প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চারজন রাজনীতিবিদ সফরসঙ্গী হিসেবে জাতিসংঘের অধিবেশনে যাচ্ছেন। এই সফর নিয়ে দেশের রাজনীতিতে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, মূলত জুলাই সনদ, পিআর পদ্ধতিতে (ভোটের সংখ্যানুপাতিক হারে সংসদে প্রতিনিধিত্ব) নির্বাচনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সৃষ্ট দূরত্ব কমানোর জন্যই এই উদ্যোগ। সরকারের তরফ থেকে চিন্তাভাবনা করে তিন দল থেকে চারজন নেতাকে প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী করা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী চারজন রাজনীতিবিদ হলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য আখতার হোসেন।
রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাতে নিউইয়র্কের উদ্দেশে দেশ ছাড়বেন তারা। আগামীকাল সোমবার তারা নিউইয়র্কে পৌঁছাবেন। আর দেশে ফিরবেন আগামী ২ অক্টোবর।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মূলত দুটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে এই সফরের আয়োজন করা হয়েছে। প্রথমত, জাতিসংঘসহ বিশ্ববাসীকে বার্তা দেওয়া যে, শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদবিরোধী বৃহত্তর রাজনৈতিক দলগুলো একাট্টা আছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে কোনো বিষয়ে আলোচনা হলে তা নিয়ে নানা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এ জন্য বিদেশে বসে তারা যেসব ইস্যুতে মতপার্থক্য রয়েছে, সেই ইস্যুগুলোতে আলাপ-আলোচনা করে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করবেন।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘যেকোনো রাজনৈতিক আলোচনা দেশের মধ্যে কি করা যায় না? দেশের মধ্যে আলোচনা করলে, বিফ্রিং করলে জনগণ জানতে পারে।’
জানা গেছে, জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন, সংসদের উভয়কক্ষে পিআর পদ্ধতিতে ভোট, স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করাসহ নানা ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে জামায়াত ও এনসিপির। তবে এনসিপি সংসদের নিম্নকক্ষে পিআর পদ্ধতিতে ভোটের বিপক্ষে, তারা শুধু সংসদের উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন চায়। যতদূর জানা গেছে, বিএনপি উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতির ব্যাপারে ছাড় দিতে পারে। এ ছাড়া অন্যান্য ইস্যুতে দূরত্ব কমানোর বিষয়েও আলোচনা হবে। বিশেষ করে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংস্কার প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর সংখ্যা কমিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকার চায়, সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে আগামী ফেব্রুয়ারিতে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা। কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ তৈরি হলে সেই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করছে অন্তর্বর্তী সরকার।
সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের বেশির ভাগ উপদেষ্টা ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন করার ব্যাপার একমত। কয়েকজন উপদেষ্টা ইতোমধ্যে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে তারা ফেব্রুয়ারির পর আর থাকবেন না। ফলে সবদিক বিবেচনা করে সরকার ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের করার ব্যাপারে অনড়। এ জন্য সব রাজনৈতিক দলকে একই চিন্তায় আনার চেষ্টা করছে।
যদিও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম শনিবার (২০ সেপ্টেম্বর) এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল সম্পৃক্ত ছিল। এই রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের অংশীজন। প্রধান উপদেষ্টা নিজে রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এবার জাতিসংঘের ৮০তম অধিবেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বিশ্বনেতা সেখানে আসবেন, সেখানে তাদের সঙ্গে মিশতে পারবেন। তারপর রোহিঙ্গা সম্মেলনে অংশ নিতে পারবেন।’ শুধু তিন দল কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখানে তো আপনাদের রিসোর্সের সীমাবদ্ধতা দেখতে হবে। জাতিসংঘের অধিবেশন কিন্তু তিন মাস ধরে চলে, হয়তোবা সরকার ভেবে দেখবে পরে আবার নতুন কাউকে পাঠাতে হয় কি না।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সফরসঙ্গী ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির খবরের কাগজকে, ‘প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে আমরা জাতিসংঘের অধিবেশনে যাচ্ছি। রাষ্ট্রের আগ্রহ আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ আছি। মূলত বহির্বিশ্বে আমরা আমাদের ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যর দৃষ্টান্ত রাখতে চাই। বাংলাদেশের জাতীয় বিষয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার জন্য প্রধান উপদেষ্টাকে সহযোগিতা করছি। এর মধ্য দিয়ে আগামী দিনে কেমন বাংলাদেশ হবে তার বার্তা বহির্বিশ্বকে দিতে চাই।’ তিনি বলেন, সফরে অনেক বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও হতে পারে। এটা স্বাভাবিক।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘তারা কী জন্য বিদেশে যাচ্ছেন সবকিছু এখনো পরিষ্কার নই। সফরসঙ্গী হিসেবে যেখানে যেখানে কথা বলা লাগবে তিনি (ডা. তাহের) কথা বলবেন। আলোচনার জন্য বিদেশে যাওয়ার দরকার নেই। এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আলোচনা-সংলাপ এখনো চলছে। এটার সমাধান দেশে বসেই করা সম্ভব।’
এ বিষয়ে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন খবরের কাগজকে বলেন, এবারের সফরে প্রধান উপদেষ্টা তার ম্যাডেন্ট দেখানোর চেষ্টা করবেন। চারজন নেতাকে নিয়ে তিনি অ্যালায়েন্স (জোট) দেখাবেন। রাজনৈতিক দলগুলো তার সঙ্গে আছে, তা দেখাবেন।’
তিনি আরও বলেন, সফরসঙ্গী হিসেবে চারজনই গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা চলমান বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এককভাবে কেউ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। সবকিছু সব দলের সর্বোচ্চ দলীয় ফোরামে আলোচনার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।
ইতোমধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনসহ অভিন্ন ৫ দফা নিয়ে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছে জামায়াতে ইসলামীসহ ৭টি ইসলামপন্থি দল, যা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার জন্য পাল্টা কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। এমন পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য ধরে রাখা এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেকার দূরত্ব কমিয়ে আনার জন্য ইতোমধ্যে ৯টি রাজনৈতিক দলও উদ্যোগ নিয়েছে। দলগুলো হলো গণতন্ত্র মঞ্চের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন ও ভাসানী জনশক্তি পার্টি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ও গণ-অধিকার পরিষদ। তারা নিজেদের মধ্যেও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকও করেছেন। দলগুলোর প্রত্যাশা, আলোচনার মধ্য দিয়ে একটা সমাধান বেরিয়ে আসবে। এতে করে চলতি মাসের মধ্যেই দুই দলের মধ্যে সৃষ্ট দূরত্ব ঘুচিয়ে আনা সম্ভব হবে। জুলাই সনদের সাংবিধানিক ও আইনগত বিষয়ে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ূম, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন ও এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সানী আবদুল হককে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানকে। মোটাদাগে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনতে সব ধরনের চেষ্টা চলছে।