ভৌগোলিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবধান দূর করা যায়, তবে হাম নির্মূল এখনো সম্ভব। যদি স্বাস্থ্য শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা অব্যাহত থাকে, তবে হামই শেষ নয়, আরও রোগ ফিরে আসবে। আর সে মূল্য পরিসংখ্যানে নয়, গণনা হবে এমন সব শিশুর জীবনে, যাদের কখনোই হারানোর কথা ছিল না।...

একটা সময় ছিল, খুব বেশি দিন আগের নয়, যখন বাংলাদেশ হাম নিয়ন্ত্রণে নিজেদের সাফল্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে পারত। যখন বংলাদেশ তাদের টিকাদান কর্মসূচি ও কার্যক্রমের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পুরস্কৃত হয়েছে। বাংলাদেশ টিকাদানের আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছিল, শিশুমৃত্যু নাটকীয়ভাবে কমিয়েছিল এবং স্বল্পব্যয়ে কমিউনিটিভিত্তিক জনস্বাস্থ্যের একটি সফল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একসময়ের প্রাণঘাতী শিশুরোগ হাম তখন প্রায় নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে বলে মনে হচ্ছিল। সে আত্মবিশ্বাস এখন ভঙ্গুর হয়ে উঠছে। সম্প্রতি শিশুদের মধ্যে হাম সংক্রমক বৃদ্ধির খবর, ২ শতাধিক প্রতিরোধযোগ্য শিশুর মৃত্যু- এসব কেবল একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। এটি শুধু একটি ভাইরাসের বিষয় নয়, বরং আরও গভীর কিছু। এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য শাসনব্যবস্থার এক করুণ চিত্র ও ফাটল।
একটি প্রতিরোধযোগ্য ট্র্যাজেডির বিস্তার
হাম কোনো রহস্যময় রোগ নয়। এটি পৃথিবীর অন্যতম সংক্রামক ভাইরাস। একই সঙ্গে সবচেয়ে প্রতিরোধযোগ্য রোগগুলোর একটি। টিকার দুই ডোজ প্রায় পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করে। তবুও বাংলাদেশে এর পুনরুত্থান ঘটছে এবং শত শত শিশু মৃত্যুবরণ করছে।
সমস্যা টিকার অভাব নয়, সমস্যা হলো টিকা সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা এবং GAVI (Global Alliance for Vaccines and Immunisation)-এর যৌথ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো প্রায় ৫ লাখ শিশু পূর্ণ টিকাদানের আওতায় আসেনি, যদিও জাতীয় কভারেজ ৮১-৮২ শতাংশের কাছাকাছি। এ ঘাটতি কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়। এটি সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের একটি বড় অংশ তৈরি করছে, যাদের ওপর হাম দ্রত আঘাত হানতে পারে। স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যেই ২০২৬ সালে শিশুদের মধ্যে হাম সংক্রমণের ‘বৃদ্ধির ঢেউ’ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, যা নিউমোনিয়া ও মৃত্যুর মতো জটিলতার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। আজকের দিনে হামজনিত শিশুমৃত্যু একটি ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা, কারণ এটি হওয়ার কথা নয়।
উচ্চ কভারেজের ভ্রান্ত ধারণা
কাগজে-কলমে বাংলাদেশ ভালো করছে বলেই মনে হয়। সরকারি হিসাবে প্রথম ডোজে প্রায় ৯৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজে ৯০ শতাংশের বেশি কভারেজ দেখানো হয়। সংখ্যাগুলো চমকপ্রদ, কিন্তু এগুলো একটি বিপজ্জনক বাস্তবতাকে আড়াল করে। আসল সত্য হলো- কভারেজ সব জায়গায় সমান নয়। শহরের বস্তি, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল এবং বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী বিশেষ করে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে টিকাদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ইউনিসেফ বারবার উল্লেখ করেছে যে, টিকাদানের এ ঘাটতিগুলো মূলত দুর্গম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেই কেন্দ্রীভূত্র। এর ফলে এমন কিছু এলাকায় ‘হার্ড ইমিউনিটি’ ভেঙে পড়ে। হাম ছড়াতে জাতীয় ব্যর্থতার দরকার হয় না, স্থানীয় স্বাস্থ্য শাসনব্যবস্থার দুর্বলতাই যথেষ্ট।
যেখানে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে
হামের প্রাদুর্ভাবকে কেবল কারিগরি সমস্যা হিসেবে দেখা সহজ। যেমন- টিকা সরবরাহ, কোল্ড চেইন বা লজিস্টিক। কিন্তু প্রকৃত সমস্যা আরও গভীরে। এটি মূলত স্বাস্থ্য শাসনব্যবস্থার সংকট। স্বাস্থ্যশাসন নির্ধারণ করে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কীভাবে ব্যবস্থাগুলো সমন্বিত হয় এবং কীভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়। আর এ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জের মুখে।
প্রথমত, সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। সরকারি কর্মসূচি, এনজিও এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বয়ে গঠিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা একদিকে বিস্তৃত হয়েছে, অন্যদিকে তৈরি করছে বিভাজন। দায়িত্বের ওভারল্যাপ রয়েছে। বিশেষ করে শেষ পর্যায়ে সেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ফাঁকও রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, নজরদারি এখনো প্রতিক্রিয়াশীল। অনেক ক্ষেত্রে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর তা শনাক্ত হয়। কমিউনিটি পর্যায়ে রিয়েল-টাইম নজরদারি এখনো দুর্বল।
তৃতীয়ত, বৈষম্য কাঠামোগতভাবে বিদ্যমান। নীতিমালা জাতীয় হলেও বাস্তবায়ন স্থানীয়। লক্ষ্যভিত্তিক কৌশল ছাড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পিছিয়েই থাকে।
চতুর্থত, জবাবদিহি সীমিত। উচ্চ কভারেজের পরিসংখ্যান স্থানীয় ব্যর্থতাকে আড়াল করে। স্বাধীন যাচাই ও কমিউনিটি পর্যবেক্ষণ ছাড়া নিশ্চিত হওয়া কঠিন যে, প্রত্যেক শিশুর কাছে সেবা পৌঁছেছে। সংক্ষেপে, স্বাস্থ্য শাসনবাবস্থা কাজ করে ততক্ষণই যতক্ষণ পর্যন্ত না তা ভেঙে পড়ে।
বৈশ্বিক প্রবণতা থেকে সতর্কবার্তা
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা সতর্ক করে বলেছে, টিকাদান ব্যবস্থায় দুর্বলতা দেখা দিলে হামই প্রথম ফিরে আসে একটি ‘প্রাথমিক সতর্ক সংকেত’ হিসেবে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক তথ্য দেখায়, টিকাদান কভারেজ হ্রাস এবং বিলম্বিত প্রতিক্রিয়ার কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে হাম আবার বাড়ছে। শিক্ষাটি স্পষ্ট: জনস্বাস্থ্যের অগ্রগতি স্থায়ী নয়, এর অবনতি হতে পারে; এমনকি সহজেই উল্টে যেতে পারে।
টিকার বাইরে: আস্থার ঘাটতি
আরেকটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো আস্থা। কোভিড-১৯ সময়ে বিশ্বজুড়ে ভুয়া তথ্য ও টিকাবিরোধী মনোভাব বেড়েছিল। সৌভাগ্যবশত বাংলাদেশ সে প্রবণতা থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত ছিল। আমাদের অভিভাবকরা সাধারণত সন্তানের টিকাদানে সচেতন, বিশেষ করে শহুরে পরিবারগুলো সময়মতো টিকা দিতে আগ্রহী। তবুও, সামান্য অনীহাও ‘হার্ড ইমিউনিটি’কে দুর্বল করে দিতে পারে।
এখানেই ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন অতিমাত্রায় দুর্বল, অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ ও চরমভাবে ব্যর্থ উপদেষ্টাকে শুধু নিজের পূর্ব পরিচিত বলেই নিয়োগ দিয়ে এবং বিভিন্ন সময়ে তিনি চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়া সত্ত্বেও তাকে না সরিয়ে ড. ইউনূস দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার চরম ক্ষতিসাধন করে চলে গেছেন। ওই উপদেষ্টার সময়কালে ২০২৪ সালের শেষ দিকে জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচি বাতিল করা হয়। আরও উদ্বেগজনকভাবে, বিকল্প উৎস নিশ্চিত না করেই টিকা ক্রয়ের চুক্তি বাতিল করা হয়। আমাদের স্বীকার করতে হবে- টিকাদান শুধু একটি জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যক্রম নয়; এটি একটি সামাজিক চুক্তিও। অভিভাবকদের বিশ্বাস করাতে হবে যে, দেশে পর্যাপ্ত টিকা আছে, টিকা নিরাপদ, টিকাদান কার্যসূচি ও সেবা নির্ভরযোগ্য এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা তাদের পাশে আছে। এ আস্থা কেবল প্রচারণা দিয়ে তৈরি হয় না। এটি গড়ে ওঠে দীর্ঘমেয়াদি কমিউনিটি সম্পৃক্ততা, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং স্বচ্ছ যোগাযোগের মাধ্যমে।
কী কী পরিবর্তন জরুরি
শত শত শিশুর প্রাণহানি ঘটানো এ পরিস্থিতির মোকাবিলা শুধু জরুরি টিকাদান কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।
১. শুধু কভারেজ নয়, সমতা নিশ্চিত করা: জাতীয় গড় নয়, ‘জিরো-ডোজ’ শিশুদের চিহ্নিত করতে হবে।
২. নিয়মিত টিকাদান জোরদার করা: অভিযান শুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নিয়মিত সেবার বিকল্প নয়।
৩. রিয়েল-টাইম ডেটা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ: ডিজিটাল ট্র্যাকিং দ্রুত লক্ষ্যভিত্তিক প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে পারে।
৪. মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের ক্ষমতায়ন: কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা ও সহায়তা দিতে হবে।
৫. জবাবদিহি নিশ্চিত করা: স্বাধীন নিরীক্ষা, কমিউনিটি পর্যবেক্ষণ ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।
৬. জনআস্থা পুনর্গঠন: সচেতনতার বাইরে গিয়ে জনগণের কথা শুনতে হবে।
শাসনব্যবস্থার নৈতিক পরীক্ষা
মূলত, আজকের হামের এ প্রাদুর্ভাব শুধু স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা নয়। এটি স্বাস্থ্য শাসনব্যবস্থার একটি পরীক্ষা। টিকাদান জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও কার্যকর উদ্যোগগুলোর একটি। প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও উপকরণ আমাদের আছে। অবকাঠামোও যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান। তার পরও শিশুরা মারা যাচ্ছে। কারণ হাম অনিবার্য নয়, তবে আমাদের স্বাস্থ্য শাসনব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছে। বর্তমান প্রাদুর্ভাবের কারণ অনুসন্ধানে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য। এতে নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক ত্রুটি এবং সম্ভাব্য অবহেলা বা দুর্নীতির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা জরুরি। যাদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে এটি হয়েছে তাদের শনাক্ত করে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, যারা তাদের সন্তান হারিয়েছেন সেই পরিবারগুলোর কণ্ঠ শোনা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
একটি সতর্কবার্তা
বাংলাদেশের সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বর্তমান পরিস্থিতি এখনো পূর্ণমাত্রার সংকটে পরিণত হয়নি। এটি একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। অনেক দেশ এ সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে বড় সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশের অতীত সাফল্য আমাদের সম্ভাবনা দেখায়। বর্তমান বাস্তবতা আমাদের ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দেয়। যদি ভৌগোলিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবধান দূর করা যায়, তবে হাম নির্মূল এখনো সম্ভব। যদি স্বাস্থ্য শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা অব্যাহত থাকে, তবে হামই শেষ নয়, আরও রোগ ফিরে আসবে। আর সে মূল্য পরিসংখ্যানে নয়, গণনা হবে এমন সব শিশুর জীবনে, যাদের কখনোই হারানোর কথা ছিল না।
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সিনিয়র জনস্বাস্থ্যবিষয়ক নীতি উপদেষ্টা
