আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বহুমুখী। এখানে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল আছে। বাংলা মাধ্যম স্কুল আছে। আবার আরবি মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। এগুলোকে সমন্বিত করে একমুখী শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই ইংরেজি শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে।...

একটি দেশ বা সমাজকে তীব্র প্রতিযোগিতামূলক আধুনিক জগতের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার জন্য উপযুক্ত জ্ঞানের বিস্তার ঘটানোর কোনো বিকল্প নেই। আর জ্ঞান বিস্তারের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পন্থা হচ্ছে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা। শুধু শিক্ষিত হলেই একটি জাতি উন্নত এবং আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকার মতো সামর্থ্য অর্জন করতে পারে না, যদি অধিত শিক্ষা মানসম্পন্ন এবং যুগোপযোগী না হয়। শিক্ষা দুই ধরনের হতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে সার্টিফিকেট অর্জনের জন্য শিক্ষা এবং অন্যটি অজানাকে জানার মানসে শিক্ষা গ্রহণ করা। বাস্তবসম্মত এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মতো শিক্ষায় জাতিকে শিক্ষিত করে তোলা না গেলে সে জাতি কখনোই উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই বিকল্পহীন বাস্তবতার কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। পৃথিবীতে এমন একটি দেশও পাওয়া যাবে না, যারা মানসম্পন্ন জ্ঞান বিস্তারের মাধ্যমে আলোকিত সমাজ গঠন ব্যতীত উন্নতির শিখরে পৌঁছতে পেরেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সর্বজনীন শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কিন্তু মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমরা কতটা সক্ষম হয়েছি, তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের অবকাশ রয়েছে বৈকি। শিক্ষা হচ্ছে সবচেয়ে মূল্যবান ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। যে জাতি শিক্ষা কার্যক্রমে সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে পারে, সে জাতির উন্নতি কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। কিন্তু আমরা যেনতেনভাবে শিক্ষা বিস্তার করতে সক্ষম হলেও শিক্ষার গুণগতমান নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। ইউনিসেফের মতে, কোনো দেশের মোট জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। বরাদ্দকৃত অর্থের বেশির ভাগই শিক্ষা-গবেষণায় ব্যয়িত হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় উন্নত এবং গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নাও হতে পারে। আমাদের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে যে ব্যয় বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা জিডিপির ২ শতাংশেরও কম। বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশই অবকাঠামোগত নির্মাণ কাজে ব্যয়িত হয়। ফলে গবেষণার কাজে অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায় খুবই কম। দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত একটি সিদ্ধান্ত। কিন্তু সঠিক ম্যানেজমেন্টের অভাবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত ব্যবসায়িক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা মানোন্নয়নের চেয়ে মুনাফা অর্জনই এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলো জানার পাশাপাশি জ্ঞাত সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্দেশ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিশন গঠন করা খুবই প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিভিন্ন খাতের জন্য একাধিক উচ্চপর্যায়ের কমিশন গঠন করা হলেও শিক্ষা খাতের সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও তা সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার জন্য কোনো কমিশন গঠন করা হয়নি। আমরা নানাভাবে শিক্ষা কমিশন গঠনের জন্য প্রস্তাব দিলেও তা হালে পানি পায়নি। তার অর্থ কি এই নয় যে, আমাদের দেশে শিক্ষা খাত রাষ্ট্রীয়ভাবে যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না?
শিক্ষা খাতে বিদ্যমান কিছু সমস্যা আমাদের জানাই আছে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম অন্তর্মুখী। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এর সংযোগ খুবই কম। স্বাধীনতার আগে অর্থাৎ গত শতাব্দীর ষাটের দশক পর্যন্তও বাংলাদেশের শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে বাইরের বিশ্বের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। একমাত্র বাংলা ব্যতীত অন্য সব বিষয় ইংরেজিতে পাঠদান করা হতো। কিন্তু স্বাধীনতার পর সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালুর নামে ইংরেজি ভাষার প্রতি কার্যত বৈরী আচরণ করা হয়। বিশ্বব্যাপী ইংরেজি ভাষা হচ্ছে জ্ঞান চর্চার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। এমন কোনো বই বা জ্ঞানের উপকরণ নেই, যা ইংরেজি ভাষায় পাওয়া যায় না। স্বাধীনতার পর সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর সময় বলা হয়েছিল ইংরেজি ভাষায় লেখা বইগুলো বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে শিক্ষার্থীদের চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু বাংলা একাডেমি বা অন্য কোনো সংস্থা বিদেশি ভাষায় লেখা বই বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতে পারেনি। ফলে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ভাষায় রচিত গ্রন্থাবলি থেকে জ্ঞান আহরণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। মূলত তখন থেকেই শিক্ষার মানের অবনতি শুরু হয়। স্বাধীনতার পর অন্যান্য খাতের মতো শিক্ষা কার্যক্রমেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে থাকে। পরীক্ষায় শুরু হয় নকলের ব্যাপক প্রবণতা। যেনতেনভাবে পরীক্ষা পাশের জন্য শিক্ষার্থীরা উদগ্রীব হয়ে পড়ে। তারা জ্ঞান চর্চার প্রতি ক্রমেই উদাসীন হতে থাকে। এক সময় শিক্ষার্থীদের মাঝে লাইব্রেরিতে গিয়ে বিভিন্ন বই দেখে নোট নেওয়ার প্রবণতা প্রত্যক্ষ করা যেত। লাইব্রেরিতে বসার স্থান পাওয়া ছিল কঠিন। কিন্তু পরবর্তীকালে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরিবিমুখ হয়ে পড়ে। উচ্চ শিক্ষার্থীদের মাঝে নিজে নোট করার চেয়ে বড় ভাইদের কাছে থেকে নোট সংগ্রহ করে তা পড়ে পরীক্ষা পাশের প্রবণতা জাগ্রত হয়।
পাকিস্তান আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধের কারণে মাঝে মাঝে সংঘাতের সৃষ্টি হতো। সেসব সংঘাতকালে দেশি অস্ত্র ব্যবহৃত হতো। কিন্তু স্বাধীনতার পর ছাত্র রাজনীতি অতি মাত্রায় কলুষিত হয়ে পড়ে। ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হলে আধুনিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা বেড়ে যায়। বিশেষ করে সরকার তার নিজস্ব স্বার্থে ছাত্রদের ব্যবহার করতে শুরু করে। অনেকেই বলেন, ছাত্র রাজনীতি এখন আর আগের মতো নেই। তাই ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কিন্তু আমি মনে করি, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ নয়, বরং একে সংস্কার করতে হবে। ছাত্ররা তাদের নিজস্ব সমস্যা নিয়ে রাজনীতি করবে, এতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু ছাত্রদের রাজনৈতিক দলগুলো যাতে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বহুমুখী। এখানে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল আছে। বাংলা মাধ্যম স্কুল আছে। আবার আরবি মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। এগুলোকে সমন্বিত করে একমুখী শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই ইংরেজি শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। কারণ ইংরেজিতে দুর্বলতা থাকলে সেই শিক্ষার্থী কর্মজীবনে কখনোই সফল হতে পারবে না। প্রতিটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গবেষণার ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে।
বর্তমান প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মোটেও কর্মমুখী নয়। উচ্চশিক্ষা সমাপনের পর একজন শিক্ষার্থী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ৩০ শতাংশই কয়েক বছর পর্যন্ত বেকার থাকে। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা আত্মঅহমিকাপূর্ণ বেকার তৈরি করছে মাত্র। আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই কারিগরি শিক্ষা চালু করা যেতে পারে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি সব শিক্ষার্থীকে কারিগরি বিদ্যা অর্জন করতে হবে। পরবর্তী সময়ে যারা অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিতে পারবে, তারা বিজ্ঞান বা অন্য কোনো বিশেষ সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশোনা করবে। আর যারা সাধারণ মানের শিক্ষার্থী, তারা উচ্চশিক্ষা সমাপন করার পর বিভিন্ন ট্রেডভিত্তিক কারিগরি লাইনে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে নেবে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জনবহুল একটি দেশ। এখানে পাবলিক বা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে বেকার সমস্যা সমাধান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থী যদি কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়, তাহলে তাকে চাকরির জন্য বসে থাকতে হবে না। নিজেই আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে। বাংলাদেশে আত্মকর্মসংস্থানের প্রচুর সুযোগ রয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। আমাদের দেশের জন্য আত্মকর্মসংস্থানই বেকার সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় হতে পারে। সরকারের তরফ থেকে তরুণদের উদ্দেশে একাধিকবার বলা হয়েছে, তোমরা চাকরির জন্য বসে থাকবে না। আত্মকর্মসংস্থান কর, তাহলে চাকরিই তোমাদের পেছনে ঘুরবে। কিন্তু আত্মকর্মসংস্থানের জন্য কারিগরি শিক্ষা বিস্তারের প্রয়োজন রয়েছে। সেই শিক্ষা কীভাবে লাভ করা হবে, তা নিয়ে কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি। যুবসমাজকে যদি কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে কর্মসংস্থানের জন্য তারা কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে না। বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশে গমন করেন কর্মসংস্থান উপলক্ষে, তাদের জন্যও কারিগরি শিক্ষা অর্জনের প্রয়োজন রয়েছে। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত একজন ব্যক্তি বিদেশে গেলে তার চাহিদা অনেক বেশি থাকবে। বাংলাদেশের মানুষ সৃজনশীল ক্ষমতার অধিকারী। তারা যে কোনো বিষয় খুব সহজেই আত্মস্থ করতে পারে। তাই তাদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার উদ্যোগ নিলে তারা কর্মক্ষেত্রে ভালো করতে পারবে।
স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে সব স্তরে গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। কারণ ভালো এবং দক্ষ শিক্ষক ব্যতীত গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আর যারা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন, তারা যাতে কোনোভাবেই কোচিংয়ের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক শিক্ষককে দেখা যায়, তারা বিদ্যালয়ের চেয়ে কোচিং সেন্টারে সময় দিতে বেশি পছন্দ করেন। এদের কারণে শিক্ষা এখন অনেকটাই বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে উপযুক্ত এবং দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যেগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খণ্ডকালীন শিক্ষক এনে পাঠদান কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করে থাকে। এতে শিক্ষার মান খারাপ হচ্ছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেওয়ার আগে তাদের অবকাঠামো এবং অন্যান্য সুবিধা ঠিকমতো আছে কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে। শিক্ষা একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। শিক্ষা কখনোই বাণিজ্যিক পণ্য হতে পারে না। শিক্ষার প্রতি আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। অনেক দিন পর দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছে। এ যাত্রাকে অর্থবহ এবং আনন্দময় করতে হলে জাতিকে অবশ্যই জ্ঞানালোকে আলোকিত করে গড়ে তুলতে হবে।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


.jpg)