ঢাকা ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
বন্দরে বেতনের দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ আইএইচএফ ট্রফিতে দুই বিভাগে রূপা জিতল বাংলাদেশ আলু সংরক্ষণাগারে কেজিপ্রতি ৫ টাকা ভাড়ার দাবি, ৭ দিনের আল্টিমেটাম বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫.৬৩ বিলিয়ন ডলার ইরান-মার্কিন চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে রবিবার, খুলে দেওয়া হবে হরমুজ প্রণালী সোনারগাঁয় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার গৃহবধূ আতঙ্কে ঘর ছাড়া, নিরাপত্তার আশ্বাস পুলিশের ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনে অভিযান ইতিহাসের দুয়ারে গিয়ে থামল বাংলাদেশ, রক্ষা পেল অজিরা চুয়াডাঙ্গায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণ জব্দ করল বিজিবি গফরগাঁওয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে স্কুলশিক্ষিকার মৃত্যু বরগুনায় চিরকুট লিখে পুলিশ সদস্যের আত্মহত্যা নরসিংদীবাসীর জন্য সুখবর, অনুমোদন পেল সরকারি মেডিকেল কলেজ বেরোবিতে শিবিরের বিরুদ্ধে ‘গুমের নাটক’ অভিযোগে ছাত্রদলের বিক্ষোভ বিশ্বকাপের শুরুতেই জয়ের হাসি বাংলাদেশের মেয়েদের নওগাঁয় মাকে নির্যাতনের অভিযোগে দুই ছেলে গ্রেপ্তার যে ডাকের ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর ভালোবাসা বিশ্বজুড়ে সংকটে রবীন্দ্র-নজরুল আরও প্রাসঙ্গিক: মোস্তফা কামাল কচুয়ায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে ধর্ষক গ্রেপ্তার ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রয়োজন প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি দাসত্বের আদেশনামা, বাজেটে ঠাঁই হয়নি শ্রমিক-কৃষকের: ওয়ার্কার্স পার্টি এজিই তৈরি করবে জেফ বেজোসের এআই স্টার্টআপ গোপালগঞ্জে ১০ শয্যার আইসিইউ উদ্বোধন: ১০ ভেন্টিলেটরের ৯টিই নষ্ট! মায়ের সঙ্গে অভিমান করে ভারতে যাওয়া সেই কিশোরীকে ফেরত রোমানিয়ার নেতৃত্বে নতুন মুখ, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত আদ্রিয়ান ভেস্তেয়া ‘নতুন কুঁড়ি’ জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যাওয়ার বাতিঘর: কবীর আহমেদ ভূঁইয়া প্রাকৃতিক ভূগোল অধ্যায়ের ১১টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ২য় পর্ব, এইচএসসির ভূগোল ১ম পত্র সফল হয়েও অপরাধবোধে ভোগেন? জেনে নিন ১০টি লক্ষণ সীমান্তে বৃদ্ধকে পুশইনের চেষ্টা, জয়পুরহাটে উত্তেজনা ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে চার শিশুর মৃত্যু
Nagad desktop

অর্থনৈতিক উত্তরণে দক্ষ টিমওয়ার্ক দরকার

প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩৭ এএম
অর্থনৈতিক উত্তরণে দক্ষ টিমওয়ার্ক দরকার
ড. মোস্তাফিজুর রহমান

আমাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করতে হবে। প্রান্তিক আয়ের মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন ধরনের পরিষেবার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের আমরা কতটা সাশ্রয়ীভাবে সুযোগ করে দিতে পারি, সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রাধিকার দিয়ে ভবিষ্যতের সুযোগগুলো আমাদের কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার উৎকর্ষতা ও মানোন্নয়নে আরও মনোযোগী হতে হবে।...

বর্তমান মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং সেক্টরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার প্রয়োজন। যারা স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ঋণ গ্রহণ করে খেলাপি হিসেবে গণ্য হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা জরুরি। আমাদের দেশের বহিস্থ খাত একটা ঝুঁকির মধ্যে আছে। একই সঙ্গে আমাদের বহিস্থ ও অভ্যন্তরীণ ঋণ এবং রাজস্ব আয়ের অনেক বড় একটি অংশ ঋণের পরিষেবায় চলে যাচ্ছে। সেদিকটায় আমাদের নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে আমরা যারা বৈদেশিক ঋণ থেকে বিনিয়োগ করছি সে ক্ষেত্রে যেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকে, সেদিকেও আমাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। প্রকল্প বাস্তবায়নে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং লক্ষ্য রাখতে হবে তা যেন সাশ্রয়ীভাবে করা সম্ভব হয়। তাহলে বিনিয়োগ থেকে আমরা যে আয় আশা করছি সেটা আমরা পাব। আমাদের যে অবকাঠামো প্রস্তুত করা হয়েছে তা অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

বিগত সময়ে অর্থনীতির ওপরে যে চাপগুলো ছিল, সেগুলো এখনো আছে। অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার নতুন করে তাদের যাত্রা শুরু করেছে। অর্থাৎ অর্থনীতির যে চ্যালেঞ্জগুলো বিদ্যমান আছে, সেগুলো নিয়েই নতুন সরকারকে কার্যক্রম শুরু করতে হয়েছে। বর্তমান সময়ে আমাদের প্রথম যে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে তা হলো মূল্যস্ফীতি। এটা নিম্নআয়ের মানুষকে বড় ধরনের একটা চাপের মুখে ফেলে দিয়েছে। তাদের সামনে একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে বৈদেশিক রিজার্ভের নিম্নগতি, রাজস্ব জিডিপির নিম্নহার ইত্যাদি চাপ রয়েছে। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা টাকার অবমূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্নমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কাজেই বর্তমান সরকারকে এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করেই অগ্রসর হতে হবে। সেখানে আমাদের মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাসহ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো মোকাবিলা করতে হবে। একই সঙ্গে সুশাসনের সঙ্গে সাশ্রয়ীভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন ইত্যাদি বিষয়ের দিকে আমাদের নজরদারি বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণে অবদান রাখতে হবে এবং ক্রমিত হয়ে গেলে সেটার মালিকানা গ্রহণ করতে হবে এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করতে হবে। এত বছরের পুঞ্জীভূত সমস্যা, বিভিন্ন ধরনের রেগুলেটরি, আইনি সমস্যা- এগুলো দু-এক বছরে আমদের সমাধান করা সম্ভব নয়। এগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলে যথেষ্ট সময় লাগবে। প্রশাসনিক সংস্কার, আইনি সংস্কার কিংবা নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার হয়তো আমরা করতে পারব। সুশাসন অর্থাৎ আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চয় উন্নয়ন করতে হবে। সেই সঙ্গে বাজারেও আমাদের সমন্বয় রক্ষা করা জরুরি। এখানে আমরা অনেক ধরনের দুর্বলতা দেখেছি। বিশেষ করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট দুর্বলতা দেখা যায়। এসব বিষয়ে আমাদের সবসময় নজর দিতে হবে। অনেক সময় দেখেছি, অর্থনৈতিক নীতিমালা গ্রহণ করেও সমাধান পাওয়া যায় না। এবার আমাদের সময় এসেছে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা দক্ষভাবে বাস্তবায়নের দিকে নজর দেওয়ার। অর্থনৈতিক উত্তরণের আমাদের একটা দক্ষ টিমওয়ার্ক থাকা দরকার।

মধ্যমমেয়াদে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা যাতে নিশ্চিত হয়, সেজন্য সামনে আমাদের বড় যে ফসলের মৌসুম আছে, সেটার উৎপাদন নির্বিঘ্ন করতে সার, বীজ, বিদ্যুৎ এগুলোর সরবরাহ নিশ্চিতে নজর দিতে হবে। সরবরাহ চেইনের মধ্যে যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে, তা দূর করতে হবে। যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও কীভাবে আমরা সহজ করতে পারি, সেদিকে নজর দিতে হবে। ২ টাকার ফুলকপি ঢাকা শহরে এসে যেন ২০ টাকা না হয়, এগুলোর দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের যোগাযোগব্যবস্থা এখন তো অনেক ভালো। সেটাকে কাজে লাগিয়ে মূল্যের বড় ধরনের বিভাজন দূর করতে হবে। আর এটা করতে হলে প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড স্টোরেজ- এসব বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে। ব্যক্তি খাতে যারা সামনে আসবেন তাদেরও উৎসাহিত করতে হবে।

দুটি বিষয়ের প্রতি আমাদের বিশেষ মনোযোগ রাখতে হবে। আমরা জানি যে, রাজস্ব আয়ের একটা বড় অংশ আমাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যয় করতে হবে। তাছাড়া বিনিময় হারের যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছে অর্থাৎ অবনমন নীতির ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে সেটাই বলা হয়েছে। একটি হলো যেকোনো প্রজেক্ট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমাদের যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় সেদিকটা আমলে নেওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব দায়ভার ও পরিষেবাদানের ক্ষেত্রে এক ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সেটাও কিন্তু আমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। কাজেই বেশ কিছু জায়গায় আমাদের সতর্কতামূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি সাবধানতা দরকার।

আমরা অনেক অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করেছি। যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বৈদেশিক বিনিয়োগ আমাদের বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে উন্নত করবে। একই সঙ্গে আমাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। আমাদের তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি চ্যালেঞ্জ যেগুলো আছে সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিমত্তা বৃদ্ধি করা, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সেবা দানের ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, অন্যদিকে আমরা যেন রাজস্ব আহরণ বাড়াতে পারি, সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে। আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। আমাদের ডিজিটালাইজেশনের দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে।দক্ষতা বৃদ্ধি করে আমাদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। আঞ্চলিক বাজারে আমরা যেন রপ্তানি বৃদ্ধি করতে পারি, সেদিকটা আমাদের অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। দেশের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি বাণিজ্যিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে বিশ্ব বাজারে ঢোকার একটা ব্যবস্থা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গেলে আমাদের প্রযুক্তি ও শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। সেগুলো মোকাবিলা করার ঝুঁকিও নতুন সরকারের সামনে আসছে। আমরা যেন ঘাটতির জায়গাগুলোতে নজরদারি বাড়িয়ে প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা অনুসরণ করতে পারি, সেদিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। আমাদের নিজস্ব আর্থসামাজিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপরে আস্থা রাখতে হবে।

আমাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করতে হবে। প্রান্তিক আয়ের মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন ধরনের পরিষেবার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের আমরা কতটা সাশ্রয়ীভাবে সুযোগ করে দিতে পারি, সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রাধিকার দিয়ে ভবিষ্যতের সুযোগগুলো আমাদের কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার উৎকর্ষতা ও মানোন্নয়নে আরও মনোযোগী হতে হবে।

লেখক: সম্মাননীয় ফেলো
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৫:১৫ পিএম
কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন
ড. আবদুর রহমান

দেশের সব মানুষের জীবন-জীবিকা স্বাভাবিক রাখা, সমাজে Unrest সৃষ্টি না হওয়াসহ ‘কৃষি বাঁচলে, কৃষক ভালো থাকবে; বাংলাদেশ ভালো থাকবে’ এই আপ্তবাক্যকে বিশ্বাস ও আস্থায় রেখে ২০২৬-২৭ সালে কৃষি খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ রেখে বাজেট পাস হবে, এটাই জাতির প্রত্যাশা এবং এ প্রত্যাশা পূরণে নতুন সরকারের প্রথম প্রণীত বাজেট সফল হবে আর সফল না হওয়ার বিকল্প কিছু নেই এ সংসদের সামনে।...

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের জাতীয় অর্থনীতির একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য খাত হচ্ছে কৃষি খাত। আর আমরা এও জানি যে, শস্য খাতের সঙ্গে মৎস্য খাত, পশু পালন ও বনায়নের পরিধিও কৃষি খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

আমাদের আগামী আর্থিক বছরের (২০২৬-২০২৭) কৃষি খাতের বাজেট ভাবনার আগে গত কয়েক বছরে কৃষি খাতে বাজেট বরাদ্দের বিষয়ে ধারণা নেওয়া অত্যাবশ্যক। ২০২০-২১ আর্থিক বছরে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ; বরাদ্দের তুলনায় ওই খাতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৯১ শতাংশ কিন্তু উল্লিখিত আর্থিক বছরে মোট জিডিপিতে এই খাতের অবদান ছিল ১৩ দশমিক ৫১ শতাংশ।

২০২১-২২ আর্থিক বছরে কৃষি খাতে বাজেটের মোট বরাদ্দের ৪ দশমিক ১ শতাংশ বরাদ্দ ছিল। ওই খাতে ব্যয় হয়েছিল মোট বরাদ্দের প্রায় ২০২০-২১ সালের মতনই প্রায় ৯১ শতাংশ অথচ ওই বছর মোট জিডিপিতে অবদান ছিল ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

২০২২-২৩ আর্থবছরে মোট বাজেটের ৪ দশমিক ২ শতাংশ এ খাতে বরাদ্দ ছিল কিন্তু মোট বরাদ্দের ৯০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে, যা আগের দুই আর্থবছরের চেয়ে ১ শতাংশ কম। এ বছর মোট জিডিপিতে ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ শেয়ার কৃষি খাতের।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, আমাদের জিডিপিতে কৃষি খাতের শতাংশ হিসাবে শেয়ারের অংশ কমছে। অর্থশাস্ত্রের পরিভাষায় তার মানে দাঁড়ায় এরকম যে, জাতীয় জিডিপিতে শিল্প খাত, সেবা খাত ও ইনফরমাল সেক্টরে জিডিপির ভূমিকা বেগবান হচ্ছে। অর্থশাস্ত্রের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় এ-জাতীয় লক্ষণ শুভকর হলেও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি একটু গভীরভাবে ভাবনার অবকাশ রাখে। আর এ ভাবনার মুখ্য দিকগুলো হচ্ছে: ক. বাংলাদেশের কৃষি খাত কৃষিতে নিয়োজিত কৃষকদের জন্য আর্থিক উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করছে কি না? খ. সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে কৃষি কাজের ওপর নির্ভরশীল কৃষকশ্রেণি শিল্প খাতের পণ্য কেনার সামর্থ্য অর্জন করেছে কি না? গ. কৃষি খাতের উদ্বৃত্ত শ্রমিকরা কি শিল্প খাতের কর্মে নিয়োজিত হচ্ছে, নাকি ইনফরমাল সেক্টরে রিকশাওয়ালা, ভ্যানওয়ালায় পরিণত হচ্ছে? ঘ. কৃষি খাতে কি এমন পুঁজি উদ্বৃত্ত হচ্ছে যা শিল্প খাতের Cash flow সম্প্রসারিত করবে? ঙ. উৎপাদিত কৃষিপণ্য দেশের মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আছে কি না? চ. কৃষিপণ্য রপ্তানি খাতের থলিতে কি জাতীয় আয় বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে; করে থাকলে জাতীয় রপ্তানির কত অংশ কৃষি খাত থেকে আসছে তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। ছ. রপ্তানির Basket-এ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা না রেখে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য আমদানি করতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করা হচ্ছে কি না? এবং জ. মোট জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান হ্রাসে কি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা দায়ী?

উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ইতিবাচক হয় তাহলে অর্থশাস্ত্রের যেসব প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদদের ধারণা যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়; আর বিপরীতে যদি চলমান প্রবন্ধে নিকট অতীতে উপস্থাপিত প্রশ্নসমূহের উত্তর যদি না হয় তাহলে মোট জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান হ্রাস পাওয়ার প্রবণতার লক্ষণ শুধু মন্দই নয় বরং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এক চরম ভারসাম্যহীন অর্থব্যবস্থার মধ্যে পরবে। যার নিশ্চিত সম্ভাব্য পরিণতি চরম আয় বৈষম্যমূলক এক সমাজ কাঠামো প্রদর্শিত হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের ক্রয় করার সামর্থ্য হারাবে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। যার চূড়ান্ত ফলাফল হয় ক্রয়ক্ষমতার অভাবে মহামন্দাসহ দুর্ভিক্ষ!!

কৃষি খাতের বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে উল্লিখিত বিষয়গুলো যদি চিন্তায় না রেখে কিংবা যতটুকু সম্ভব সমাধান বিষয়ে না ভেবে বাজেট পাস করা হয় তাহলে ভবিষ্যৎ জাতীয় অর্থনীতির গতিধারা এবং জাতীয় জীবযাত্রার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে জাতি পতিত হবে অমানিশার ঘোর অন্ধকারে। তাই, সাধু সাবধান!!

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা যা মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। রাজস্ব আয়ের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোট টাকা। জাতীয়ভাবে গৃহীত লোনের সুদ পরিশোধের খরচের জন্য ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের ব্যাংক ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা (যা বেসরকারি বিনিয়োগে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ সরবরাহ হ্রাস করবে)। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য মাত্রা ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

মহান জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করার আগে কৃষি খাতে আবার সেই পুরোনো বাংলা প্রবাদ প্রমাণিত হয়েছে, ‘বাংলাদেশের কৃষি প্রকৃতির হাতের জুয়া খেলা’। হাওড় এলাকায় অতিবৃষ্টি ও বেড়িবাঁধ ভাঙনের ফলে যে বিশাল ক্ষতি হয়েছে তাতে একদিকে সংশ্লিষ্ট চাষি তো চাষাবাদ করতে গিয়ে ধারদেনা পরিশোধ করতে পারছে না পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণের সমস্যাসহ ভবিষ্যৎ চাষাবাদ পরিচালনায় মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

দিনাজপুর ও বগুড়া অঞ্চল সুগন্ধি চাল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণপূর্বক বাজারজাতকরণের জন্য রয়েছে দেশময় সুখ্যাতি। কিন্তু এই এলাকায়ও অতিবৃষ্টির ফলে ফসল মাঠ থেকে তোলা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণ বিষয়েও সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা।

সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় অধিকাংশ ফসলি জমি প্রায় এক ফসলি হয়ে গেছে। চলতি সপ্তাহে দৈনিকে প্রকাশিত গভীর নলকূপ থেকে উত্তোলিত সেচের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ উত্তোলিত পানিকে করেছে সেচকাজে ব্যবহারের জন্য ক্ষতিকর। এই বিষয়ে অবশ্য চলতি প্রবন্ধের লেখকসহ অন্যান্য গবেষক ভবিষ্যতের সচেতনতামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন।

চলতি বছরে আলু চাষিদের দূরাবস্থার বিষয়ে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া প্রকাশ করেছে বাস্তব তথ্যসহ বিভিন্ন সংবাদ।

এখানে একথা বলা কোনোরকম অযৌক্তিক হবে না যে, আমাদের জাতীয় অর্থনীতির পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ভারসাম্যমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মাথায় রেখে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে ভাবা হয়নি বলে গবেষকরা মনে করেন।

বাজেটে কৃষি খাতকে ফসল উৎপাদনের বহুমাত্রিকতাকে মাথায় রেখে বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজন ফসল উৎপাদন, জমির উর্বরতা, জমির মান, সেচ সুবিধাগুলো বিবেচনায় নিয়ে সমগ্র দেশকে বিভিন্ন কৃষি অঞ্চলে ভাগ করা।

ফসল উৎপাদনের বিষয়টি বলতে বলার চেষ্টা করছি যে, কোনো অঞ্চলে কোনো ফসল উৎপাদন তুলনামূলক কম খরচে বেশি ফসল উৎপাদন করা যায়, এ মানদণ্ডের ভিত্তিতে সমগ্র দেশকে বিভিন্ন কৃষি উৎপাদন জোনে বিভক্ত করে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন।

যেহেতু Surface Water-এর সঙ্গে গভীর নলকূপের সেচের পানিতেও Salinity-এর পরিমাণ ক্ষতিকর পর্যায়ে চলে গেছে তাই সেচ সুবিধা দেওয়া এবং জমির উর্বরতা ধরে রাখার বিষয়টি কৃষি খাতের বাজেটে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। সেচ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে আর একটি বিষয় বাজেটে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। সেটা হলো সেচের জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুৎব্যবস্থা যেমন হতে হবে নিরবচ্ছিন্ন ও উৎপাদন খরচ হ্রাসের পর্যায়ে চাষিদের বিদ্যুৎ ব্যয় নির্ধারণ করা তৎসহ ডিজেলের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম বজায় রাখার ব্যবস্থা থাকতে হবে বাজেটে।

বাজেটের প্রস্তাবনায় অর্থমন্ত্রী, বাছাই কমিটি এবং সর্বোপরি সংসদ নেতা বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়নে কতিপয় অত্যাবশ্যকীয় নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। রাষ্ট্রের উল্লিখিত দায়িত্ববান ব্যক্তিদের কৃষক, কৃষি খাত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও চূড়ান্ত পর্যায়ের বাজারজাতকরণ বিষয়ে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে যে মন্ত্রণালয়ের যা যা করণীয় সে বিষয়ে কার্যকর সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

দেশের সব মানুষের জীবন-জীবিকা স্বাভাবিক রাখা, সমাজে Unrest সৃষ্টি না হওয়াসহ ‘কৃষি বাঁচলে, কৃষক ভালো থাকবে; বাংলাদেশ ভালো থাকবে’ এই আপ্তবাক্যকে বিশ্বাস ও আস্থায় রেখে ২০২৬-২৭ সালে কৃষি খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ রেখে বাজেট পাস হবে, এটাই জাতির প্রত্যাশা এবং এ প্রত্যাশা পূরণে নতুন সরকারের প্রথম প্রণীত বাজেট সফল হবে আর সফল না হওয়ার বিকল্প কিছু নেই এ সংসদের সামনে।       

লেখক: উপ-উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) ও কোষাধ্যক্ষ
প্রাইম ইউনিভার্সিটি। অর্থনীতিবিদ ও কলামিস্ট

মানবতার এক ফোঁটা রক্ত জীবন বাঁচায়

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম
মানবতার এক ফোঁটা রক্ত জীবন বাঁচায়
ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ

রক্ত সঞ্চালন যেন নিরাপদ হয়। আর যদি দূষিত, রোগাক্রান্ত রক্ত দেওয়া হয়, তাহলে জীবন রক্ষার পরিবর্তে অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালনে জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। মনে রাখতে হবে, আমার শরীরের রক্তে আরেকটি জীবন রক্ষা করছে। পৃথিবীর আলো, বাতাস উপভোগের অপার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাই  পরোপকারই হোক আমাদের জীবনের ব্রত। একের রক্ত অন্যের জীবন, রক্তই হোক আত্মার বাঁধন। ‘রক্ত দিন জীবন বাঁচান, এক ব্যাগ রক্তদানে বাঁচবে একটি প্রাণ।’...

১৪ জুন বিশ্ব রক্তদান দিবস। রক্ত অবশ্যই মানবদেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শরীরে পূর্ণমাত্রায় রক্ত থাকলে মানবদেহ থাকবে সজীব ও সক্রিয়। আর রক্তশূন্যতা বা এনিমিয়া দেখা দিলে শরীর অকেজো ও দুর্বল হয়ে পড়ে, প্রাণশক্তিতে ভাটা পড়ে। রক্তের বিকল্প শুধু রক্তই। অতি প্রয়োজনীয় এই জিনিসটি কলকারখানায় তৈরি হয় না। মানুষের রক্তের প্রয়োজনে মানুষকেই রক্ত দিতে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে আজ পর্যন্ত রক্তের কোনো বিকল্প আবিষ্কার হয়নি। রক্তের অভাবে যখন কোনো মানুষ মৃত্যুর মুখোমুখি হয়, তখন অন্য একজন মানুষের দান করা রক্তই তার জীবন বাঁচাতে পারে। তাই এর চেয়ে মহৎ কাজ আর কী হতে পারে? প্রতি বছরই এ দিবসের একটি প্রতিপাদ্য থাকে, এবারের প্রতিপাদ্য ‘মানবতার এক ফোঁটা রক্ত দিন, জীবন বাঁচান।’

রক্তের বিভিন্ন গ্রুপের আবিষ্কারক ও ট্রান্সফিউশন মেডিসিনের জনক অস্ট্রিয়ান বংশোদ্ভূত নোবেল বিজয়ী জীববিজ্ঞানী ও চিকিৎসক কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার ১৮৬৮ সালের ১৪ জুন জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯০০ সালে ব্লাড গ্রুপ আবিষ্কার করেন। তার এই আবিষ্কার উন্মোচন করে দিয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক বিশাল অধ্যায়। জন্মদিনে তাকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানাতে ১৪ জুন উদ্‌যাপন করা হয় ‘বিশ্ব রক্তদান দিবস’। স্বেচ্ছায় এবং বিনামূল্যে  রক্তদান করে যারা লাখ লাখ লোকের প্রাণ বাঁচাতে সহায়তা করছেন, তাদের প্রতি সম্মান জানাতেই এ দিবসটি পালিত হয়।

১৯৯৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক রক্তদান দিবস পালন এবং ২০০০ সালে ‘নিরাপদ রক্ত’ এই থিম নিয়ে পালিত বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০০৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহান্সবার্গে প্রথম পালিত হয় আন্তর্জাতিক রক্তদান দিবস। ২০০৫ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এ দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়। অগণিত মুমূর্ষু রোগীকে স্বেচ্ছায় রক্তদান করে যারা জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেন তাদের  মূল্যায়ন, স্বীকৃতি ও উদ্বুদ্ধকরণের জন্য বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালন করা হয়। এ দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য জনগণকে রক্তদানে ও নিরাপদ রক্ত ব্যবহারে উৎসাহিত করা, স্বেচ্ছায় রক্তদানে সচেতন করা এবং নতুন রক্তদাতা তৈরি করা। এ দিবস পালনের আরও উদ্দেশ্য দেশের জনগণকে প্রাণঘাতী রক্তবাহিত রোগ এইডস, হেপাটাইটিস-বি ও সি-সহ অন্যান্য রোগ থেকে নিরাপদ থাকার জন্য স্বেচ্ছা রক্তদান ও রক্তের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। ‘ভোগে নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ’। আমাদের ভালো কাজ, ভালো চিন্তা, মহৎ উদ্যোগ মানবজাতির কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। এরূপ একটি কল্যাণকর কাজ হলো রক্তদান। স্বেচ্ছায় রক্তদানে অন্য মানুষের মূল্যবান প্রাণ রক্ষা পায়, নিজের জীবনও ঝুঁকিমুক্ত থাকে।

স্বেচ্ছায় রক্তদান করলে মানুষের অনেক উপকারে আসে। ধর্ম-বর্ণ-জাতিনির্বিশেষে সবার রক্তই একই রকম, লাল রঙের। সবকিছুতেই বিভেদ থাকলেও এর মধ্যে নেই কোনো বিভেদ।

মানুষের শরীরে রক্তের প্রয়োজনীয়তা এত বেশি যে, রক্ত ছাড়া কেউ বেঁচে থাকতে পারে না। মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচাতে প্রায়ই জরুরি ভিত্তিতে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হয়। রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে প্রয়োজনভেদে রোগীকে সম্পূর্ণ রক্ত বা রক্তের কোনো উপাদান যেমন লোহিত কণিকা, অণুচক্রিকা বা রক্তরস দেওয়া হয়।

১. যেকোনো কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে সাধারণত সম্পূর্ণ রক্ত দেওয়া হয়, যেমন–দুর্ঘটনা, রক্তবমি, পায়খানার সঙ্গে রক্তপাত, প্রস্রবকালীন রক্তক্ষরণ ইত্যাদি। ২. জটিল বা বড় ধরনের অপারেশন হলে সম্পূর্ণ রক্তের প্রয়োজন হয়। ৩. বিভিন্ন রকমের অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতায় সাধারণত লোহিত কণিকা দেওয়া হয়, যেমন থ্যালাসেমিয়াসহ অন্যান্য হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া, আয়রনের অভাবজনিত রক্তাল্পতা, ইত্যাদি। অবশ্য আমাদের দেশে খরচের কথা বিবেচনা করে এসব রোগীকেও সম্পূর্ণ রক্ত দেওয়া হয়। ৪. এ ছাড়া হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বরে অণুচক্রিকা দেওয়া হয়। ৫. রক্তরস দেওয়া হয় হিমোফিলিয়া ও অন্যান্য কোয়াগুলেশন ডিজঅর্ডারে এবং আগুনে পোড়া রোগীকে।

বাংলাদেশের মতো দেশে বছরে ৫ থেকে ৭ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়, যার মাত্র ৩১ ভাগ পাওয়া যায় স্বেচ্ছায় রক্তদাতার মাধ্যমে। বাকি রক্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে পেশাদার রক্তদাতা এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়।

১৮ থেকে ৬০ বছরের যেকোনো শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও সক্ষম ব্যক্তি, যার শরীরের ওজন ৪৫ কেজির ওপরে, তারা ৪ মাস পর পর  নিয়মিত রক্তদান করতে পারেন। তবে রক্ত দিতে হলে কিছু রোগ হতে মুক্ত থাকতে হবে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশ অনুযায়ী নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের জন্য রক্তদাতার শরীরে কমপক্ষে ৫টি রক্তবাহিত রোগের অনুপস্থিতি পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে। এ রোগগুলো হলো–হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, এইচআইভি বা এইডসের ভাইরাস, ম্যালেরিয়া ও সিফিলিস। রোগের স্ক্রিনিং করার পর এসব রোগ থেকে মুক্ত থাকলেই সেই রক্ত রোগীর শরীরে দেওয়া যাবে। অবশ্য একই সঙ্গে রোগীর এবং রক্তদাতার রক্তের গ্রুপিং ও ক্রসম্যাচিং করাটাও জরুরি। এ ছাড়া রক্তদাতা শারীরিকভাবে রক্তদানে উপযুক্ত কি না তা জানার জন্য তার শরীরের ওজন, তাপমাত্রা, নাড়ির গতি, রক্তচাপ, রক্তস্বল্পতার উপস্থিতি ইত্যাদি পরীক্ষা করে দেখা হয়।

১. রক্তের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কম থাকলে (পুরুষদের ন্যূনতম ১২ গ্রাম/ডেসিলিটার এবং নারীদের ন্যূনতম ১১ গ্রাম/ডেসিলিটার)। ২. রক্তচাপ ও শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক না থাকলে। ৩. কিছু রোগ শনাক্ত হলে যেমন–হেপাটাইটিস বি বা সি, জন্ডিস, এইডস, সিফিলিস, গনোরিয়া, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি। ৪. শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগ, যেমন হাঁপানি, সি.ও. পি.ডি, হৃদরোগ, অন্য কোনো জটিল রোগ। ৫. অন্তঃসত্ত্বা নারী, ঋতুস্রাব চলাকালীন, সন্তান জন্মদানের এক বছরের মধ্যে। ৬. যারা কিছু ওষুধ সেবন করছেন, যেমন–কেমোথেরাপি, হরমোন, অ্যান্টিবায়োটিক ইত্যাদি। ৭. ছয় মাসের মধ্যে বড় কোনো দুর্ঘটনা বা অপারেশন হলে।

অনেকে রক্তদানে ভয় পান। কেউ কেউ ভাবেন এতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে, দুর্বল হয়ে পড়বেন বা রোগাক্রান্ত হয়ে পড়বেন। কেউ আবার মনে করেন এতে হৃৎপিণ্ড দুর্বল বা রক্তচাপ কম হয়, এমনকি কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করেন। তাছাড়া কিছু সামাজিক, ধর্মীয় কুসংস্কার ও অজ্ঞতা অনেক সময় মানুষকে রক্তদানে নিরুৎসাহিত করে, এগুলো সম্পূর্ণ অমূলক। কেউ ধর্মের দোহাই দিয়ে বলেন, রক্তদান করা নিষিদ্ধ, তাই অন্যকে রক্তদান থেকে বিরত রাখেন। কিন্তু এগুলোর কোনো ভিত্তিই নেই।

রক্তদান একটি মহৎ কাজ, যা রক্তদাতাকে মানুষ হিসেবে বড় করে তোলে। রক্তদাতার সবচেয়ে বড় পাওয়া অসহায় বিপন্ন মানুষের জীবন বাঁচানো। রক্তদান ধর্মীয় দিক থেকে পুণ্যের  কাজ। একজন মানুষের জীবন বাঁচানো অবশ্যই মহৎ কাজ। মানবিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সব দৃষ্টিকোণ থেকেও রক্তদাতা অনাবিল আনন্দ অনুভব করেন এবং সামাজিকভাবেও বিশেষ মর্যাদা পান। গ্রহীতা আর তার পরিবার চিরদিন ঋণী থাকেন তার জীবন বাঁচানোর জন্য। দাতার জন্য এটা যে কি আনন্দের তা ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়।

সরকারিভাবে ও বেসরকারিভাবে যারা রক্ত সংগ্রহের কাজে জড়িত, তারা কিছু বিষয়ে রক্তদাতাদের উৎসাহিত করতে পারেন। যেমন–তাদের সঠিক মূল্যায়ন করা, পুরস্কারের ব্যবস্থা করা বা অন্য কোনোভাবে সম্মানিত করা ইত্যাদি। এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রক্তদাতার সংখ্যা বেড়ে যাবে, মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও উৎসাহ বৃদ্ধি পাবে। মিডিয়া, রাজনীতিবিদ ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ও ধর্মীয় নেতারা এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। নিরাপদ রক্তের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় কেবল বিনামূল্যে স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে। এজন্য বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যাতে পৃথিবীর সব দেশে বিনামূল্যে স্বেচ্ছায় রক্তদান নিশ্চিত করার মাধ্যমে মুমূর্ষু রোগীর জীবন নিরাপদ রক্ত দিয়ে বাঁচানো যায়।

তবে মনে রাখতে হবে, রক্ত সঞ্চালন যেন নিরাপদ হয়। আর যদি দূষিত, রোগাক্রান্ত রক্ত দেওয়া হয়, তাহলে জীবন রক্ষার পরিবর্তে অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালনে জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। মনে রাখতে হবে, আমার শরীরের রক্তে আরেকটি জীবন রক্ষা করছে। পৃথিবীর আলো, বাতাস উপভোগের অপার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাই  পরোপকারই হোক আমাদের জীবনের ব্রত। একের রক্ত অন্যের জীবন, রক্তই হোক আত্মার বাঁধন। ‘রক্ত দিন জীবন বাঁচান, এক ব্যাগ রক্তদানে বাঁচবে একটি প্রাণ।’ ‘হাসিমুখে রক্তদান, হাসবে রোগী বাঁচবে প্রাণ।’  যখন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে অশান্তি, সংঘাত আর বিদ্বেষের বাষ্প, ঠিক তখনই আমরা এক বাক্যে বলতে চাই, ‘রক্ত দিয়ে যুদ্ধ নয়, রক্ত দিয়ে জীবন জয়।’  

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক

আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম
আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার
ড. মো. আব্দুর রউফ

দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘ ব্যর্থতার মূল কারণ- নির্বিচারে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার অনুকরণ করা, মূলত দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থার পরামর্শে পদক্ষেপ নেওয়া, আমাদের দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনভিজ্ঞ ব্যক্তি কর্তৃক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মতামত দেওয়া এবং সর্বোপরি সমস্যার মূলে না যাওয়া অর্থাৎ সঠিক পরিমাণ বিক্রয় তথ্যপ্রাপ্তির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া। দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন করার কথা কেউ বলেন না।...

বাংলাদেশের রাজস্বব্যবস্থা সংকটাপন্ন বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না। কর-জিডিপি অনুপাত এখন ৬.৬, যা পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। আমাদের আশপাশের দেশেও তা ১৫, ১৬, ১৮, উন্নত দেশে ২৫ থেকে ৩০-এর কাছাকাছি। তাহলে সংকটাপন্ন বলাই যায়। মনে প্রশ্ন জাগে–কেন এমন হলো? সাদা চোখে দেখি কারণ, খুব সহজ। তা হলো, এ যাবৎ রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নয়নে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো সঠিক ছিল না। পদক্ষেপ সঠিক হলে ফলাফল ভালো হতো। রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রশ্ন এলেই কতকগুলো গৎবাঁধা কথা বলা হয়। সেগুলো হলো, কর অব্যাহতি কমাতে হবে, করের ভিত্তি বাড়াতে হবে, একক ভ্যাট হার চালু করতে হবে, রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা বাড়াতে হবে, রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বাড়াতে হবে ইত্যাদি। সম্প্রতি একটা কথা খুব জোরেশোরে বলা হচ্ছে। তা হলো, কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করতে হবে। এটা শুধু বলা হচ্ছে তা নয়, বরং এটা করতে গিয়ে ইতোমধ্যে অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনার জন্ম দেওয়া হয়েছে।

আমি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি যে, বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার মূল সমস্যা হলো বিক্রয় তথ্য গোপন করে ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি দেওয়া হয়। সব বিক্রির ক্ষেত্রে ভ্যাট চালানপত্র জারি করা হয় না, কখনো জাল ভ্যাট চালানপত্র জারি করা হয়, আবার কখনো চালানপত্র জারি করা হলেও একাধিক হিসাব সংরক্ষণ করা হয় ইত্যাদি। এরূপ নানাভাবে বিক্রয় তথ্য গোপন করে ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি দেওয়া হয়। কোন প্রতিষ্ঠানের সঠিক বিক্রির পরিমাণ কত এ তথ্য এনবিআর তথা সরকারের কাছে নেই। এই হলো রাজস্ব ব্যবস্থার মূল সমস্যা। এ সমস্যার সমাধান সহজ; তা হলো, দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন করা। এই মূল কাজটাই এ যাবৎ করা হয়নি। দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থার প্রতিনিধি বা আমাদের দেশের বক্তারা ইনভয়েস অটোমেশন নিয়ে কোনো কথা বলেন না। কর অব্যাহতি কমিয়ে লাভ কী যদি বিক্রির চালানপত্র জারি করা নিশ্চিত করা না যায়। বিক্রির চালানপত্র জারি নিশ্চিত না করে করের ভিত্তি বাড়িয়ে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না। একক ভ্যাট হার চালু করা, রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা বাড়ানো, রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বাড়ানো সব বিষয়ে একই কথা। বিক্রির সঠিক তথ্য পেতে এসব পদক্ষেপ তেমন সহায়তা করে না। বিক্রির সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলে কোনো সংস্কার কাজে আসবে না। রাজস্ব ব্যবস্থায় সব সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হতে হবে বিক্রির সঠিক তথ্য পাওয়া নিশ্চিত করা, যেন প্রকৃত টার্নওভারের ওপর করারোপ করা যায়।

কর-নীতি ও বাস্তবায়ন কেন আলাদা করতে হবে?: এবার কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করার প্রসঙ্গে আসি। কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করতে হবে–এ কথা প্রথম বলেছে দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থা। তার পর আমাদের দেশের কিছু অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সিভিল সোসাইটি লিডার, নীতি-নির্ধারক অর্থাৎ যারা পাবলিকলি কথাবার্তা বলেন তারা এ কথা বলে যাচ্ছেন এবং একটা গোলাকার আঁধারে একটা আয়তাকার বস্তু প্রবেশ করানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা কোনোদিন সফল হবে না বা ভালো ফলাফল বয়ে আনবে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ঋণের শর্ত হিসেবে এটা জুড়ে দিয়েছে। এখন এটা টক অব দ্য টাউন হয়ে গেছে। দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন এভাবে টক অব দ্য টাউন হয় না। কারণ, মনস্তাত্বিকভাবে আমরা বিদেশিদের কথায় বেশি গুরুত্ব দিই। চিন্তাচেতনায় আমরা নিজেদের দেউলিয়া মনে করি। নিজেদের ওপর আমাদের বিশ্বাস নেই। কিন্তু আইএমএফে যারা চাকরি করেন, তারাও বিভিন্ন দেশ থেকে আসেন। কখনো স্বল্পমেয়াদে চাকরি নিয়ে আসেন। কখনো অতি স্বল্পমেয়াদে কনসালট্যান্সি নিয়ে আসেন। আইএমএফের কিছু নিজস্ব ভাষা রয়েছে, তারা সেগুলো বলতে থাকেন। সব দেশে গিয়ে তারা একই কথা বলেন। এমন কথার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমরা আমাদের নিজেদের ঘর তছনছ করে ফেলছি। কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করার যৌক্তিকতা নিয়ে মূলত দুটি কথা বলা হয়। এক হলো, একই প্রতিষ্ঠান নীতি-নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের কাজ করলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। দুই হলো কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা থাকা হলো আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা। আজ আমরা আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা নিয়ে আলোচনা করব।

আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আন্তর্জাতিক নয়, চিরন্তন নয়: আন্তর্জাতিক বলতে আমরা মূলত বুঝি এমন কোনো বিষয় যা একাধিক বা অনেক দেশের মধ্যে বিরাজমান। অর্থাৎ এক জাতির সীমা অতিক্রম করে অনেক জাতির কাছে পৌঁছে যাওয়াকে আন্তর্জাতিক বলা হয়। সাধারণত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে প্রচলিত কোনো বিষয়কে আমরা আন্তর্জাতিক বলে বিবেচনা করে থাকি। উল্লেখ্য, আজ যেটাকে আমরা আন্তর্জাতিক বলছি সেটা কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক ছিল না। কিছুদিন আগে হয়তো সেটা কোনো জাতীয় বিষয় ছিল। তারও আগে হয়তো কোনো জাতীয় বিষয়ও ছিল না। হয়তো একাডেমিক আলোচনার বিষয় ছিল। আবার, আজ যেটাকে আমরা আন্তর্জাতিক বলছি কিছুদিন পর সেটা হয়তো আর আন্তর্জাতিক থাকবে না। হয়তো সে বিষয়ের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। তাহলে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আন্তর্জাতিক নয় এবং কোনো শাশ্বত, চিরন্তন ধারণা নয়, যা নির্বিচারে অনুসরণযোগ্য। আজ যদি নতুন কিছু বলা হয় সেটাও কিছুদিন পর আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে পারে। তাই, আমাদের উচিত হবে আইডিয়ার মেরিট বিবেচনা করা। কোনো কিছু আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা হিসেবে প্রচলিত হয়েছে বলে সেটাকেই গ্রহণ করতে হবে–অন্য কোনো নতুন চিন্তা করা যাবে না, এমনটা উত্তম নয়, কল্যাণকরও নয়। আজ থেকে ৮০ বছর আগে ভ্যাটের অস্তিত্ব ছিল না। হয়তো ৪০ বছর পরে ভ্যাটের অস্তিত্ব থাকবে না। নতুন কোনো করব্যবস্থা আসবে। তাই, নতুন কোনো বিষয়ের আবির্ভাব হলে নিজস্ব পরিবেশে তার মেরিট যাচাই করে গ্রহণ বা বর্জন করা সুবিবেচনাসম্মত।

আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা উত্তম নয়: উত্তম কথাটাও আপেক্ষিক। এক দেশে যা উত্তম, এমন হতে পারে যে, অন্য দেশে তা পরিত্যাজ্য। আমেরিকা, ইউরোপে হোমোসেক্সুয়ালিটি, গে ম্যারেজ, লিভিং টুগেদার এগুলো হলো আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা। কিন্তু আমাদের দেশের সংস্কৃতিতে এগুলো নিন্দনীয়, পরিত্যাজ্য। তাই, অন্য পরিবেশের যেকোনা ধারণা উত্তম বলে অনুকরণ করা সমীচীন নয়। উত্তম হলো নিজের পরিবেশের জন্য উপযোগী হয় এমন আইডিয়া নিজে উদ্ভাবন করা। অন্যের উদ্ভাবিত আইডিয়া যাচাইবাছাই করে গ্রহণ বা বর্জন করা। তাহলে দাঁড়ালো এই যে, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আন্তর্জাতিক নয়, উত্তম নয় এবং শাশ্বত, চিরন্তন বিষয় নয়। নিজস্ব পরিবেশ ও বাস্তবতা অনুধাবন না করে নির্বিচারে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুকরণ করা সুবিবেচনাসম্মত নয়, কল্যাণকর নয়।

রাজস্ব ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা: আমেরিকা, ইউরোপের রাজস্ব ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করা আমাদের দেশের জন্য কোনো উত্তম পদক্ষেপ নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সব পরামর্শ আমাদের জন্য উত্তম নয়–সব পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে তা কাম্য নয়। রাজস্ব ব্যবস্থায় আমেরিকা, ইউরোপের আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আনয়ন করার আগে সমাজব্যবস্থায় হোমোসেক্সুয়ালিটি, গে ম্যারেজ, লিভিং টুগেদার এগুলো কেন নিয়ে আসা হচ্ছে না? কারণ, এ দেশের সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে ওইসব আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা একেবারেই বেমানান। এই পরিবেশে খাপ খাওয়ানো যাবে না। ব্যাপক জনগোষ্ঠী তা মেনে নেবে না। তাই, রাজস্ব ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আনয়ন করার আগে অবশ্যই স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। এখানেই ভুল হয়েছে। ফলে অনেক ঘটনা, দুর্ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে।

আমাদের দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘ ব্যর্থতার মূল কারণ হলো, নির্বিচারে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার অনুকরণ করা, মূলত দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থার পরামর্শে পদক্ষেপ নেওয়া, আমাদের দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনভিজ্ঞ ব্যক্তি কর্তৃক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মতামত দেওয়া এবং সর্বোপরি সমস্যার মূলে না যাওয়া অর্থাৎ সঠিক পরিমাণ বিক্রয় তথ্যপ্রাপ্তির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া। দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন করার কথা কেউ বলেন না। দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থা যা বলে, অন্যরা সেটাই বলতে থাকেন। আবারও যদি এই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে আরও অনেক দিন এই জাতিকে ভুগতে হতে পারে। তাই, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার নির্বিচার অনুকরণ নয়, রাজস্ব ব্যবস্থায় নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করা নয়, দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন করার কাজ জোরোশোরে শুরু করুন। রাজস্বব্যবস্থা এবং অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটে যাবে।

লেখক: সাবেক সদস্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনালস ফোরাম এবং ইন্টারন্যাশনাল ভ্যাট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট

জনআকাঙ্ক্ষার বাজেট এবং নানামুখী চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম
জনআকাঙ্ক্ষার বাজেট এবং নানামুখী চ্যালেঞ্জ
ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে জনআকাঙ্ক্ষা অনেক। বাজেটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের উচ্চমূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, জ্বালানিসংকট ও বিনিয়োগে স্থবিরতা দূর করার চাপ আছে। প্রতিটি মানুষের কথা মাথায় রেখে বাজেট করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উচ্চমূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা এবং রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বাজেটে নির্ধারণ করা।...

চব্বিশের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ আবার নতুন করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। এই যাত্রায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠিত হয়। বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদের শাসনের বিরুদ্ধেও এ দেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে বর্তমান সরকার। ২০১৬ সালের ভিশন ২০৩০, ২০২২ সালের রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফা এবং ২০২৩ সালের যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফার ভিত্তিতে বিএনপির নেতৃত্বে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে সেটিই ফ্যাসিবাদবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের পরিবেশ তৈরি করেছে। তার ওপর দাঁড়িয়েই সংগঠিত হয়েছে ২০২৪-এর ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান। বিগত সরকার দেশে অর্থনীতির যে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, সমাজ-সংস্কৃতির বুনন যেভাবে ধ্বংস করেছে তাতে এর পুনরুদ্ধার ও একে পুনরায় গতিশীল করা রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া সম্ভব নয়। মনে রাখা দরকার, সব মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং মানবিক বিবেচনাসম্পন্ন সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা ছাড়া এই রাজনৈতিক সংস্কার টেকসই হবে না।

দূরদর্শী ও কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে অর্থনীতির মূল সূচকগুলো ইতিবাচক ধারায় ছিল। বিগত সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থনীতিতে সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে সব প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ও ধ্বংস করেছে। তথাকথিত উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে মূলত লুটপাট ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে অর্থনীতির মৌল ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। এ অবস্থার পুনরুদ্ধারই শুধু নয়, একে উত্তরণ ও সমৃদ্ধ পুনর্গঠনের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যই রাজনীতি ও অর্থনীতির পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে ২০২৬-২৭ জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আয়-ব্যয়ের হিসাবনিকাশ নয়, বরং দেশকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়নের পথ-নকশার অংশ হিসেবে বাজেট সামনে আসা। বিগত সরকারের শাসনামলে অর্থনৈতিক নীতি ও পরিকল্পনায় বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে ক্ষুদ্র দলীয় ও গোষ্ঠীগত দুরভিসন্ধিই ছিল প্রধান প্রবণতা। একদিকে খেটে খাওয়া মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ-সম্পদ দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে মুষ্টিমেয় লুটেরাদের হস্তগত হয়েছে এবং বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির পাশাপাশি গোটা বিশ্বে যে নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মেরুকরণের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে তা গোটা বিশ্বকে এবং বিশেষ করে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। দেশের অর্থনীতির ভগ্নদশার পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতায় তৈরি হওয়া নতুন ঝুঁকিসমূহ মোকাবিলার প্রত্যয়কে কেন্দ্রে রেখেই এবারের বাজেটে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান নির্ধারণ হয়েছে। বাজেটে উল্লেখ আছে, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনার কথাও রয়েছে। বাজেটে সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে বাস্তবমুখী দক্ষতানির্ভর ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে যোগ্য মানবসম্পদে পরিণত করার কথা উল্লেখ আছে। এমনকি মৌলিক অধিকার হিসেবে সবার জন্য মানসম্পন্ন সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছর বাজেটে পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান ও আয়বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হবে। কৃষিকে উৎপাদন, জীবিকা ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার কৌশলগত খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা হবে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করে আমানতকারীদের আস্থা ও দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনা কথাও রয়েছে। উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তোলার প্রতিও জোর দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে দেশকে রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় জনগণের অংশগ্রহণে বনায়নকে একটি সবুজ বিপ্লবে রূপান্তর, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পরিবেশগত বিবেচনার পাশাপাশি, নদীগুলোর নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় শুরু করার মাধ্যমে একটি টেকসই, সবুজ ও পরিবেশ-সহনশীল বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা হবে। টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা দেখতে হলে মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

দেশে সামষ্টিক অর্থনীতির তুলনামূলক চিত্রে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ৬.৭৮ শতাংশ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পতিত সরকারের সময়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ৪.২২ শতাংশে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩.৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশে ২০০৫-০৬ সময়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.১৭ শতাংশ, যা বেড়ে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ১১.৬৬ শতাংশে পৌঁছায়। সম্পদের অসম বণ্টনব্যবস্থা, সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতির কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত নিম্ন পর্যায়ে রয়ে গেছে; এখনো তা ৮ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৮ শতাংশ যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।

দেশের বর্তমান বাস্তবতা পর্যালোচনায় দেখা যায় বিগত সরকারের অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে অর্থনীতি এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবে আমরা বিশ্বাস করি যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সঠিক নীতি, কার্যকর সংস্কার ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নতুন প্রবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টিতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করবে। একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে ওঠে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সৃজনশীলতা, শ্রম, দক্ষতা ও উৎপাদনশীল সক্ষমতার ওপর। সে কারণে, বর্তমান সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে যাত্রা শুরু করবে। ফলে, উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। বাজেটে উল্লেখ আছে, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশে উন্নীত হবে, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপির ২.৭ শতাংশে উন্নীত হবে এবং মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত হবে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কার্যক্রমের প্রথম ধাপ এক বছর মেয়াদি। দ্বিতীয় ধাপ, অর্থনীতির উত্তরণ এক থেকে তিন বছর মেয়াদের মধ্যে সম্পন্ন হবে। তৃতীয় ধাপ, সমৃদ্ধ অর্থনীতি পাঁচ বছরের মধ্যে সম্পন্ন হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ১০.২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব করেছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ১৩.৭ শতাংশ এবং বিগত অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে অপরিহার্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি খাত ও তৃণমূলের মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে অগ্রাধিকার রয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে মোট ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ২৯.৭৪ শতাংশ। ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৮.৬৬ শতাংশ। সাধারণ সেবা খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৬.১৩ শতাংশ।

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে জনআকাঙ্ক্ষা অনেক। বাজেটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের উচ্চমূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, জ্বালানিসংকট ও বিনিয়োগে স্থবিরতা দূর করার চাপ আছে। প্রতিটি মানুষের কথা মাথায় রেখে বাজেট করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উচ্চমূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা এবং রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা বাজেটে নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেটা কীভাবে সফল করা হবে এখন তা দেখার বিষয়। প্রথম বাজেটে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী সরকার অর্থনীতির নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করবে–নতুন সরকারের কাছে এটাই চাওয়া।

লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা 
ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ

শিশুর জন্য বাজেট, দেশের জন্য বিনিয়োগ

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম
শিশুর জন্য বাজেট, দেশের জন্য বিনিয়োগ
দীপু মাহমুদ

শিশুদের জন্য বরাদ্দ কোনো অনুগ্রহ নয়, কোনো দয়া নয়, কোনো আনুষ্ঠানিক সামাজিক দায়বদ্ধতাও নয়। এটা হচ্ছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বুদ্ধিমান বিনিয়োগ। আর যে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে বুদ্ধিমান বিনিয়োগের গুরুত্ব বোঝে, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আসন্ন বাজেটের আলোচনায় তাই শিশুদের আর প্রান্তে রাখা যাবে না। কারণ যাদের হাতে আগামী বাংলাদেশের দায়িত্ব থাকবে, তাদের জন্য বরাদ্দই আদতে ভবিষ্যতের জন্য বরাদ্দ।...

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে কৃষক আছেন, ব্যবসায়ী আছেন, শিল্পোদ্যোক্তা আছেন, সরকারি চাকরিজীবী আছেন, পেনশনভোগী আছেন। বাজেট ঘোষণার আগে তাদের সংগঠনগুলো দাবি জানায়, সংবাদ সম্মেলন করে, স্মারকলিপি দেয়, নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করে। বাজেট-পরবর্তী আলোচনাতেও তাদের লাভক্ষতি নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ হয়। কিন্তু একটি বড় জনগোষ্ঠী আছে, যারা এসব আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত। তারা দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। তারা ভোট দেয় না, কর দেয় না, সংগঠিত চাপ তৈরি করতে পারে না। তাই রাজনৈতিক আলোচনার টেবিলেও তাদের জন্য আলাদা চেয়ার থাকে না। তারা বাংলাদেশের শিশু।

কথাটি কঠোর শোনাতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হলো বাজেট কেবল অর্থনৈতিক দলিল নয়, এটা রাজনৈতিক দলিলও। রাষ্ট্র কাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কাদের প্রয়োজনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে এবং ভবিষ্যৎকে কীভাবে কল্পনা করছে–তার প্রতিফলন ঘটে বাজেটে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বাংলাদেশের শিশুদের অবস্থান এক ধরনের বৈপরীত্যের জন্ম দেয়। কারণ যাদের ওপর সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করার কথা, তারা প্রায়ই সবচেয়ে কম দৃশ্যমান।

এখানে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখা প্রয়োজন। শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ–এই বাক্যটি আমরা এত বেশি শুনেছি যে অনেক সময় এর গভীরতা অনুভব করি না। কিন্তু অর্থনীতির ভাষায় এর অর্থ অত্যন্ত বাস্তব। আজ যে শিশু জন্ম নিচ্ছে, সে ২০ বছর পরে শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে, ২৫ বছর পরে কর দেবে, ৩০ বছর পরে অর্থনীতির উৎপাদনশীল শক্তিতে পরিণত হবে। অর্থাৎ একটি দেশের আগামী তিন-চার দশকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নির্ভর করছে আজকের শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি ও সুরক্ষার ওপর। বিশ্বব্যাপী মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে, তার প্রায় সবই একটি বিষয়ে একমত–শৈশবে বিনিয়োগের চেয়ে বেশি মুনাফা আর কোনো সামাজিক বিনিয়োগে পাওয়া যায় না। একজন শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা, তাকে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলও। যে রাষ্ট্র এ কথা বুঝতে পারে, সে রাষ্ট্র উন্নয়নের ভিত্তি মজবুত করে। যে রাষ্ট্র এটা উপেক্ষা করে, সে রাষ্ট্র ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির ভিত দুর্বল করে।

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিশু উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বব্যাপী প্রশংসা পেয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ বেড়েছে, মেয়েদের শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এসব অর্জনের আড়ালে এখনো বহু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অপুষ্টি, শিক্ষার মানের সংকট, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, প্রতিবন্ধী শিশুদের বঞ্চনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত–এসব সমস্যা এখনো লাখো শিশুর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে রাখছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিশুদের জন্য ব্যয়কে আমরা প্রায়ই খরচ হিসেবে দেখি, বিনিয়োগ হিসেবে নয়। একটি সেতু নির্মাণের বরাদ্দ সহজেই দৃশ্যমান হয়। একটি উড়ালসড়ক চোখে পড়ে। কিন্তু একজন শিশুর পুষ্টি উন্নত হওয়া বা শেখার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। ফলে রাজনৈতিকভাবেও এসব খাত অনেক সময় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায় না। অথচ দীর্ঘমেয়াদে একটি সেতুর চেয়েও মূল্যবান হতে পারে একটি সুস্থ, দক্ষ ও শিক্ষিত প্রজন্ম।

বাংলাদেশ বর্তমানে জনমিতিক সুযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে আছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এখনো তুলনামূলকভাবে বেশি। এই সুযোগকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে আগামী প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার বিকল্প নেই। কিন্তু দক্ষ মানবসম্পদ বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হয় না, তার ভিত্তি গড়ে ওঠে জন্মের পর থেকেই। জীবনের প্রথম এক হাজার দিন, প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শেখার পরিবেশ–এসবই পরবর্তী জীবনের সক্ষমতা নির্ধারণ করে।

একজন অপুষ্ট শিশুর শেখার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। একজন শিক্ষাবঞ্চিত শিশু পরবর্তী সময়ে দক্ষ কর্মী হয়ে উঠতে পারে না। একজন সুরক্ষাহীন শিশু সহিংসতা, শোষণ বা সামাজিক বঞ্চনার শিকার হতে পারে। অর্থাৎ শিশুদের প্রতি অবহেলা শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতির ওপরই বোঝা হয়ে ফিরে আসে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গেও শিশুদের কথা নতুন করে ভাবতে হবে। বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভব করে শিশুরাই। একটি বন্যা শুধু ফসল নষ্ট করে না, শিশুর স্কুল বন্ধ করে দেয়, অপুষ্টি বাড়ায়, রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে এবং অনেক পরিবারকে এমন সংকটে ফেলে, যেখানে শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে জাতীয় পরিকল্পনায় তাই শিশুবান্ধব বিনিয়োগকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। মূল্যস্ফীতির সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্নআয়ের পরিবারগুলো। আর সেই পরিবারের শিশুরাই প্রথমে পুষ্টিকর খাবার হারায়, শিক্ষার সুযোগ হারায়, স্বাস্থ্যসেবার বাইরে চলে যায়। তাই শিশুকেন্দ্রিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে কেবল কল্যাণমূলক প্রকল্প হিসেবে নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো জবাবদিহি। শিশুদের জন্য কত টাকা বরাদ্দ হচ্ছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে। বরাদ্দকৃত অর্থ প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, কর্মসূচিগুলো প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে কি না এবং কোন খাতে বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে–এসব বিষয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। শিশুবান্ধব বাজেটের অর্থ কেবল বেশি বরাদ্দ নয় বরং আরও কার্যকর, আরও লক্ষ্যভিত্তিক এবং আরও জবাবদিহিমূলক ব্যয়।

এখানে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজেরও দায়িত্ব আছে। কারণ শিশু নিয়ে প্রশ্ন কেবল নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। এটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয়, স্থানীয় সরকারের বিষয়, পরিবেশ নীতির বিষয় এবং সর্বোপরি জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের বিষয়। শিশুদের প্রান্তিক কোনো ইস্যু হিসেবে দেখার সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে।

জাতীয় বাজেট শেষ পর্যন্ত একটি নৈতিক দলিলও বটে। এই দলিল বলে দেয় রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কী ভাবছে। একটি সমাজ তার সবচেয়ে শক্তিশালী নাগরিকদের জন্য কত ব্যয় করছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের জন্য কী করছে। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল প্রবৃদ্ধির হার নয়, উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো সেই উন্নয়ন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ভবিষ্যৎমুখী।

বাংলাদেশ যখন উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তখন সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে শিশুদের স্থান দিতে হবে। কারণ আগামী দিনের বাংলাদেশ কোনো সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে না, কোনো ভবনের ওপরও নয়। আগামী দিনের বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে থাকবে আজকের শিশুদের কাঁধে। সে কারণেই শিশুদের জন্য বরাদ্দ কোনো অনুগ্রহ নয়, কোনো দয়া নয়, কোনো আনুষ্ঠানিক সামাজিক দায়বদ্ধতাও নয়। এটা হচ্ছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বুদ্ধিমান বিনিয়োগ। আর যে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে বুদ্ধিমান বিনিয়োগের গুরুত্ব বোঝে, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

আসন্ন বাজেটের আলোচনায় তাই শিশুদের আর প্রান্তে রাখা যাবে না। কারণ যাদের হাতে আগামী বাংলাদেশের দায়িত্ব থাকবে, তাদের জন্য বরাদ্দই আদতে ভবিষ্যতের জন্য বরাদ্দ।

লেখক: কথাসাহিত্যিক