দেশের আপামর জনসাধারণকে সেবা দিয়ে উন্নতির সূচকগুলোকে ক্রমশ ঊর্ধ্বগামী করাই প্রশাসনের মূল দায়িত্ব। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর থেকে সমাজের এমন সব দিক নিয়ে চিন্তাশীল মানুষের মত প্রকাশের সুযোগ হয়েছে, যা আগে ছিলই না বা অত্যন্ত সীমিত ছিল। সে রকম একটি বিষয় হচ্ছে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়ের সমন্বয়জনিত নাগরিকদের জন্য কল্যাণচিন্তা। সরকারি চাকরির বিভিন্ন শাখা সম্পর্কে অবহিত আছেন এমন ব্যক্তিদের এমন একটি সাধারণ ধারণা আছে যে, পররাষ্ট্র সার্ভিসে কেবল উচ্চতম মেধাবীরা কাজ করেন। এখানে প্রথমত, ‘মেধাবী’র সংজ্ঞা পরীক্ষা করা প্রাসঙ্গিক। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, মেডিসিন, অর্থনীতি ও ইংরেজি সাহিত্যের সমন্বয়ে কোনো পরীক্ষায় উঁচু নম্বর পাওয়া এবং ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, আরবি ও রাজনীতিবিজ্ঞান সমন্বয়ে কোনো পরীক্ষায় উঁচু নম্বর পাওয়া এক বিষয় নয়। প্রথম গুচ্ছটি তুলনামূলকভাবে বেশ কঠিন। কাজেই দ্বিতীয় গুচ্ছে উচ্চতর নম্বর পেয়ে যারা কূটনৈতিক সার্ভিসে যোগদান করেছেন কেবল তাদের মেধাবী বলা সংজ্ঞাটির পূর্ণ যুক্তি প্রকাশ না করে কেবল আংশিক যুক্তিটি প্রকাশ করে থাকে। তেমনি এ সার্ভিসে সম্পাদনযোগ্য কাজের কাঠিন্যও অন্যান্য সার্ভিসের কাজের কাঠিন্যের চাইতে কোনোভাবেই বেশি নয়। কাজেই এখানে যারা অপশন দিয়ে যোগদান করেন তারা তুলনামূলকভাবে কঠিন কোনো কর্মসম্পাদনের জন্যই যে এখানে আসেন তাও সঠিক না।

সাধারণত এ চাকরিতে উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ, সমাজ, সংস্কৃতি এবং সামাজিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা যায় বলে এ চাকরিতে প্রার্থীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপশন দিয়ে থাকেন। এখানে আর্থিক সুবিধাদিও বেশি। এবার আসি অন্য একটি দিকে- তা হলো এ পেশাটি মেধা তালিকায় কেবল উঁচ্চতর স্থান অধিকারীদের দিয়ে গঠিত নয়। যেমন- দেশের প্রথম সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ১৯৭৩ ব্যাচের অনেক প্রার্থী তুলনামূলকভাবে উচ্চতর মেধাতালিকায় স্থান পাওয়া সত্ত্বেও অপশন দিয়ে প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারে যোগদান করেন। ১৯৭০ এবং তৎপূর্ববর্তী বছরগুলোতে মেধা অনুযায়ী ৯৫ শতাংশের বেশি প্রার্থী কূটনৈতিক সার্ভিসের পরিবর্তে প্রশাসন বাছাই করতেন। আবার পশ্চিম পাকিস্তানি প্রার্থীরা মাতৃভাষা উর্দু নিয়ে অনেক বেশি নম্বর পেয়ে সুবিধা পেতেন। ১৯৫৮ সালে অষ্টম স্থান অধিকারী প্রার্থী অডিট ও অ্যাকাডন্টসে যোগদান করেন, কারণ তার পছন্দ। ১৯৭৯ ব্যাচে যোগদানকারী, পরবর্তীতে ক্যাবিনেট সেক্রেটারি হয়েছেন, একজন প্রার্থী অপশন দিলেই পররাষ্ট্র সার্ভিস পেতে পারতেন। কিন্তু তিনি প্রশাসনে যোগদান করেন। ১৯৮১ ব্যাচে প্রথম স্থান অধিকারী প্রার্থী কাস্টমস সার্ভিসে যোগদান করেন। ওই ব্যাচে অন্য তিনজনের সঙ্গে দুজন কর্মকর্তা পররাষ্ট্র সার্ভিসে যোগদান করেন। যাদের মেধা তালিকার ওপরে ৫০ অবস্থানেরও উচ্চতর স্থান লাভকারী বেশ কয়েকজন প্রার্থী ট্যাক্স, অডিট এবং প্রশাসনে যোগদান করেন। পরবর্তী সব ব্যাচেই কমবেশি এ প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
পরিকল্পনা কমিশন এ দুই সংস্থার মাঝখানে পরিকল্পনার বা প্রকল্পের পিপি, টিপি, দেশি মুদ্রার নিশ্চয়তা প্রদান, প্রকল্পের কর্মচারী নিয়োগ, সমঝোতা স্মারক, ঋণচুক্তি, অনুদান চুক্তি ও নানাবিধ প্রটোকল সম্পাদনের কাজে সহায়তা করে থাকে। অন্যদিকে বিদেশে অবস্থিত আমাদের কূটনৈতিক মিশনগুলো বিদেশে আমাদের কর্মীদের কর্মসংস্থানের বিষয়েও মূল ভূমিকা পালন করেন না। এটি করেন বৈদেশিক ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং তাদের লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় কর্মরত আমাদের প্রায় ৯০ লাখ কর্মীর বাছাই, প্রশিক্ষণ, নিয়োগপত্র আনয়ন, পাসপোর্ট ও ভিসার ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা ইত্যাদি কাজ এ এজেন্সিরা বিদেশি নিয়োগকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করে। কর্ম অনুসন্ধান এবং চুক্তি সম্পাদনের বিষয়গুলোতে আমাদের কূটনৈতিক সার্ভিসের সদস্যদের অবদান একান্তই আনুষ্ঠানিক। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা স্বার্থে সবচেয়ে নিবিড়ভাবে জড়িত দেশ হচ্ছে আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী। নেপাল বা ভুটান আজ পর্যন্ত আমাদের প্রতিরক্ষার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়নি।
সমরনীতির মানে অর্থনীতি তথা অর্থনৈতিক স্বার্থ। হিটলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ববাজার দখল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। বৃহৎ প্রতিবেশীর সঙ্গে আমাদের এক বছরেই বাণিজ্যঘাটতি ৯.২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এমতাবস্থায় দিল্লিতে অবস্থিত আমাদের কূটনৈতিক মিশনে যে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা পদায়িত আছেন তিনি আমাদের কূটনৈতিক সার্ভিসের সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবেন- এমন কোনো কাজ করার মতো থাকে না এবং তা নেইও। তাহলে দূরবর্তী দেশগুলোতে আমাদের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র সার্ভিসের সদস্যদের সমন্বিত হয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করার মতো কোনো বিষয় কি অবশিষ্ট থাকে? কারণ সুদূর চীন আমাদের আক্রমণ করবে না। চীনের সঙ্গেও আমাদের বাণিজ্যঘাটতি ২০.৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তেমনি মস্কোয় আমাদের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা এবং পররাষ্ট্র সার্ভিস সমন্বিতভাবে আমাদের স্বার্থে কোনো ভূমিকা পালন করবেন এমন কাজও মূলত নেই। এখানে উল্লেখযোগ্য যে রাশিয়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে মায়ানমারকে সমর্থন করে বরং আমাদের অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থি ভূমিকাতেই রয়েছে। ওয়াশিংটনেও আমাদের একজন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আছেন। ওই দূরবর্তী দেশে আমাদের প্রতিরক্ষা স্বার্থ আরও ক্ষীণ। সেখানেও দূতাবাস ও তার দপ্তরের সমন্বিতভাবে বাংলাদেশের কোনো সামরিক স্বার্থ দেখভাল করার অবকাশ নেই। সশস্ত্র বাহিনীর জন্য প্রশিক্ষণ এবং সামরিক সাজ-সরঞ্জাম ক্রয়ের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ডিরেক্টর জেনারেল ডিফেন্স পার্চেসের দপ্তর মিলেই করতে পারে, তা তারা করছেও। সম্প্রতি একজন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা খবরের কাগজে আমাদের কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সার্ভিসের সদস্যদের মধ্যে প্রতিটি পর্যায়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে যে সুচিন্তিত মত প্রকাশ করেছেন সেই সূত্রে এ বিষয়টি বিবেচ্য।
আরেকদিকে ১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশের আমদানি-বাণিজ্যে ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ রপ্তানি আয়ের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ উৎপাদনে উঁচু ব্যয়, মালিকদের উচ্চ মুনাফা অর্জন, পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের অভাব আমাদের পণ্যের প্রতি বিদেশি আকর্ষণ বৃদ্ধির জন্য সহায়ক নয়। সামান্য তৈরি পোশাক, কাঁকড়া, নারিকেলের ছোবড়া, আম এবং আরও কিছু পণ্য বিশ্ববাজারে একান্তই সামান্য রূপে প্রতিভাত হয়। অন্যদিকে আমাদের ক্যাপিটাল মেশিনারি এবং গার্মেন্টসের জন্য প্রয়োজনীয় নানাবিধ সাজ-সরঞ্জাম আমদানির প্রচণ্ড চাপ থাকায় শুধু ভারত এবং চীনের সঙ্গে আমাদের এ বিপুল বাণিজ্য-ঘাটতি। এক বছরেই আমাদের রপ্তানি আয় ৪.৭৮ বিলিয়ন ডলার, আর আমদানি খরচ ৬.৪৯ বিলিয়ন ডলার। আবার মধ্য আয়ের দেশে পদার্পণজনিত বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে গিয়ে আমাদের বিদেশের বাজারে কোটামুক্তভাবে প্রবেশের অধিকার সংকুচিত হয়ে আসছে। তখন আমাদের রপ্তানি আরও কমবে এবং বাণিজ্য-ঘাটতি আরও বৃদ্ধি পাবে। এসব বিবেচনায় আমাদের রপ্তানি-বাণিজ্য হঠাৎ হঠাৎ কোনো কোনো সেক্টরে প্রবৃদ্ধি দেখালেও সামগ্রিকভাবে তা আমদানি-বাণিজ্যে ব্যয়িত অর্থের চাইতে অনেক কম বিদেশি মুদ্রা অর্জন করবে। কাজেই দেশের অভ্যন্তরীণ কল্যাণে নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার পদক্ষেপ নিতে হবে। যাতে করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। দেশি কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। কারণ অভ্যন্তরীণ বাজারে বিভিন্ন পণ্যের বিপুল চাহিদা হয়েছে। উঁচু শ্রেণির অল্পসংখ্যক মানুষ ছাড়া বাকিদের কাছে এ পণ্য বিপণন করা সম্ভব হবে। এবং এতে আমদানি-বাণিজ্য অনেকটা হ্রাস করে অন্তত বিশ্বের বড় দুটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য-ঘাটতি অনেকটা কমিয়ে আনা যাবে। কাজেই পররাষ্ট্র সার্ভিসের লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার নানাবিধ উদ্যোগ নেওয়া। কারণ ওই কাজটি দেশের অন্য কোনো সার্ভিসের চাইতে বিদেশে অবস্থিত আমাদের বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশন অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারেন। এখানে আরও কয়েকটি বিষয় বিবেচ্য, তা হলো, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া, পোল্যান্ডের মতো দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের রপ্তানির সম্পর্ক একদম ক্ষীণ। এসব দূতাবাসের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে এগুলোর ব্যয় সঠিক যৌক্তিকতায় আনা আবশ্যক। চীন বা পাকিস্তান যখন বলে যে, আমাদের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করবে- এ কথার অর্থ তারা আমাদের এখানে তাদের রপ্তানি আরও বৃদ্ধি করবে এবং তাই হয়ে আসছে। আমাদের রপ্তানি ওই দুটি দেশে কোনোভাবেই বৃদ্ধি পাবে না। এ স্বার্থ দেখার কাজ করছেন ওই দুটি দেশের কূটনৈতিক সার্ভিসের সদস্যরা। এ ক্ষেত্রে আমাদের কর্মকর্তাদের স্বদেশের পক্ষে ভূমিকা পালনের কোনো সুযোগ নেই। ফরেন সার্ভিস ও প্রতিরক্ষা সমন্বিত প্রয়াসে আমাদের জন্য কোটি মানুষের কল্যাণকারী কোনো কিছু আনয়ন করতে পারেনি। এটা তাদের সীমাবদ্ধতা নয়, আমাদের অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা বিন্যাসটাই সেরকম। কাজেই ফরেন ও ডিফেন্স অফিসগুলোর ব্যয় সম্পাদনের ফলাফলের সঙ্গে ব্যয়িত অর্থ আংশিক অপচয়মূলক। জনগণের করের অর্থ ব্যয়ের আরও ফলদায়কতা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী কোনো যুদ্ধরত বাহিনী নয়, তারা দীর্ঘদিন শান্তিরক্ষার কাজ করছে। পার্বত্য এলাকাতেও তাদের কোনো বিদেশি শত্রুর মোকাবিলা করতে হয়নি। তা একান্ত শান্তিরক্ষার কাজ। অভ্যুত্থান ও সংস্কারের এ শুভলগ্নে নানা স্থানে বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে জনগণের সম্পদের আরও যৌক্তিক ব্যবহারের দিকে দায়িত্বশীল সবার নজর দেওয়া জুলাই শহীদদের স্বপ্নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে। শাসনতন্ত্রের মূলনীতিতেও এগুলো বিদ্যমান।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও প্রজাতন্ত্রের সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল
[email protected]
.jpg)
.jpg)
.jpg)