আমাদের অগ্রাধিকারগুলো স্ট্র্যাটেজিক্যালি চিন্তা করতে হবে। কৌশলগত চিন্তার একটা সক্ষমতা দেখাতে হবে। বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বের ব্যাপক কৌতূহল, আস্থা ও শুভকামনা আছে। তার ফল আমরা ঘরে তুলতে পারছি কি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের আস্থা তৈরির কাজটা আরও জোরালো করার ব্যাপারে অবশ্যই চেষ্টা থাকতে হবে।...

অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। সেখানে কীভাবে গতি আনা যায়; সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেখানে কী প্রস্তাব আসবে, কীভাবে তা বাস্তবায়ন হবে, এখন কতটা হবে, পরে কতটা হবে ইত্যাদি দেখার বিষয়। জবাবদিহিমূলক সমাজ তৈরির অন্যতম স্তম্ভ নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই বহু কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। লৌহ ত্রিভুজে রাজনৈতিক যে অংশ ছিল, সেটা ভেঙেছে। পুনর্নির্মাণের একটি বিষয় আছে। ‘অলিগার্ক’-এর ক্ষমতা বাজারে এখনো রয়ে গেছে। আমলাতন্ত্র যেভাবে স্থবিরতা তৈরির যন্ত্র হিসেবে কাজ করে, তা এখনো আছে।
বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক উদারনৈতিক দেশ। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য উপযুক্ত জায়গা। শান্তিপূর্ণ বিশ্ব রক্ষায় জাতিসংঘের আওতায় সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত থাকবে। গণতান্ত্রিক, উদারনীতির ক্ষেত্রে ভাবমূর্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই ভাবমূর্তি রক্ষা করতে হবে। নিরাপত্তার জন্য, রপ্তানির জন্য, রেমিট্যান্সের জন্য, বিনিয়োগের জন্য, ব্যবসায়ীদের জন্য ভাবমূর্তি রাখতে হবে। বিদেশি ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশকে কীভাবে দেখে? কোনো দেশের সঙ্গে রেষারেষি থাকলে, সম্পর্ক খারাপ করলে ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়- দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ১৯৭২ সালে এই নীতিমালায় আমরা ধ্রুবতারা হিসেবে জড়িয়ে ছিলাম। পরবর্তীতে মনে হয়েছে, কারও সঙ্গে বেশি বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে কম বন্ধুত্ব কেন করছি না। প্রয়োজনের নিরিখে, জাতীয় স্বার্থের নিরিখে, কারও সঙ্গে একটু বেশি হবে, কারও সঙ্গে একটু কম হবে। কিন্তু সরাসরি কারও সঙ্গে বৈরিতায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সবার সঙ্গেই বন্ধুত্ব থাকবে। বন্ধুত্বের জায়গায় বন্ধুত্ব। জাতীয় স্বার্থ, জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতেই আমরা পরিপক্ব করব।
ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের ফলে আমাদের সম্ভাবনার জায়গা বিস্তৃত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার কিছু কাজ শুরু করেছে। যে আকাঙ্ক্ষায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে যে সরকার গঠিত হলো, অর্থাৎ বাংলাদেশকে বৈষম্যহীন, সক্ষম ও জবাবদিহির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন বছরের মূল বিষয় নতুন সরকারের কাজের ফল দেখা। এখানে প্রত্যেক অংশীজনকে বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থাৎ অর্থনীতি যারা চালান, বিশেষ করে ব্যক্তি খাত, অন্তর্বর্তী সরকার, রাজনৈতিক দল, ছাত্রশক্তি ও নাগরিক সমাজ। অংশীজন যারা এই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় যুক্ত হয়েছেন, নতুন বছরে প্রত্যেকের জন্য আলাদা চ্যালেঞ্জ আছে, আবার সম্মিলিত চ্যালেঞ্জও আছে। সেই কাজ কোন দিকে এগোবে– নতুন বছরে নতুন সরকারের মাধম্যে আমরা সেটাই দেখব।
অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কমিশন গঠন নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক ছিল। কিন্তু এর গঠন প্রক্রিয়ায় কেতাবি ধরনের কিছু বিষয় আছে। সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে জোরালোভাবে এগোতে হবে। কিছু জায়গায় কিন্তু সরকার সংস্কার কমিশনের সুপারিশের আগেই পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সংস্কারের যেসব প্রস্তাবনা আসবে সেগুলো কতটা বাস্তবায়ন করা হবে। যেমন- জনপ্রশাসন সংস্কার করতে গিয়ে কিছু বিষয় সামনে আসার পরই দেখা গেল প্রশাসনে অস্থিরতা। হয়তো ভালো প্রস্তাব, কিন্তু অস্থিরতার কারণে বাস্তবায়ন সম্ভব হলো না। সে জন্য এই অস্থিরতাকে সফলভাবে মোকাবিলা করতে যে রাজনৈতিক ইচ্ছা ও দৃঢ় মনোবল দরকার, এটিও দেখার বিষয়। তাছাড়া সংস্কার করতে গিয়ে অনেক সময় যে অনৈতিক চাপ তৈরি হয়, তা মোকাবিলা করা গুরুত্বপূর্ণ। এ চাপ সাধারণত রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠনগুলোর মধ্য থেকে আসে। অঙ্গসংগঠনগুলো কি এখনো আগের মতোই চলবে? সে জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। অঙ্গসংগঠনগুলোর চাপ উপেক্ষা করাও সংস্কারেরই অংশ। বিগত সময়ে যে প্রবণতা চলে আসছিল; অঙ্গসংগঠনগুলোর চাপ গ্রহণ করে শেষ পর্যন্ত যে পরিণতি হয়েছে, সেখান থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর শিক্ষা নিতে হবে।
আমরা দেখেছি, সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কিংবা নাগরিক সমাজের সঙ্গে অফিসিয়াল আলোচনা করা হয়েছে। এ ধরনের কেতাবি আলোচনায় অনেক কিছুই উঠে আসে না। খোলামেলা আলোচনা না হলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যায় না। শুধু একপক্ষীয় আলোচনা করা ঠিক নয়। অর্থাৎ শুধু বলে গেলাম, তার কোনো প্রতিফলন নেই। এখানে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব আছে। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হলো, তাদের চিন্তাধারা পরিষ্কার করা। যেটা বলছিলাম, অনৈতিক চাপ যেসব জায়গা থেকে আসে সেখানে সংস্কার করে তাদের করণীয় ঠিক করতে হবে। সেগুলো জাতির সামনে দৃশ্যমান করা দরকার। নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো, জনপরিসরের আলোচনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা। নাগরিক সমাজ ক্ষমতার ভাগীদার হতে চাইছে না। তারা যে সজাগ আছে, সেটা বোঝানো। চব্বিশের আগস্টের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করেই তাদের নিশ্চিত করতে হবে যে এত বড় অভ্যুত্থান হলো, তার প্রতিফলন হচ্ছে কি না। আমরা দেখছি, বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্ট বাংলাদেশকে বর্ষসেরা ঘোষণা করেছে। তার পরিপ্রেক্ষিতেও একটি দায়িত্ব এসে যায়, সে জন্য নাগরিক সমাজের ভূমিকা স্পষ্ট করা তৃণমূল পর্যন্ত।
নতুন বছরে অর্থনীতির কথায় যদি আসি, বাংলাদেশ কি মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ে গেছে, যার জন্য আপনি অনেক আগে থেকেই সতর্ক করে আসছিলেন? আমাদের পরিসংখ্যানে যে ঘাপলা ছিল, সেটা তো বেরিয়ে এসেছে। আমাদের অগ্রগতি হয়েছে বটে। কিন্তু বাঁক বদল করার মতো উন্নতি কতটা হয়েছে? তার সুনির্দিষ্ট উদাহরণ হলো, এখনো আমরা প্রবৃদ্ধির চালক হিসেবে চিহ্নিত করি পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সকে। দুটোরই ‘সেলিং পয়েন্ট’ হচ্ছে সস্তা শ্রম। আমরা সস্তা শ্রমের অর্থনৈতিক একটা অবস্থার মধ্যে আটকে আছি। সেখান থেকে উৎপাদনশীল শ্রমে উত্তরণ ঘটাতে পারছি না। তরুণ প্রজন্মকে বাংলাদেশে রাখা যাচ্ছে না। কারণ এখানে আকর্ষণ নেই। এখান থেকে বের হওয়ার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।
আমাদের ব্যবসার অন্যতম বাধা হলো সময়ক্ষেপণ। দৃশ্যমান কিছু দুর্নীতি বন্ধ হয়েছে বটে, হয়রানির বাস্তবতা এখনো শেষ হয়নি। বেকারত্বও উদ্বেগজনক পর্যায়ে আছে। এখন বেকারত্ব চরম আকার ধারণ করেছে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে আমাদের নজর বেশি গেছে। তার সংগত কারণও আছে। সামষ্টিক অর্থনীতি নাজুক ছিল, সেটা মেরামত করবে, ঠিক আছে। কিন্তু অর্থনীতির চাকা যদি না ঘোরানো হয়, তবে বেকারত্বের মতো সংকট বাড়বে। এখন রিজার্ভে টান পড়ছে না, কারণ আমদানি হচ্ছে না। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড না হওয়ার কারণে আমদানি হচ্ছে না। অর্থনৈতিক স্থবিরতাও বড় সমস্যা। আমাদের নতুন প্রবৃদ্ধির চালকগুলো খুঁজতে হবে। যেমন কৃষি একটা। প্রবৃদ্ধির চালক হওয়ার জন্য কৃষির বিশাল সম্ভাবনা আছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ– সামাজিক নিরাপত্তায় জোরালো আলোচনা দরকার। সাধারণ মানুষের দুর্দশা লাঘবে আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার পরিসর কীভাবে বাড়ানো যায়, সেটা দেখা দরকার।
বৈদেশিক বিনিয়োগ আসার জন্য বিদেশিরা দেখবে এখানে জমি আছে কি না, সহজে ইউটিলিটি পাচ্ছি কি না, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন, ইজ অব ডুয়িং বিজনেস তথা সহজে ব্যবসা করার সূচক কেমন। সে কারণে বিদেশি বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে আছে। এমনকি দেশি বিনিয়োগও হচ্ছে না। এক ধরনের ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ বা অপেক্ষা করার মতো অবস্থা দেখা যাচ্ছে। এ বাস্তবতা কীভাবে কাটানো যায়, সেখানেও মনোযোগী হতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিস্তৃত করা অগ্রাধিকার; মানবাধিকার ও মর্যাদার জায়গা নিশ্চিত করা অগ্রাধিকার এবং ক্ষমতার দম্ভ যেন ফিরে না আসে, সেটাও অগ্রাধিকার। কোনোটা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে লং লিস্ট বানিয়ে ভজঘট পাকিয়ে ফেললাম, তাও হবে না। আমাদের অগ্রাধিকারগুলো স্ট্র্যাটেজিক্যালি চিন্তা করতে হবে। কৌশলগত চিন্তার একটা সক্ষমতা দেখাতে হবে। বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বের ব্যাপক কৌতূহল, আস্থা ও শুভকামনা আছে। তার ফল আমরা ঘরে তুলতে পারছি কি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের আস্থা তৈরির কাজটা আরও জোরালো করার ব্যাপারে অবশ্যই চেষ্টা থাকতে হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও এক্সিকিউটিভ
চেয়ারম্যান পিপিআরসি


.jpg)