এক বছরের ব্যবধানে আবারও বড় আকারে ভাঙন ধরল সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দল জাতীয় পার্টিতে। এ বছরের মে মাসে দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে যারা দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন বা যারা দল ছেড়ে চলে গেছেন; তারাই গতকাল শনিবার সম্মেলন করে আরও একটি ব্র্যাকেটবন্দি জাপার জন্ম দিলেন। এ নিয়ে মোট সাতবার ভাঙল আশির দশকে গড়ে ওঠা দল জাতীয় পার্টি (জাপা)।
জাপায় এ বড় ভাঙন ধরানোর নেপথ্যে রয়েছেন জাতীয় পার্টির একসময়ের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং সাবেক দুই কো-চেয়ারম্যান এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার ও মো. মুজিবুল হক চুন্নু।
বহিষ্কৃত অংশের নেতাদের দায়ের করা মামলায় জি এম কাদের যখন চেয়ারম্যান হিসেবে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না, তখনই এল বড় ভাঙনের ঘোষণা। মূল দলটিতে প্রভাবশালী নেতারা এখন কেউ রইলেন না। তবু মূল দলের মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী প্রত্যয়ের সঙ্গে বলেছেন, দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা জি এম কাদেরের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ আছেন।
আনিসুল ইসলাম মাহমুদ চেয়ারম্যান, এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার মহাসচিব
শনিবার (৯ আগস্ট) রাজধানীর গুলশানের একটি অভিজাত রেস্তোরাঁয় সম্মেলনের আয়োজন করেন জাপা থেকে বিভিন্ন সময়ে বহিষ্কৃত ও দলছুট নেতারা। এ নেতাদের কেউ কেউ এরশাদপত্নী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে ব্র্যাকেটবন্দি জাপায় যুক্ত হয়েছিলেন। কেউ কেউ জাপার রাজনীতি ছেড়ে বিভিন্ন নামসর্বস্ব দলে যোগ দিয়েছিলেন। আবার কেউ রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছিলেন।
সেই নেতারা এবার যে দলটির জন্ম দিলেন, সে দলটি জাতীয় পার্টি (আনিস-হাওলাদার) নামে পরিচিত হবে।
সম্মেলনে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ চেয়ারম্যান ও এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার জাতীয় পার্টির মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া কাজী ফিরোজ রশিদ সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও মুজিবুল হক চুন্নু নির্বাহী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এই সময় সারা দেশ থেকে আসা কাউন্সিলরদের পাশাপাশি প্রায় তিন হাজারের বেশি ডেলিগেট উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনে প্রথম অধিবেশনের উদ্বোধনী আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। স্বাগত বক্তব্য দেন এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার। সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন মুজিবুল হক চুন্নু।
বক্তব্য রাখেন জাতীয় পার্টি (জেপি) মহাসচিব শেখ শহিদুল ইসলাম, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) প্রেসিডিয়াম সদস্য দিদারুল আলম দিদার, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (মতিন) মহাসচিব জাফর আহমেদ জয়।
ব্র্যাকেটবন্দি জাপা এক কাতারে আসবে
সাত দফায় বিভক্ত জাতীয় পার্টির সব অংশকে এক কাতারে নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছেন নতুন দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘আজ থেকে জাতীয় পার্টি একক নেতৃত্বে চলবে না। জাতীয় পার্টি পরিচালিত হবে যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে। এখন থেকে জাতীয় পার্টিতে আর বিভাজনের আশঙ্কা নেই। বরং খণ্ডিত জাতীয় পার্টিগুলোকে এক ছাতার নিচে নিয়ে এসে ঐক্যবদ্ধ করে পল্লিবন্ধু এরশাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ শুরু করব।’
রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘জাতীয় পার্টিকে আমরা নিয়ে যাব সাধারণ মানুষের কাছে। ফিরিয়ে দেব তৃণমূলের মর্যাদা। পল্লিবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের গড়া জাতীয় পার্টি কারও একক সম্পত্তি নয়। এই পার্টি জনগণের আশা ও অধিকার রক্ষার আন্দোলনে রাজপথে থাকবে। আমরা দেশের মানুষকে নতুন পথ দেখাতে চাই। জাতীয় পার্টি এখন শুধু বিরোধী শক্তি নয়। আমরা হয়ে উঠতে চাই জাতির বিকল্প নেতৃত্ব।’
নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের কথা উঠছে। কিন্তু কীভাবে নির্বাচন হবে। আদৌ নির্বাচন হবে কিনা জানি না। তা ছাড়া দেশে এখন যে পরিবেশ বিরাজ করছে, তাতে নির্বাচন কী দরকার। বড় দুই দলের মধ্যে আসন ভাগাভাগি করে নিলে নির্বাচনের খরচ বাবদ ২ হাজার কোটি টাকা বেঁচে যায়।
সংস্কার প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘এখন সরকার বলছে, সংস্কার করতে হবে। সংস্কার কি আমরা করিনি। শিক্ষানীতি, ওষুধনীতি, উপজেলা পদ্ধতি- সবই সংস্কারের অংশ ছিল। এখন সংস্কারের জন্য বিদেশ থেকে লোক ভাড়া করে আনতে হয়। তারা কীভাবে সংস্কার করবে। তারা সংস্কারের প্রস্তাব দিতে পারে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করতে হলে নির্বাচিত সংসদ লাগবে।’
সভাপতির বক্তব্যে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, সবাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন। কিন্তু ক্ষমতায় যারা থাকেন তাদের দুর্নীতি চোখে পড়ে না। ক্ষমতা থেকে গেলেই দুর্নীতির মামলা হয়। আবার ক্ষমতায় এলে দুর্নীতির মামলা উঠে যায়।
যারা মূল স্রোতের বাইরে গিয়েছেন, তারা নিশ্চিহ্ন হয়েছেন: পাটোয়ারী
বিভিন্ন সময়ে জাতীয় পার্টি (জাপা) থেকে বহিষ্কৃত ও দল ত্যাগ করা নেতারা যখনই নতুন দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী।
শনিবার সকালে রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় তরুণ পার্টির সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।
শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘মূল স্রোতের বাইরে গিয়ে যারা জাতীয় পার্টিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চেয়েছেন, তারাই নিশ্চিহ্ন হয়েছেন। জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেবেন পল্লিবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও জি এম কাদেরের অনুসারীরা। জি এম কাদেরের নেতৃত্বে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ আছেন।’
কোনো ষড়যন্ত্রে বিভ্রান্ত না হয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান জাতীয় পার্টির মহাসচিব।