দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব যদি এখনই সতর্ক না হন এবং নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকার আইন প্রয়োগের বিষয়ে আক্ষরিক অর্থে কঠোর না হয়, তাহলে পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশবাসীর মনে প্রত্যয় জন্মেছে, একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে দেশ গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাবে।...

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো এখন প্রচারে ব্যস্ত। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ মিছিল-মিটিংয়ে মুখর। তবে যতটা মুখর হওয়ার কথা ছিল ততটা হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ দেশের অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির শীর্ষনেত্রীসহ প্রভাবশালী নেতারা কেউ দেশত্যাগ করেছেন, কেউ আছেন কারাগারে। এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাহী আদেশে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় অন্য যেসব নেতা-কর্মী দেশে রয়েছেন, তারাও নিষ্ক্রিয়। ফলে নির্বাচনি মাঠে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বেশ ভালোভাবেই অনুভূত হচ্ছে। বস্তুত, বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে ঘিরে। মাঝখানে আশির দশকে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি কিছুদিন মাঠ গরম রাখলেও তার পতনের পর সে দলটি চলে গেছে ব্যাকফুটে। ফলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একসময়ের ঢাকার ফুটবল লীগের মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও আবাহনী লিমিটেডের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে হয়ে ওঠে। ফুটবল লীগে আবাহনী-মোহামেডানের খেলার দিন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে যেমন গ্যালারি উপচে পড়ত, তেমনি আমাদের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির উপস্থিতি জমজমাট অবস্থা সৃষ্টি করত। এই দুই দল অংশ না নিলে সে নির্বাচন পানসে হয়ে যায়, গ্রহণযোগ্যতাও পায় না।
বিদ্যমান বাস্তবতার কারণেই এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেই। তাই এ নির্বাচনটি সেভাবে উৎসবমুখর যে হবে না, তা বলাই বাহুল্য। অনেকেই আওয়ামী লীগবিহীন এ নির্বাচনকে একপক্ষীয় বলেও অভিহিত করছেন। তাদের মতে, এ দেশে আওয়ামী লীগ ও সমমনারা একটি পক্ষ, আর বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলগুলো আরেকটি পক্ষ। এবার নির্বাচনি মাঠে রয়েছে বিএনপি-জামায়াতসহ তাদের মিত্ররা, যেটি একটি পক্ষ। অন্য পক্ষটি নেই। তবে এবার ভোটের লড়াইয়ে রাজনীতির হিসাবনিকাশ পাল্টে যেতে বসেছে। বিএনপির দীর্ঘদিনের ভোট ও জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী এবার তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গর্ভে জন্ম নেওয়া নবজাতক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নতুন মাত্রা সৃষ্টি করেছে। মাঠে আছে আওয়ামী লীগের বিশ্বস্ত অংশীদার জাতীয় পার্টির খণ্ডাংশ; যেটি জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন।
আওয়ামী লীগের বিদায়ের পর জনমনে ধারণা ছিল একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে দেশে স্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হবে। বিশেষত, নির্বাচনে যখন একসময়ের মিত্রদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হচ্ছে, তখন অপ্রীতিকর বা অনভিপ্রেত কোনো ঘটনা ঘটবে না। কিন্তু ভোটের তারিখ যতই এগিয়ে আসছে, নির্বাচনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকবে কি না তা নিয়ে দেশবাসীর মনে শঙ্কা বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে যে যুদ্ধংদেহী মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে কাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের পথ বিঘ্নের অনাকাঙ্ক্ষিত কাঁটা ছড়িয়ে পড়ে কি না, সে আশঙ্কায় অনেকের বুক দুরু দুরু করছে। এরই মধ্যে অশনি সংকেতের মতো দুঃসংবাদটি এসেছে শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী থেকে। সেখানে স্থানীয় প্রশাসন আয়োজিত রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে একজন নিহত ও বহুসংখ্যক আহত হয়েছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নির্বাচন কমিশন দায়িত্বশীল না হলে এ ধরনের সহিংসতা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গণতান্ত্রিক রাজনীতির চূড়ান্ত কর্মপ্রক্রিয়া হলো ভোট। আর জনগণের ভোট স্বপক্ষে টানার প্রধান উপায় হলো কথার মাধ্যমে তাদের তুষ্ট করা। এজন্য অংশগ্রহণকারী দলগুলো স্ব স্ব নির্বাচনি মেনিফেস্টো উপস্থাপন করে; যাতে রাষ্ট্রক্ষতায় গেলে তারা দেশ ও জনগণের কল্যাণে কী কী কাজ করবে তার বিশদ বর্ণনা থাকে। তবে নিরেট সত্য হলো, ভোটদাতাদের ৯০ শতাংশের কাছে দলগুলোর সে মেনিফেস্টো থাকে অজানা। তারা নেতা বা প্রার্থীদের মুখের কথাকে বিশ্বাস করেই ভোট দেয়। আর সেজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের কথা বলতে হয়, মানে সভা-সমাবেশে বক্তৃতা দিতে হয়। এসবই রাজনীতির স্বীকৃত প্রক্রিয়া।
কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। আমাদের দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতারাই নিজ নিজ কর্মসূচি ও আদর্শের কথা বলার পাশাপাশি বিরুদ্ধপক্ষের সমালোচনায় মুখর হন। সমালোচনায় কোনো দোষ নেই। তবে তা শিষ্টাচারের মধ্যে থাকতে হয়। কিন্তু তারা কখনো কখনো এতটাই প্রগলভ হয়ে ওঠেন যে, শিষ্টাচার-শালীনতার কথা বিস্মৃত হন। অনেক সময় তা ব্যক্তিগত আক্রমণে গড়ায়। এ মুহূর্তে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর বাগযুদ্ধ মানুষ খুব উপভোগ করছে। তবে নিঃশঙ্কচিত্তে নয়। সবার মনেই শঙ্কা বাসা বেঁধেছে- দলগুলো যেভাবে পরস্পরের দিকে কথার তীর ছুড়তে শুরু করেছে, না জানি কখন তা নির্বাচনি পরিবেশকেই বিদ্ধ করে ফেলে।
প্রসঙ্গত, দলগুলোর পারস্পরিক আক্রমণের কিঞ্চিত এখানে তুলে ধরা আবশ্যক বলে মনে করছি। সহৃদয় পাঠক তাহলে বুঝতে পারবেন আসন্ন নির্বাচনে অহেতুক এ বাগযুদ্ধের কোনো প্রয়োজন আছে কি না। যেমন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে বলছেন, দলটি ক্ষমতায় থাকতে দেশ চারবার দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এ কথা বলার সময় তিনি হয়তো বিস্মৃত হয়েছিলেন, ওই সরকারের অন্যতম অংশীদার ছিল তার দল জামায়াত। তাদের যে দুই শীর্ষনেতা চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রী ছিলেন, তাদের একজনের বিরুদ্ধে এক-এগারো সরকারের সময় দুর্নীতির মামলাও হয়েছিল এবং তিনি জেলেও গিয়েছিলেন। ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যের জবাব অবশ্য বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাহলে সেই সরকার থেকে জামায়াতের নেতারা কেন পদত্যাগ করেননি? তারেক রহমান জামায়াত নেতার বক্তবের প্রতিউত্তর দিলেও একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার যে প্রশ্ন তিনি তুলেছেন, জামায়াত সে ব্যাপারে নিশ্চুপ থেকেছে।
এদিকে নবজাতক দল এনসিপির নেতারা বিএনপির কোনো কোনো নেতার বিরুদ্ধে একেবারে উলঙ্গ প্রচারণায় নেমেছেন। কয়েকদিন আগে এক বিকালে রাজারবাগের একটি রেস্তোরাঁয় এক বন্ধুর সঙ্গে কফি খেতে খেতে খোশগল্প করছিলাম। এসময় মিছিলের আওয়াজ পেয়ে জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখলাম, এনসিপি প্রার্থী নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারীর নির্বাচনি মিছিল যাচ্ছে। জামায়াতের কর্মী-সমর্থক সমন্বয়ে মিছিলটির আকার একেবারে ছোট ছিল না। তবে তাতে যে স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল, তা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। মিছিলকারীরা স্লোগান দিচ্ছিল- ‘মির্জা আব্বাস-চাদাবাঁজ,’ ‘বিএনপি-চাঁদাবাজ, যুবদল-চাঁদাবাজ, ছাত্রদল-চাঁদাবাজ’। একসময়ের সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী দুই বন্ধু বিস্ময়ে হা হয়ে গেলাম। কেননা, নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধিতে প্রতিদ্বন্দ্বী দল বা প্রার্থী সম্পর্কে কোনো প্রকার কটূক্তি, আপত্তিকর বক্তব্য-বিবৃতি কিংবা স্লোগান দেওয়া নিষিদ্ধই শুধু নয়, দণ্ডনীয়ও বটে। কিন্তু সে বিধি বা আইনের তোয়াক্কা ওরা যে করছে না, তা বলাই বাহুল্য। বলে নেওয়া দরকার, সে মিছিলের ওই স্লোগান এখন সামাজিকমাধ্যমে ঘুরছে। একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিক সম্পর্কে প্রকাশ্যে এমন অশালীন স্লোগান দেওয়ায় সচেতন ব্যক্তিরা উষ্মা প্রকাশ করছেন। যারা এ স্লোগান দিয়েছে, তাদের শিক্ষা-দীক্ষা, সভ্যতা-ভব্যতা ও রাজনৈতিক জ্ঞানগরিমা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলছেন।
অন্যদিকে একই দিনে কাকরাইলের হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের পিঠা উৎসবে দলবলসহ অনধিকার প্রবেশ করতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হয়েছেন এনসিপি প্রার্থী নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী। সেখানে শিক্ষার্থীরা তাকে প্রবেশ করতে দিতে চায়নি। তার পরও প্রবেশ করতে গেলে যে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়, তার মধ্যে কে বা কারা নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারীর মাথায় ডিম নিক্ষেপ করে। কিন্তু পরে দেখা গেল নাসীরসহ বেশ কয়েকজন মাথায় ব্যান্ডেজ বাধা। প্রচার করা হয়েছে হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে বিএনপি কর্মীদের দ্বারা তারা মারাত্মক আহত হয়েছেন। আমাদের দেশের রাজনীতিতে ব্লেইম গেম বা দোষারোপ নতুন কিছু নয়। তবে মুরগি বা হাঁসের ডিমের আঘাতে ‘মারাত্মক’ আহত হওয়া অভিনবই বটে। সামাজিকমাধ্যমে কোনো কোনো রসিকজন মন্তব্য করেছেন, ‘যে মুরগি ওই শক্তিশালী ডিম্ব প্রসব করেছে, সে মুরগিটাকে জাতীয় বীর আখ্যা দিয়ে পুরস্কার দেওয়া হোক’। এসব হাস্যরসের কথা। তবে বিষয়টি কিন্তু হাসিঠাট্টার নয়, অত্যন্ত গুরুতর। যেভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে সহিংস মনোভাবের বিস্তৃতি ঘটছে, তা অচিরেই মল্লযুদ্ধের রূপ ধারণ করে কি না, এ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে সচেতন সমাজ।
দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব যদি এখনই সতর্ক না হন এবং নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকার আইন প্রয়োগের বিষয়ে আক্ষরিক অর্থে কঠোর না হয়, তাহলে পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত ২৮ জানুয়ারি একটি দৈনিকের বিশেষ প্রতিবেদনে সে চিত্রই ফুটে উঠেছে। তাতে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে ছয় দিনে প্রার্থীদের দ্বারা আচরণবিধি লঙ্ঘনের ৮০টি অভিযোগ জমা পড়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। রাজনীতি সচেতন মহলের আশঙ্কা ভোটের তারিখ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এ প্রবণতা আরও বেড়ে যেতে পারে।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশবাসীর মনে প্রত্যয় জন্মেছে, একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে দেশ গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাবে। রাজনৈতিক দলগুলোর অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড দেশবাসীর সে প্রত্যাশাকে দুরাশায় পরিণত করে কি না, সেটাই উদ্বেগের বিষয়।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]


.jpg)
.jpg)