পররাষ্ট্রনীতিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের কী বলা যায় বা বলতে পারি, সে সীমারেখা নির্ধারণ করতে হবে। পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে অভ্যন্তরীণ নীতির একটা প্রতিফলন। অভ্যন্তরীণ নীতির মধ্যে যদি সমস্যা থাকে, অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি যদি ঠিক না থাকে, তাহলে পররাষ্ট্রনীতি বা অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। সুতরাং, বহির্বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ পরিবেশ সুস্থ রাখা অপরিহার্য।...

আমাদের দেশে যা কিছু ঘটছে তাতে এরকম একটা সন্দেহ জাগে যে, কেউ হয়তো ইচ্ছা করে এগুলো ঘটানোর চেষ্টা করছে, যাতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক দিন দিন আরও খারাপ হয়। কিছু লোকের হয়তো ক্ষুদ্র স্বার্থ থাকতে পারে। সুতরাং এ ব্যাপারে আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত। বর্তমান সরকারও কিছু করতে পারছে বলে মনে হয় না। আশা করি, অন্তত ইলেকশনটা যেন ঠিকমতো হয়ে যায়। নতুন যে সরকার আসবে তারা বুঝবে কীভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কটা একটা স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা যায়। সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক করা খুব সহজ নয়। একটা টেকসই এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্পর্ক যাতে যথাযথভাবে গড়ে ওঠে, তার জন্য উভয় পক্ষকেই কাজ করতে হবে। এখানে দায়টা কার বেশি তা বুঝে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে। সম্পর্ক খারাপ হলে আমাদের কী ক্ষতি হতে পারে, তা মাথায় রেখে সম্পর্কটাকে একটা স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। অনেকের মধ্যে সম্পর্কটাকে উল্টো দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা দেখতে পাচ্ছি।
ভারতের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কসহ অনেক কিছুই জড়িত। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, আমাদের যে পারস্পরিক অবস্থান তাতে দুই দেশের যে গুরুত্বপূর্ণ ভালো সম্পর্ক তা এগিয়ে নিতে হবে। বাস্তবে আমরা তা দেখতে পাচ্ছি না। নানান রকমের উসকানি আছে বা বিভিন্ন রকমের সমস্যা আছে। তা সত্ত্বেও সম্পর্কটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সে চেষ্টা করতে হবে। সে চেষ্টাটা এদিক থেকে নেই। ভারত বিরাট দেশ। তাদের যেভাবেই দেখি না কেন তারা আমাদের চেয়ে সবকিছুতেই অনেক শক্তিশালী।
ছোট দেশ হিসেবে আর কিছু না হোক আমাদের যে অর্থনৈতিক অবস্থান অনেক উন্নত হয়েছে, তা ধরে রাখতে পারি। নিজেদের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে গেলে আমরা সমস্যায় পড়ব। সুতরাং, আমাদের আরও বেশি সতর্ক হওয়া উচিত। আরও বেশি সচেষ্ট হওয়া উচিত। কীভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কটা ভালো করা যায়।
পৃথিবীর অনেক দেশ আছে, যেমন- ইউরোপে ছোট-বড় সব রকমের দেশ আছে। ছোট দেশগুলো কি বড় দেশগুলোর সঙ্গে শত্রুতা করে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কটা সবসময় যে ভালো ছিল তা কিন্তু নয়। তার পরও একটা বোঝাপড়ার মধ্যে আসতে হবে। আমরা যদি মনে করি যে, চীন কিংবা পাকিস্তান এসে আমাদের ক্ষতিগুলো পুষিয়ে দেবে, সেটা সম্ভব নয়। যেমন- ভারতকে দিয়ে চীনের প্রয়োজন কমিয়ে ফেলা যায় না, তেমনি চীনকে দিয়ে ভারতের প্রয়োজনকেও কমিয়ে ফেলা যাবে না। দুটো আলাদা বিষয়। প্রত্যেকের সঙ্গে আমাদের আলাদা আলাদা সুসম্পর্ক প্রয়োজন। আগে যেটা বলা হতো যে, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।
ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্কোন্নয়ন করতে হলে প্রতিযোগিতামূলক প্রতিক্রিয়া জানানো থেকে বিরত থাকতে হবে। একজন কিছু বললে আরেকজন আরও বাড়িয়ে কিছু বলার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পারস্পরিক আস্থার জায়গা তৈরির চেষ্টা চালাতে হবে। সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য বাড়িয়ে বলা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। কূটনৈতিক সম্পর্কোন্নয়নে আমাদের আরও সচেতন ও কৌশলী হতে হবে। কোনো অসংগতির প্রতিবাদ অবশ্যই করতে হবে, সে ক্ষেত্রেও কৌশলী হতে হবে। ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে উত্তেজনা না বাড়িয়ে যা করলে উত্তেজনা কমবে সেই পন্থা নিতে হবে। ভারতের তুলনায় আমাদের সক্ষমতা অনেক কম, তা মাথায় রেখেই আমাদের অগ্রসর হতে হবে।
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই সীমান্ত পথে বহু মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর কথা এসেছে। আমাদের এখানেও নানা রকম কথা বলা হচ্ছে। ওদের দিক থেকেও নানা রকম কথা বলা হচ্ছে। তার পর এই যে পুশ-ইন টুশ-ইন হচ্ছে, তো এগুলোতে যেকোনো সময় আমরা একটা ফাঁদে পা দিয়ে দিতে পারি। সম্পর্কটা আরও খারাপ হয়ে যেতে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করা মানে এই না যে আমরা ভারতের সঙ্গে শত্রুতা তৈরি করব। পাকিস্তান আমাদের সঙ্গে আছে, আমাদের আর ভারতকে প্রয়োজন নেই, এটা মনে করলে তা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক থাকা খুব জরুরি। কিন্তু তা সমতা এবং মর্যাদার ভিত্তিতে। ভারত-পাকিস্তানে চলমান সংঘাত নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান, ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব, মায়ানমারে সম্ভাব্য মানবিক করিডর, রোহিঙ্গা সংকটসহ নানা প্রসঙ্গে এসেছে। যা আলোচনার মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে।
আমরা যদি মনে করি একজনের জায়গায় আরেকজনকে প্রতিস্থাপন করা যায়, তাহলে আমরা বোকার স্বর্গে বাস করছি। বর্তমানে সে লক্ষণটাই বেশি দেখছি। আমাদের অভ্যন্তরীণ চালিকাশক্তি বা মানসিক অবস্থা হয়তো ঠিক নেই। আমরা কী করতে চাই, তা নিজেরা হয়তো বুঝতে পারছি না।
যা সঠিক তা করার জন্য আমাদের নির্ভয় হতে হবে। দেশের জন্য আমাদের সঠিক কাজটাই করতে হবে। দেশের মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে পারে। আগের সরকারের পতনের পেছনে এটাই কারণ ছিল। তারা মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করেছে। ফলে শেষ পর্যন্ত তাদের পতন হয়েছিল।
সুতরাং, দেশের ভেতরের সমস্যগুলো ঠিক করতে হবে। আবার কেউ কিছু বললেই মব সৃষ্টি করে তাকে হেনস্থা করতে হবে, এটাও ঠিক নয়। আশা করি, মানুষের মনে শুভবুদ্ধির উদয় হবে। দেশের ভেতরে আমরা যদি স্থিতিশীল পরিবেশ আনতে পারি, তাহলেই আমাদের পররাষ্ট্রনীতিকে আমরা আরও জোরদার করতে পারব। পররাষ্ট্রনীতিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের কী বলা যায় বা বলতে পারি, সে সীমারেখা নির্ধারণ করতে হবে। পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে অভ্যন্তরীণ নীতির একটা প্রতিফলন। অভ্যন্তরীণ নীতির মধ্যে যদি সমস্যা থাকে, অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি যদি ঠিক না থাকে, তাহলে পররাষ্ট্রনীতি বা অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। সুতরাং, বহির্বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ পরিবেশ সুস্থ রাখা অপরিহার্য।
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত
.jpg)
.jpg)
.jpg)