ঢাকা ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর সম্ভাবনা বাড়ছে: ইইউ পর্যবেক্ষণ সংস্থা বিছানা নাপাক হলে ঐ ঘরে নামাজ পড়া যাবে কি? পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ও কার্য উপদেষ্টা কমিটি গঠন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিচুক্তি অনিশ্চিত কারাগারে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার ব্যবস্থা করলেন টাঙ্গাইলের ডিসি বরাদ্দ অর্থের ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে চার স্তরে মজুত, জলাতঙ্কের ভ্যাকসিনের কোনো সংকট নেই: স্বাস্থ্যমন্ত্রী নারী ও শিশুর সুরক্ষায় প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ প্রয়োজন: সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ভোটের দায়িত্বে মারা গেলে ১০ লাখ টাকা পাবে পরিবার মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি পোশাক শিল্পের জন্য অশনি সংকেত: ড. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানকে আলোচনা বিলম্ব করার ‘মূল্য দিতে হবে’: ট্রাম্প আড়াইহাজারে চাঁদাবাজির অভিযোগে এসআই প্রত্যাহার পাবনায় সন্তানের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ৩ গাজীপুরে বাস উল্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩ শিক্ষার্থী আহত সিংগাইরে চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে মৃত্যু: ১৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা চার দিনের সংগীত উৎসবে মেতে উঠছে ঢাকা সরকারি ভাতা বিতরণে নগদের প্রতি আস্থা অব্যাহত আলিয়ঁসে শুরু  হচ্ছে তিন শিল্পীর ‘ত্রিবন্ধন’ জাকসু ভিপি ও জিএসের ছাত্রত্ব শেষ: পদে বহাল থাকা নিয়ে নতুন সংকট ঢাকাসহ ১২ জেলায় রাত ১টার মধ্যে বজ্রবৃষ্টির আভাস ধানমন্ডিতে বহুতল ভবনে আগুন সময়টা কি তবে শেষ! রাসুল (সা.)-এর বর্ণনায় আজকের সমাজ বড় বাজেটের বড় প্রশ্ন সুর-ছন্দের আন্তর্জাতিক মেলবন্ধনে মেতে উঠছে ঢাকা ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে দেশজুড়ে সনি-স্মার্টের ‘গোল্ডেন গোল অফার’ শুরু প্রেমিকার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই রাবি শিক্ষার্থীর গলায় ফাঁস ‘ফেসবুক ফার্স্ট’ রতন শেখ চতুর্থবার সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ ওসি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ৫ বছরের মেগা কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার গণতন্ত্রমুখী বাজেট ও প্রত্যাশার সমীকরণ পশ্চিমবঙ্গে নতুন মন্ত্রিসভার দপ্তর বণ্টন
Nagad desktop

এলপিজি খাতে জ্বালানি সুরক্ষায় বিইআরসি ব্যর্থ!

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:০৭ এএম
আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:০৮ এএম
এলপিজি খাতে জ্বালানি সুরক্ষায় বিইআরসি ব্যর্থ!
ড. এম শামসুল আলম

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন কর্তৃক ১২ এপ্রিল ২০২১ তারিখে লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ আদেশ-২০২১-এ বলা হয়:

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন-২০০৩-এর ধারা ২২(খ) এবং ধারা ৩৪ অনুযায়ী প্রবিধানমালার মাধ্যমে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসারে এলপিজিসহ পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের মূল্যহার নির্ধারণ করা অত্র কমিশনের দায়িত্ব। এ লক্ষ্যে এলপিজিসহ পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের ট্যারিফ নির্ধারণ-সংক্রান্ত (১) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রবিধানমালা-২০১২; (২) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রবিধানমালা-২০১২ এবং (৩) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রবিধানমালা-২০১২ প্রণয়ন করা হয় এবং সেগুলোর ওপর আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভেটিং গ্রহণের লক্ষ্যে ২৭ জুন ২০১২ এবং ৩ জুলাই ২০১২ তারিখে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে প্রেরণ করা হয়, যা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। 

এলপিজির মূল্যহার নির্ধারণের জন্য কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ৩১ জুলাই ২০১৬ তারিখে কমিশনে একটি পত্র প্রেরণ করে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন-২০০৩ মোতাবেক ক্যাবের আবেদনের ভিত্তিতে মূল্যহার  পুনর্নির্ধারণের পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ না থাকায় কমিশন ওই আবেদন আমলে নেয়নি। অতঃপর ভোক্তাপর্যায়ে এলপিজির মূল্যহার পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে নির্দেশনা চেয়ে ক্যাব হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নম্বর- ১৩৬৮৩/২০১৬ দায়ের করে। ওই রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক ২৫ আগস্ট-২০২০ একটি দেন।

ওই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন কর্তৃক দাখিলকৃত জবাব হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক বিবেচিত না হওয়ায় ২৯ নভেম্বর ২০২০ তারিখে হাইকোর্ট বিভাগ স্বপ্রণোদিত (Suo Moto) হয়ে কনটেম্পট পিটিশন নং-৪৪৭/ ২০২০-এ আদালত অবমাননার রুল ইস্যু করেন। ফলে কমিশন হাইকোর্ট বিভাগের ওই আদেশ প্রতিপালনের উদ্যোগ নেয় এবং ১৪ জানুয়ারি ২০২১ গণশুনানি আয়োজন করে। সরকারি-বেসরকারি লাইসেন্সিদের এলপিজির মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ প্রস্তাব কমিশনে পাঠাতে বলা হয়। আগ্রহী ব্যক্তি/সংস্থা/প্রতিষ্ঠানসমূহকে গণশুনানিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে কমিশনের ওয়েবসাইট ও গণমাধ্যমে গণবিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। গণশুনানিতে ক্যাব ও সরকারি-বেসরকারি লাইসেন্সিদের প্রতিনিধসহ গণমাধ্যম কর্মী, সংস্থা ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট নাগরিকরা অংশগ্রহণ করেন। 

গণশুনানিন্তে ১২ এপ্রিল ২০২১ তারিখে কমিশন প্রতি ১২.৫ কেজি বোতলজাত এলপিজির মূল্যহার বেসরকারি লাইসেন্সিদের ক্ষেত্রে ১০৬৮ টাকা থেকে ১০১৬ টাকা এবং সরকারি লাইসেন্সিদের ক্ষেত্রে ৬০০ টাকা থেকে ৫৯১ টাকা পুনর্নির্ধারণ করে। মূল্যহারে সমন্বয়কৃত মজুতকরণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ, ডিস্ট্রিবিউটর চার্জ এবং রিটেইলার চার্জ নির্ধারণ করে বেসরকারি লাইসেন্সিদের ক্ষেত্রে যথাক্রমে ১৪৯ টাকা, ২৫ টাকা ও ২৮ টাকা। সরকারি লাইসেন্সিদের ক্ষেত্রে যথাক্রমে ১১৭.৭৫ টাকা, ৫০ টাকা ও ৩০ টাকা। এলপিজি আমদানি মূল্যহার ধরা হয় ৬৪২ টাকা। জাহাজ ভাড়া ও প্রিমিয়াম চার্জ ও সেই সঙ্গে অন্যান্য চার্জ ধরা হয় যথাক্রমে ১০১ টাকা ও ৭ টাকা। উৎস/ইআরএল পর্যায়ে সরকারি এলপিজির মূল্যহার ধরা হয় ৩৫৭.৮৯ টাকা।

ঘোষিত মাসভিত্তিক সৌদি সিপির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভোক্তাপর্যায়ে এলপিজি/আটোগ্যাসের মূল্যহার শুনানিন্তে নির্ধারণের জন্য সুপারিশ প্রদানের লক্ষ্যে গণশুনানিতে পক্ষগণ প্রতিনিধিদের আপত্তি উপেক্ষা করে কমিশন অত্র আদেশের ৮(৬) অনুচ্ছেদে ক্যাব ও লাইসেন্সি উভয়ের প্রতিনিধি নিয়ে ৭ সদস্যের এক কমিটি গঠন করে। এ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কমিশন গণশুনানি ব্যতীত নির্বাহী আদেশে প্রতি মাসে সৌদি সিপির ভিত্তিতে এলপিজির মূল্য সমন্বয় আদেশ দেয়। এ কমিটি স্বার্থসংঘাত যুক্ত হাওয়ায় এবং বিইআরসি আইন ও প্রবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় ক্যাব এ কমিটিতে তার প্রতিনিধি পাঠায়নি। অর্থাৎ কমিটিতে ক্যাবের প্রতিনিধি অনুপস্থিত। অবশ্য এলএনজির আমদানি মূল্য ভোক্তাপর্যায়ে গ্যাসের মূল্যহারে মাসভিত্তিক সমন্বয়ের লক্ষ্যে অনুরূপ গঠিত কমিটি ক্যাবের দায়েরকৃত ১৮১২০/২০২২ নম্বর রিট মামলায় উচ্চ আদালত স্থগিত করে রেখেছেন।

ক্যাব ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে কমিশনের চেয়ারম্যানকে লেখা পত্রে প্রতি ১২.৫ কেজি সরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের বিদ্যমান মূল্যহার ৬৯০ টাকা বহাল রেখে এ মূল্যহারে এলপিজি বস্তিবাসী নারী ও নারীদের হোটেল-রেস্তোরাঁর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ায় বিতরণের প্রস্তাব করে। পত্রে উল্লেখ করা হয়, সরকার ভর্তুকি দিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে দরিদ্র ভোক্তাদের বিদ্যুৎ দেয়। ২০২৪ সালের হিসেবে দেখা যায়, সরকার ৪৩.৮৪ শতাংশ আবাসিক ভোক্তাকে দরিদ্র হিসেবে লাইফ লাইন গ্রাহকের মূল্যহারে বিদ্যুৎ দেয়। বেসরকারি বা কালোবাজারে সরকারি এলপিজির মূল্যহার ১,৫৪০ টাকা বা তারও বেশি। অথচ সাশ্রয়ী মূল্যের সরকারি এলপিজি বিত্তবানদের দেওয়া হয়। আবার কমিশনের নির্ধারিত মূল্যহার অপেক্ষায় লাইসেন্সিরা বেশি মূল্যহারে এলপিজি বিক্রি করে। তা নিয়ন্ত্রণে কমিশন নিষ্ক্রিয়। জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য এমন অবিচার, অনাচার, বৈষম্য ও অসমতার অবসান এবং প্রান্তিক জনগণের জ্বালানিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হতে হবে। বিইআরসি এ প্রস্তাব বরাবরের মতো এবারও উপেক্ষা করেছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন-২০০৩-এর ধারা ২২(খ) এবং ধারা ৩৪ অনুযায়ী প্রবিধানমালার মাধ্যমে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসারে এলপিজিসহ পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের মূল্যহার নির্ধারণ করা অত্র কমিশনের দায়িত্ব। এ লক্ষ্যে এলপিজিসহ পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের ট্যারিফ নির্ধারণ-সংক্রান্ত (১) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রবিধানমালা-২০১২; (২) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রবিধানমালা-২০১২ এবং (৩) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রবিধানমালা-২০১২ প্রণয়ন করা হয়।...

কমিশনের হিসেবে তিতাসের গ্যাস বিতরণে সিস্টেম লস ০২ শতাংশ। কিন্তু তিতাসের হিসেবে তা ১৩.৫৩ শতাংশ। তিতাসে গ্যাস অপচয় ও চুরি নিয়ন্ত্রণহীন। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে কমিশন পক্ষগণ প্রতিনিধিদের প্রস্তাব আমলে নেয়। অবৈধ গ্যাস সংযোগ ও নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করা এবং আবাসিকে প্রিপেইড ও শিল্পে এভিসি মিটার লাগানোর আদেশ দেয়। আদেশ কার্যকর করা না হলেও কমিশন নিষ্ক্রিয়। প্রতি বছর এলপিজি ও তিতাসের গ্যাস বিস্ফোরণে ভোক্তারা নির্বিচারে মারা যাচ্ছে। এর কোনো প্রতিকার নেই। ভোক্তাদের কোনো নিরাপত্তা নেই। কমিশন নির্বিকার। পরিস্থিতি দেখে মনে হয় রোম পোড়ে, নিরো বাঁশি বাজায়। বিগত ৮ মে তারিখে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী তার বাসায় গ্যাস বিস্ফোরণে দগ্ধ হয় এবং হাসপাতালে মারা যায়। এ অবস্থায় ক্যাব ১৫ মে ২০২৫ তারিখের এক পত্রে তিতাসের কাছে ২০০১ সাল থেকে হালনাগাদ (১) যত দুর্ঘটনা ঘটেছে, প্রতিটি দুর্ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট এবং প্রতিটি দুর্ঘটনার ব্যাপারে গৃহীত ব্যবস্থাবলির বিবরণ, (২) অবৈধ গ্যাস সংযোগ ও গ্যাস নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করা সংক্রান্ত বছরভিত্তিক তথ্যাদি এবং সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থাগুলোর বছরভিত্তিক বিবরণ, (৩) তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে গৃহীত বিভাগীয় কার্যক্রমের বছরভিত্তিক বিবরণ এবং (৪) মোট গ্যাস সরবরাহ ও সিস্টেমলসের বছরভিত্তিক বিবরণ চেয়ে পাঠিয়েছে। যদি কমিশন বিআরসি আইনের আওতায় অর্পিত দায়িত্ব পালনে আন্তরিক ও সক্রিয় হতো তাহলে ভোক্তাদের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হতে হতো না।

বিইআরসির সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল জলিলের বিরুদ্ধে আদালতের ২৫ আগস্ট ২০২০ তারিখের আদেশ অবমাননার অভিযোগ গঠিত হয়, কারণ তিনি হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গণশুনানি করে এলপিজির দাম নির্ধারণ করেননি। এ আদেশ অমান্য করায় ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর আদালত তার বিরুদ্ধে কন্টেম্পট রুল ইস্যু করেন এবং কারণ দর্শাতে বলেন কেন তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। রুল নিষ্পত্তির সময় আদালত আব্দুল জলিলের নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি বিবেচনায় নেন। তবে তাকে সরাসরি ক্ষমা না করে আদালত বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আদালত বলেন, সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের আদেশ দেশের সব সংবিধিবদ্ধ সংস্থা ও কর্মকর্তার জন্য বাধ্যতামূলক। কমিশনের মতো একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে তার এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছে। বিশেষ করে আদালত উল্লেখ করেন যে, গণশুনানি একটি অপরিহার্য প্রক্রিয়া যা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট, এবং তা এড়িয়ে গিয়ে দাম নির্ধারণ করা বেআইনি ও অসাংবিধানিক। 

আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয় যে, আব্দুল জলিলের আচরণ ‘highly irresponsible and in contempt of the order of the court’। এমন আচরণ একজন দায়িত্বশীল পাবলিক অফিসার হিসেবে তার উপযুক্ততা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আদালত এটিও স্পষ্ট করেন যে, যদিও তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগের উপাদান বিদ্যমান ছিল, তার নিঃশর্ত ক্ষমা ও ভবিষ্যতে আদালতের নির্দেশ যথাযথভাবে পালনের প্রতিশ্রুতির কারণে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তাকে সতর্ক করা হয়েছে। সবশেষে, আদালত পরিষ্কারভাবে বলেন যে, বিচার বিভাগের আদেশ পালন করা শুধু আইনগত বাধ্যবাধকতাই নয়, বরং নৈতিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। আব্দুল জলিলের এই আচরণ বিচার বিভাগের মর্যাদার প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রকাশ করে, যা ভবিষ্যতে গ্রহণযোগ্য হবে না। যদিও আদালত তাকে সরাসরি অপসারণ করেননি, তবে তার আচরণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনার বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি কড়া বার্তা দিয়েছেন যে, আদালতের আদেশ অমান্য করলে শাস্তি অনিবার্য।

অতীতে আদালত অবমাননার অপরাধের শাস্তি থেকে কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে অব্যাহতি পান কিন্তু আদালতের বিবেচনায় একটি স্বায়ত্তশাসিত নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার প্রধান হিসেবে আদালতের নির্দেশনা অমান্য করা গুরুতর দায়িত্বহীনতা এবং প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অগ্রহণযোগ্য। তবে আদালত কঠোরভাবে সতর্কবার্তা দেন যে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু বিগত ৫ মে তারিখে প্রদত্ত কমিশনের আদেশে আদালত অবমাননার অপরাধ পুনরায় ঘটেছে। সুতরাং এ অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া আদালতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ দিয়ে এবং সরকারি ও বেসরকারি লাইসেন্সিদের লুণ্ঠনমূলক মুনাফা করার পথ উন্মুক্ত করে, কমিশন ভোক্তাদের ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানি প্রাপ্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। আগে কমিশনের পক্ষ থেকে কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান আদালতকে তাদের নির্দেশনা মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু একই অপরাধ পুনরায় করে তারা সে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।

আদালতের সরাসরি পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে যে, এ ধরনের আচরণ কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিজ নিজ পদে থাকার যোগ্যতা ও উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, জনশুনানি এড়িয়ে এলপিজির মূল্য নির্ধারণের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ডের ফলে তারা নৈতিক ও প্রশাসনিক ভিত্তি হারিয়েছে। আদালতের বক্তব্য- ‘Such conduct of the Chairman of BERC may amount to lack of eligibility and/or suitability to hold such post’ -এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে।

সুতরাং, আদালত অবমাননা ও জনগণের আস্থার অপব্যবহারের মতো গুরুতর ও পুনরাবৃত্ত অপরাধের কারণে তারা তাদের নিজ নিজ পদে থাকার ন্যায্যতা ও যোগ্যতা হারিয়েছেন।

লেখক: জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব ও ডিন, প্রকৌশল অনুষদ, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়

গণতন্ত্রমুখী বাজেট ও প্রত্যাশার সমীকরণ

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম
আপডেট: ১০ জুন ২০২৬, ০৬:১০ পিএম
গণতন্ত্রমুখী বাজেট ও প্রত্যাশার সমীকরণ
ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল

কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য–এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই এবারের বাজেট একটি নতুন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করতে পারে। কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই এই গণতন্ত্রমুখী বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে না, সমান্তরালে সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কারও নিশ্চিত করতে হবে। স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং জবাবদিহিহীন যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা উপড়ে ফেলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।...

অতীতে দেশের অর্থনীতি যে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা এবং বাহ্যিক চাকচিক্য প্রদর্শনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, তা সবার জানা। স্বৈরাচারী সরকারের আমলে গৃহীত উচ্চাভিলাষী, মেগা-প্রকল্পনির্ভর এবং খাতাকলমে বড় জিডিপি প্রবৃদ্ধির বাজেটগুলো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও নেতিবাচক ধস নামিয়েছিল। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ-সংকট এবং ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর দশা তারই অকাট্য প্রমাণ। বিভিন্ন সূত্রের আভাসে জানা গেছে, এবারের বাজেট হতে যাচ্ছে ‘গণতন্ত্রমুখী’। সাম্যবাদী বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিযাত্রায় ‘গণতন্ত্রমুখী বাজেট’ ধারণাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও অপরিহার্য।

গণতন্ত্রমুখী বাজেট বলতে এমন একটি অর্থনৈতিক দর্শনকে বোঝায়–যেখানে বাজেটের কেন্দ্রে থাকে সাধারণ নাগরিক। এতকাল ধরে যে ‘টপ-ডাউন’ অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করা হয়েছে, তার অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল মানুষের অধিকার ও চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়াই এ বাজেটের মূল লক্ষ্য হবে। স্বৈরাচারী কাঠামোর প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল কতিপয় সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পকেট ভারী করা এবং এমন কিছু দৃশ্যমান অবকাঠামো তৈরি করা, যা সাধারণ মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে খুব কমই অবদান রাখে। এর ফলে সমাজে তৈরি হয়েছে তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য।

বাজেটকে শুধু মুখে ‘গণতন্ত্রমুখী’ বললেই হবে না। এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট খাতের পুনর্বিন্যাস এবং কাঠামোগত সংস্কার। একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্ত হয় তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণের ওপর। আর এ অধিকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি স্তম্ভ হলো– কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। বিগত সরকারের আমলে এই তিন খাতের ওপর দিয়ে যে অবহেলার ঝড় বয়ে গেছে, তার ক্ষত এখনো দগদগে। মেগা প্রকল্পের আড়ালে দেশের ফুসফুসখ্যাত এ খাতগুলোকে ক্রমাগত সংকুচিত করা হয়েছে। তাই নতুন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন নিশ্চিত করতে এই তিন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির অন্য কোনো বিকল্প নেই।

যে দেশের সিংহভাগ মানুষ এখনো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল, মানসম্মত শিক্ষা নতুন প্রজন্মের একমাত্র ভবিষ্যৎ এবং সাধারণ মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় চিকিৎসার পেছনে, সেখানে এই তিন খাতকে পেছনে ফেলে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এবারের বাজেটকে যদি সত্যিকার অর্থেই একটি ঐতিহাসিক ও রূপান্তরকামী দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে রাষ্ট্রকে তার ব্যয়ের অগ্রাধিকার আমূল বদলে ফেলতে হবে। এই বিনিয়োগই নির্ধারণ করবে আমরা কেমন বাংলাদেশ পেতে যাচ্ছি।

বিগত সরকার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষিকে এক প্রকার উপেক্ষাই করেছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ উচ্চমূল্যস্ফীতির এই ক্রান্তিকালে খাদ্য নিরাপত্তাই হলো আমাদের সবচেয়ে বড় ঢাল। সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো দেশের মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা। এর জন্য প্রয়োজন কৃষি খাতে ভর্তুকি বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং বীজ ও সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পান, সে জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট বাজারজাতকরণ কাঠামোর জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখতে হবে। কৃষি খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও সবচেয়ে বড় উৎস। ফলে কৃষির আধুনিকায়ন ও কৃষিজাতশিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করলে তা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করবে।

কৃষির পর যে খাতটি জাতির মেরুদণ্ড শক্ত করে, তা হলো ‘শিক্ষা’। বিগত আমলগুলোতে শিক্ষা খাতকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ কারিকুলাম, গবেষণায় বরাদ্দের অভাব এবং দলীয়করণের কারণে শিক্ষার গুণগত মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। নতুন বাংলাদেশে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বরাদ্দের গুণগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ বা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া উচিত, অথচ আমাদের দেশে তা বরাবরই উপেক্ষিত ছিল। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই ক্ষতি পূরণে সাহসী পদক্ষেপ দেখতে চায় দেশবাসী। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন ও প্রশিক্ষণ এবং উচ্চশিক্ষায় গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর সুযোগ আমরা হারাব। শিক্ষা খাতকে বৈষম্যমুক্ত করা না গেলে কোনো দিনই একটি সাম্যবাদী ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব নয়।

শিক্ষা ও কৃষির মতোই আরেকটি ভঙ্গুর ও উপেক্ষিত খাত হলো ‘স্বাস্থ্য’ খাত। বিগত দিনগুলোতে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা দেশের মানুষকে কতটা নিঃস্ব করেছে, তা সবার জানা। সাধারণ মানুষের আয়ের একটি বিশাল অংশ চলে যায় চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে, যা অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে দারিদ্র্যের চরম সীমায় ঠেলে দিচ্ছে। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র কখনোই তার নাগরিকদের চিকিৎসার অভাবে মরতে দিতে পারে না। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ জিডিপির অন্তত ২ থেকে ৩ শতাংশে উন্নীত করা সময়ের দাবি। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর আধুনিকায়ন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য বিমা চালুর জন্য বাজেটে পাইলট প্রজেক্টের সূচনা করা যেতে পারে। চিকিৎসাসেবা যখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে, তখনই বাজেটের গণতান্ত্রিক চরিত্র সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান হবে।

কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য–এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই এবারের বাজেট একটি নতুন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করতে পারে। কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই এই গণতন্ত্রমুখী বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে না, সমান্তরালে সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কারও নিশ্চিত করতে হবে। স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং জবাবদিহিহী যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা উপড়ে ফেলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাজেটের টাকা যাতে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের পকেটে না গিয়ে সরাসরি মাঠপর্যায়ে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তার জন্য একটি স্বচ্ছ, আধুনিক ও ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি খাতের খরচের হিসাব জনগণের সামনে উন্মুক্ত রাখতে হবে, যেন বাজেটের ওপর নাগরিকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই হবে বাজেটের প্রকৃত গণতন্ত্রীকরণ।

এই বিশাল বাজেটের অর্থসংস্থানের ক্ষেত্রেও একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর থেকে নামিয়ে ফেলতে হবে। একটি গণতন্ত্রমুখী বাজেটের নীতি হওয়া উচিত প্রত্যক্ষ করের ওপর জোর দেওয়া। অর্থাৎ, ধনীদের ওপর করের হার বাড়িয়ে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের করের বোঝা কমাতে হবে। কর ফাঁকি রোধ, অর্থ পাচার বন্ধ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে যদি অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি করা যায়, তবে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে আসবে। স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার এ প্রক্রিয়াটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে। যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে প্রণোদনা দেওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি আরও সম্প্রসারিত করার মাধ্যমেই এ বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রতিফলিত হবে।

লেখক: চিকিৎসক, ছড়াকার ও কলামিস্ট
[email protected]

দারিদ্র‍্য থেকে মুক্তি–পথের সন্ধানে

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম
আপডেট: ১০ জুন ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম
দারিদ্র‍্য থেকে মুক্তি–পথের সন্ধানে
কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

বাংলাদেশের রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শনির্ভর এক দৃঢ় ভিত্তি–সাম্য, মানবাধিকার, মানবমর্যাদা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতা। একটি ন্যায়ভিত্তিক মানবিক সমাজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় মূল্যবোধ ও কার্যকারণ তাই বংলাদেশের জন্মলগ্মেই নিহিত। এ পর্যন্ত দেশকে সে পথে তেমন পরিচালনা করা হয়নি; তাই বলে তা কখনো বাস্তবায়িত হবে না–এ কথা বলা যায় না। বরং সেই আদর্শিক তাগিদ বাস্তবায়িত হওয়া বাঞ্ছনীয়।...

জন্মের সময় মানুষের মাথায় স্বাধীনতার তিলক থাকে এবং তখন মানবমর্যাদা ও সব মানবাধিকার তার প্রাপ‍্য থাকে। কিন্তু সমাজ ও রাজনৈতিক ব‍্যবস্থা মানুষের মধ‍্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে। ক্ষমতা ও সম্পদের বদৌলতে কিছু মানুষ সমাজের ওপরতলা দখলে নেয়। তাদের দাপটে অসংখ‍্য মানুষ ছিটকে পড়ে জন্মগত অধিকার থেকে। তারা হয় দরিদ্র, বঞ্চিত, অবহেলিত, অনেক সময় লাঞ্ছনার শিকার।

বর্তমান সময়ে সম্পদে-প্রযুক্তিতে পৃথিবী অচিন্তনীয় উচ্চতায় অধিষ্ঠিত। থেমে নেই অগ্রগতি–উভয় ক্ষেত্রে দ্রুত নতুন নতুন চূড়া প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। অপরদিকে পৃথিবীর সর্বত্র, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পিছিয়ে থাকা, পিছিয়ে পড়া ও পিছিয়ে রাখা মানুষের লম্বা মিছিল বিদ‍্যমান। বিশ্বব‍্যাপী বিভাজনের এই কুৎসিত স্বরূপ বোঝার জন‍্য নিম্নোক্ত তথ‍্য কয়েকটিই যথেষ্ট। বিশ্ব বৈষম‍্য প্রতিবেদন-২০২২ (World Inequality Report 2022) অনুযায়ী, বিশ্বের অতি ধনী ১০ শতাংশ মানুষের মালিকানায় বিশ্বের ৭৬ শতাংশ সম্পদ, তার মধ্যে ৪০ শতাংশের হাতে ২২ শতাংশ আর পেছনের ৫০ শতাংশের হাতে মাত্র ২ শতাংশ। বিশ্বব‍্যাংকের তথ‍্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মূল‍্যের ভারসাম‍্য রক্ষাকারী ডলারে দৈনিক ৩ দশমিক শূন্য ডলার আয়সীমার ভিত্তিতে বিশ্বে অতি দারিদ্র‍্যকবলিত মানুষের সংখ‍্যা ৮০৮ মিলিয়ন (৯ দশমিক ৯ শতাংশ), আর দৈনিক আয়সীমা ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ পিপিপি ডলারের ভিত্তিতে দরিদ্র মানুষের সংখ‍্যা প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন (৪৫ শতাংশ)। যেখানে বর্তমানে সম্পদ ও প্রযুক্তিতে বিশ্ব সনৈ সনৈ করে শিখরে ওঠার উদাহরণ স্থাপন করে চলেছে, সেখানে বৈষম‍্য ও দারিদ্র্যের এই ভয়াবহতা মানবতার চরম অবমাননা এবং মানবতার ধ্বজা সমুন্নত রাখতে বিশ্বনেতাদের নৈতিক ও নীতিগত গুরুতর সীমাবদ্ধতার নির্দেশক।

এবার আসি বাংলাদেশের কথায়। প্রাপ্ত তথ‍্য থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে দেশের মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ এবং জাতীয় আয়ের ৪১ শতাংশ। অপরদিকে, সবচেয়ে পেছনের ১০-এর হাতে জাতীয় আয়ের ১ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং জাতীয় সম্পদের ১ শতাংশের কম। পেছনের ৫০ শতাংশ মানুষের মালিকানায় রয়েছে জাতীয় সম্পদের মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জাতীয় আয়ের ১৯ শতাংশ।

বিশ্বব‍্যাপী সম্পদ ও আয় বিভাজনের তুলনায় বাংলাদেশে তা খানিকটা কম প্রকট। বলাবাহুল‍্য, তার পরও অতি প্রকট। মৌলিক চাহিদার খরচের ভিত্তিতে বিশ্বব‍্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৫ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২১ দশমিক ৪ থেকে ২২ দশমিক ৯ শতাংশের মধ‍্যে। বিদ‍্যমান সম্পদ ও আয় বিভাজন থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার ওপরের অসংখ‍্য মানুষ সেই সীমার এত সন্নিকটে যে তাদের নানা টানাপোড়নের মধ‍্যদিয়ে চলতে হয়। দরিদ্র এবং দরিদ্রসম মানুষের অনুপাত দেশের সব মানুষের ৬০ বা ততধিক শতাংশ হতে পারে।

দারিদ্র‍্য শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়। দারিদ্র‍্য আসলে মহুমাত্রিক, যেমন জীবনের নানা মাত্রা রয়েছে। আয় ছাড়াও মাত্রাগুলোর মধ‍্যে রয়েছে: শিক্ষা, স্বাস্থ‍্য‍, সক্ষমতা, সমাজে অবস্থান, আইনের বিচারের নিশ্চয়তা, সব মানবাধিকারে যথাযথ অভিগম‍্যতা এবং মানব-মর্যাদা। এই নিরিখে বিচার করলে দেখা যাবে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে বঞ্চিত। মুষ্টিমেয়ের নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজব‍্যবস্থা। অবশ‍্য উন্নত বিশ্বে আইনের শাসনের প্রচলন তুলনামূলকভাবে উন্নতমানের থাকায়, দেখা যায় মৌলিক মানব স্বাধীনতা মোটামুটি সবাই ভোগ করেন।

লক্ষণীয়, পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র ওয়াশিংটন সমঝোতা-ভিত্তিক নব‍্য উদারতাবাদ দাপটের সঙ্গে বিরাজমান। এর মূল সুর হলো যাদের যত বেশি সম্পদ ও ক্ষমতা আছে তারাই অগ্রগতির সিংহভাগ নিজেদের করে নেয়।

তদুপরি, উন্নয়নশীল বিশ্বে অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতা এমন যে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বলি হয় বিভিন্নভাবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমতার পরিবর্তনও ঘটানো হয়। আবার উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশে অনেক সময় আন্তর্জাতিক যোগসাজশে দেশ পরিচালনা করা হয়, ক্ষমতাবলয়ের স্বার্থ রক্ষার কৌশল হিসেবে।

এ বাস্তবতায় কোনো উন্নয়নশীল দেশে মানবকেন্দ্রিক কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব হতে পারে, সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। পরিবর্তনের সম্ভাবনা অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু তার জন‍্য প্রয়োজন জনমুখী রাষ্ট্রচিন্তা, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকার এবং বৈষম‍্য হ্রাসে কার্যকর রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বিদ‍্যমান বৈশ্বিক ও দেশীয় ক্ষমতাকাঠামোর বাস্তবতায় এমন পরিবর্তন সহজে ঘটবে–তার নিশ্চয়তা নেই।

স্মর্তব‍্য, ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। এ প্রবন্ধের শুরুতে যে বক্তব‍্য উল্লেখ করা হয়েছ, তা এ ঘোষণাপত্রের প্রথম ধারায় বলা হয়েছে: মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং মর্যাদা ও সব মানবাধিকারের অধিকারী। সুতরাং, যদি এমন একটি সমাজ গড়ার লক্ষ‍্য থাকে যেখানে ব্রত হবে দারিদ্র্যের উল্লিখিত বহুমাত্রিকতার উপশমে সচেষ্ট হওয়া, তবে সেখান থেক শুরু করতে হবে। অর্থাৎ, সোজা কথায়–মানুষ হিসেবে সব মানুষ সমান; আর মানবতার দাবি হচ্ছে, কারও প্রতি বৈরিতা, অবহেলা, অন‍্যায় আচরণ না করা এবং সবার জন‍্য ন‍্যায‍্য রাষ্ট্রীয় ও আইনি ব‍্যবস্থা নিশ্চিত করা। তবেই জনকেন্দ্রিক, সুস্থ, ন‍্যায়ভিত্তিক ও বহুমাত্রিক-দারিদ্র্যমুক্ত রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের পথ প্রশস্ত হতে পারে।

এই আলোকে বলা যায়, বাংলাদেশের রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শনির্ভর এক দৃঢ় ভিত্তি–সাম্য, মানবাধিকার, মানবমর্যাদা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতা। একটি ন্যায়ভিত্তিক মানবিক সমাজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় মূল্যবোধ ও কার্যকারণ তাই বংলাদেশের জন্মলগ্মেই নিহিত। এ পর্যন্ত দেশকে সে পথে তেমন পরিচালনা করা হয়নি; তাই বলে তা কখনো বাস্তবায়িত হবে না–এ কথা বলা যায় না। বরং সেই আদর্শিক তাগিদ বাস্তবায়িত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সমাজচিন্তক

রামিসা ও নূরজাহান হত্যা: আমাদের মূল্যবোধের পচন

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
রামিসা ও নূরজাহান হত্যা: আমাদের মূল্যবোধের পচন
ড. নাহিদ ফেরদৌসী

নূরজাহান বেগমের মরদেহ পরীক্ষা করলে আইনের চেয়ে বেশি ধরা পড়ে আমাদের মূল্যবোধের পচন। যে দেশের সংবিধান বলে জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা, সেই দেশের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অধিকার কেবল কাগজে বন্দি হবে না–এ দাবি এখন সময়ের।...

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি বিচারিক কার্যকারিতা ও শিশু সুরক্ষার বিষয়ে গভীর উদ্বেগের সূত্রপাত করেছিল। ঘটনা সংঘটনের ১৯ দিন পর, ঘথ ৭ জুন বহুল প্রতীক্ষিত রায় প্রকাশ হয়েছে।

এতে দুজন মূল অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই যুগান্তকারী রায়টি নিঃসন্দেহে দ্রুত বিচারের একটি নজির সৃষ্টি করেছে। রায়টি শোকাহত মা-বাবার জন্য কতটুকু স্বস্তি ও মানসিক মুক্তি এনে দিয়েছে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে এসেছে কি না, তা নির্ভর করছে রায়টির দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর।

স্বপ্ন মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান, যা কারও দ্বারা দখল বা কেড়ে নেওয়া যায় না। একজন বাবা-মা সারাজীবন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সন্তানের ভবিষ্যৎকে ঘিরে যে স্বপ্ন বুনে যান, তা কেবল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ নয়; বরং তা একটি গভীর মানবিক প্রতিশ্রুতি, ভালোবাসা ও আশার প্রতিফলন।

কিন্তু আজ আমরা এমন এক সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে শিশুদের–বিশেষ করে কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। তাদের মৌলিক অধিকার, নিরাপদ শৈশব ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা আজ গভীর প্রশ্নের সম্মুখীন।

রামিসার মতো একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর সংঘটিত নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিক কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটকে উন্মোচিত করেছে। এই নির্মম ঘটনা জাতির বিবেককে যেমন গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সহিংসতা ও অবক্ষয়ের নগ্ন চিত্রও স্পষ্ট করেছে।

যে মা-বাবা তাদের সন্তানের স্বপ্ন, আশা ও ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে জীবনের প্রতিটি ত্যাগ স্বীকার করেন, তাদের জন্য সন্তানের নিথর ও ক্ষতবিক্ষত দেহের সামনে দাঁড়ানো অকল্পনীয়, ভাষাহীন ও চিরস্থায়ী বেদনার অভিজ্ঞতা। এই বেদনা কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমগ্র মানবিক সমাজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

এই নির্মম ঘটনার জন্য প্রকৃত দায় কার–পরিবার, সমাজ, নাকি রাষ্ট্র? নাকি আমাদের সম্মিলিত উদাসীনতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং কার্যকর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতাই এই ট্র্যাজেডির মূল কারণ?

আজ প্রশ্ন আরও গভীরভাবে উঠে আসে–শিশুদের সার্বিক সুরক্ষার চূড়ান্ত দায়িত্ব কার ওপর বর্তায়? এবং কেন বারবার এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে?

বছরের পর বছর কত আর মা-বাবাকে সন্তানের শোকে আজীবন মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাতে হবে? রামিসার মতো অসংখ্য শিশু ও পরিবার আজ একই অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে বসবাস করছে, এটাই আমাদের সমকালীন সামাজিক বাস্তবতার নির্মম চিত্র।

এখন সময় এসেছে ন্যায়বিচারের এমন একটি দৃষ্টান্তমূলক ও কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার, যেখানে অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হবে দ্রুত, নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য; যাতে আর কোনো মা-বাবাকে সন্তানের নির্মম মৃত্যু স্মরণ করে আজীবন মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে না হয়।

বাংলাদেশের আইনি প্রেক্ষাপটে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ মোকাবিলার জন্য সুস্পষ্ট আইনগত কাঠামো বিদ্যমান। দণ্ডবিধি-১৮৬০ (Penal Code, 1860)-এর অধীনে হত্যা (ধারা ৩০২) এবং ধর্ষণ-সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধগুলোর জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (Women and Children Repression Prevention Act, 2000) শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা এবং যৌন সহিংসতার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন করেছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত। এ ছাড়া শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে শিশু আইন-২০১৩ (Children Act, 2013) রাষ্ট্রকে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে, যা সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে জীবন, মর্যাদা ও সমতার অধিকারকে সুরক্ষা দেয়। তবুও বাস্তবতা হলো, আইনগত কাঠামো থাকা সত্ত্বেও এর কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া এবং প্রতিরোধমূলক সামাজিক ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী না হলে এ ধরনের নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দ্রুত নিরপেক্ষ ও সময়বদ্ধ বিচার নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে। শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে সমন্বিতভাবে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও নজরদারি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

আইন ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে রামিসার ওপর সংঘটিত ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড এমন এক অপরাধ, যা সমাজের সামষ্টিক বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট Bachan Singh v. State of Punjab (1980) এবং পরবর্তীতে Machhi Singh v. State of Punjab (1983) মামলায় ‘Rarest of the Rare Cases’ নীতি প্রবর্তন করে ঘোষণা করেন যে, যখন কোনো অপরাধের নৃশংসতা, ভুক্তভোগীর অসহায়ত্ব, অপরাধের সামাজিক অভিঘাত এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত এতটাই গভীর হয় যে, সাধারণ শাস্তি ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য পূরণে অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে, তখন সর্বোচ্চ শাস্তি বিবেচিত হতে পারে। আদালত আরও উল্লেখ করেন যে, এমন অপরাধ সমাজের ‘collective conscience’ বা সামষ্টিক বিবেককে স্তম্ভিত করে দেয়। রামিসার মতো একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর সংঘটিত এই পাশবিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড সেই নীতির আলোকে বিচারযোগ্য একটি ঘটনা হিসেবে জনমনে প্রতীয়মান হয়েছে, যেখানে ন্যায়বিচার কেবল একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং সমগ্র সমাজের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য।

গত ৩১ মে ঢাকার মিরপুর-১১-এর একটি অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের অর্ধগলিত মরদেহ। তার পাশেই ছিল সন্তানদের পাসপোর্ট সাইজের ছবি, সার্টিফিকেটের ফ্রেম–এক যুগ্ম সচিব, এক বুয়েট শিক্ষক, এক কানাডাপ্রবাসী ছেলে আর এক স্কুলশিক্ষিকা কন্যার মা। কিন্তু মা মারা গেছেন কবে? কেউ জানেন না। গন্ধ ছড়ালে প্রতিবেশীরা ফোন দেয় ৯৯৯-এ। এ ঘটনা কোনো ইংরেজি থ্রিলারের দৃশ্য নয়। এ আমাদের সমাজের সাদা-কালো সিসিটিভির ফুটেজ–যেখানে বড় পদ, বিদেশি ডিগ্রি, চমকানো সিভির নিচে পুঁতে রাখা আছে এক প্রবীণের নিঃশব্দ যন্ত্রণা, অবহেলা আর অপেক্ষার অবসান।

বাংলাদেশে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩’ আছে। আইনটি স্পষ্ট বলেছে: সন্তানকে মায়ের ভরণপোষণ দিতেই হবে–খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান, এমনকি ‘সঙ্গ’ দেওয়াও আইনি দায়িত্ব। পিতা-মাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো যাবে না। অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা ৩ মাসের কারাদণ্ড। এসব বিধান দেখে মনে হয়, নূরজাহান বেগমের সন্তানদের জেলে যাওয়া উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো–কে যাবে আদালতে? আইনে বলা আছে, শুধু ভুক্তভোগী বাবা বা মা নিজেই অভিযোগ করতে পারবেন। যে মা মারা গেছেন, তিনি তো আর মামলা করবেন না। অথচ বেঁচে থাকতেও তিনি কি পারতেন? নিজের সন্তান–যুগ্ম সচিব আর বুয়েট শিক্ষক, যাদের মুখে সমাজের ‘আইন’ ও ‘নীতি’ উচ্চারিত হয়, তাদের বিরুদ্ধে থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া, কোন বৃদ্ধ বাবা-মা সেটা পারেন?

এটাই এই আইনের মারাত্মক দুর্বলতা। বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের অবহেলা একটি ‘নীরব অপরাধ’–কারণ ভুক্তভোগী নিজে প্রায়শই শারীরিক, মানসিক বা আর্থিকভাবে অসহায়; আর সামাজিক লজ্জায় চুপ করে থাকেন। নূরজাহান বেগমের মরদেহ পরীক্ষা করলে আইনের চেয়ে বেশি ধরা পড়ে আমাদের মূল্যবোধের পচন। যে দেশের সংবিধান বলে জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা, সেই দেশের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অধিকার কেবল কাগজে বন্দি হবে না–এ দাবি এখন সময়ের।

লেখক: ডিন, স্কুল অব ল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় 
[email protected]

ট্রাম্পের চুক্তি যে কারণে নস্যাৎ করতে চান নেতানিয়াহু

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম
ট্রাম্পের চুক্তি যে কারণে নস্যাৎ করতে চান নেতানিয়াহু
সামি আল-আরিয়ান

ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আরববিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো অর্থপূর্ণ পথ নেই। তবে নেতানিয়াহু তার মূল বিশ্বাসের পরিপন্থি কোনো চুক্তি মুখ বুজে মেনে নেবেন, এমনটা ভাবা হবে সবার জন্য বিপজ্জনক বিভ্রম। তবে এর চেয়েও গভীরতর বিভ্রম হলো, পাশবিক শক্তি দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন এর রাজনৈতিক, নৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে।...


ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন না। তার পুরো রাজনৈতিক ক্যারিয়ারজুড়ে ইসরায়েলি আধিপত্য বজায় রাখা এবং নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধের কৌশলকেই তিনি পছন্দ করেন বেশি।

বর্তমানে তার প্রধান অগ্রাধিকার হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে প্রায় চূড়ান্ত হওয়া সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত রাখা। এ সংকটের কূটনৈতিক বিজয় ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিলে তিনি তা নস্যাৎ করার জন্য রাজনৈতিক, সামরিক, কূটনৈতিক, গণমাধ্যম এবং লবিংয়ের মতো হাতিয়ার ব্যবহার করবেন।

তথাকথিত ‘চূড়ান্ত বিজয়’ নিয়ে তিনি অনমনীয় এবং আপস করতে নারাজ। তার কাছে কোনো সমঝোতাই গ্রহণযোগ্য নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না গাজায় হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ, লেবাননে হিজবুল্লাহকে খতম এবং স্বয়ং ইরানকে নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করা হচ্ছে।

গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন এবং ইরানজুড়ে চলা যুদ্ধগুলো কখনোই বিচ্ছিন্ন কোনো সংঘাত ছিল না। এসব যুদ্ধ ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠা এবং এ অঞ্চলে ইসরায়েলি হেজিমনি বা আঞ্চলিক আধিপত্য সুসংহত করার আগ্রাসনের অংশ হয়ে ওঠে। নেতানিয়াহু ভালো করেই জানেন, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সত্ত্বেও তার এই লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। তিনি নিশ্চিত হয়েছেন, পর্যাপ্ত শক্তি প্রয়োগ না করার কারণে তার লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়াতে প্ররোচিত করার পর, নেতানিয়াহু এখনো আত্মবিশ্বাসী তিনি আবারও সেই একই চাল চালতে পারবেন। তবে এবার তার লক্ষ্য সীমিত হামলা নয়, বরং চূড়ান্ত ও সর্বাত্মক যুদ্ধ, যা এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যকে স্থায়ীভাবে বদলে দেবে।

নেতানিয়াহু অবশ্য যা-ই মনে করেন না কেন, ট্রাম্পকে আরও জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি হয়তো বিশ্বাস করেন, ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণভাবে, মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশ এখন প্রকাশ্যেই এসব যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার পক্ষে জনসমর্থন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ট্রাম্পবিরোধী মনোভাব ট্রাম্পের নিজের জোটের মধ্যেই ফাটল ধরাচ্ছে। তার সমর্থকরা নেতানিয়াহুর এজেন্ডা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও সৈন্যদের রক্ত দেওয়ার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

আমেরিকানরা এখন আরও বেশি করে জানতে চাচ্ছেন কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি আঞ্চলিক যুদ্ধের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক বোঝা বইতে হবে। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এ প্রশ্নগুলো আরও জোরালো হচ্ছে। জ্বালানি বাজার এখনো নাজুক এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বাড়ছে, যা মার্কিন ভোক্তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিয়েছে এবং হোয়াইট হাউসের জন্য অর্থনৈতিক পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠছে।

ট্রাম্প জানেন, অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে কোনো বৈদেশিক অভিযান চালানো সম্ভব নয়। আর যেহেতু মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে তাই যেকোনো ভুলের মাশুল তাৎক্ষণিকভাবে দিতে হবে। তিনি যদি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারান, তাহলে তাকে ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসনের মুখে পড়তে হতে পারে।

আন্তর্জাতিক চাপ ট্রাম্পের ওপর আরও তীব্রভাবে চেপে বসেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৌশলগত পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। এ সংকট যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। ৩৯ দিনব্যাপী চলা যুদ্ধে ইরান এবং তাদের মিত্রদের হামলায় আটটি দেশজুড়ে থাকা অন্তত ১৬টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার কয়েকটি প্রায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

স্যাটেলাইট ইমেজের ওপর ভিত্তি করে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানি হামলায় ওই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর অন্তত ২২৮টি স্থাপনা ও সরঞ্জাম ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হ্যাঙ্গার, জ্বালানি ডিপো, যুদ্ধবিমান, রাডার নেটওয়ার্ক, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এ যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের পুরো কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত মারাত্মকভাবে ফুরিয়ে এসেছে।

পেন্টাগন সতর্ক করেছে, ক্ষেপণাস্ত্রের এ মজুত আগামী দশকের আগে পূরণ করা সম্ভব হবে না। রাশিয়ার এবং চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের পরিকল্পনা করতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক দুর্বলতা। ট্রাম্পের যুদ্ধ করার উদ্দেশ্য ছিল নিজের আধিপত্য জাহির করা, কিন্তু এখন তা উল্টো আমেরিকার শিল্প ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে।

ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব সর্বোচ্চ লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিল। সেটা হলো ইরানকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা, তার পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করা, প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ইরানি রাষ্ট্রের উৎখাত বা একে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলা। কিন্তু এর একটি লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। ইরান আত্মসমর্পণ করেনি, তার সরকার ভেঙে পড়েনি এবং তীব্র চাপের মধ্যেও আঞ্চলিক জোটগুলোকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। ইরান এবং তার মিত্ররা আঘাত সয়েছে, কিন্তু পরাজিত হয়নি।

ইরান যুদ্ধক্ষেত্রকে প্রসারিত করেছে, বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহকে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সহজ বিজয় থেকে বঞ্চিত করেছে। আত্মসমর্পণের বিকল্প হিসেবে তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার পথ বেছে নেয়, যা পুরো পরিস্থিতিকে ঘুরিয়ে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিকে পরাস্ত করার ক্ষমতা ইরানের ছিল না। কিন্তু পাল্টা আক্রমণ করে তারা আত্মরক্ষা করতে পেরেছে। ইরানের জন্য পরাজয় এড়ানো, নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং শত্রুকে তার রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে বঞ্চিত করাই যথেষ্ট ছিল। একটি রাষ্ট্র যখন প্রবল পরাক্রমশালী শক্তির মুখোমুখি হয়, তখন নিজের অস্তিত্ব ও কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে পারাটাই এক ধরনের বিজয়। ইরান সেটা পেরেছে।

নেতানিয়াহু তার সম্প্রসারণবাদী প্রকল্পের হুমকিটা এখন বুঝতে পারছেন। কিন্তু যুদ্ধবিরতি ইসরায়েল কখনই মেনে নিতে পারবে না। কেননা তাহলে যুদ্ধটি ইসরায়েলের বিজয়ের মধ্যদিয়ে শেষ হবে না, শেষ হবে ইরানের টিকে থাকার মধ্যদিয়ে।

বর্তমান আলোচনা, যা জানা গেছে যে পাকিস্তান মধ্যস্থতা করছে এবং বেশ কয়েকটি আরব ও ইসলামিক রাষ্ট্র এতে সমর্থন দিচ্ছে। চুক্তির প্রায়-চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে অন্তত ৬০ দিনের জন্য লেবাননসহ বহুমাত্রিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি খাতের অস্থিরতা এবং উত্তর আমেরিকায় আসন্ন বিশ্বকাপের মতো বড় ইভেন্টগুলোকে বিঘ্নিত করতে পারে এমন একটি বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কা থেকে ওয়াশিংটনের এখন শান্ত পরিস্থিতি প্রয়োজন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই পিছুটান কোনো বিজয়ের ফসল নয়, বরং পরিস্থিতি তাকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করছে।

যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি, অন্তর্বর্তী সময়ে এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্যে একগুচ্ছ পদক্ষেপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালির মধ্যদিয়ে নৌচলাচল নিরাপদ করা, ইরানের শিপিংয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, ইরানের অবরুদ্ধ করে রাখা সম্পদের আংশিক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া এবং সম্পর্ক আরও স্বাভাবিক করার বিষয়ে আলোচনা শুরু করা।

এ রূপরেখা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বেশ কয়েকটি দাবি মেনে নেবে। কিন্তু নেতানিয়াহুর কাছে এটা একেবারেই অসহ্য লাগছে। কারণ, এরকম চুক্তি হলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে স্বস্তিতে থাকবে। তার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে না। আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গেও ইরানের সম্পর্ক অটুট থাকবে। এতে তেহরান ভবিষ্যতে আরও বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যাবে। ট্রাম্পের ওপর নেতানিয়াহুর তীব্র চাপ দেওয়ার কারণ এটাই। দুজনের মধ্যে যে কথা চালাচালি হচ্ছে তা এ কারণেই উত্তপ্ত ও অস্বাভাবিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হচ্ছে। নেতানিয়াহু কূটনৈতিক সমঝোতার বিরোধিতা করছেন এবং গাজা ও লেবাননজুড়ে নতুন করে হামলা বাড়ানোর জন্য ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন।

নেতানিয়াহুর সামনে এখন সীমিত ও বিপজ্জনক কিছু পথ খোলা আছে। তিনি যদি কূটনৈতিক সমঝোতাকে সরাসরি আটকে দিতে না পারেন তাহলে এ চুক্তি যাতে বাস্তবায়িত না হয় সেজন্য নাশকতা করার চেষ্টা করবেন। এ জন্য তিনি লেবাননে হামলা চালিয়ে যাওয়া এবং ফিলিস্তিনে আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারেন। নেতানিয়াহু হয়তো হিসাব কষছেন, গাজায় নতুন করে গণহত্যা, অবরোধ জোরদার করা বা অধিকৃত পশ্চিম তীরের পবিত্র স্থানগুলোতে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালালে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যেতে পারে। এরকম পরিস্থিতেতে ট্রাম্প তখন ইসরায়েলের দাবির পক্ষে দাঁড়াতে বাধ্য হবেন।

আসলে ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আরববিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো অর্থপূর্ণ পথ নেই। তবে নেতানিয়াহু তার মূল বিশ্বাসের পরিপন্থি কোনো চুক্তি মুখ বুজে মেনে নেবেন, এমনটা ভাবা হবে সবার জন্য বিপজ্জনক বিভ্রম। তবে এর চেয়েও গভীরতর বিভ্রম হলো, পাশবিক শক্তি দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন এর রাজনৈতিক, নৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে। আদর্শিক অন্ধত্ব এবং কৌশলগত ব্যর্থতার মাঝে আটকা পড়ে নেতানিয়াহু হয়তো শেষ পর্যন্ত মারাত্মক জুয়া খেলতে পারেন এবং পুরো ব্যবস্থাটি তার সঙ্গে ভেঙে পড়ার আগ পর্যন্ত যুদ্ধকে আরও ছড়িয়ে দিতে পারেন। এরকম শঙ্কা একেবারেই অমূলক নয়। (সংক্ষেপিত)

লেখক: ইস্তাম্বুল জাইম ইউনিভার্সিটির ‘সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’-এর পরিচালক। মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান

রামিসার মৃত্যু, অপরাধীর শাস্তি এবং সমাজের দায়

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
রামিসার মৃত্যু, অপরাধীর শাস্তি এবং সমাজের দায়
রাজেকুজ্জামান রতন

একটা দেশ তার ভবিষ্যৎ তৈরি করে শিশুদের মাধ্যমে। শিশুদের চোখে স্বপ্ন তৈরি করা সমাজের কাজ, কিন্তু আমাদের শিশুরা পথ চলছে, বড় হচ্ছে দুঃস্বপ্ন আর আতঙ্ক নিয়ে। রামিসার খোলা চোখ যেন তাকিয়ে আছে আর প্রশ্ন করছে, আমাদের জন্য কেমন বাংলাদেশ তৈরি করছ তোমরা?...

রামিসার নৃশংস হত্যার খবরে শিউরে উঠেছিলেন দেশের মানুষ। একটা শিশুর গলা কেটে বালতিতে রেখেছে খুনি। যখন দরজায় ধাক্কা দিয়ে মা ডাকছেন, তখন ঘরের ভেতর তার সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করা হচ্ছে। নৃশংসতা বোঝানোর জন্য এটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু না, আরও ভয়ংকর বর্বরতার চিত্র দেখেছেন মানুষ। শিশুর শরীর ক্ষত-বিক্ষত, এতটুকু শরীরে নির্মম আঘাতের চিহ্ন, আর তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। কোনো মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ এই ঘটনার বিবরণ পড়ে সুস্থ থাকতে পারেন? তার সন্তান, তার স্বজন অথবা চারপাশের উচ্ছল শিশুদের মুখের দিকে তাকালে বুকের ভেতর কি হাহাকার তৈরি হবে না? এ কোন সমাজে বাস করছি আমরা? এই ঘটনায় কেঁপে উঠেছিল সারা দেশ, বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন এক মাসের মধ্যেই এই নৃশংসতার বিচার হবে।

৭ জুন বেলা ১১টায় রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা ও স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন আদালত। হত্যাকাণ্ড সংঘটনের ১৯ দিন এবং মামলা দায়েরের ১৮ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন, অধিকাংশ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও আসামিদের সাফাই সাক্ষ্যসহ যাবতীয় বিচারিক কার্যক্রম শেষে মামলাটির রায় ঘোষণা দেশের বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একটা মাইলফলক। মানুষ বলতে পারবেন অন্তত একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হলো।

রামিসা আমাদের সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই আমাদের সমাজ, যেখানে শিশুরা সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন। আয়না কখনো মিথ্যা দেখায় না। প্রতিবিম্ব দেখানোর জন্য শুধু উল্টো হয়ে আসে ছবিটা। মানুষের মাথা তাকে আবার সোজা করে দেখে। মুখের ময়লা দূর না করে শুধু আয়না মুছলে চেহারা পরিষ্কার দেখা যাবে না।

কারণ এসব নতুন ঘটনা নয়। রামিসার আগে যেমন পরেও তেমনি ধর্ষণ, হত্যা চলছেই। কিছু ঘটনায় মানুষ উত্তাল হয়ে ওঠেন আর বাকিগুলো কী হয়? শত শত ঘটনা পত্রিকার পাতায় ঠাঁই পায়, আড়ালে থেকে যায় যে কত তার সংখ্যা অনুমান করা ছাড়া উপায় নেই। যেমন ২০২৪ সালের মার্চে মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণের ঘটনায় পুরো দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল। তখনো মানুষের বিক্ষোভের কারণে দ্রুত বিচার সম্পন্ন হয়েছিল। শিশু আছিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। এর চার দিন পর ডেথ রেফারেন্সের নথি হাইকোর্টে পৌঁছায়। রায় ঘোষণা এবং ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানোর এক বছর পূর্ণ হলেও পরবর্তী অগ্রগতি কতটুকু, তা আজ অজানা। অথচ ছুটির দিন বাদে টানা শুনানি করে মাত্র ১৪ কার্যদিবসে আলোচিত এই মামলার বিচারকাজ শেষ হয়েছিল। শুধু আছিয়া হত্যাকাণ্ডই নয়, এমন বহু বেদনাকাতর সংবেদনশীল মামলার কাগজ আদালতে ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে। ধর্ষণের দায় স্বীকার করার পরও বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে, নিষ্পত্তি হয় না। আবার রায় হলেও তা কার্যকর হয় না, উল্টো অনেক আসামি জামিনে বের হয়ে আসে। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পরও শাস্তি না হওয়ার আক্ষেপ বুকে নিয়েই বেঁচে থাকতে হয় নির্যাতিত পরিবারগুলোকে। কেউ যখন দেখেন তার প্রিয় সন্তানের খুনি তার চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন কি ধিক্কার তৈরি হয় না সমাজ ও বিচারের প্রতি?

আছিয়ার বেদনা না ভুলতেই রাজধানীতে নির্মমতার শিকার হলো দ্বিতীয় শ্রেণি পড়ুয়া সাত বছরের শিশু রামিসা। নারী ও শিশুর জীবন, নিরাপত্তা তাহলে কোথায়? আমাদের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা যেন অপরাধীদের কাছে একধরনের প্রশ্রয়ের বার্তা দেয়। নির্যাতিতার দোষ খুঁজে বের করা, পোশাকের দোহাই দেওয়া, সাজগোজ করাকে অজুহাত করা এবং শয়তান ভর করার মতো আত্মপক্ষ সমর্থন করার নানা দৃষ্টান্ত দেখা হয়েছে ইতোমধ্যে। কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো শাস্তি না থাকায় নারীর প্রতি সহিংসতা বা ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে।

সব খবর পত্রিকায় আসে না, পরিসংখ্যান সব বলে না; কিন্তু যা বলে তা কি আতঙ্কিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়? বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন গত ২ মে প্রকাশ করা হয়। সেই প্রতিবেদনের তথ্য অত্যন্ত ভয়াবহ: দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পেয়ে যাচ্ছে আসামিরা। আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে সময় লাগছে ৩ বছর ৭ মাস। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে। প্রতিবার শুনানিতে স্বজনরা অপমানিত হন, বেদনায় ভারাক্রান্ত হন আর বাড়তে থাকে ক্ষোভ কিংবা অসহায়ত্ব।

এই এক পরিসংখ্যানেই যথেষ্ট আমাদের বিচারব্যবস্থার গতি এবং চিত্র বুঝতে পারার জন্য। কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটার পর মামলা হওয়া, আসামি ধরা পড়া এবং সাজা হওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে কোনো কোনো মামলায় ১০ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। অনেক সময় রায় হওয়ার আগেই মামলার বাদী মারা যান। শুধু তা-ই নয়, আসামি জামিনে বের হয়ে এসে বাদীকে জীবননাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনাও অহরহ ঘটে। এ ছাড়া এটা কে না জানে যে, থানায় মামলা করতে গেলে প্রশাসন, প্রভাব এবং পয়সার কী গুরুত্ব। কিছু আপাত নিরীহ পরামর্শ দেওয়া হয়, যেমন মামলা করে কী লাভ? কোনো ফল পাবে না, শুধু টাকা খরচ। বিপদ বাড়বে ইত্যাদি। আবার গ্রাম্য মাতব্বর বা প্রভাবশালী মহল সালিশ-বৈঠকের মাধ্যমে লোক দেখানো শাস্তি, জরিমানা করে মীমাংসা করা আর বাদীকে নানা রকম ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার নজিরও কম নয়।

কয়েকটা ঘটনা মনে করা যেতে পারে। ২০১৭ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে জাকিয়া সুলতানা রুপাকে গণধর্ষণ ও হত্যায় ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। ওই মামলার বিচার থেকে রায় পর্যন্ত ছয় মাসও লাগেনি। রায়ে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। কিন্তু উচ্চ আদালতে দীর্ঘ শুনানি শেষে তিন আসামিকেই সাজা কমিয়ে সাত বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

গত ১ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে গহিন জঙ্গলে উদ্ধার হওয়া সাত বছরের শিশু জান্নাতুল নাইমা ইরার রক্তাক্ত ছবিটি ভোলার নয়। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বাবু শেখ নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা শেষে গলা কেটে জঙ্গলে রেখে যাওয়া হয় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে। কিন্তু তিন মাস পার হলেও ওই ঘটনায় এখনো অভিযোগপত্রই দিতে পারেনি পুলিশ।

কুমিল্লার তরুণী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়নি দীর্ঘ ১০ বছরেও। ওই ঘটনাও সারা দেশে আলোড়ন তৈরি করেছিল। ফেনীতে ২০১৯ সালে আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায়ে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। সাত বছর পরও ওই মামলা হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় আটকে আছে। ফলে কমছে না হত্যা ও ধর্ষণ। মে মাসে দেশে অন্তত ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ৬৬টি গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন। এ ছাড়া গত মাসে ৮৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ১১ হাজার ৯৩৪টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা করা হয়েছে ৬ হাজার ১৩৫টি। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬ হাজার ৩১ জন শিশু, যার মধ্যে ৫ হাজার ৬৩১ জন মেয়ে এবং ৪০০ জন ছেলে শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ৩১০ জন শিশুকে। ভাবা যায়! কতটা নিরাপত্তাহীন আমাদের শিশুরা।

একটা দেশ তার ভবিষ্যৎ তৈরি করে শিশুদের মাধ্যমে। শিশুদের চোখে স্বপ্ন তৈরি করা সমাজের কাজ, কিন্তু আমাদের শিশুরা পথ চলছে, বড় হচ্ছে দুঃস্বপ্ন আর আতঙ্ক নিয়ে। রামিসার খোলা চোখ যেন তাকিয়ে আছে আর প্রশ্ন করছে, আমাদের জন্য কেমন বাংলাদেশ তৈরি করছ তোমরা? অপরাধীর শাস্তির পাশাপাশি শিশুদের স্বস্তির সমাজ কি তৈরি হবে না? 

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]