আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহকে নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় ধরে নিয়ে ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা-চরভদ্রাসন-সদরপুর) আসনের প্রার্থীরা ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। দলীয় প্রতীকের প্রচারে তারা ব্যস্ত সময় পার করছেন। দেশের রাজনীতিতে এই আসনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। পদ্মা সেতু হওয়ায় এই আসনের ওপর দিয়ে গেছে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে। রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে এই আসনটি রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করেছে। এসব কারণে ভৌগলিকভাবে আসনটির গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি। সবদিক বিবেচনায় এটি জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসন। তাই ভোটে অংশ নেওয়া প্রতিটি দল আসনটি নিজেদের দখলে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে স্বাধীনতার পর থেকে আওয়ামী লীগ ও শেখ পরিবারের দখলে থাকা আসনটিতে এবার বিএনপির প্রার্থী তুলনামূলক এগিয়ে আছেন।
ভাঙ্গা, চরভদ্রাসন ও সদরপুর উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, ভোটে অংশ নেওয়া প্রতিটি দলের প্রার্থীরা পুরোদমে নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছেন। প্রার্থীরা নিয়মিত গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ করে নির্বাচনি মাঠ গোছাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি মিলাদ-মাহফিল, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। এ ছাড়া যারা জুলাই আন্দোলনে শহিদ বা আহত হয়েছেন, তাদের বাড়ি গিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীরা খোঁজ নিচ্ছেন। পরিবারের সদস্যদের সহায়তা করছেন। নির্বাচনি প্রচারের পাশাপাশি প্রার্থীরা তাদের প্রতীক সম্বলিত ব্যানার-ফেস্টুন তিন উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে স্থাপন করছেন। চায়ের দোকানেও বইছে ভোটের আমেজ।
জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত (১৯৯৬ সাল ছাড়া) আসনটি ছিল আওয়ামী লীগের দুর্গ। ২০১৪ সালে শেখ পরিবারের অন্যতম সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোট করে নির্বাচিত হন। তারপর থেকে ২০২৪ সালের ভোট পর্যন্ত তিনি এখানে একক আধিপত্য কায়েম করেন। তবে গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই আসনের রাজনীতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এ আসনে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী নেই। বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বাবুল তার ‘ক্যারিশমেটিক রাজনীতি’ দিয়ে আসনটিতে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করেছেন। অন্য দলের প্রার্থীরা এখানে রীতিমতো কোণঠাসা। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছাড়া বিএনপি এখান থেকে আর কখনো জিততে পারেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপি থেকে আসনটিতে মনোনয়ন পেয়েছেন কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল। মনোনয়ন পাওয়ার আগে থেকেই তিনি এখানে ব্যাপক গণসংযোগ করেন। এ ছাড়া বিএনপি ও অঙ্গসংঠনের নেতা-কর্মীদের নিয়ে তৃণমূলে ব্যাপক কাজ করেন। ফরিদপুর-২ আসনের বাসিন্দা হওয়ায় তিনি প্রথমে সেখান থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। পরে দলের নির্দেশে ফরিদপুর-৪ আসনে তিনি নির্বাচনি কাজ শুরু করেন। আসনটিতে জামায়াত থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে ভাঙ্গা উপজেলার আমির সরোয়ার হোসেনকে। তিনিও সভা-সমাবেশ করে ভোটারদের মন জোগানোর চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া খেলাফত মজলিসের জেলার সহসভাপতি মিজানুর রহমান মোল্লা, ইসলামী আন্দোলনের ইসাহাক হোসেন, সিপিবির ভাঙ্গা উপজেলার সভাপতি আতাউর রহমান, স্বতন্ত্র প্রার্থী মুজাহিদ বেগ ও রায়হান জামিল মাঠে তৎপর রয়েছেন।
নির্বাচনি মাঠ ঘুরে জানা গেছে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে রায়হান জামিল বেশ তৎপর রয়েছেন। এক টাকা কেজি গরুর মাংস ও ১০ টাকায় ১ কেজি ইলিশ মাছ বিতরণ করে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
চরভদ্রাসন উপজেলার বাসিন্দা লাভলু মিয়া বলেন, ‘এই আসনে বিএনপি বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। বিএনপির প্রার্থী নির্বাচনি প্রচারে দিন-রাত সমানতালে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি সবার থেকে এগিয়ে আছেন।’
সদরপুর উপজেলার ভোটার আবুল বাসার বলেন, ‘আমরা একটি সুষ্ঠু সুন্দর নির্বাচন দেখতে চাই। সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে– একটি লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তারা করে দেবে। এবারে নির্বাচনে আমাদের ভোট হবে উন্নয়নের পক্ষে।’ ভাঙ্গা উপজেলার ভোটার রবিউল বলেন, ‘যিনি আমাদের আসনের জন্য কাজ করবেন, আমরা তাকেই ভোট দেব। বিশেষ করে ভাঙ্গা নিয়ে যার বিশেষ পরিকল্পনা থাকবে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’
নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপির প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বাবুল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। ছাত্রদল থেকে শুরু করে যুবদল হয়ে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছি। ফ্যাসিস্ট সরকারের মার খেয়ে রক্তে রঞ্জিত হয়েছি। ১২৮টি মামলা কাঁধে নিয়ে এলাকার জনগণের জন্য কাজ করেছি। আমার ওপর নীতিনির্ধারক মহলের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। আমার ত্যাগ বিবেচনা করে তারা এ আসনে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। আশা করি এবার ধানের শীষের পক্ষেই জনগণ রায় দেবেন।’
স্বতন্ত্র প্রার্থী রায়হান জামিল বলেন, ‘আমি বিভিন্নভাবে ভোটারদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। তাদের দাবি জানার চেষ্টা করছি। নির্বাচিত হতে পারলে এসব দাবি পূরণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মিজানুর রহমান মোল্লা জয়ের ব্যাপার আশাবাদী। বলেন, ‘জিততে পারলে ইসলামিক নিয়ম-নীতি মেনে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি সুন্দর সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করব। প্রতিটি সেক্টরের উন্নয়নে ভূমিকা রাখব।’
জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘জামায়াতকে শক্তিশালী করতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি– আমি মানুষের মধ্যে জায়গা করে নিতে পেরেছি। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইসলামি দলগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা এসেছে। আশা করছি এবারের নির্বাচনে তারা আমাকে নির্বাচিত করবেন।’