শাসক যদি অজ্ঞ এবং জ্ঞানের আলো বঞ্চিত হন, তাহলে সমাজে দুর্ভোগ নেমে আসে। শাসক ভালোমন্দ বিভাজন করতে ভুলে যান। তারা চাটুকারবেষ্টিত হয়ে থাকতে পছন্দ করেন। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন ছাড়া উদার গণতান্ত্রিক দেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক এ সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে গড়ে তুলবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরাচারীর জন্ম এ দেশে না হতে পারে।...

ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক এ সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়। শিক্ষা, গবেষণা এবং শিল্প-সাহিত্যচর্চার রাজনীতিকরণ কখনোই সভ্য সমাজের পরিচায়ক নয়। শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্পকলা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি অর্থাৎ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব শাখায় দেশ যাতে এগিয়ে যেতে পারে, তেমন নৈতিক মানসম্পন্ন একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার অবশ্যই কাজ করবে। উল্লেখ্য, অন্যান্য বছর পয়লা ফেব্রুয়ারি বইমেলা শুরু হলেও এবার নির্বাচনসহ নানা অনিবার্য কারণে বইমেলার আয়োজনে কিছুটা বিলম্ব হয়।
একুশে বইমেলা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী এতে কোনো সন্দেহ নেই। সমাজে জ্ঞানের কদর কমে গেলে পেশিশক্তির প্রাধান্য বৃদ্ধি পায়। এমন একটি উন্নত দেশ দেখানো যাবে না, যারা জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত নয়। জ্ঞানচর্চা ও বিতরণের মাধ্যমে একটি জাতি তার উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ তরবারির চেয়ে কলমের শক্তি বেশি। মানবতার ধর্ম ইসলামে জ্ঞানের কদরের কথা বলা হয়েছে। একটি হাদিসে বলা হয়েছে, কলমের কালি শহিদের রক্তের চেয়েও উত্তম। আবার অন্যত্র বলা হয়েছে, জ্ঞানী মানুষের নিদ্রা অজ্ঞ লোকের সারা রাত জেগে নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম।
স্বাধীনতা-পূর্বকালে ষাটের দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের শিক্ষা কার্যক্রমের মান ছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ের। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বব্যাপী। বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে শিক্ষার্থীরা জ্ঞানার্জনের জন্য আসতেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আমলে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্গতির সূচনা হয়। পরীক্ষায় নকলের ছড়াছড়ি শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের অটোপাস দেওয়া হয়। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের নামে আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজির প্রতি সীমাহীন অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়। বাংলা ও ইংরেজি ভাষাকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দাঁড় করানো হয়। অবস্থাটা এমন হয় যে, অনেকেই মনে করতে শুরু করেন, ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করলে তা স্বাধীনতার চেতনার পরিপন্থি হবে। সর্বস্তরে বাংলা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিশ্বমানের জ্ঞানের আধার ইংরেজি বইগুলোকে বাংলায় অনুবাদ করে আমরা শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করতে পারিনি। ফলে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিকমানের জ্ঞান অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। শুধু তাই নয়, উচ্চশিক্ষা লাভ করার পরও অধিকাংশ শিক্ষার্থী শুদ্ধভাবে বাংলা লিখতে ও পড়তে পারে না। বর্তমানে যারা উচ্চশিক্ষিত হয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশই কার্যত অর্ধশিক্ষিত রয়ে যাচ্ছে। জ্ঞানার্জনের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে গেছে উদ্বেগজনকভাবে। আমরা শিক্ষার্থীদের বইমুখী করতে পারিনি। আগে উচ্চশিক্ষার্থীরা নিয়মিত লাইব্রেরিতে যেতেন। এখন লাইব্রেরিগুলো ফাঁকা পড়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই পূর্ববর্তী সিনিয়রদের কাছ থেকে প্রাপ্ত নোটের ওপর নির্ভর করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে। যেহেতু উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও একজন শিক্ষার্থীর অধিত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থেকে যাচ্ছে, তাই তারা কর্মজীবনে গিয়ে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।
বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষালাভকারী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেকারের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি তিনজন উচ্চশিক্ষিতের মধ্যে অন্তত একজন বেকার। সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর একজন শিক্ষার্থীকে গড়ে দেড় বছর বেকার থাকতে হচ্ছে। জনবহুল বাংলাদেশে সাধারণ উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি ব্যাপক মাত্রায় কারিগরি শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করা ছাড়া বেকার সমস্যার সমাধান করা যাবে না। স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকার আমলে বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল, পরবর্তীকালে তা আর নিরাময় করা সম্ভব হয়নি। সরকারের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকৃত জ্ঞানের বিস্তার ঘটানোর পরিবর্তে পাশের হার বেশি দেখিয়ে কৃতিত্ব অর্জন করা। ফলে অবস্থা এমন হয়েছে যে, সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জনকারী একজন শিক্ষার্থীর পক্ষেও সঠিক ও শুদ্ধভাবে বাংলা ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তাদের সন্তানদের বিদেশে উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার সুযোগ হয়। তাই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তাদের কোনো উদ্বেগ নেই। অথচ প্রকৃত জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন ছাড়া একটি দেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না।
এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, বুদ্ধির মুক্তি ও চিন্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না গেলে একটি সমাজ সঠিকভাবে বিকশিত হতে পারে না। গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষায় জাতিকে শিক্ষিত করে তোলা না গেলে উন্নত মানবিক সমাজ গঠন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এটা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই যে, আমাদের বর্তমান সমাজে জ্ঞানের কোনো কদর নেই। সমাজে তারাই সবচেয়ে সম্মানিত বলে বিবেচিত হন, যারা বিপুল বিত্তের মালিক। এ বিত্ত কীভাবে বা কোন পন্থায় অর্জিত হলো, সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। ফলে আমাদের সমাজে জ্ঞানান্বেষণের চেয়ে অর্থবিত্তের অন্বেষণ বেশি করা হয়। জ্ঞানী ব্যক্তির প্রতি সমাজের এ অবহেলা সমাজকে আগ্রাসী করে তুলছে।
আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক মহামতি সক্রেটিস বলেছিলেন, জ্ঞানই সৎ গুণ এবং নিজেকে চেন। তখনকার গ্রিক সমাজ ছিল জ্ঞানবিমুখ, অন্ধকারাচ্ছন্ন। বিশেষ করে শাসকশ্রেণি ছিল অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত। তাই তারা সক্রেটিসের এ বক্তব্য সহ্য করতে পারেনি। শাসকশ্রেণি মনে করেছিল, সক্রেটিস দেশের মানুষকে শাসকদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলছেন। যুবসমাজকে বিপথগামী করছেন। একপর্যায়ে সক্রেটিসকে বিচারের নামে হেমলক বিষপানে হত্যা করা হয়। বিষের পাত্র হাতে নিয়ে সক্রেটিস শাসকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, I to die, you to live; which is better only god knows. সক্রেটিসের সেই অমিয় বাণী এখনো কানে বাজে। পৃথিবী সক্রেটিসকেই মনে রেখেছে, বিচারের নামে হত্যাকারী শাসকদের নয়। সক্রেটিস জ্ঞানকে আইভরি টাওয়ারে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষের মাঝে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি জানতেন, সাধারণ মানুষ যদি উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়, তাহলে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে না। ফলে শাসকদের স্বৈরাচারী তৎপরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারবে না। একশ্রেণির শাসক আছেন, যারা কখনোই চান না, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠুক। একটি দেশের শাসক যদি প্রকৃত জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হন, তাহলে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠতে পারে। যে দেশের শাসক সত্যিকার জ্ঞানের আলোয় আলোকিত, সেই সমাজে সাধারণ মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে বসবাস করতে পারেন। আর শাসক যদি অজ্ঞ এবং জ্ঞানের আলো বঞ্চিত হন, তাহলে সমাজে দুর্ভোগ নেমে আসে। শাসক ভালোমন্দ বিভাজন করতে ভুলে যান। তারা চাটুকারবেষ্টিত হয়ে থাকতে পছন্দ করেন। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন ছাড়া উদার গণতান্ত্রিক দেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক এ সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে গড়ে তুলবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরাচারীর জন্ম এ দেশে না হতে পারে।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


.jpg)