সমাজ ও রাষ্ট্রের বৈষম্য দূরীকরণে বর্তমান প্রজন্মের নারীদের শিক্ষা দীক্ষায় আরও বেশি সচেতন হওয়া জরুরি। যে শিক্ষা মানুষের মনকে অবমুক্ত করে দেয় তা কখনো আড়াল করে রাখা যায় না। রাষ্ট্র সমাজ ও পরিবারকে আলোকিত করতে হলে পুরুষের পাশাপাশি নারীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থনৈতিক সামাজিক মুক্তির জন্য নারীর দরকার উদারমুখী শিক্ষা।...
দেশে যখন মারাত্মক অপরাধ সংঘটিত হয় তখন আইনের বিষয়গুলো সামনে আসে। সাম্প্রতিক অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় আইনের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সর্বমহলে একই প্রশ্ন আদৌ কি আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে! বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ২০২৫ আইনটি নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা এবং নির্যাতন প্রতিরোধ ও শাস্তির জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। মূলত এটি ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি সংশোধিত রূপ। আইনে অপরাধের শাস্তি ও দিকনির্দেশনার বিষয়ে সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা অনেকটাই শৈথিল্য দেখা যায়। আইন আছে কিন্তু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় সাধারণ জনগণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারে না। ইদানীং যে বিষয়টি বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে তা হলো–যখন কাউকে হত্যা করা হচ্ছে বা আঘাত করা হচ্ছে তা কিছু মানুষ ভিডিও করছে আবার কেউবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকায় থাকছে। এমন ঘটনা এখন সমাজে অহরহ চলছে। অথচ অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির সাহস পেত না কেউ।
নারীর প্রতি সহিংসতা বৈষম্য আদিকাল থেকেই চলে আসছে। আমরা জানি, নারীর প্রতি সহিংসতা এখন শুধু সামাজিক সংকট নয়, এটি মৌলিক মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। নারীর প্রতি বৈষম্য উন্নয়নের অন্তরায়। এ বৈষম্য রোধে আন্তর্জাতিক যে প্রয়াসগুলো রয়েছে তার মধ্যে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণমূলক পদক্ষেপ হলো জাতিসংঘে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও)। নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্যবিলোপ সনদ সংক্ষেপে সিডও নামে পরিচিত। নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে সিডও সনদে ৩০টি অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছে। এর প্রথম ১৬টি অনুচ্ছেদ নারীর প্রতি কত ধরনের বৈষম্য আছে তা নিশ্চিত করে। বাকি ১৪টি অনুচ্ছেদ ব্যক্ত করে কীভাবে এগুলো বিলোপ করা যায়। অর্থাৎ এর মূল বিষয় হলো নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ বা দূরীকরণ। সিডও সনদে রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক সব ক্ষেত্রে নারীর মানবাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি স্পষ্ট করে বলা আছে। বাংলাদেশের সংবিধানে নারীর অধিকার নিশ্চিতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা রয়েছে। সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, সমাজ বাস্তবতায় সংবিধানের ধারার যথার্থ বাস্তবায়ন আজও সম্ভব হয়নি। নারীরা নানা ক্ষেত্রে নিষ্পেষিত এবং বৈষম্যের শিকার।
নারী ও শিশু নির্যাতনের সামগ্রিক চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে দেশে যৌন সহিংসতা ও শারীরিক নির্যাতন উচ্চ মাত্রায় অব্যাহত রয়েছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) কর্তৃক সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে ২৫৩টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এ মাসে ধর্ষণের ঘটনা ৩৩টি, দলবদ্ধ ধর্ষণ ১২টি এবং ধর্ষণ ও হত্যা ৫টি। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ছয়জন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী। উল্লেখ্য, ধর্ষণের শিকার ৩৩ জনের মধ্যে সাতজন শিশু ও আটজন কিশোরী রয়েছে। অন্যদিকে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন দুজন শিশু, একজন কিশোরী ও ৯ জন নারী এবং ধর্ষণও হত্যার শিকার হয়েছেন দুজন শিশু ও তিনজন কিশোরী। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা ১২টি, যৌন হয়রানি ১১টি, শারীরিক নির্যাতনের ৬০টি ঘটনা ঘটেছে। অ্যাসিড নিক্ষেপে আক্রান্ত হয়েছেন একজন নারী। এ মাসে চারজন কিশোরী ও ২৭ জন নারীসহ মোট ৩৫ জন আত্মহত্যা করেছেন। এ মাসে অপহরণের শিকার হয়েছেন চারজন কিশোরী, অন্যদিকে একজন কিশোরী ও পাঁচজন নারী নিখোঁজ রয়েছেন। গণমাধ্যম সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, পরীক্ষার ফলে অকৃতকার্য, প্রতিশোধ, পারিবারিক বিরোধ, যৌতুক, প্রেম ঘটিত, হতাশা, অভিমান ইত্যাদি কারণে এই হত্যাকাণ্ড ও আত্মহত্যাগুলো সংগঠিত হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার মূল কারণ বিবেচনায় আসে বিচারহীনতা। নারীকে বিভিন্নভাবে ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে, যা কখনো কাম্য নয়। এসব বিষয় নিয়ে নাগরিক জীবনে উদ্বেগ ও অস্বস্তি বিরাজ করছে।
নারী ও শিশু সহিংসতার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা বাড়ছে, যা সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও বিচারহীনতার সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে। সমাজ বিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব, সামাজিক অস্থিরতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিকৃত নানা চর্চা ও নৈতিক শিক্ষার অভাবে বারবার নৃশংসতার শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা। এ বিষয়ে রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। পাশাপাশি পরিবারগুলোকে হতে হবে আরও বেশি সচেতন। আইনজীবীদের মতে, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ আইনের বিচারের সময় আসামির জামিন ভুক্তভোগী নারীর জীবনকে হুমকির মধ্যে ফেলে। এজন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট আইনের পরিবর্তন ও সঠিক প্রয়োগ। নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্যরোধে সরকারকে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এজন্য একটি যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত আইন প্রণয়ন করা জরুরি। যার মাধ্যমে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
সমাজ ও রাষ্ট্রের বৈষম্য দূরীকরণে বর্তমান প্রজন্মের নারীদের শিক্ষা দীক্ষায় আরও বেশি সচেতন হওয়া জরুরি। যে শিক্ষা মানুষের মনকে অবমুক্ত করে দেয় তা কখনো আড়াল করে রাখা যায় না। রাষ্ট্র সমাজ ও পরিবারকে আলোকিত করতে হলে পুরুষের পাশাপাশি নারীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থনৈতিক সামাজিক মুক্তির জন্য নারীর দরকার উদারমুখী শিক্ষা। ইসলামে নারী শিক্ষার অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। মহান আল্লাহপাক পুরুষকে যেমন শিক্ষা অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন তেমন নারীকেও শিক্ষা অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর বিধানে শিক্ষা অর্জন করা নর-নারীর সমান অধিকার। একটি পরিবারকে সুশিক্ষিত করে তুলতে হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। নারীরা সমাজের অবরোধ প্রথা ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। জাতি গঠনে এই নারীরা অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। পুরুষের সঙ্গে সমানতালে উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় শরিক হতে পেরেছেন। শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য জরুরি। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয় প্রয়োজন সচেতনতা, শিক্ষা এবং পারিবারিক ও সামাজিক মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন। নারী ও পুরুষের টেকসই সমতা প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে প্রয়োজন পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব।
ঘটা করে বিভিন্ন দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিবসটি শুধু অধিকার দাবি নিয়ে সরব নয় নারীরা সোচ্চার হয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ব গড়ে তোলার প্রত্যয়ে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সব ক্ষেত্রে সমতার চর্চায় হতে পারে একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার হাতিয়ার। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নারীর সামাজিক সুরক্ষায় এবং নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিতে চালু করছে ফ্যামিলি কার্ড। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং দেশের অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও এরকম একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে পারবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান সরকার নারীর ক্ষমতায়নে নারীবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন যার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নে এ প্রজন্মের নারীরা পুরুষের সহযোগী হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে পারে। আমরা আশাবাদী অচিরেই সরকার সহিংসতামুক্ত কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে।
লেখক: সহকারী সম্পাদক, খবরের কাগজ
বেগম রোকেয়া পদকপ্রাপ্ত (পল্লি উন্নয়ন)
স্থানীয় সরকার গবেষক
.jpg)
.jpg)
.jpg)
