আবুধাবি থেকে রিয়াদ- উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে নিজেদের ভাগ্য নিজেদের নির্ধারণ করে নিতে হবে, ইসরায়েল ও আমেরিকার দাবার ঘুঁটি হলে চলবে না।...
শনিবারের সকাল। দুবাই বিমানন্দর। একের পর এক ফ্লাইটের উড্ডয়ন বাতিল হচ্ছে। একই দৃশ্য দেখা গেল আবুধাবি, দোহা, মানামা ও কুয়েত সিটিতে। ওই দিন বিকেলে দুবাই ও কুয়েত বিমানবন্দর আক্রান্ত হলো। এ ঘটনায় বিমূঢ়, স্তম্ভিত উপসাগরীয় অঞ্চলের মানুষ।
কেন যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটা বোঝা কঠিন। তিনি সবসময় আপ্তবাক্যের মতো বলে থাকেন- ‘আমেরিকা ফার্স্ট’, কিন্তু এরপরই দেখি পরমমিত্রের দিকে ঘনিষ্ঠ হয়ে বলছেন- ‘ইসরায়েল ফার্স্ট’।
ঘটনা কী? এটা কি এপস্টেইন ফাইল থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার কৌশল? ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে থাকতে চান এবং ওয়াশিংটনকে যে সেই যুদ্ধে টেনে আনতে চান, সেটা তো তার নিজেকে বাঁচানোর কৌশল হিসেবে করে যাচ্ছেন।
ইসরায়েল যুদ্ধ চায় এবং ইসরায়েলই সবসময় যুদ্ধ শুরু করে। ট্রাম্প যদি যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানাতেন, তাহলে যে করেই হোক, ইসরায়েল ইরানে হামলা করত।
লক্ষ্য যা-ই থাকুক, ইসরায়েলের যুদ্ধংদেহী অপকর্মের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এতে এ অঞ্চলের রাজতন্ত্র হুমকির মুখে পড়তে পারে। যে যুদ্ধ তারা চান না, বাধা দেওয়ার কথা বলেন, সেই যুদ্ধের দায় তাদের ওপর বর্তাবে।
এটা আসলে যুদ্ধের চিরাচরিত গল্প, যেখানে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চলবে, উপসাগরীয় অঞ্চল টুকরো টুকরো হয়ে যাবে এবং ইসরায়েল রাজনৈতিক সুবিধা পাবে।
ইরানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে আঘাত করছে। যেমন- কাতার ও ওমান। তারা আক্রান্ত হওয়ায় ওয়াশিংটনকে যুদ্ধ থামানোর জন্য চাপ দেবে, যে যুদ্ধে আসলে যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হতে পারবে না।
এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়াচ্ছে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলকে আমেরিকার দ্বারা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ছে। আমেরিকার যেন এ দেশগুলোকে নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর উপসাগরীয় অঞ্চলটা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিমুখী আক্রমণের মাঝে পড়ে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল এমন নয়। উপসাগরীয় দেশগুলো সামরিক দিক থেকে ক্ষমতাহীনও নয়। তারা জানে কোথায়, কখন, সামরিক অভিযান চালাতে হবে; সে সক্ষমতা তাদের আছে।
আসলে পরিণামে যা ঘটছে তা হলো আঞ্চলিক অস্থিরতা ও গোলযোগ বাড়ল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ‘আমেরিকাই প্রথম’- এ মন্ত্র আর জপছেন না। তিনি এ আপ্তবাক্যটিকে পরিত্যাগ করেছেন। তিনি এখন আসলে বিশ্বকে গায়ের জোরে নতুন একটা কাঠামো দিতে চাইছেন। কিন্তু এর পরিণাম যে কী হতে পারে, তা তিনি ভেবে দেখেননি।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এ আসলে দুঃস্বপ্নের মতো। পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলটির অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটছিল নতুন ‘ব্যবসায়িক মডেলে’র ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু এ যুদ্ধ ও আগ্রাসন তাদের এ মডেলের সঙ্গে যায় না। উপসাগরীয় দেশগুলো গুরুত্ব দেয় কানেকটিভিটি, অর্থাৎ বাণিজ্যের নানা পথ আবিষ্কার করা, পুঁজির সচলতা, ডাটা পদ্ধতির ব্যবহার, জ্বালানিশক্তির অবকাঠামো তৈরি ইত্যাদির ওপর। কয়েক দশক ধরে তারা এ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কিন্তু ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ সবকিছু তছনছ করে দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটন নীরবে-নিঃশব্দে তার নীতির বাস্তবায়ন ঘটায় কাতার ও ওমানের মধ্যস্থতায়। ইসরায়েল ও হামাস, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করে দোহা। মাসকাট ঠিক একই কাজ করে আরও সূক্ষ্মভাবে। কিন্তু প্রতিদানে তারা কী পেল? পেল আগুন-যুদ্ধ। কাতার যাদের হয়ে কূটনৈতিক মধ্যস্থতা করে তাদের মধ্যে আছে ইরান ও ইসরায়েল। গত এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে সেই ইরান দুবার এবং ইসরায়েল একবার কাতারে হামলা করেছে। ওমানও সর্বশেষ আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়নি।
ওয়াশিংটন যে উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিরাপত্তা দেবে বলেছিল, তা প্রতিবার মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে গেছে। কিন্তু এবার ইরান দেশগুলোকে মুহুর্মুহু আক্রমণ করছে, তা অতীতের সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ড্রোন ও মিসাইলের ঢেউ আছড়ে পড়ছে সামরিক স্থাপনায় এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, অর্থাৎ বিমানবন্দর, নৌবন্দর, তেলের মজুতের ওপর। হোটেল এবং ভবন আক্রান্ত হচ্ছে। উপসাগরীয় সামরিক প্রতিরক্ষা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে এবং এর অভিঘাত রাজধানী ছাড়িয়ে আরও দূরবর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ইরানের লক্ষ্যটা কী, তা এখন স্পষ্ট। ইরান উপসাগরীয় অর্থনীতির ওপর আঘাত হানছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর শক্তিকেন্দ্র এবং অবকাঠামো ভেঙে দিচ্ছে।
উপসরীয় নেতারা এখন দুঃসময়ের মুখোমুখি। তারা ভাবছেন নিয়ন্ত্রিত কূটনীতির কথা। যুক্তরাষ্ট্রকে তার কূটনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর তুলনায় ইরান বাড়তি সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। তাদের সস্তা ড্রোনগুলো উপসাগরীয় মানচিত্রজুড়ে তারা ছুড়ে দিচ্ছে। ড্রোনগুলো আঘাত হানছে উপসাগরীয় নেটওয়ার্কের ওপর।
উপসাগরের যুদ্ধ বিমানগুলো এরপর হয়তো আত্মরক্ষায় এগিয়ে আসবে। তারা সাহায্য নেবে তাদের মিত্রদেশ যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের। কিন্তু এভাবে যত তারা যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হবে, ততই উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কাছাকাছি চলে আসবে।
ইরানের সুবিধা হচ্ছে, বিমান হামলার জন্য যে খরচ হয়, ড্রোনের খরচ সে তুলনায় অনেক কম। ফলে, কতদিন উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে পারবে সেটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। আসলে তাদের এ অঞ্চল নিয়ে ইসরায়েলের যে ভাবনা- গোলযোগ বাঁধিয়ে রাখা, তা থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোকে সরে আসতে হবে। আকাশপথে বিমান হামলা করে তেহরানের রেজিম চেঞ্জ করা যাবে না। খামেনির পতন ইরানের ইসলামিক রিপাবলিককে এমন একদিকে ঠেলে দিচ্ছে যেখানে এ দেশটি না ইসলামি, না প্রজাতন্ত্র, কোনোটাই হবে না। বরং ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড দেশটিকে সামরিক স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র করে তুলবে।
সবমিলিয়ে ইসরায়েল আসলে উপসাগরীয় স্থিতিশীলতাকে তছনছ করে দিচ্ছে। এর বিকল্প কী? বিকল্প হচ্ছে, স্বায়ত্তশাসিত নিজস্ব উপসাগরীয় নীতি গ্রহণ করা যা সার্বভৌমত্ব এবং উপসাগরীয় ঐক্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু উপসাগরের নিরাপত্তা কাঠামো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে; তার পরও বলব, উপসাগরীয় অঞ্চলটি ক্ষমতাহীন নয়। তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারে কোথায় কখন তাদের সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দাবি করতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যে সে যে আগ্রাসী আক্রমণের নীতি গ্রহণ করেছে তা সীমিত করে আনে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সুযোগ এসেছে ৭ অক্টোবর পরবর্তী পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে তারাই হয়ে উঠতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের সব সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের যে ধর্মকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদকে সমর্থন করে, তা থেকে সরে আসতে হবে। তাদের এ নীতিতে এগিয়ে যেতে হলে বেছে নিতে হবে ‘উপসাগরই প্রথম’- এ নীতি; ইসরায়েল ও আমেরিকাই প্রথম এটা মেনে নিলে হবে না। মোদ্দা কথা, উপসাগরীয় দেশগুলোকে সক্রিয় হয়ে নিজেদের ভাগ্য নিজেদের নির্ধারণ করে নিতে হবে; যুক্তরাষ্ট্রের খেলার দাবার ঘুঁটি হলে চলবে না। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট আসলে নতুন ধরনের উপসাগরীয় রাজনীতির সংজ্ঞা নির্মাণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলো সে নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে যাবে।
লেখক: লন্ডন কিংস কলেজের ডিফেন্স স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ
মিডিলইস্ট আই থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান


.jpg)