকে সে বিষয়ে স্ব স্ব দলের বক্তব্য এবং সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিষয়াদি নির্বাচনকালে বা নির্বাচনের আগে যথার্থভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন আর বৈদেশিক সম্পর্ক বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পাদিত এবং নির্বাচনের পর প্রয়োজন অনুযায়ী চুক্তির বিষয়েও পরিচ্ছন্ন ধারণা দিলে জনগণ প্রতিটি দলের অবস্থান পরিষ্কারভাবে জানতে ও বুঝতে পারে। আর এসবের কারণে ভোট প্রদানের ক্ষমতার যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করার পথ সুগম হয়।
যাই হোক, যেকোনো দল যখন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তখন ওই দলের নির্বাচনি প্রচার, প্রচারণার মূল প্রাণভোমরা দুটি। প্রথমটি হলো নির্বাচনি ইশতেহার (মানে একটি রাজনৈতিক দল কীসের ভিত্তিতে স্বীয় দলের পক্ষে জনগণের ভোট চাইছে) আর অন্যটি হচ্ছে ওই দলের মূল নেতৃত্বের ব্যক্তিত্ব, আচার-আচরণ, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দেশপ্রেমসহ নেতৃত্বের শতভাগ গুণাবলি। তৎসঙ্গে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতাও অন্যতম বিষয়।
আমরা বেকারকে বোঝাতে পারিনি কোন দলের ইশতেহারে সত্যিকারভাবে কর্মসংস্থানের অবারিত প্রতিশ্রুতি রয়েছে। পারিনি কোন দল সুশাসন, নারীর ক্ষমতায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন গতি টেনে ধরতে পারবে। এ বিষয়গুলোর সম্যক ধারণা নিয়ে ভোটদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারার বিষয়টিতে এখন সমাপ্তি টানা প্রয়োজন।
না পারার কারণগুলোর মধ্যে আমার মতে অন্যতম কর্মী হিসেবে নিজে যেমন দলকানা তেমনি ভোটারদের দল, ব্যক্তি কিংবা মার্কাকানা করে ফেলেছি। আমরা মাঝে-মধ্যে ভোটারদের মধ্যে শুনতে পাই- ভাই ওই দলকে বেশি ভালো লাগে বা ওই প্রার্থীও শিক্ষা, জ্ঞানে, চরিত্রে, ভদ্রতায় ভালো কিন্তু ‘ওই মার্কাটা দেখলে আর মাথা ঠিক থাকে না।’ অন্ধভাবে কোনো মার্কার প্রতি শতভাগ দুর্বলতা তাও একদিনে হয়নি; পদ্মা, মেঘনা, যমুনার বহু ঢেউয়ের ফেনিল পেরিয়ে ‘মার্কাকানা’ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। দলীয় নির্বাচনি লক্ষ্যের পরিবর্তে স্লোগান হয়েছে ‘মার্কা আছে? কোন সে মার্কা।’ মানেটা কী দাঁড়ায়? দলের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নেই, নেই দলীয় নির্বাচনি লক্ষ্য! এ বিষয়ে মন্তব্য করা বেশ কঠিন বৈ আর কী।
ধর্মভিত্তিক কোনো কোনো দল বলে যে, এই মার্কায় ভোট দিলে স্বয়ং স্রোষ্টাকে ভোট দেওয়া হবে, ধর্মাবতারকে ভোট দেওয়া হবে কিংবা ধর্মীয় পুস্তককে ভোট দেওয়া হবে। আমি কোনো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করছি না। তারা তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস বা সংস্কৃতিনির্ভর কথা বলছে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি যার যেমন বিশ্বাস, তিনিই তেমনই বলবেন, এটাই স্বাভাবিক। আমি বলছি এসব কারণে ভোটার ভোট প্রদানের কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তার সার্বভৌম ক্ষমতার সঠিক পথ হারিয়ে ফেলেন। যেখানে তার ভোট প্রদানের যথার্থতা প্রতিফলিত হয় না।
সংগত কারণেই প্রশ্ন আসে- তাহলে ভোটার তার মতামত প্রকাশের যে সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করবে সেটার জন্য কী কী নিয়ামক, উপাদান বা রাজনীতি সম্পর্কিত কোন কোন চলক- Positive Impact ফেলতে পারে। বিষয়গুলো আপনাদের অজানা নয়- শুধু স্মরণ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা আর কী।
নিয়মিত ভিত্তিতে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, গ্রাম, পাড়া ও মহল্লার প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ করে জনগণকে রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সমাজের বিভিন্ন ভাঙাগড়া বিষয়ে নির্ভুল তথ্য দেওয়া, যাতে জনগণ রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয়ে সর্বদা সজাগ ও সচেতন থাকে। চলতি শতাব্দীর প্রথম দিকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে, বিভাগীয় শহর, জেলা শহর, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতি মাসে কোনো কোনো দলের জনসভা অনুষ্ঠিত হতো। বেশ কিছু বছর ধরে সব রাজনৈতিক দলের এ ধরনের কর্মকাণ্ড সংগঠিত হয় না বলেই ধরে নেওয়া যায়। ঢাকায় ও বিভাগীয় মহানগরে ইস্যুভিত্তিক কিছু সভা হলেও তৃণমূল পর্যায়ে তেমন গণসংযোগ দেখা যায় না। ফলে জনগণ রাজনৈতিক তথ্য বিষয়ে অবহিত থাকে না। অধিকাংশ নাগরিক Facebook-নির্ভর হওয়ায় পত্রপত্রিকা যেমন পড়ে না তেমনি আবার Facebook-এর ভুল তথ্যে সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তি। একথা বলা খুব একটা তথ্যহীন হবে না যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অধিকাংশ প্রার্থী রাজনৈতিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তেমন নয়, তাই তারাও জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে না। অবশ্য একটা উল্লেখযোগ্য সময় ধরে দলীয় মার্কায় স্থানীয় নির্বাচন হয়েছে।
আর একটি বিষয় আমাদের উপেক্ষা করা ঠিক হবে না যে, বাংলাদেশের অধিকাংশ নাগরিকই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তৎপর হয়। তাই ভোটের সার্বভৌমত্ব কায়েম করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর জনসেবায় অবদান রাখার মতো তুলনামূলক বিবেচনাযোগ্য এবং ওইসব প্রার্থীর প্রাথমিক পবিত্র দায়িত্ব হলো ভোটারকে তাদের দলের আদর্শ, অন্য দলের আদর্শ, উদ্দেশ্য ও ইশতেহারের সঙ্গে স্বীয় দলের ভালোমন্দ বুঝিয়ে বলা। জনগণ যাতে দলগুলোর জনস্বার্থ বিষয়ক প্রতিশ্রুতি বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পায়।
এখানে আর একটা প্রশ্ন আসতে পারে পাশ্চাৎপদ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সচেতনতা বৃদ্ধি অনেকটা দুঃসাধ্য কাজ। একটি বিষয় আমাদের স্বীকার করা উচিত- জনগণকে সচেতন করা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ওপরই নির্ভর করে না। প্রকৃতির শিক্ষার ওপরও নির্ভর করে। তাই জনগণকে একদম মূর্খ ভাবা ঠিক হবে না। প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত ও আন্তরিকতা।
জনগণকে যদি রাজনৈতিক দলগুলো সত্যিকারভাবে সচেতন করে গড়ে তোলে তাহলেই ‘ভোটের ক্ষমতাই শেষ কথা’ এটা প্রতিষ্ঠিত হবে। সচেতন জনগণ যখন অবস্থান নেয় তখন সামরিক আমলা, বেসামরিক আমলা যে শ্রেণি-পেশার কর্মকর্তা-কর্মচারী হোক না কেন; জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নেন না, নিতেও পারেন না।
প্রসঙ্গত আর একটা বিষয় এখানে বলতে হয়। বিষয়টি হলো ভারতের পশ্চিম বঙ্গের সিপিএমের একটি প্রচারের ধরন উল্লেখ করতে চাই। ১৯৯৯ সালের পয়লা মে ‘মহান মে দিবস’। যাদবপুর রেলস্টেশনে দেখি দুই মাথায় দুজন ও মাঝখানে একজন দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখছেন। তিনজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর। আমি একজনার বক্তব্য শুনলাম ১০ মিনিট। লোকজন বক্তব্য শুনছে আর হেঁটে যাচ্ছে। আমি যাবদপুর থেকে হেঁটে হেঁটে পার্কসার্কাস পর্যন্ত এলাম। তিন ঘণ্টার হাঁটাহাঁটির মধ্যে শতাধিক স্থানে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের মে দিবসের বক্তব্য দিতে দেখলাম। আমি জনসচেতনতা সৃষ্টির এই অভিনব কৌশল বিষয়ে রাত্রে যাবদপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গোপাল চক্রবর্তীর (তিনি একজন সিপিএমের নেতা ছিলেন) কাছে জানতে চাইলাম এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের তাৎপর্য। তিনি বললেন, আজ ৫০ হাজারের বেশি অভিজ্ঞ মানুষ ওই রকম ৫-১০ জনের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন। স্যার বললেন যে, যেসব মানুষকে পশ্চিমবঙ্গে ওইভাবে বক্তব্য শোনানো হয়েছে ওই মানুষগুলোকে এক স্থানে জড়ো করে বক্তব্য শোনানোর চেয়ে এটাই যুক্তিসঙ্গত। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিকার অর্থে সর্বসাধারণের সার্বভৌমত্বের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাহলে জনতার ভোটের ক্ষমতাও কার্যকর করা যায়।
এ ক্ষেত্রে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীর দায়িত্ব অন্যতম। প্রতিটি সংসদীয় এলাকার প্রার্থীরা যদি একটি বিষয়ে একমত থাকেন যে, তারা তাদের দলীয় নির্বাচনি ইশতেহার, দলীয় আদর্শ ও উদ্দেশ্য প্রচার করে ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোটদানে আগ্রহী করবেন; অন্য কোনো বাঁকা পথে ভোটারদের প্রভাবিত করবেন না, তাহলেই ‘জনগণের ভোটের ক্ষমতা শেষ কথা’ বাক্যটির যথার্থতা বাস্তবায়িত হয়- অন্যথায় না।
লেখক: উপউপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত), প্রাইম ইউনিভার্সিটি। অর্থনীতিবিদ ও কলামিস্ট


.jpg)