বাংলাদেশের সংবিধানে এখনো ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ আছে, তবে সঙ্গে আছে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামও। ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ দল/জোট ক্ষমতায় ছিল দেড় দশকেরও বেশি। এ সময়েও রাজনীতি ও সমাজে রাষ্ট্রের ধর্মীয় পক্ষপাত কমেনি বরং বেড়েছে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা কমেনি বরং বেড়েছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিভিন্ন গোষ্ঠী অনেক ক্ষেত্রে এ ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ দলকেও পরিচালনা করেছে। বিনা নির্বাচনে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ধর্মীয় শক্তিগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে বিগত সরকার।...

বিশ্বের অন্য অনেক অঞ্চলের মতো দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও রাজনীতিতে ধর্ম এখন আগের যেকোনো সময়ের চাইতে বেশি উপস্থিত। ধর্ম সামনে রেখে সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা, সন্ত্রাসও বাড়ছে ক্রমেই। পাকিস্তান প্রথম থেকেই ইসলামী রাষ্ট্র। তবুও সেখানে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই বিভিন্ন মত ও পথের অনুসারীদের মধ্যে সহিংস সংঘাত কখনো কমেনি বরং বেড়েছে। ইসলামের নামে বিভিন্ন মসজিদে হামলা ও মুসল্লি হত্যাও প্রায় নিয়মিত। যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পাকিস্তান এখন সন্ত্রাসের ও ড্রোন হামলার স্থায়ী ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
এ অঞ্চলের সবচাইতে বড় রাষ্ট্র ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হলেও সেখানে গত কয়েক দশকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রসার ঘটেছে অনেক। কয়েক দফা জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে প্রায় একচেটিয়া বিজয় নিয়ে সেখানে হিন্দুত্ববাদী দল ক্ষমতাসীন। তিন দফা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন গুজরাটে মুসলিম গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত এবং ভারতে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা সৃষ্টির নায়ক নরেন্দ্র মোদি। জোর করে ইতিহাস পরিবর্তন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ এবং বিদ্বেষও নানাভাবে বাড়ছে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। নেপালে নতুন প্রণীত সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতা বিধান রেখে পাস হলেও নেপালকে হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণার জন্য সেখানে আন্দোলন দাঁড় করানোর চেষ্টা এখনো বলবত আছে। নেপালের রাজনীতিতে ভারতের বর্তমান সরকার নানাভাবে হস্তক্ষেপ করছে। সামনে সেখানেও হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি প্রসারের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবিধানে এখনো ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ আছে, তবে সঙ্গে আছে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামও। ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ দল/জোট ক্ষমতায় ছিল দেড় দশকেরও বেশি। এ সময়েও রাজনীতি ও সমাজে রাষ্ট্রের ধর্মীয় পক্ষপাত কমেনি বরং বেড়েছে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা কমেনি বরং বেড়েছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিভিন্ন গোষ্ঠী অনেক ক্ষেত্রে এ ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ দলকেও পরিচালনা করেছে। বিনা নির্বাচনে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ধর্মীয় শক্তিগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে বিগত সরকার।
বিশ্বজুড়ে ধর্মকে ধরে সন্ত্রাস, সংঘাত ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তার থেকে বেশি বাড়ছে আতঙ্ক এবং এ বিষয় নিয়ে ধোঁয়াশা। সারা বিশ্বে সংবাদমাধ্যমে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ‘ইসলামপন্থি রাজনীতির সন্ত্রাস’ নিয়ে প্রবল মনোযোগ এবং হুলস্থুল দেখা গেলেও এর উৎস সন্ধানে অনাগ্রহও দেখা যায় সেরকমই। যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ মডেল’ জোরকদমে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে সন্ত্রাসী ভূতুড়ে গোষ্ঠী, ডিজিটাল প্রচারণা আর অদৃশ্য সরকারের তৎপরতা। দেশে দেশে পুঁজিপন্থি সংস্কার চলছে আর তার যাত্রাপথ মসৃণ করে বিভিন্ন ধর্মের নামে উন্মাদনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই ‘মৌলবাদ’, ‘আধুনিকতা’, ‘পশ্চিম’, ‘ধর্ম’, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ইত্যাদি নিয়ে সাদাকালো বিভাজনকে প্রশ্নের মধ্যে আনার তাগিদ তৈরি হয়েছে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে বৈশ্বিক ফ্যাসিবাদী কাঠামো বিবেচনায় রেখে বর্তমান প্রবন্ধে এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র, ধর্মপন্থি ও তথাকথিত সেক্যুলার রাজনীতির পারস্পরিক ঐক্য-বিবাদের নানা গ্রন্থি তুলে ধরে বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের সর্বজনের বিপদের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
বর্তমান সময়ে যথাযথ পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে আলোচনার গুরুত্ব বহুবিধ। কারণ-
প্রথমত, বিশ্বজুড়ে সামাজিক সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ‘ধর্মীয়’ এজেন্ডার চাপ আগের চাইতে অনেক বেশি। একই সময়ে সাম্প্রদায়িক, জাতিবিদ্বেষী, বর্ণবাদী, যৌনবাদী, অসহিষ্ণু দৃষ্টিভঙ্গীর বিষয়গুলোও আগের তুলনায় বেশি উপস্থিত।
দ্বিতীয়ত, ধর্মকে ভিত্তি করে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য নানা গোষ্ঠীর তৎপরতা বাড়ছে। ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ নামে দেশে দেশে সামরিকীকরণও বাড়ছে।
তৃতীয়ত, শোষণ ও অবিচারের সৃষ্ট পরিস্থিতি এবং এর থেকে মুক্তির দিশাহীনতার মধ্যে বিভিন্ন ধর্মের নানাবিধ সংগঠন ও তৎপরতা অনেক বেশি পরিসর তৈরি করেছে।
চতুর্থত, ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হিসেবে পরিচিত অনেক রাজনৈতিক দলও নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে, ক্ষমতা ও ভোটের রাজনীতি করতে গিয়ে ধর্ম ও ধর্মীয় বিভিন্ন গোষ্ঠীকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে এবং তার কাছে আত্মসমর্পণ করছে।
পঞ্চমত, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা তার প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখতে নানাভাবে ‘ধর্মীয় সন্ত্রাস’ চাষ করছে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমি প্রথমেই কয়েকটি প্রশ্নের মুখোমুখি হই। এগুলো হলো:
এক. ‘মৌলবাদী’ শব্দটি ধর্মপন্থি রাজনীতি বোঝাতে উপযুক্ত শব্দ কি না। দুই. এই রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সবসময় ‘উদারনৈতিক’ ‘গণতান্ত্রিক’ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বিপরীত হিসেবে দেখা ঠিক কি না।
তিন. তথাকথিত ‘মৌলবাদী’ রাজনৈতিক শক্তি কি পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের বিরুদ্ধ কোনো শক্তি, ‘মৌলবাদ’ আর পুঁজিবাদী উন্নয়নের মধ্যে কি অন্তর্গত কোনো বিরোধ আছে?
চার. প্রান্তস্থ দেশগুলোতে ‘মৌলবাদ’ কি বৈশ্বিক পুঁজিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ তৈরি করেছে?
পাঁচ. ‘মৌলবাদ’ কি কেবল মুসলিম দেশ ও গ্রামীণ অঞ্চলের বিষয়? এবং ছয়. ধর্মপন্থি রাজনীতি কি সমাজের গরিব-নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে বা করতে পারে?
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা ক্রমশ পেতে থাকব আশা করি। তবে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ নিয়ে লেখার শুরুতে কয়েকটি বিষয়ে আমার অবস্থান পরিষ্কার করে নিতে চাই।
প্রথমত, সাধারণভাবে ধার্মিক মানুষের কাছে ধর্মের রূপ, আর ধর্মের একটি নির্দিষ্ট বয়ানের ওপর ভিত্তি করে কোনো গোষ্ঠীর রাজনৈতিক তৎপরতা এক কথা নয়।
দ্বিতীয়ত, নিজ নিজ ব্যাখ্যা অনুযায়ী ধর্মের মৌল আদর্শের প্রতি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তার/তাদের বিশ্বাস ও চর্চার অধিকার অবশ্যই রাখেন। তা অন্য কারও সঙ্গে না মিললে তাতে কেউ আপত্তি করতে পারেন না, যদি তা তাদের অসুবিধা না ঘটায়।
তৃতীয়ত, কোনো ব্যক্তি/গোষ্ঠী/সংগঠন যখন ধর্মের মৌল আদর্শ নিজেদের মতো সংজ্ঞায়িত করে এবং অন্যদের মত/বিশ্বাস/চর্চা অস্বীকার করে তা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে তখন তা তৈরি করে সহিংস পরিস্থিতি। জোর করে চাপানোর এ মতাদর্শিক অবস্থানই ফ্যাসিবাদী রাজনীতির জন্ম দেয়।
চতুর্থত, ধর্মীয় চর্চায় যুক্ত আছেন, সেটাই তাদের জীবিকা এরকম ইমাম, মুয়াজ্জিন, মাদ্রাসা শিক্ষক প্রমুখকে কায়েমি স্বার্থবাদীদের সঙ্গে গাটছড়ায় বাঁধা কতিপয় ক্ষমতাবান ধর্মীয় নেতার ভূমিকা থেকে ভিন্নভাবে দেখতে হবে। কারণ এ পেশাজীবীরা পেশাগত কারণে এবং জীবিকার প্রয়োজনে সাধারণত বিত্তবান ও ক্ষমতাবানদের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য থাকেন।
পঞ্চমত, মৌলবাদী আর সাম্প্রদায়িক এক কথা নয়। কারও মধ্যে এই দুটো প্রবণতা একসঙ্গে নাও থাকতে পারে। মৌলবাদ ধর্মকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা জীবনচর্চা কাঠামো। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ধর্মের পরিচয়কে ভিত্তি করে তৈরি হলেও তাতে অন্যদের প্রতি বিদ্বেষ থাকে প্রধান। সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি মানে অন্য সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বিদ্বিষ্ট, আক্রমণমুখী। একজন ধর্মবিশ্বাসী সাম্প্রদায়িক নাও হতে পারেন, যেমন একজন সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি ধর্মবিশ্বাসী বা চর্চাকারী নাও হতে পারেন। অর্থাৎ ব্যক্তির ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ধর্মভিত্তিক সম্প্রদায়কে নিয়ে বিদ্বেষী রাজনীতি এক কথা নয়। অভিজ্ঞতা বলে, সাম্প্রদায়িকতা অনেক সময় ধর্মীয় সংখ্যালঘুর জমিজমা, সম্পদ দখলের আবরণ হিসেবেও ব্যবহার হয়।
ষষ্ঠত, কোনো ব্যক্তি ধর্মবিশ্বাসী মানেই মৌলবাদী নন, ধর্মবিশ্বাসী মানেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অনুসারী নন।
সপ্তমত, খ্রিষ্টান মানে খ্রিষ্টান সুপ্রিমেসিস্ট নয়, ইহুদি মানেই জায়নবাদী নয়, হিন্দু মানেই বর্ণবাদী নয়, ইসলামপন্থি মানেই সন্ত্রাসী নয়।
অষ্টমত, মৌলবাদ প্রাচ্যনির্দিষ্ট বা প্রাচীন মতবাদ যেমন শুধু নয়, বস্তুত এর শুরু পাশ্চাত্যেই এবং এটি বর্তমানে ‘আধুনিক’ পুঁজিবাদী ব্যবস্থারই ফলাফল। ইহজাগতিকতা বা সেক্যুলারিজম এবং গণতন্ত্রও পশ্চিম নির্দিষ্ট এবং ‘আধুনিক’ কালের বিষয় শুধু নয়। এর বহু ধারা বিভিন্ন কালে মুসলিম বিশ্বসহ প্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় বহুকাল আগে থেকেই পাওয়া যায়।
লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং
ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক


