নির্বাচনের দিন ক্ষণ নিয়ে বিএনপির মধ্যে সংশয়-সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। দলটি মনে করছে, সংস্কারের অজুহাত দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন দেরি করতে চাইছে। আর এই কারণেই একের পর এক ইস্যু সামনে আনা হচ্ছে। বিশেষ করে সংস্কার ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হবে না- সরকার ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একাধিক নেতার এমন বক্তব্যে এই সংশয় আরও বেড়েছে। এ ছাড়া জুলাই সনদ তৈরিতে জামায়াতে ইসলামীর গণভোটের প্রস্তাব সামনে আনার ঘটনাটিও সন্দেহের চোখে দেখছে বিএনপি।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে গত রবিবার এই দাবি তুলে ধরে নতুন করে বিষয়টি সামনে এনেছে জামায়াত। এর আগে এনসিপিও গণভোটের কথা বলছে। তা ছাড়া সংস্কার নাকি নির্বাচন- কোনটি আগে এমন প্রশ্নে গণভোট আয়োজন হতে পারে বলে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন চলছে বেশ কিছুদিন ধরে।
যদিও সরকার এই বিষয়ে এখনো স্পষ্ট করে কিছুই জানায়নি। সর্বশেষ গত রবিবার ‘দি ইকোনমিস্টে’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘জাতীয় নির্বাচন চলতি বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে আগামী বছরের জুনের পরে হবে না।’
আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচনের কথা প্রধান উপদেষ্টা একাধিকবার বললেও বিএনপি তাতে আশ্বস্ত হতে পারছে না। দলটির অধিকাংশ নেতা মনে করেন, সরকার নানা কৌশলে নির্বাচন দেরি করতে পারে। আর এ জন্যই সম্প্রতি দলটি নানা ইস্যুতে সরকারকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে। একের পর এক দাবি নিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত থাকার ঘটনায়ও দলটির মনে এই সন্দেহ আরও বাড়ছে। জুলাই সনদ নিয়েও তাদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। এ জন্য বিএনপি আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন হলেও এখনই সে বিষয়ে রোডম্যাপ চাইছে। তবে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গেই দেশে প্রশাসনসহ সামগ্রিক পরিস্থিতি বিএনপির দিকে ‘ঝুঁকে’ পড়বে এমন আলোচনাও রয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় খবরের কাগজকে বলেন, ‘ডিসেম্বর থেকে জুনে নির্বাচন হবে তার কোনো রোডম্যাপ নেই। ফলে জুনে নির্বাচন হবে তার নিশ্চয়তা কী? নির্বাচনের পদ্ধতির বিষয়ে এখনো সরকার জাতির সামনে কিছু পরিষ্কার করছে না। প্রধান উপদেষ্টা এক কথা বলেন, আর তার প্রেস সচিব ও অন্য উপদেষ্টারা বলেন আরেক কথা। কার কথা সঠিক, তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ বাড়ছে। তবে পারস্পরিক প্রেক্ষাপট এবং জনগণের চোখ-মুখের ভাষা ও পালস বুঝে সিদ্ধান্ত নেবে বিএনপি।’
সূত্র জানায়, নির্বাচন প্রশ্নে সরকারের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ থাকার কারণেই সরকারকে নানামুখী চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে বিএনপি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যার বিচারের দাবিতে এক সপ্তাহ ধরে লাগাতার মাঠের কর্মসূচি পালন করছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। অন্যদিকে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে বসানোর দাবিতে নগর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি চলছে গত এক সপ্তাহ ধরে। এতে ওই এলাকায় এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এই আন্দোলন চলার মধ্যেই ইশরাক হোসেন ফেসবুক পোস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের কতিপয় ব্যক্তি প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘সর্বশক্তি দিয়ে এরা ঢাকায় বিএনপির মেয়র আটকানোর চেষ্টার মধ্য দিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচনে কী ভূমিকা পালন করবে, তা ক্লিনকাট (পরিষ্কার) বুঝিয়ে দিল।’
উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে সংস্কার বাস্তবায়ন, মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের জন্য মানবিক করিডর ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে না পরে- এ সব ইস্যুতে সরকারের সঙ্গে বিএনপির মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। সব শেষ আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞার বিষয়েও পুরোপুরি একমত পোষণ করেনি দলটি। বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধে প্রশ্নে এনসিপির ডাকে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিলেও বিএনপি সেখানে যায়নি। যদিও পরে ‘আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধে বিএনপি অত্যন্ত আনন্দিত’ বলে জানিয়েছিল দলটি।
সূত্র বলছে, কৌশলগত কারণে সরকারের বিরুদ্ধে ‘অলআউট’ আন্দোলনেও নামতে পারছে না বিএনপি। কারণ প্রথম দিন থেকেই তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন করে আসছে। ফলে সরকারকে বেশি চাপ বা বিতর্কের মধ্যেও তারা সহজে ফেলতে পারছে না। কারণ তাতে আবার বিতাড়িত আওয়ামী লীগ সুযোগ নিতে পারে, এমন আশঙ্কা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য খবরের কাগজকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার তো নির্বাচিত সরকার নয়। তারা কোনো স্থায়ী সরকারও নয়। ৯ মাস আগে যে চিত্র ছিল আজকে তো আর সেই চিত্র নেই। আগে সাধারণ মানুষ লাফালাফি-হইচই করেছে, আর এখন লাফালাফি হইচই করছে বিভিন্ন গোষ্ঠীর লোকজন। তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপার, ক্ষমতার ব্যাপার, টাকা-পয়সার ব্যাপার- অনেক কিছু চলে আসছে। ৯ মাস পর আজ এই পরিস্থিতি কেন হলো? জনগণ ক্রমেই সরকারের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলছে। সুশীল সমাজের বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল এক সেমিনারে বলেন, ‘বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নেওয়া এই সরকারের প্রধান দায়িত্ব। এই মুহূর্তে আমরা কোথায় যাচ্ছি, আগামী দিনে বাংলাদেশ কোথায় যাবে, এই সরকার কত দিন থাকবে, নির্বাচন কবে হবে, নির্বাচনের পরে বাংলাদেশ কোথায় যাবে- এ বিষয়গুলো নিয়ে সবার মনে কাজ করছে। এখানে আমরা কোনো নিশ্চয়তা দেখতে পাচ্ছি না।’
আর গতকাল সিলেটে এক সভায় স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘আমরা নির্বাচনের কথা বললে অন্তর্বর্তী সরকার খুব নারাজ হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন দাবি করবে না তো কী দাবি করবে?’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখন যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তাতে সরকারকে আর নির্বাচনপন্থি বলা যায় না। গণতন্ত্রপন্থি বলা যায় না।’ তিনি বলেন, ‘স্বৈরতন্ত্রের পতন হয়েছে কিন্তু তার কিছু সহযোগী দেশে থেকে গেছে। তাদের মধ্যে ক্ষমতার মোহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। তারা বন্দর বিদেশিদের দিয়ে দিচ্ছে, ব্যবসাবাণিজ্য নিজেদের নামে লিখে দিচ্ছে। কিন্তু নির্বাচনের কথা বললেই মনে হচ্ছে, তারা ওই কথা কখনোই শোনেনি। তারা নিজেরাই তাদের ব্যর্থতা জাতির সামনে তুলে ধরছে। সামনের দিনগুলোতে নির্বাচনের দাবি করলে হবে না, নির্বাচন আদায়ে প্রশ্ন দেখা দেবে।’
বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল খবরের কাগজকে বলেন, সংস্কার ও নির্বাচনকে সুকৌশলে একটা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। গত ১৫ মের মধ্যে সংস্কার ইস্যুতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু শেষ হয়নি। এখন বলছে আলোচনা চলবে। তবে অনির্দিষ্টকালের জন্য জনগণ তো ম্যান্ডেট দেয়নি। এতে দেশের বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, নানা দাবিদাওয়া নিয়ে রাজপথে মাঠে নামছে মানুষ। এতে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু এটা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অন্তর্বর্তী সরকারের নেই, একমাত্র নির্বাচিত সরকারের রয়েছে। কিন্তু তার পরও তারা নির্বাচনের সুস্পষ্ট কথা বলছে না, আর আইনের প্রয়োগও করতে পারছে না। সবমিলিয়ে দেশে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। নির্বাচনের দিনক্ষণ বললে জনমনে স্বস্তি ফিরে আসবে।
যা বলছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, বিএনপিকে প্রথম থেকেই সবাই কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে। সুশীল সমাজ, ছাত্ররা ও বামরা বিএনপিকে চাপে রেখেছে। ভুল কিছু পদক্ষেপ নেওয়ায় বিএনপিরও কিছুটা ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়েছে। ছাত্র-জনতার বিপ্লব ধারণ না করে একটা পাতা ফাঁদে পা দিয়েছে। জনগণকে ধারণ না করায় বিএনপির জনপ্রিয়তা আগের তুলনায় কমেছে।
তিনি বলেন, বিএনপিকে দুটি বিষয় পরিষ্কার করতে হবে। প্রথমত, ভারতের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান কী? দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন বা নিষিদ্ধের বিষয়ে দলের অবস্থান কী? কারণ বিএনপির কিছু কিছু নেতা আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পর তাদের বক্তব্য ঘিরে জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
দিলারা চোধুরী আরও বলেন, সরকার নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা না করে তাদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি করিডর নির্মাণ ও বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দিয়ে তাদের বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। এতে জনমনে অন্তর্বর্তী সরকার সম্পর্কে সন্দেহ বাড়ছেই।