বাস্তবে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে হলে কঠোর সাংবিধানিক মানদণ্ড পূরণ করতে হয় এবং প্রয়োজনে তা আদালতের বিচারাধীনও হতে পারে। কোনো রাজ্যে যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে সংবিধান অনুযায়ী সরকার চালানো সম্ভব হচ্ছে না, তখন কেন্দ্র সেই রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারে। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার কার্যত আর কোনো ক্ষমতা থাকে না। রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে থাকে না।...

পশ্চিমবঙ্গে কি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে দিল্লির নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ সরকার? আসন্ন বিধানসভা ভোটের আগে হাতেগোনা কয়েক মাস বাকি। কিন্তু অসম্পূর্ণ ভোটার তালিকা, পাহাড়প্রমাণ ‘বিচারাধীন’ ভোটারদের তথ্য যাচাই, হঠাৎ করে সিডি আনন্দ বোসকে সরিয়ে দুদে প্রাক্তন আইপিএস আর এন রবিকে রাজ্যপাল করে পাঠানোর মতো ঘটনা পরম্পরায় বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসনের আশঙ্কা একেবারেই অমূলক নয়। অনেকের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন সম্ভব না হলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সম্ভাবনা থেকেই যায়।
বাস্তবে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে হলে কঠোর সাংবিধানিক মানদণ্ড পূরণ করতে হয় এবং প্রয়োজনে তা আদালতের বিচারাধীনও হতে পারে। কোনো রাজ্যে যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে সংবিধান অনুযায়ী সরকার চালানো সম্ভব হচ্ছে না, তখন কেন্দ্র সেই রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারে। এ ব্যবস্থার উল্লেখ রয়েছে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫৬-এ। চলতি কথায় এটাকেই ‘রাষ্ট্রপতি শাসন’ বলা হয়।
রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার কার্যত আর কোনো ক্ষমতা থাকে না। রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে থাকে না। যদিও বাস্তবে তা কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং রাজাপাল রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি হিসেবে রাজ্য পরিচালনা করেন। অনেক ক্ষেত্রে বিধানসভা ভেঙে দেওয়া হয় বা ‘সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশন’-এ রাখা হয়, অর্থাৎ বিধানসভা থাকলেও তা কার্যকরভাবে কাজ করে না।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হওয়ার পর সেটিকে সংসদের অনুমোদন পেতে হয়। সাধারণত দুই মাসের মধ্যে লোকসভা ও রাজ্যসভা–উভয় কক্ষেই তা পাস করাতে হয়। অনুমোদন পেলে রাষ্ট্রপতি শাসন প্রথমে ছয় মাস পর্যন্ত বলবৎ থাকে। প্রয়োজনে তা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো যেতে পারে, তবে সাধারণ নিয়মে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি শাসন চালু রাখা যায় এবং প্রতিবারই সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
অন্যদিকে, যদি কোনো রাজ্য সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় এবং নানা জটিলতার কারণে সঙ্গে সঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন করা সম্ভব না হয়, তখন কেন্দ্রীয় সরকার সেই রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে রাজ্য প্রশাসন রাজ্যপালের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং নির্বাচন কমিশন পরিস্থিতি অনুকূল হলে নির্বাচনের আয়োজন করে। নির্বাচন হয়ে নতুন বিধানসভা গঠিত হয়। এর পর নতুন সরকার শপথ নিলে রাষ্ট্রপতি শাসনের অবসান ঘটে।
আবার কোনো রাজ্যে একটি নির্বাচিত সরকার (মন্ত্রিসভা) এবং বিধানসভা কার্যকর অবস্থায় থাকলেও কেন্দ্র সরকার চাইলে সংবিধানের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের ভূমিকা ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড রয়েছে। এমনিতে রাজ্য সরকার সরাসরি রাষ্ট্রপতি শাসন ঠেকাতে পারে না। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫৬ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন, কোনো রাজ্যে সংবিধান অনুযায়ী সরকার চালানো সম্ভব হচ্ছে না, তাহলে তিনি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারেন।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে ১ কোটি ২০ লাখ ভোটারকে বাদ রেখেই জোট হবে কি না সে ব্যাপারে ধোঁয়াশা বজায় রেখেছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জগ্রনেশ কুমার। চলতি সপ্তাহে নিউ টাউনের একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, অবাধ ভোট করার জন্য সব রকমের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোনো বৈধ ভোটারকে বাদ রেখে ভোটগ্রহণ করা হবে না। প্রশ্ন ওঠে, ইতোমধ্যেই বাদ পড়া ৫৮ লাখ মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটার এবং প্রায় ৬২ লাখ বিচারাধীন বা অ্যাডজুডিকেটেড ভোটারদের (অর্থাৎ সব মিলিয়ে ১ কোটি ২০ লাখ) কি বাদ রেখেই ভোট গ্রহণ করা হবে? বিরোধী সিপিআই (এম) এবং কংগ্রেস বারবার অ্যাডজুডিকেটেড ভোটার নাম বাদ দেওয়ার বিপক্ষে বলে আসছে। ৬০-৬২ লাখ ভোটারকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বঞ্চিত করা যাবে না বলে তাদের মত। এ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে গত তিন দিন বারবার কালো পতাকা দেখায়। সেই সঙ্গে দেওয়া হয় ‘গো ব্যাক’ স্লোগান। কিন্তু এতদসত্ত্বে এ নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেননি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। তবে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, কোনো রাজনৈতিক নেতার হুমকিকে মেনে নেওয়া হবে না। এসব ক্ষেত্রে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এত কিছু হচ্ছে তা সবই ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে। নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে দেখা করে তৃণমূলের নেতারা বলেছেন, ‘আমরা আনি নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক নিরপেক্ষ সংস্থা, কিন্তু তাদের কাজে তার প্রতিফলন হচ্ছে না।’
পশ্চিমবঙ্গে হিংসামুক্ত ভোটের কথা বলেছেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার আনেশ কুমার। কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের ভোট হবে অবাধ, শান্তিপূর্ণ। কোনোরকম হিংসা বরদাশত করা হবে না। এ সূত্রেই তিনি জানিয়েছেন, ভোটের কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের ভয় দেখানো বা হুমকি দেওয়া যাবে না। এ-সংক্রান্ত অভিযোগ পেলে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, বৈধ কারও নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে না। জ্ঞানেশ জানিয়েছেন, এবার পশ্চিমবঙ্গে ৮০ হাজারেরও বেশি ভোট গ্রহণ কেন্দ্র বা বুথ থাকবে। কোনো বুথে ১২০০-এর বেশি ভোটার থাকবেন না। স্বচ্ছতার খাতিরে প্রতিটি বুথে ওয়েব কাস্টিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। জ্ঞানেশ এ-ও জানিয়েছেন, প্রতিটি বুথে ভোটার সহায়তা কেন্দ্র, পানীয় জলের বন্দোবস্ত এবং বাইরে মোবাইল ফোন রাখার জায়গা থাকবে।
নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের বৈঠকে ‘সতর্কবাণী’ পেয়েছেন রাজ্যের বেশ কয়েকজন আমলা এবং পুলিশ আধিকারিক। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ‘কোপে’ পড়তে হয় রাজ্য পুলিশের সর্বোচ্চ কর্তা ডিজি (আইনশৃঙ্খলা) বিনীত গোয়েলকেও। জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার থেকে পুলিশ সুপারদের সোমবার ‘সতর্কবার্তা’ দিয়েছে কমিশন। বলা হয়েছে, বিধানসভা নির্বাচনের সময়ের গণ্ডগোল, রাজনৈতিক হিংসা বরদাশত করা হবে না। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ জানান, নির্দেশ মতো না চললে পরিণামে বিচার বিভাগীয় তদন্তের মুখেও পড়তে হতে পারে পুলিশ বা আমলাকে। ভোটের পরও নজর রাখবেন তারা। ২০২১ সালের মতো ২০২৬ সালে ‘ভোট পরবর্তী হিংসা’র অভিযোগ বরদাশত করা হবে না। ইরান যুদ্ধের বাহানায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মতো পশ্চিমবঙ্গেও রান্নার গ্যাসের কালোবাজারি শুরু হয়েছে। বহু গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটারই জানাচ্ছেন, গ্যাস নেই। অথচ ডেলিভারি বয়দের বেশি টাকা কবুল করলেই মিলছে। গ্যাস কোম্পানিগুলো অবশ্য গ্যাসের অভাব রয়েছে এমনটা স্বীকার করতে রাজি নন। তা সত্ত্বেও কালোবাজারি কেন, তা নিয়ে তারা একটি মন্তব্যও করেননি। এর জেরে বহু মধ্যবিত্ত পরিবারেই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তার পরিবেশ। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বেশ কয়েকটি নামজাদা রেস্তোরাঁ ও হোটেলও। তবে কেন্দ্র আপাতত পরিস্থিতি সামাল দিতে একাধিক কৌশল নিয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে। সরকারি মহলের দাবি, এ মুহূর্তে ঘরোয়া বাজারে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবস্থাপনায় বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তার ফলে এখনই তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এনএলজি) দাম বাড়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি অংশ ঘরোয়া ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দেওয়ার কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে গ্যাসের মজুত অযথা বাড়ানো বা কালোবাজারি রুখতে নতুন কিছু নিয়মও চালু হয়েছে। দুটি গ্যাস বুকিংয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে যেখানে একটি বুকিংয়ের পর পরবর্তী বুকিং করতে ন্যূনতম ২১ দিন অপেক্ষা করতে হতো, সেখানে এখন সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ২৫ দিন করা হয়েছে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, বাণিজ্যিক ব্যবহারের তুলনায় ঘরোয়া রান্নার গ্যাসের সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে সংস্থাগুলোকে। পাশাপাশি বিদেশ থেকেও অতিরিক্ত গ্যাস আমদানির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক
.jpg)
.jpg)
.jpg)