ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কাছে পরাজয়ের পর একই চিত্র দেখা গেল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনেও। দেশের দুটি বড় ক্যাম্পাসের টানা দুই নির্বাচনে শিবিরের উত্থান ও ছাত্রদলের পরাজয় এখন সাধারণ ছাত্রদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
গত ১১ সেপ্টেম্বর শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জাকসুর ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয় ২১টি হলে। এই নির্বাচনে জাকসুর ২৫টি পদের মধ্যে ২০টিতে জয় পেয়েছে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল। এর মধ্যে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও দুটি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ (এজিএস) সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ দখল করে তারা। অন্যদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্যানেল থেকে সহসভাপতি (ভিপি) পদে আবদুর রশিদ জিতু একাই নির্বাচিত হয়েছেন। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা দুটি করে পদে বিজয়ী হন।
সাংগঠনিক দুর্বলতায় শিবিরের সঙ্গে পেরে উঠেনি ছাত্রদল
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে জাবিতে গোপনে সংগঠন গোছানোর কাজ করেছে ছাত্রশিবির। ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ও বাম সংগঠনের ভেতরে মিশে থেকে সাংগঠনিক শক্তি গড়ে তোলে তারা। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরে প্রশাসনেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। বিপরীতে ছাত্রদল ছিল নেতৃত্ব সংকটে, অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত এবং সাংগঠনিক দুর্বলতায় ভুগছিল তারা। এসব কারণে ভোটের মাঠে শিবিরের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি তারা।
সাবেক ছাত্রদল নেতা ও জাকসুর সাবেক ভিপি আশরাফ উদ্দিন খান ছাত্রদলের সাংগঠনিক দুর্বলতাকে প্রধান বাধা হিসেবে দেখছেন হারের জন্য। তিনি বলেন, ‘ছাত্রদল দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসে কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। কমিটি গঠন হলেও সাংগঠনিক অব্যবস্থাপনার জন্য তা অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। বিপরীতে ছাত্রশিবির কৌশলগতভাবে নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছে। তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশতে পেরেছে।’
এ বিষয়ে কথা হয় ছাত্রদলের প্যানেল থেকে হল সংসদে তিনবার নির্বাচিত সমাজসেবা সম্পাদক ও বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মোস্তফা নাজমুল মানছুর তমালের সঙ্গে। ছাত্রদলের পরাজয়ের জন্য সাংগঠনিক দুর্বলতাকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘ছাত্রদল দীর্ঘ ১৫ বছর ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতে না পারায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।’
শিবিরের উত্থান: ৩৬ বছর পর প্রকাশ্য জয়
১৯৮৯ সালের ১৫ আগস্ট জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হন ছাত্রদল নেতা হাবিবুর রহমান (কবির)। ওই ঘটনার পর থেকে দীর্ঘ ৩৫ বছর ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে পারেনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত বছরের নভেম্বরে ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করে ছাত্রশিবির। এরপর জাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল দেয় সংগঠনটি।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, জাকসু নির্বাচনে শিবিরের জয়ের ক্ষেত্রে সংগঠনটির নিজস্ব ভোটব্যাংক, সাংগঠনিক পরিচিতি ও দক্ষতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতার অনুপস্থিতি ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করার পর থেকে কর্মসূচিতে নারী নেতৃত্বের অন্তর্ভুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ ভোটারদের মধ্যে তাদের প্রতি আস্থা বাড়িয়েছে। মূলত শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাদের সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবমূর্তিই ছিল জয়ের প্রধান নিয়ামক।
ছাত্রশিবির সম্পর্কে কবির হত্যাকাণ্ড নিয়ে নেতিবাচক ধারণা, নারীদের নিরাপত্তা ও পোশাকের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার শঙ্কার বিষয়টিকে বিবেচনায় নেয় সংগঠনটি। নানা পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের এসব ধারণা ও শঙ্কার বিষয়গুলো দূর করতে কাজ করে তারা। ক্যাম্পাসে আয়োজন করে হেলথ ক্যাম্প। ওই কর্মসূচিতে পুরুষের চেয়ে দ্বিগুণ নারী স্বেচ্ছাসেবী রাখা হয়। এ ছাড়া জাকসু নির্বাচনে সমন্বিত শিক্ষার্থী প্যানেলে ছয় নারী প্রার্থী রাখা হয়। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরও প্রার্থী করা হয়।
গত বছরের অক্টোবরে ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরুর পর থেকে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পবিত্র কোরআন শরিফ বিতরণ, ১৬ ডিসেম্বরে বিজয় দিবস উপলক্ষে কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন, শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, শিক্ষার্থী বৃত্তি, শীতের পোশাক বিতরণ, জুলাইয়ে আহত ব্যক্তিদের সম্মাননা, কোরবানির ঈদে শিক্ষার্থীদের জন্য মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন ও অসুস্থদের সহায়তা প্রদানসহ নানা কার্যক্রম চালিয়েছে সংগঠনটি। ক্যাম্পাসে আত্মপ্রকাশের পর থেকে এ পর্যন্ত ছাত্রশিবির দলীয় কোন্দল কিংবা কোনো ধরনের সংঘর্ষের ঘটনায় জড়ায়নি। ক্যাম্পাসে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে ছাত্রশিবির থাকলে ছাত্রদল সেখানে উপস্থিত থাকবে না, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলেও শিবির বিষয়টি নিয়ে বিতর্কে জড়ায়নি। সংগঠনটি আত্মপ্রকাশের পরপরই বাম সংগঠনের পক্ষ থেকে শিবিরবিরোধী মশালমিছিল হলে বিষয়টিকে ‘গণতান্ত্রিক চর্চা’ হিসেবে শিবিরের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে স্বাগত জানানো হয়। নির্বাচনি প্রচারণায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসব বিষয় তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা ছিল ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীদের।
তবে ছাত্রদলের শাখা সদস্যসচিব ওয়াসিম আহমেদ অনিক বলেন, ‘ছাত্রদলের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে। নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ছিল, যাতে একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীকে জয়ী করা যায়।’ কোন্দলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ছাত্রদলের ভেতরে কোনো ধরনের কোন্দল নেই। তবে স্বীকার করতে হবে, এই বছরের জানুয়ারির আগে দীর্ঘদিন সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো ছিল না। এটা একটি দিক হতে পারে। আমাদের মধ্যে মনোমালিন্য থাকলেও সবাই সংগঠনকে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। জাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের ভেতরের কোনো দুর্বলতা প্রভাব ফেলেনি, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিলাম।’
শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফফান আলী নির্বাচনে অনিয়ম, জামাতের প্রতিষ্ঠান থেকে পরিকল্পিত ওএমআর শিট ও মেশিন ক্রয়, শিবিরের গুপ্ত রাজনীতির কৌশল, ছাত্রদলের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা প্রচার ও মব সৃষ্টিসহ বিভিন্ন বিষয়কে ছাত্রদলের পরাজয়ের পেছনে কারণ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘শিবির দীর্ঘদিন হলে থাকার সুযোগ পেয়েছে, তারা রাজনীতি করেছে। ছাত্রদল সে সুযোগ পায়নি। এদিক থেকে সাংগঠনিকভাবে পিছিয়ে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিছু ছিল সত্য, কিন্তু জাকসুতে সেটার কোনো প্রভাব ছিল না। জাকসুতে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করেছে। তা ছাড়া জাকসুতে ছাত্রদলের যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে সাংগঠনিক হিসেবে তারা শিবিরের থেকে তুলনামূলক নবীন।