দুই ডিসেম্বর- দাসপ্রথা বিলোপ আন্তর্জাতিক দিবস। দাসপ্রথা বললে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে প্রাচীন যুগের এক নির্মম চিত্র- কালো মানুষদের শৃঙ্খলে বেঁধে জাহাজে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তারা হচ্ছে এক দেশের সম্পত্তি, তাদের জীবনের দাম শুধু বাজারের দর। ইতিহাস বলে, এ নিষ্ঠুরতা আইনি ও নৈতিকভাবে অনেক আগেই বিলোপ হয়েছে। আসলে কি দাসপ্রথা শেষ হয়েছে? আধুনিক সমাজের পর্দার আড়ালে এখনো বেঁচে আছে এক অদৃশ্য শৃঙ্খল, যেখানে মানুষ এখনো দাস, শুধু নাম বদলেছে- শিশুশ্রম, গৃহকর্মী নির্যাতন, মানব পাচার, বেতনহীন শ্রম, জোরপূর্বক বিবাহ কিংবা ঋণের দাসত্ব।
বিশ্বে আজ প্রায় ৫ কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে আধুনিক দাসত্বের শিকার- জাতিসংঘের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে এমন ভয়াবহ পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। এদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ এই অদৃশ্য শৃঙ্খলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। দাসত্ব এখন আর কেবল জোর করে শৃঙ্খল পরানোর ব্যাপার নয়; বরং এটি এমন এক কাঠামো, যেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য ও সামাজিক অবিচার মিলেমিশে তৈরি করেছে এক নিঃশব্দ কারাগার।
বাংলাদেশে শিশুশ্রম এখনো দুঃখজনক বাস্তবতা। শহরের অলিগলিতে, হোটেল-রেস্তোরাঁয়, ইটভাটায় কিংবা গার্মেন্টসে হাজারো শিশু ন্যায্য মজুরি ছাড়া শ্রম দিচ্ছে। তারা জানে না বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ের গন্ধ, জানে না শৈশবের স্বাধীনতা কী। অনেকে আবার কাজের জায়গায় নির্যাতনের শিকার হয়, কখনো শারীরিক, কখনো মানসিক। এটি শুধু দারিদ্র্যের ফসল নয়, এটি এক সামাজিক অন্ধত্বের ফল, যেখানে শিশুর শ্রমকে আমরা ‘সহজ সমাধান’ বলে মেনে নিয়েছি।
গৃহকর্মীদের অবস্থাও কম ভয়াবহ নয়। শহরের অনেক ঘরে এখনো তারা আধুনিক দাসত্বের শিকার। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করেও অধিকাংশ সময় তারা ন্যায্য মজুরি পায় না। তাদের ছুটি নেই, ব্যক্তিগত জীবন নেই, অনেকের পরিচয়পত্র পর্যন্ত তাদের নিয়োগকর্তার কাছে আটকে রাখা হয়। আইন রয়েছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। বাংলাদেশে ২০১৫ সালে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি প্রণীত হলেও তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
মানব পাচার এই আধুনিক দাসপ্রথার সবচেয়ে নির্মম রূপ। দেশের নানা অঞ্চলের মানুষ বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলো বিদেশে ভালো কাজের আশায় দালালের মাধ্যমে পাড়ি জমায়। কিন্তু গন্তব্যে গিয়ে তাদের অনেকে পাসপোর্ট হারায়, বেতন পায় না, নির্যাতনের শিকার হয়, বা বাধ্য হয়ে যৌনকাজে নিযুক্ত হয়। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অনেক নারী ও কিশোরী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মানব পাচারের শিকার হয়ে আজও ফিরতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে (বিশেষত সৌদি আরবে) শ্রমিক হিসেবে গিয়ে অনেক নারী অভিবাসী শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম নির্যাতনের শিকার হয়; অনেকে দেশে ফেরেন লাশ হয়ে। এই দাসত্ব আজ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্ধকার দিক হয়ে উঠেছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য এ শৃঙ্খলকে আরও শক্ত করে। বিশ্বায়নের যুগে আমরা যখন প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও পুঁজির প্রবাহের কথা বলি, তখন এই বৈষম্য ক্রমে বেড়ে চলে। ধনী দেশগুলো সস্তা শ্রমের খোঁজে দরিদ্র দেশগুলোর মানুষকে ব্যবহার করছে। বড় বড় কোম্পানির সাপ্লাই চেইনে আজও বেতনহীন বা অতি নিম্নবেতনের শ্রমিক কাজ করছে। পোশাকশিল্প থেকে ইলেকট্রনিক পণ্যের উৎপাদন পর্যন্ত- অদৃশ্য দাসরা নীরবে ঘাম ঝরাচ্ছে, যাতে ভোক্তা সমাজের চাহিদা পূরণ হয়।
অভিবাসনের চাপও এ দাসত্বের আরেক রূপ। মধ্যপ্রাচ্য বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শ্রমবাজারে লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছে কঠিন পরিবেশে, প্রায়ই আইনি সুরক্ষা ছাড়াই। অনেকে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন, বেতন না পেয়ে দেশে ফিরে আসেন ঋণের বোঝা নিয়ে। এই অভিবাসী শ্রমিকরাই দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা এনে দেন, কিন্তু তাদের মানবিক মর্যাদা প্রায়শই অবহেলিত থাকে।
বিশ্বের নানা প্রান্তে আধুনিক দাসত্বের আরও ভয়ংকর রূপ দেখা যায়। আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে এখনো শিশুদের জোরপূর্বক সৈনিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মৎস্যশিল্পে হাজারো মানুষ বন্দির মতো কাজ করছে, কোনো চুক্তি বা মজুরি ছাড়াই। আবার উন্নত দেশগুলোতেও যৌনপাচার ও বাধ্যতামূলক শ্রম চলছে নীরবে, অনেক সময় অভিবাসী বা অনথিভুক্ত শ্রমিকদের দিয়ে।
এ বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে- দাসপ্রথা সত্যিই কি বিলোপ হয়েছে, নাকি শুধু রূপ বদলেছে? আধুনিক সমাজে স্বাধীনতার সংজ্ঞা যতই বড় হোক, বাস্তবিক অর্থে অনেক মানুষের জীবন এখনো নিয়ন্ত্রণাধীন। তারা কারও না কারও অধীনে বাধ্য, শোষিত, বন্দি। প্রযুক্তি ও পুঁজির যুগে এই দাসত্ব আরও জটিল, কারণ এখন তা সহজে চেনা যায় না। শিকল নেই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ আছে। গায়ের দাগ নেই, কিন্তু মানসিক শৃঙ্খল অটুট।
রাষ্ট্র ও সমাজের দায় এখানে অস্বীকার করার উপায় নেই। দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা বিস্তার, শ্রম আইন প্রয়োগ ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদার ছাড়া এই দাসত্ব ভাঙা সম্ভব নয়। শুধু আন্তর্জাতিক দিবস পালন নয়, প্রতিটি রাষ্ট্রকে তার নিজস্ব কাঠামোর মধ্যে এই সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে। বাংলাদেশে যেমন নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, মানব পাচার ও শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকলেও, বাস্তব প্রয়োগে আমরা পিছিয়ে। প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও আইনি দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের সাহস জোগায়।
সচেতন সমাজ গঠন এ অমানবিক কাঠামো ভাঙার প্রথম পদক্ষেপ। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবাইকে জানতে হবে মানবমর্যাদার অর্থ কী, শ্রমের ন্যায্যতা কী এবং কেন কারও শ্রমকে শোষণ করা অপরাধ। মিডিয়া, নাগরিক সমাজ ও এনজিওগুলোকে এ বিষয়ে আরও সরব হতে হবে। শুধু শহর নয়, গ্রামাঞ্চলেও সচেতনতা বাড়াতে হবে, কারণ দাসত্বের অনেক শিকড় সেখানে।
আধুনিক দাসত্বের বিরুদ্ধে লড়াই একদিনের নয়, এটি দীর্ঘ সামাজিক রূপান্তরের লড়াই। যতদিন না পর্যন্ত আমরা বুঝতে পারি যে প্রতিটি মানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী, ততদিন এই অদৃশ্য শৃঙ্খল আমাদের সমাজে রয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন জাতিসংঘ, আইএলও ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এ বিষয়ে কাজ করছে। প্রত্যেক দেশের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি না থাকলে এগুলো কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
অন্যদিকে, ভোক্তা সমাজেরও এখানে ভূমিকা রয়েছে। আমাদের ভোগের প্রতিটি পণ্য কোথা থেকে আসে, কে তৈরি করে, সে প্রশ্ন করা দরকার। যদি আমরা সস্তা পোশাক বা পণ্য কিনি, যার পেছনে শিশুশ্রম বা শোষণ লুকিয়ে আছে, তাহলে আমরাও সেই শৃঙ্খলের অংশ হয়ে পড়ি। নৈতিক ভোগবাদ এখন সময়ের দাবি- যেখানে ভোক্তা ও উৎপাদক উভয়ের মানবাধিকার রক্ষা পায়।
আধুনিক দাসত্বের বিরুদ্ধে লড়াই আসলে স্বাধীনতার নতুন সংজ্ঞা খোঁজার লড়াই। এটি কেবল আইনি নয়, নৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নও বটে। স্বাধীনতা মানে শুধু রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে মুক্ত থাকা নয় বরং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে মুক্ত থাকা। যতদিন দারিদ্র্য, লিঙ্গ বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার থাকবে, ততদিন দাসত্ব কোনো না কোনো রূপে বেঁচে থাকবে।
এ কারণেই ২ ডিসেম্বর দিনটি কেবল ইতিহাসের স্মৃতি নয়, এটি বর্তমানের প্রতিজ্ঞা। প্রতিজ্ঞা- কোনো মানুষ আর শোষণের শিকার হবে না, কোনো শিশুর শৈশব বিক্রি হবে না, কোনো শ্রমিক আর ন্যায্য মজুরি ছাড়াই ঘাম ঝরাবে না। দাসপ্রথা বিলোপের লড়াই এখনো শেষ হয়নি; কেবল যুদ্ধক্ষেত্র বদলেছে। আজ এই অদৃশ্য যুদ্ধের সৈনিক হতে হবে আমাদের সবাইকে।
যখন আমরা স্বাধীনতার কথা বলি, তখন মনে রাখা দরকার- স্বাধীনতা তখনই অর্থপূর্ণ, যখন তা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। আধুনিক দাসত্বের এ অন্ধকারে যতক্ষণ পর্যন্ত একটিও মানুষ বন্দি থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানবজাতির স্বাধীনতা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

