খামেনির দৃষ্টিতে স্বাধীনতা ও শক্তি দেশের সীমার বাইরে থেকেও প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই যুদ্ধ ইরানিদের শাসকদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য নয় বরং তা তাদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য করে ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ করার কৌশল।...
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন হলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ১৯৩৯ সালে মাশহাদ শহরে জন্ম নেওয়া এই ধর্মীয় নেতা ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত আছেন। দেশটির সামরিক, বিচারিক ও কৌশলগত নীতিনির্ধারণে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব ধরে রেখেছেন। তেহরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মারা যান। একটি ধর্মপ্রাণ পরিবারে জন্ম নেওয়া খামেনি অল্প বয়সেই কোরআন ও ইসলামি ফিকাহ শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ইরানের ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র কোমে উচ্চতর ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেন। এখানেই তিনি ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন ইরানের বিপ্লবী নেতা রুহুল্লাহ খোমেনির মতাদর্শের সঙ্গে, যা তার রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৯৬০-৭০ দশকে ইরানের শাহ সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন খামেনি। একাধিকবার গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন। তার বক্তৃতা ও লেখালেখী তৎকালীন তরুণ সমাজের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে শাহ শাসনের পতন ঘটে এবং খোমেনি দেশের সর্বোচ্চ নেতা হন। নতুন ইসলামি প্রজাতন্ত্রে খামেনি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থানে উঠে আসেন। ১৯৮১ সালে তিনি ইরানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এই সময় চলছিল ইরান-ইরাক যুদ্ধ। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক নীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। একই বছর এক বোমা হামলায় গুরুতর আহত হন; সেই হামলার পর তার ডান হাত আংশিকভাবে অকার্যকর হয়ে যায়। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদের সিদ্ধান্তে খামেনি ইরানের সুপ্রিম লিডার নির্বাচিত হন।
এই পদ ইরানের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর অবস্থান। ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দুতে থাকা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শুধু একজন ধর্মীয় নেতা নন- তিনি ইরানের রাষ্ট্রকাঠামো, সামরিক নীতি ও আঞ্চলিক কৌশলের প্রধান নিয়ন্ত্রক। তার নেতৃত্বে ইরান একটি আদর্শভিত্তিক বিপ্লবী রাষ্ট্র থেকে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের হামলায় নিহত হয়েছেন। বিশ্বের অন্য অনেক দেশের তুলনায় ইরানের শাসন পদ্ধতি বেশ আলাদা। সেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট বা সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হলেও দেশের মূল ক্ষমতা থাকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছিল যে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার চেষ্টা করা হতে পারে। এমনকি দেশটির অন্য কোনো নেতা নন, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিই কেন আমেরিকা বা ইসরাইলের টার্গেটে সেই প্রশ্নও বহু বছর ধরে আলোচনায় আছে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার শাসনের এই ব্যবস্থা চালু হয় ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে। একটি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে রেজা শাহ পাহলভীর রাজতন্ত্রকে উৎখাত করা হয়। তাকে উৎখাতের পর ইরানে ধর্মীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর দেশটি দুজন সুপ্রিম লিডার বা সর্বোচ্চ নেতা পেয়েছে। তাদের পদবি হিসেবে আয়াতুল্লাহ ব্যবহার করা হয়, শিয়া ধর্মাবলম্বিদের কাছে যার অর্থ সিনিয়র ধর্মীয় নেতা। সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশটির সামরিক বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ ছিলেন। এ ছাড়া দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার সম্মতি দরকার হতো।
এমনকি ইরান পারমাণবিক ক্ষমতার অধিকারী হবে কিনা অথবা জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থাকে সহযোগিতা করবে কিনা, এসবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তিনি দিতেন। ইরানের সর্বোচ্চ এ ধর্মীয় নেতা মারা যাওয়ার পর পরবর্তী নেতা কে হবেন কিংবা কীভাবে নির্বাচিত হবেন সে প্রশ্নও সামনে আসছে। ইরানের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় দেশটির জনগণের নেতা নির্বাচনে কার্যত কোনো এখতিয়ার থাকে না। এমনকি সামাজিক মাধ্যমে কেউ খামেনির সমালোচনা করলে সে জন্যও তাকে জেলে যেতে হতে পারে। এমন প্রথা চালু ছিল। ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের ধর্মীয় নেতাদের একটি পর্ষদ আলী খামেনিকে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচন করে; যদিও তাকে দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ দিতে সংবিধান সংশোধন করার প্রয়োজন পড়েছিল। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি ছিলেন সেই আদর্শগত শক্তি, যিনি ইরানে পাহলভি রাজতন্ত্র অবসানের বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছিলেন সেই নেতা, যিনি ইরানের সামরিক ও আধা সামরিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালীরূপে গড়ে তুলেছিলেন। এ ব্যবস্থা শুধু শত্রুর বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে ক্ষান্ত হননি, বরং দেশের সীমার বাইরে গিয়েও নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। আজকের ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা তিনিই গড়ে তুলেছিলেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে দেশটির রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। দীর্ঘ যুদ্ধ, সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন দেওয়ার কারণে ইরানিদের ভেতর একধরনের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। এতে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আলী খামেনির অবিশ্বাস আরও গভীর হয় বলে মত বিশ্লেষকদের।
৩৭ বছরের শাসক জীবনে আলী খামেনি সম্ভবত এ বছর জানুয়ারিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন। ডলারের বিপরীতে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়ালের ব্যাপক দরপতন ঘিরে গত বছর ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে ব্যবসায়ী ও দোকানদাররা বিক্ষোভ শুরু করেছিলেন। সেখান থেকে পুরো দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, বিক্ষোভকারীরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের ডাক দেন। শুধু কট্টর ধর্মীয় নেতা নয়, খামেনি একজন বাস্তববাদীর নেতাও ছিলেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, তিনি বিশ্বাস করতেন যে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়াই ভিন্ন কৌশলে পরিচালনা করতে হবে; প্রতিরোধ করতে হবে, কিন্তু প্রয়োজনে আলোচনাও করতে হবে। ২০১৫ সাল, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তত দিনে দেশটির ওপর নানা কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি ধুঁকছিল।
আলী খামেনি অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক চাপ কমানো এবং সরকারের বৈধতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। আলী খামেনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনায় অনুমোদন দেন। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বশক্তির সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তিতে উপনীত হয় ইরান। এটি ইরান পরমাণু চুক্তি নামে পরিচিত। ওই চুক্তিতে বলা ছিল, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনবে, বিনিময়ে ধাপে ধাপে ইরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে। যদিও ওই চুক্তি হওয়ার তিন বছর পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে বের করে আনেন এবং দেশটির ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এর জেরে আলী খামেনিও আবার তার আগ্রাসী অবস্থানে ফিরে আসেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা বাতিল করেন এবং ধীরে ধীরে চুক্তি লঙ্ঘনের সমর্থন দেন। খামেনির দৃষ্টিতে স্বাধীনতা ও শক্তি দেশের সীমার বাইরে থেকেও প্রয়োজন। তাহলে সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করতে এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো শত্রুর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ মোকাবিলা করতে একটি অগ্রগামী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখা যায়। এ ভাবনা বাস্তবে পরিণত হয় ইরানের বাইরে সহযোগী দেশ ও গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মিলে বিকল্প বাহিনী গড়ে তোলার মাধ্যমে। ইরানি বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, পরবর্তী নেতা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন আলেমের নেতৃত্বে গঠিত একটি অন্তর্বর্তী পরিষদ সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করবেন। ট্রুথ সোশ্যালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনিকে হত্যার ঘোষণা দেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তেহরানকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বেশ কজন ভালো প্রার্থী রয়েছে।
ইরানের শেষ রাজার ছেলে রেজা পাহলভিও এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, ইসলামিক শাসনব্যবস্থার পতন ঘটলে ইরানে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পরিকল্পনা তারও রয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে মানবিক হস্তক্ষেপ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে নয়। চূড়ান্ত বিজয় আমাদের দ্বারাই অর্জিত হবে। আমরা, ইরানের জনগণই এই চূড়ান্ত লড়াইয়ে বিজয় অর্জনের কাজ শেষ করব। সর্বোচ্চ নেতাই ইরানের জটিল শিয়া ধর্মীয় ক্ষমতাকাঠামোর প্রাণকেন্দ্রে থাকেন। রাষ্ট্রের যেকোনো বিষয়ে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। খামেনি তার শাসনকালে আইআরজিসিকে ব্যাপক ক্ষমতাশালী করে তুলেছিলেন; তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী নানা সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিয়ে গঠিত প্রতিরোধ অক্ষেরও নেতৃত্ব দেয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই যুদ্ধ ইরানিদের শাসকদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য নয় বরং তা তাদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য করে ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ করার কৌশল। এই প্রক্রিয়ায় পাহলভিরা দালালের ভূমিকায় নেমেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে টানা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মানুষ নন। কিন্তু ইসরায়েলের লক্ষ্য অনেক বেশি দীর্ঘমেয়াদি। তারা বৃহত্তর ইসরায়েলের স্বপ্ন পূরণে ধাপে ধাপে এগোতে প্রস্তুত।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, যুক্তরাজ্য


