সংসদ নির্বাচন ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো শেষ হয়নি। কোথাও বিজয়ের উচ্ছ্বাস, কোথাও পরাজয়ের হতাশা, আবার কোথাও ভিন্ন ভিন্ন অনিশ্চয়তা– সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক টান টান উত্তেজনা দৃশ্যমান রয়েছে। নির্বাচনি প্রক্রিয়া চলাকালে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনা নতুন করে অনেকের মনেই প্রশ্ন তুলেছে।...
সারা দেশের বেশকিছু কেন্দ্রে ছোট ছোট কয়েকটি সহিংসতার মধ্য দিয়ে শেষ হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোট গ্রহণ। এই লেখাটি যখন লিখছি ততক্ষণে ভোট গ্রহণ শেষে ভোট গণনা শুরু হয়েছে। গণমাধ্যমসূত্রে দু-একটি কেন্দ্রের ফলও আসতে শুরু করেছে। এখন চূড়ান্ত ফলাফলের অপেক্ষা। এই নির্বাচনে মোট ৫০টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী সংখ্যা ১ হাজার ৭৫৫ জন, স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। নারী প্রার্থী ৮৩ জন (দলীয় ৬৩ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২০ জন)। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। তাদের প্রার্থী সংখ্যা ২৯১ জন। এই নির্বাচনে নিবন্ধিত ১০টি রাজনৈতিক দল কোনো প্রার্থী দেয়নি।
অন্যদিকে গণভোট ও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুপুর পর্যন্ত ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৮৪৫টি পোস্টাল ব্যালট রিটার্নিং কর্মকর্তার হাতে পৌঁছেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে মোট ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি ব্যালট পৌঁছেছে। প্রবাসীরা ৫ লাখ ৫৪ হাজার ২৫৮টি ব্যালট সংগ্রহ করেছেন এবং এর মধ্যে ভোটদান সম্পন্ন করেছেন ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৭৫১ জন। ৫ লাখ ৩৭ হাজার ৫৫৪ জন ভোটার তাদের ভোট-সংশ্লিষ্ট দেশের পোস্ট অফিস বা ডাকবাক্সে জমা দিয়েছেন। ইতোমধ্যে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ২৬৬টি ব্যালট বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে এবং ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৫৫১টি ব্যালট রিটার্নিং কর্মকর্তারা হাতে পেয়েছেন।
গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে তুলে ধরা তথ্য অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ ছিল বিচ্ছিন্ন হলেও তা একেবারে উপেক্ষা করার মতো নয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও কয়েকটি ছোট রাজনৈতিক দল নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ‘বিশৃঙ্খল’ আখ্যা দিয়ে কিছু কেন্দ্রে অনিয়মের কথা জানায়। তবে নির্বাচন কমিশনের দাবি ছিল, বড় ধরনের কোনো গোলযোগ হয়নি এবং কোনো কেন্দ্রেই ভোট স্থগিত করার প্রয়োজন পড়েনি। এই দুই অবস্থানের পার্থক্যই নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের জায়গাটিকে স্পষ্ট করে তোলে।
নির্বাচন বড় ধরনের অচলাবস্থা বা সর্বব্যাপী সহিংসতা ছাড়াই শেষ হলেও অনিয়মের অভিযোগ, আচরণবিধি লঙ্ঘন, মনোনয়ন বাতিল এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে বিতর্কিত করে তুলেছে। এসব অনিয়ম হয়তো নির্বাচনকে পুরোপুরি অকার্যকর করে দেয়নি, কিন্তু ভোট-পরবর্তী সময়ে জনগণের আস্থা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
সংসদ নির্বাচন ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো শেষ হয়নি। কোথাও বিজয়ের উচ্ছ্বাস, কোথাও পরাজয়ের হতাশা, আবার কোথাও ভিন্ন ভিন্ন অনিশ্চয়তা– সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক টান টান উত্তেজনা দৃশ্যমান রয়েছে।
নির্বাচনি প্রক্রিয়া চলাকালে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনা নতুন করে অনেকের মনেই প্রশ্ন তুলেছে। কোথাও কেন্দ্র দখলের অভিযোগ, কোথাও আগের দিন রাতে ব্যালটে সিল মারার অভিযোগ, কোথাও এজেন্টের স্বাক্ষরকরা অগ্রিম রেজাল্টশিট প্রাপ্তির অভিযোগ, কোথাও ভোটারদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ, আবার কোথাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারার অভিযোগ সামনে এসেছে। নির্বাচন শেষ হতে না হতেই কেউ বলছেন, ভোট ছিল মোটামুটি শান্তিপূর্ণ; কেউ আবার বলছেন, প্রত্যাশিত পরিবেশ পাননি তারা। এই দ্বিমুখী বয়ানই দেখিয়ে দিচ্ছে, নির্বাচন শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়–এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন ভোট গ্রহণ শেষ। গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে নানা ধরনের তথ্য আমাদের সামনে এসেছে।
বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই নানা সীমাবদ্ধতা, বিতর্ক ও প্রত্যাশার ভার বহন করে চলছে। স্বাধীনতার পর থেকে নির্বাচন এ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা হয়ে উঠেছে ক্ষমতা দখলের কঠিন লড়াইয়ের মঞ্চ। আদর্শ, নীতি বা কর্মসূচির চেয়ে অনেক সময় নির্বাচনে প্রাধান্য পায় সাংগঠনিক শক্তি, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং মাঠের বাস্তব দখল। ফলে নির্বাচন মানেই সাধারণ মানুষের মধ্যে একদিকে আশার সঞ্চার, অন্যদিকে শঙ্কার জন্ম।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনও এর ব্যতিক্রম নয়। ভোটের আগে যেমন ছিল নানা আশঙ্কা, ভোটের দিনেও তেমনি দেখা গেছে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনা। কোথাও ভোটার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কোথাও কেন্দ্রভিত্তিক উত্তেজনার খবর এসেছে, আবার কোথাও প্রার্থীদের মধ্যে অভিযোগ-পাাল্টা অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে। এসব ঘটনা নতুন নয়, বরং বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে এগুলো প্রায় পরিচিত দৃশ্য। প্রতিটি নির্বাচনেই কিছু না কিছু ঘটনা ঘটে, যা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্কের জন্ম দেয়।
ভোট-পরবর্তী শঙ্কাগুলোর একটি বড় জায়গা জুড়ে আছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। নির্বাচন শেষ হলেও ফলাফল নিয়ে বিরোধ কিংবা রাজনৈতিক আন্দোলনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন-পরবর্তী সময় প্রায়ই স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। কখনো কখনো বিজয়ী ও পরাজিত পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, কখনো প্রতিবাদ কর্মসূচি, আবার কখনো দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অচলাবস্থা দেখা দেয়। এসব শঙ্কা সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করে, কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি পড়ে অর্থনীতি, সামাজিক জীবন এবং রাষ্ট্রীয় শাসনে।
নির্বাচনের শেষে এসে বলা যায়, ফলাফল যা-ই হোক না কেন, সামনে অপেক্ষা করছে বড় দায়িত্ব। দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর সংযম দেখানোর, দায়িত্ব প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার, আর দায়িত্ব রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য আরও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনি সংস্কৃতি গড়ে তোলার। না হলে প্রতিটি নির্বাচনই শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের ঘটনা হয়ে থাকবে, গণতন্ত্রের গভীরতর চর্চা আর এগোবে না।
একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা এবং নির্বাচন পদ্ধতির ওপর নাগরিকদের স্থায়ী আস্থা সৃষ্টির লক্ষ্যে স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থাই ছিল সকলের প্রত্যাশা। আর এই প্রত্যাশা পূরণে সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদিচ্ছা, রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীলতা এবং নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সক্রিয়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র কোনো একদিনের আয়োজন নয়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক সহনশীলতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং নাগরিক আস্থা। আজকের নির্বাচন হয়তো সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে, কিন্তু গণতান্ত্রিক চর্চার মান কতটা উন্নত হবে বা হলো সেই প্রশ্নের উত্তর আমাদের অজানা।
লেখক: ড. সুলতান মাহমুদ রানা, অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
.jpg)
.jpg)
.jpg)