নানা টানাপড়েন থাকলেও জাতীয় পার্টির (জাপা) খোলনলচে অনেকটা বদলে যাচ্ছে। দলটির মহাসচিব পরিবর্তনসহ শীর্ষ পদগুলোতে আসছে বড় ধরনের পরিবর্তন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান মহাসচিব মো. মুজিবুল হক চুন্নুর বদলে আসতে পারেন দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। যদিও মহাসচিব পদে আরও বেশ কয়েকজনের নাম শোনা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে দলটির ঢাকা বিভাগীয় অতিরিক্ত মহাসচিব ও নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা, প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়ার নামও শোনা যাচ্ছে। দলের মাঠপর্যায়ের নেতারা শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে পছন্দ করেন। জাপা চেয়ারম্যানও তাকে মনোনীত করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাঁচ বছর আগেই দলের তৃণমূল থেকে সর্বজনগ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে মহাসচিব করার আবেদন আসে চেয়ারম্যানের কাছে। তবে কো-চেয়ারম্যানদের চাপে পড়ে তিনি মো. মুজিবুল হক চুন্নুকে দলের মহাসচিব পদে বহাল রাখেন।
তৃণমূলের বেশ কয়েকজন নেতা খবরের কাগজকে বলেন, দলের অতিরিক্ত মহাসচিবদের মধ্যে শামীম হায়দার পাটোয়ারী তৃণমূলের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত রয়েছেন। দলের চেয়ারম্যান, মহাসচিবের পরে তৃণমূলের নানাসংকট সমাধানে শামীম হায়দার বেশি উদ্যোগী হয়েছেন। রাজনীতির বাইরে এসে তৃণমূল কর্মীদের ব্যক্তিগত নানাসংকটও দ্রুততম সময়ে তিনি সমাধান করেছেন বলে জানা গেছে।
লিয়াকত হোসেন খোকা সম্প্রতি জি এম কাদেরের ঘনিষ্ঠ হলেও আগে রওশন এরশাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে। তাকে দলের তৃণমূলের একাংশ পছন্দ করলেও অধিকাংশ নেতা-কর্মী তার ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছেন। রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, তিনি দলের চেয়ারম্যানকে ভুল তথ্য সরবরাহ করেন। এ ছাড়া বিগত সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, উপনির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে (সরাইল-আশুগঞ্জ) প্রভাব খাটিয়ে নির্ধারিত প্রার্থীকে সরিয়ে নিজে প্রার্থী হয়েছেন। নির্বাচনের আগে দলের হয়ে কোনো প্রচার তিনি করেননি। প্রতিটি নির্বাচনে জামানত হারিয়ে দলকে ডুবিয়েছেন বলে তার বিস্তর সমালোচনা হয়েছে। জাপার প্রেসিডিয়ামে তার অন্তর্ভুক্তি নিয়েও প্রশ্ন আছে তৃণমূলের।
এদিকে জি এম কাদেরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া তিন নেতাকে দল থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। তারা হলেন, দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কো-চেয়ারম্যান এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার ও মহাসচিব মো. মুজিবুল হক চুন্নু। দলের প্রেসিডিয়াম থেকে আরও বেশ কয়েকজন নেতাকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এ নেতাদের মধ্যে রয়েছেন সোলায়মান আলম শেঠ, নাজমা আকতার, নাসির মাহমুদ, জহিরুল ইসলাম জহির, মোস্তফা আল মাহমুদ, জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া ও আরিফ খান।
তবে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের এ প্রশ্নে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এ প্রসঙ্গে খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোনো নোটিশ না দিয়ে হুট করে কাউকে দল থেকে বাদ দেওয়া একেবারেই অগণতান্ত্রিক, গঠনতন্ত্রের নিয়মবিরোধী। সাতজন প্রেসিডিয়াম সদস্যকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে দলের প্রেসিডিয়াম সভাতেও কোনো কথা হয়নি। আমি ওয়েবসাইটে ঢুকে দেখি সাতজন নেতার বদলে অন্য সাতজন আনকোড়া লোককে দলের প্রেসিডিয়ামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা আর চেয়ারম্যানের সঙ্গে কোনো আলোচনা করতে চাই না।’
কাউন্সিল অধিবেশন ডাকার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ও জি এম কাদেরের বিরুদ্ধে ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করার উদ্যোগে দলের তৃণমূল নেতারা জি এম কাদেরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। দলের জন্য যারা ক্ষতিকর ও নেতিবাচক তাদের দল থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি তুলেছেন তারা। সম্প্রতি প্রেসিডিয়াম সভায় এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জি এম কাদের তার বিরোধীদের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছেন বলে খবরের কাগজ নিশ্চিত হয়েছে।
জি এম কাদের-ঘনিষ্ঠ একজন নেতা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, আলোচিত এই তিন নেতাসহ অনেকে বিগত সময়ে জি এম কাদেরকে চাপে রাখার জন্য শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে চলেন। এ জন্য আওয়ামী লীগ নেতারা বিভিন্ন সময়ে জি এম কাদেরকে চাপে রাখতেন। একপর্যায়ে তাকে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করেছেন। ওই একই নেতারা এখন সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে জি এম কাদেরকে চাপে ফেলার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে জাতীয় পার্টিকে ভাঙারও উদ্যোগ রয়েছে। এতে সরকারের ছোট্ট একটি মহলের ইন্ধন রয়েছে বলে জি এম কাদেরের কাছে খবর এসেছে। ফলে জি এম কাদেরের রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক না কেন তিনি এই নেতাদের সঙ্গে আর কোনো আপস করতে রাজি নন। এ কারণে তিনি দলের খোলনলচে বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জাপার দপ্তর সম্পাদক মাহমুদ আলম বলেন, ‘অতীতে যারা পতিত সরকারের সঙ্গে আপস করে চলেছে, যারা দল ভাঙতে চেয়েছে তাদের নিয়ে বরাবরই তৃণমূলের নেতাদের আপত্তি ছিল। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান যতবার স্বতন্ত্র রাজনীতি করতে চেয়েছেন, ততবার তারা বাধাবিঘ্ন সৃষ্টি করেছেন। এখন পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আমরা যখন নিজস্ব ধারায় রাজনীতি করতে চলেছি, তখন তারা চেয়ারম্যানের ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। তাদের নিয়ে তৃণমূল নেতাদের যে ওজর-আপত্তি, এবার চেয়ারম্যান তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।’
দলের মহাসচিব পদে পরিবর্তন নিয়ে এখন মুখ খুলতে নারাজ ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী ও লিয়াকত হোসেন খোকা। তবে তারা দুজনেই তৃণমূলের নেতাদের মতামতকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন।
ওদিকে জি এম কাদেরবিরোধী শিবিরকে চাঙা করতে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, রুহুল আমিন হাওলাদার রওশন-শিবির থেকে কাজী ফিরোজ রশীদ, গোলাম মসীহ্, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, সুনীল শুভ রায়দের দলে টানার চেষ্টা করছেন। বাদ পড়া সাত প্রেসিডিয়াম সদস্যের সঙ্গেও তারা যোগাযোগ করছেন। তাদের মধ্যে সোলায়মান আলম শেঠ বলেন, ‘চেয়ারম্যান আমাকে হুট করে প্রেসিডিয়াম থেকে বের করে দিয়েছেন। তিনি কেন তা করেছেন, তা আমি জানি না। এখন আমি রাজনীতি করব কি না, তা ভাবছি। যে পরিস্থিতি এখন নিজের ব্যবসার দিকেই মনোযোগ দেব।’
জহিরুল ইসলাম জহিরও আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি বলেন, ‘মরহুম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে দল করেছি। তার আদর্শেই রাজনীতি করি। আমি এর বাইরে গিয়ে কোনো কিছু করতে চাই না।’
আনিসুল ইসলাম মাহমুদ খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, তারা খুব শিগগির ঢাকায় জাপার দশম জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করবেন। এ কাউন্সিলের অনুমোদন নিতে তারা জাপার মহাসচিব মো. মুজিবুল হক চুন্নুর স্বাক্ষরে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন। তবে চেয়ারম্যানের অনুমোদন ছাড়া তারা এ চিঠি ইসিতে দিতে পারেন কি না, জানতে চাইলে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘এ ক্ষমতা মহাসচিবের রয়েছে।’
বিরোধী শিবিরের এমন উদ্যোগে মহাসচিব পরিবর্তনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে কি না, জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির দায়িত্বশীল নেতারা কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি। জাপার বর্তমান মহাসচিব মো. মুজিবুল হক চুন্নুকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি সাড়া দেননি।