শুধু যোগ্য ও দক্ষ কূটনীতিকদের নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন, যাতে রাজনৈতিক প্রভাব বা দলের আনুগত্যের কারণে পদদলিল ভেঙে না যায়। সরকারকে অবশ্যই জনগণের জন্য ন্যায্য ও কার্যকর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে হবে, শুধু দলের স্বার্থের জন্য নয়। আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি হাজারো তরুণের আত্মত্যাগ এবং রক্তদানের মাধ্যমে, তার স্পিরিটকে কখনো উপেক্ষা করা যাবে না। এ দেশ আমাদের সবার। তাই দেশের স্বার্থ রক্ষা ও উন্নয়নের জন্য আমাদের সমানভাবে কাজ করতে হবে।...
বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার পর জনগণের প্রাথমিক উত্তেজনা কিছুটা কমেছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো অগ্রাধিকারভিত্তিতে জাতীয় কার্যক্রম শুরু করা। বিএনপির ভূমিধস বিজয় জনগণের মধ্যে আনন্দ সৃষ্টি করলেও দলটির ওপর বড় দায়িত্বও অর্পিত হয়েছে। দলটির নির্বাচনি ইশতেহারে দুর্নীতি দমনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হওয়ায় তা ফিরিয়ে আনা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ করা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলে অর্থনৈতিকসংকট অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব।
বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চমানের শিক্ষা, চাহিদাভিত্তিক পাঠদান এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে পার্শ্ববর্তী দেশসহ আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসবে। এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সুস্থ ও সহনশীল পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উপার্জনের সুযোগ, নিরাপদ আবাসন এবং নির্ধারিত সময়ে শিক্ষা সম্পন্ন করার উপযোগী ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ইশতেহারের লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হয়।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণা প্রশংসনীয়। তবে এ অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। শিক্ষকদের মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়, কিন্তু এসব প্রশিক্ষণের বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে তেমন কোনো মূল্যায়ন বা জরিপ হয়নি। তাই নতুন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণের আগে পূর্ববর্তী প্রশিক্ষণের ফলাফল, শিক্ষকদের দক্ষতার উন্নয়ন এবং শ্রেণিকক্ষে তার প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং তা সাধারণ মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে সরকারি ও আন্তর্জাতিক সহায়তায় আধুনিক হাসপাতাল ও যন্ত্রপাতি থাকলেও সাধারণ মানুষ এখনো কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত। দরিদ্র মানুষের জন্য চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর সরকারি হাসপাতালে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে তারা যথাযথ সেবা পায় না। অন্যদিকে, বেসরকারি হাসপাতালের ব্যয় বহন করা অধিকাংশ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, দালালচক্র নিয়ন্ত্রণ করা এবং সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
দেশের বিভিন্ন স্থানে বেসরকারি পর্যায়ের গণপরিবহন মোটামুটি ভালো সেবা দিলেও চাঁদাবাজির কারণে ভাড়া বেশি। পরিবহন কোম্পানিগুলোকে বিভিন্ন মহলে চাঁদা দেওয়ায় সেই অতিরিক্ত ব্যয় যাত্রীদের ওপর চাপানো হয়। অন্যদিকে, বড় শহরগুলোতে বিশেষ করে ঢাকায়, কার্যকর ও সমন্বিত গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা যানজট, পরিবেশ দূষণ এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন সরকারের কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
দেশে প্রচুর বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রয়োজন, তবে এটি কেবল বিদেশে তাদের ডাক দিয়ে বা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সভায় বিনিয়োগের কথা বলে আনা সম্ভব নয়। অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা শুধু সৌজন্যবশত বললেও বাস্তবে তা বাস্তবায়িত হয় না। কারণ একজন বিনিয়োগকারী তার অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগ করবে না। এ নিরাপদ পরিবেশ সরকার একা তৈরি করতে পারে না; সরকারের অগ্রণী ভূমিকা অপরিহার্য।
যদি সরকার এমন কোনো সিদ্ধান্ত বা আচরণ গ্রহণ করে, যার ফলে বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলনে নামে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা ভয়ভীতি বা অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগে অংশ নেবে না। অতএব, নতুন সরকারকে এ ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধ করতে হবে। পূর্ববর্তী সরকারের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, দলের কিছু উগ্র বা উচ্চাভিলাষী সদস্য বিষয়গুলোর গুরুত্ব বোঝে না, ফলে সরকারকে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
এ ছাড়া দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা নেই, কারণ অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারকে ব্যাংকিং ব্যবস্থা স্বচ্ছ ও নিরাপদ করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈদেশিক এবং দেশীয় বিনিয়োগ দুটোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সরকারের উচিত যথেষ্ট উপযুক্ত ও দক্ষ ব্যক্তিদের হাতে নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করা। পাশাপাশি, পূর্ববর্তী সরকারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ পরিবেশ আরও স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য করা যায়।
নতুন কর্মসংস্থান প্রধানত বেসরকারি খাতে তৈরি হয়; সরকারি খাতে এর পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত। সরকারি খাতে কিছু কেরানি এবং উচ্চশ্রেণির কেরানি নিয়োগ করা হয়, যা মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ৫ শতাংশ। বাকি ৯৫ শতাংশ কর্মসংস্থান বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করে সরকারকে বেসরকারি খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
বর্তমানে দেখা যায়, সরকারি চাকরির জন্য মানুষ কখনো উচ্চ বেতনের একাধিক বেসরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে সেই চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা করছে, কখনো ঘুষ দিয়ে নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করছে। এর পেছনের মূল কারণ হলো চাকরির নিরাপত্তা এবং দুর্নীতি। সরকারি চাকরিতে দুর্নীতি করা তুলনামূলক সহজ, বেসরকারি খাতে তা তত সহজ নয়। তাই সরকারকে বেসরকারি খাতকে সঠিকভাবে সহায়তা করতে হবে, যাতে বাধা বা আইনের জটিলতা দিয়ে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না হয়। অন্যথায়, দেশে বেকারত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে।
কৃষকের উৎপাদিত শাকসবজি নিকটবর্তী শহরে পাঁচ-ছয় গুণ এবং ঢাকায় ১০-২০ গুণ দামে বিক্রি হয়। এর মূল কারণ হলো পথে পথে চাঁদাবাজি, যা স্থানীয় মাস্তান ও ইউনিফর্মধারী লোভীদের দ্বারা আদায় করা হয়। এতে একদিকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায় নিত্যপণ্যের দাম, অন্যদিকে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের মূল্য না পেয়ে নিজে সর্বস্বান্ত এবং নিরুৎসাহিত হন কিছু উৎপাদন করতে। এটি কীভাবে মোকাবিলা করবে সরকার?
বর্তমান যুগে ‘গ্লোবাল ভিলেজে’ বাংলাদেশকে কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োজন, যা শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এজন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দক্ষ ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট ও প্রকৃত মেধাবী কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে হবে।
পররাষ্ট্র কাজে শুধু রাজনৈতিক যোগসূত্র বা চয়েসের কারণে পদায়ন করা হলে জাতির কোনো লাভ হয় না। কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের বিশ্ব রাজনীতি, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক ভাষাগত দক্ষতায় পারদর্শী হতে হবে। বিদেশে কূটনীতিকদের দায়িত্ব হবে দেশীয় বাজার সৃষ্টি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আনা এবং বাংলাদেশের সঠিক ভাবমূর্তি তুলে ধরা। রাজনীতিবিদদের এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যতটা সম্ভব দূরে রাখা উচিত। আমাদের প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশের মিশনগুলো থেকে প্রাপ্য সেবা পাচ্ছেন না। নতুন সরকারকে এ সমস্যা পেশাগত দক্ষতা এবং চতুরতার সঙ্গে সমাধান করতে হবে, যাতে দেশের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো দেশকে স্থায়ী শত্রু বা মিত্র হিসেবে দেখা যায় না। বৈশ্বিক পরিস্থিতি, অর্থনীতি এবং সমরনীতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের শত্রু-মিত্র সম্পর্কও পরিবর্তিত হয়। এ জটিল এবং পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি বোঝার দক্ষতা রয়েছে কেবল ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাটদের। তাই সরকারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এমন মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে, যারা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেশের স্বার্থ রক্ষা এবং কূটনৈতিক চতুরতা প্রয়োগ করতে সক্ষম।
পতিত সরকারের সময়ে দেখা গেছে, সংবাদ পাঠিকা বা কিছু অভিনয়কর্মীও উন্নত বিশ্বের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পদায়ন পেয়েছেন, যা দেশের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এতে জাতীয় স্বার্থ এবং ভারসাম্যহীন জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ক্ষমতা হ্রাস পায়। কোনো দেশ যদি আমাদের ওপর আক্রমণ করার কথা ভাবেও, সেই জোটের সদস্যরা তা নিজেদের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করবে- এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে।
সুতরাং, শুধু যোগ্য ও দক্ষ কূটনীতিকদের নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন, যাতে রাজনৈতিক প্রভাব বা দলের আনুগত্যের কারণে পদদলিল ভেঙে না যায়। সরকারকে অবশ্যই জনগণের জন্য ন্যায্য ও কার্যকর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে হবে, শুধু দলের স্বার্থের জন্য নয়। আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি হাজারো তরুণের আত্মত্যাগ এবং রক্তদানের মাধ্যমে, তার স্পিরিটকে কখনো উপেক্ষা করা যাবে না। এ দেশ আমাদের সবার। তাই দেশের স্বার্থ রক্ষা ও উন্নয়নের জন্য আমাদের সমানভাবে করতে হবে।
লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট: ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
[email protected]
.jpg)
.jpg)
.jpg)